-"কেন করছ আমার বোনের সাথে এমন? কি ক্ষতি করেছিল আমার বোন তোমার? নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসতো তোমায়। তোমাদের জন্য কি না করেছে ও? সব সময় তোমাদের পাশে থেকেছে। আর তার সাথেই কি-না এমন করলে তোমরা?"
প্রীতি ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে। রাইসা লামিয়া ও নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। সবাই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে। তবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। উমাইরা আর নেই, চলে গেছে সে। এই অপরাধবোধ নিয়ে কিভাবে থাকবে তারা? প্রীতি নিজেকে সামলে নিয়ে কান্না মাখা কন্ঠে বলল—
-"আমরা যখন ক্লাস নাইনে পড়তাম, তখন আমি আমদের কলেজের এক সিনিয়র ভাই নাম আরিফিন, তাকে পছন্দ করতাম। কিন্তু সে পছন্দ করত উমাইরাকে। তবে উমাইরা বিষয়টা জানত না।
আমরা দু'জন একদিন স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটছিলাম। তখনই কোথা থেকে আরিফিন ভাই এসে উমাইরাকে প্রোপজ করে। তবে উমাইরা সাথে সাথে রিজেক্ট করে দেয়।
সেইদিন থেকে আমার মনে ওর জন্য হিংসার সৃষ্টি। আমি ভাবতাম কেন সব ভালো ওর হয়? কেন সবাই ওকে ভালোবাসে? আমি ওর চেয়ে সুন্দর, গুণবতী তবে কেনো আমাকে ভালো না বেশে আরিফিন ভাই উমাইরাকে ভালবাসলেন?
শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আমি প্রতিহিংসায় মত্ত হয়ে পড়ি। তারপর, একদিন জানতে পারলাম রাইসা ও লামিয়ার সম্পর্ক ভেঙেছে, তখন ওদের ভুল ভাল বুঝায় আমি।
উমাইরার বিরুদ্ধে উস্কে দেই, ওরা পড়ে বিশ্বাস করে উমাইরাই কারনে ওদের সম্পর্ক নষ্ট হয়। এমন কি ওই ছেলেদের ও আমিই শিখিয়ে দেই কি বলতে হবে।
এইভাবে রাইসা লামিয়া ও দূরে সুরে আসে, উমাইরার প্রতি রাগ ক্ষোভ জমতে শুরু করে ওদের মনে। ওদের কোনো দোষ নেই আমি ওদের ভুল ভাল বুঝেছিলাম বলেই ওরা এমন করেছে।"
তারপর আবারও কান্নায় ভেংগে পরে প্রীতি। উপস্থিত সকলেই হতবিহ্বল। সবাই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রীতির দিকে, কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না যেন।
হিংসা মানুষকে কোন পর্যায়ে নামিয়ে নিতে পারে। অয়ন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। তার ভালোবাসার মানুষ তারই বোনকে এতটা আঘাত দিয়েছে? আর সে কিছু না জেনে বুঝেই নিজের বোনকে আঘাত করেছে, অপমান করেছে। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে অয়নের।
কান্না থামিয়ে লম্বা একটা শাস নিয়ে, এগিয়ে গেলো আজাদ রহমানের সামনে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, দুই হাত জোড়ো করে প্রীতি আবারও বলতে শুরু করলো—
-"আমাকে ক্ষমা করুন, আমি অনুতপ্ত। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আমি অন্যায় করে ফেলেছি। নিজের সব চেয়ে কাছের ও প্রিয় বান্ধবীকে ক্ষতবিক্ষত করেছি।
আমি জানি মারের দাগ শুকিয়ে যায়, তারপর মানুষ সেই মারের কথা ভুলেও যায়। তবে কথার আঘাত! কথার আঘাত কোনো দিন ভোলা যায় না। সারাজীবন সঙ্গ দেয়।
আমি সেই অস্ত্রই প্রয়োগ করেছি আমার প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর ক্ষেত্রে। কথার বান ছুঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করেছি। তার হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণ আমি দেখেও দেখতে চাই নি। প্রতিহিংসা আমকে অন্ধ করে ফেলেছিল। আমি সব দোষ স্বীকার করছি আমকে ক্ষমা করুন।
আজাদ রহমান নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখের অভিব্যক্তি বোঝা দায়—শোক, রাগ না অপমান, স্পষ্ট নয় কিছুই। কিন্তু কণ্ঠে ছিল অটল দৃঢ়তা। শান্ত স্বরে, কিন্তু তীক্ষ্ণ উচ্চারণে তিনি অয়নের উদ্দেশে বললেন—
-"ওদের এখনই বেরিয়ে যেতে বলো। আমার মেয়েকে চরিত্রহীন বলা! এত বড় সাহস ওরা কোথায় পায়? এই মুহূর্তেই চলে যাও আমার চোখের সামনে থেকে, আর কোনোদিন এসো না!"
কথা শেষ করেই হনহন করে চলে গেলেন নিজের কক্ষে। তাঁর পেছন পেছন বাকিরাও নীরবে প্রস্থান করলেন।
রয়ে গেল কেবল অয়ন, প্রীতি রাইসা আর লামিয়া। বিধ্বস্ত, স্তব্ধ। কারও মুখে কোনো কথা নেই, যেনো শব্দগুলো গলায় এসে থমকে গেছে।
অয়ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কারও দিকে না তাকিয়েই, নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে।
---------------------------------
প্রীতির জীবনেও ঝড় নামে। রাইসা আর লামিয়া একসময় ওর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছিল। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয় প্রীতির প্রিয়জনরাও। একা হয়ে পড়ে প্রীতি। সব দিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে নিজেকেই দায়ী করতে শুরু করে। উমাইরার সঙ্গে করা অন্যায়, অয়নের বদলে যাওয়া আচরণ, রাইসা-লামিয়ার বিচ্ছেদ, সবকিছু মিলিয়ে এক তীব্র অনুশোচনার ঘূর্ণিপাকে ঘুরপাক খেতে থাকে ও।
সবকিছু জানার পর অয়ন আর প্রীতির সম্পর্কে ফাটল ধরে। অয়ন কিছুতেই প্রীতিকে মেনে নিতে পারছিল না। যতবার প্রীতির মুখোমুখি হয়েছে, ততবারই বোনের ওপর করা অন্যায়গুলো ওর মনে ঝড় তুলেছে। ফলে প্রীতির প্রতি ওর আচরণ দিন দিন রুক্ষ হয়ে উঠেছে—অনেক সময় ওকে অপমানও করেছে অয়ন।
কিন্তু অয়নের সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল নিজের সঙ্গে। নিজের ভেতরেই এক ধরণের ঘৃণা জন্মেছিল, নিজেকেই সহ্য হচ্ছিল না ওর। যাকে ভালোবেসে এসেছিল এতোদিন, সেই মানুষটাই তার বোনকে আঘাত করেছে বারবার। নিজের বোনের প্রতি এই অবিচার, অয়ন নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিল না।
একদিন অয়ন জানায়—সে প্রীতিকে বিয়ে করতে পারবে না। অয়নের বাবা-মা-ও এই সিদ্ধান্তে সহমত জানান। শেষ পর্যন্ত, তিনজন একসাথে প্রীতিদের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টা জানাতে আসেন।
তবে এমন একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে—তা কেউ কল্পনাও করেনি।
বাড়ির ভেতর হুলস্থুল পরিস্থিতি। সবাই দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি করছে। কেউ ফোন করছে, কেউ গাড়ি ডাকছে, কেউ প্রীতিকে কোলে করে বের করে আনছে।
প্রীতি আত্ম*হত্যার চেষ্টা করেছে।
অয়ন ও তার বাবা-মা স্তব্ধ। তারা যেন পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। কেউ কিছু বলতেও পারছে না।
শেষমেশ, বাকিদের সাথে তারাও ছুটে যান হাসপাতালে।
হাসপাতালের করিডোরে টান টান উত্তেজনা। সবাই পায়চারি করছে, চিন্তায় কেউ ঠিক করে ভাবতেও পারছে না কিছু। চারপাশে যেন এক অদৃশ্য ভারী নিস্তব্ধতা। প্রীতিকে কেবিনে নেওয়া হয়েছে।
ঠিক তখনই প্রীতির বাবা এগিয়ে এসে আজাদ রহমানের দু’হাত ধরে ফেললেন। কণ্ঠ কাঁপছে, চোখ ভিজে।
-"ক্ষমা চাই, আজাদ ভাই। আমার মেয়ে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে।"
আজাদ রহমান অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন তাঁর দিকে।
প্রীতির বাবা বললেন—
-"প্রীতি সব কিছু আমাদের জানিয়েছিল। উমাইরা মায়ের সাথে করা অন্যায়ের কথা। তারপর থেকে ওর প্রতি বাড়ির সবার আচরণ পাল্টে গিয়েছিল। ও একা হয়ে গিয়েছিল আমাদের মাঝেই। আমরা বুঝতেই পারিনি... যে ও এমন এক গভীর বিষণ্ণতার মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল। অপরাধবোধ ওকে কুরে কুরে খাচ্ছিল প্রতিদিন।
প্রীতির মানসিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। এক সময় অবস্থা এতটাই সংকটজনক হয় যে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে। কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হয় তাকে।"
প্রীতির বাবা এখনও আজাদ রহমানের হাত ধরে আছেন। কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ, চোখজোড়া অনুশোচনায় ক্লান্ত।
-"একটা সুযোগ দিন, আজাদ ভাই। আমি জানি, ও ভুল করেছে। ওর উপর অনেক চাপ দিয়েছি। কিন্তু ও এখন ভেঙে পড়েছে একেবারে।
তিনি থেমে যান এক মুহূর্ত। তারপর গলা পরিষ্কার করে আবার বলেন—
-"আপনারা যে কষ্ট পেয়েছেন, সেটা অস্বীকার করছি না। আজ ও হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরছে। আমি হাতজোড় করে বলছি, অন্তত একবার ওকে ক্ষমা করে দিন।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা আজাদ রহমানের চোখে জল টলমল করে ওঠে। ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু কিছু বলেন না। তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—ক্ষোভ, কষ্ট আর পিতার মন একসাথে যুদ্ধ করছে।
করিডোর জুড়ে আরও একবার নেমে আসে স্তব্ধতা।
আসলে ভালোবাসা তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কাকে ভালো লাগবে, কখন লাগবে—তা কখনোই ঠিক করে বলা যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষটাকেও কেউ না কেউ ভালোবাসে। তাই হয়তো অয়নের ভালোবাসাটাকে দোষ দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না।
এই সবকিছুর মাঝেও, অয়ন কখনো 'প্রতারক প্রেমিক' পরিচয় দিতে পারে নি নিজেকে। প্রীতির সব দোষ-গুণ, ভালো-মন্দ, সবকিছু মেনেই সে তাকে গ্রহণ করেছিল। ভালোবাসা কখনো কখনো বিচার করতে জানে না—শুধু আপন করে নিতে চায়।
প্রীতিকে একদিন হাসপাতালে রাখা হলো। বাকি সবাই বাড়িতে ফিরে গেছেন। আজাদ রহমান ও রুমানা বেগম ছেলেকে নিয়ে বসেছেন, পরবর্তী সিদ্ধান্ত কি নেওয়া যায় জানার জন্য। রাহেলা বেগম ও উপস্থিত আছেন।
বেশ চিন্তা ভাবনা করার পর সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন বিয়েটা হবে। প্রীতিকে ক্ষমা করবেন তারা। বাকিটা উমাইরা বুঝে নেবে।
পরদিন চার জন মিলে প্রীতিদের বাড়িতে আসেন। আজাদ রহমান এসে প্রীতির পাশে বসে। আকস্মিক প্রীতির মাথায় হাত রাখলেন আজাদ রহমান। প্রীতি অবাক হয়ে চোখ তুলে চাইলো তার দিকে। তারপর মাথায় হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন—
-"তুমি কি তোমার ভুল বুঝতে পেরেছো?"
প্রীতি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে, বোঝালো সে বুঝেছে।
আজাদ রহমান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের সাহায্যে প্রীতির চোখের পানি মুছে দিলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। তাকে দাঁড়াতে দেখে প্রীতিও উঠে দাঁড়ালো মাথা নিচু করে।
সবার দৃষ্টি আজাদ রহমানের দিকে। কি করতে চাইছেন তিনি? কেউ ঠাওর করতে পারছেন না। সবার উদ্দেশ্যে আজাদ রহমান বলা শুরু—
-"অয়ন প্রীতিকে ভালোবাসে! ভবিষ্যতে প্রীতি আমাদের বাড়ির বউ হবে। তোমরা সবাই জানো প্রীতিকে আমরা আংটি পরিয়ে গিয়েছিলাম।
উমাইরা যদিও এখন জানে তবে শুরুতে প্রীতি বলতে নিষেধ করেছিল। সারপ্রাইজ দিবে বলে। তবে উদ্দেশ্য ছিল উমাইরাকে আঘাত করা, তাই বিষয়টা গোপন রেখেছিল।
সে সব কথা নাহ হয় এখন থাক। প্রীতি যেহেতু আমাদের বাড়ির বউ হবে, তো তার সম্মান মানে আমাদের সম্মান। সে যেহেতু নিজের ভুল বুঝেছে আর ক্ষমা চেয়েছে, তাহলে আমাদের উচিত ওকে ক্ষমা করে একটা সুযোগ দেওয়া।
প্রীতিরা যা করেছে তার শাস্তি মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাকে দিয়েছে। যার অপরাধী তারা, ক্ষমাও করার অধিকার তার। প্রীতি রাইসা লামিয়া আমার মেয়ের অতি প্রিয় বান্ধবী, যাদের আমার মেয়ে অসম্ভব ভালবেসেছে।
উমাইর এখন রেগে আছে রাগ পড়ে গেলে ও ক্ষমা করবে তোমাদের। আমার মেয়ে এখানে থাকলে সেও বলতো তোমাদের ক্ষমা করে দিতে। তোমরা সবাই অবগত উমাইর সম্পর্কে। আমার কথা কি তোমরা বুঝেছো?"
উপস্থিত সকলেই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় অর্থাৎ তারা বুঝেছে। যেহেতু ওরা ক্ষমা চেয়েছে, নিজেদের ভুল বুঝেছে, সেখানে আর রাগ পোষণ করে লাভ নেই। মেয়ে তো চলেই গেছে, তারা আর রাগ পুষে রেখে কি করবে?
সেই ভাবনা থেকেই সকলে আজাদ রহমানের কথা মেনে নিয়েছে। আজাদ রহমান পরিবারের সবার সম্মতি পেয়ে খুশি হলেন। তিনি সবার উদ্দেশ্যে আরও কিছু বললেন—
-"আজকের কোনো কথাই যেনো বাড়ির অন্য কারও কানে না যায়। তাহলে সবাই প্রীতিকে অন্য চোখে দেখবে।
উমাইরা কোথায় আছে কেনো গিয়েছে এইসব কিছু আমি তোমাদের বলতে পারবো না। তাই তোমরা কিছু জিজ্ঞাসা করো না। সময় হলে ও চলে আসবে।
আর ও যখন ফিরে আসে তখন তোমরা ওর কাছে ক্ষমা চাইবে, ওর রাগ মান অভিমান ভাঙ্গবে। ততদিন সবাই আগের মতন থাকো। এই নিয়ে আমি দ্বিতীয় বার আর কোনোদিন কোনো কথা শুনতে চাই না বলতেও চাই না। আশা করি আমার কথা তোমরা সবাই বুঝেছো।
------------------------
প্রায় তিন বছর চিকিৎসা নেওয়ার পর প্রীতি এখন সুস্থ। এই তিন বছর প্রীতি অনেক চেষ্টা করছে বিয়ে ভাঙার। এমন অপরাধীকে বিয়ে করতে নিষেধ করেছে অয়নকে। কিন্তু অয়ন কথা শোনে নি।
সম্পূর্ণ সাপোর্ট করেছে প্রীতিকে। সব কিছুতে পাশে থেকেছে। এত ভুল এত অপরাধ সব কিছু নিয়েই প্রীতিকে গ্রহণ করেছে সে।
------------------------------
দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেলো। আজাদ রহমান ও রুমানা বেগম ভেবেছিলেন উমাইরা ফিরে আসবে। ওয়াসিফের আসার তারিখ ঘনিয়ে আসছে। তার আগে উমাইরা না আসলে বড়ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। আজাদ রহমান মেয়েকে ফোন করেন কবে আসবে জানার জন্য। কিন্তু অভিমানী মেয়ে তাঁর, সে জানিয়েছে সে আসবে না। অনেক বোঝানোর পর ও কাজ হয় নি। উমাইরা নিজের কথায় অটুট। আপন মানুষদের কাছে আঘাত পেয়ে চলে এসেছে উমাইরা, তাদের কাছে আর কোনো দিন ফিরে যাবে না সে।
এরই মধ্যে ওয়াসিফ দেশে চলে আসে। ওয়াসিফ একজন scientist রিসার্চের কাজ শেষ হওয়ায় ফিরে এসেছে সে। এখন থেকে দেশে বসেই রিসার্চ করবে সে।
সবাই আতঙ্কে ছিল, উমাইরা নেই! ওয়াসিফের প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবেই সবাই আতঙ্কে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ওয়াসিফ কোনো প্রতিক্রিয়ায় দেখলো না। উমাইরার কথা একবার ও জিজ্ঞাসা করে নি।
সবাই বেশ চিন্তিত হলেও আজাদ রহমান বুঝে গেছেন, ওয়াসিফ সব কিছু জেনে গেছে। এরপর কেটে যায় বেশ কিছু দিন, ওয়াসিফ ও নিজের মতন কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সবাই বুঝে গেছে ওয়াসিফ সব জেনেই দেশে এসেছে। তাই কেউ ওকে আর ঘাটে নি।
তারপর একদিন আজাদ রহমান অসুস্থ হয়ে পড়েন। উমাইরাকে সব জানানো হলে সে টিকেট বুক করে দেশে চলে আসে।
বাবা অন্ত প্রাণ উমাইরা সেই বাবা অসুস্থ শুনে কি করে বিদেশ বিভুরে পড়ে থাকে। অনার্স ও কমপ্লিট হয়েছে ইতিমধ্যে। পার্ট টাইম জব নিয়েই সময় কাটছিল। বাবার অসুস্থতার কথা আর স্থির থাকতে দেয় নি উমাইরাকে, তাইতো চলে এসেছে দেশে পাঁচ বছর পর।
বর্তমান—
থমথমে পরিবেশ রহমান ভিলায়। বাড়ির প্রতিটা মানুষ বিস্মিত, বাকরুদ্ধ হয়ে আছেন। বলার মতন কোনো ভাষা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না।
এহসানের শরীর রাগে কেঁপে উঠেছে। চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করে অয়ন ও প্রীতির পানে। রাগে চেঁচিয়ে উঠলো এহসান—
-"কিভাবে? কিভাবে পারলে তোমরা উমাইরার সাথে এরূপ আচরণ করতে? প্রতিহিংসা? প্রশ্ন করেছিলে না ভাবী কেনো সবাই উমাইরাকেই ভালোবাসে স্নেহ করে? উত্তর তো তোমার কথার মধ্যেই আছে।
চঞ্চল, মায়াবতী উমাইরা, নিজের আগে সব সময় অন্যকে রাখা, সকলের বিপদে সবার আগে পাশে দাঁড়ানো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা।
ছোট বড় সবাইকে সম্মান করা, স্নেহ করা, ভালোবাসা। যার মনে নেই কোনো হিংসের ছিটে ফোটা। বিনয়ের সাথে সবার সাথে কথা বলা। নিজের কথায় সবাইকে হাসিতে মাতিয়ে রাখা।
মন খারাপ থাকলে মন ভালো করে দেওয়া। এমন একটা মেয়েকে কে না ভালোবেসে থাকবে? কে না স্নেহ করে থাকবে? যার মন শুদ্ধ, যার নিয়ত সঠিক, যার উদ্দেশ্য সঠিক, নেই কোনো চুতুরত, নেই কোন ধূর্ততা তার সাথে ভালো হবে না তো আর কার সাথে হবে বলো?"
সবাই নিশ্চুপ! মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রীতির পানে দৃষ্টি স্থির সবার। নিস্তব্ধতা ভেঙে ওয়াসিফ বলে উঠলো—
-"থাম এহসান! মামু কি বলেছে ভুলে গেছিস? প্রীতি এই বাড়ির বউ। ও এই বাড়ির সম্মান। আর একটা কথাও বলার প্রয়োজন নেই। ওরা ওদের ভুল বুঝেছে ক্ষমাও চেয়েছে।
তবে ওরা যার দোষী তার কাছে ক্ষমা চাওয়া বাকি। তার ক্ষমা পাওয়া বাকি। আশা করি তোমরা এইবার তার কাছে ক্ষমা চাইবে। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করবে।"
অয়ন ও প্রীতির সম্মুখে থেকে সরে গেলো ওয়াসিফ। রুমান রহমানের সামনে হাটু গেড়ে বসে বলল—
-"চিন্তা করো না মামুনি! তোমার মেয়েকে আবার আগের মতন করে ফিরেয়ে দেবো, তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি।" ছলছল চোখে চেয়ে ওয়াসিফের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলেন রুমানা বেগম।
সবাই যার যার রুমে যাও, অনেক রাত হয়েছে বিশ্রাম নাও গিয়ে।
ওয়াসিফের কথার ওপর আর কেও কোনো কথা বলতে পারলো না। ওয়াসিফ খুবই বুদ্ধিমান, চতুর, গুরুগম্ভীর স্বভাব, প্রচুর বদমেজাজি একজন পুরুষ। একবার রেগে গেলে তাকে কেউ সামলাতে পারে না।
তাইতো কেউ তাকে রাগাতে চায় না। নিজের যোগ্যতায় সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছে সে। তার কথার একটা ভার সব সময়ই থাকে। সবাই তার কথা মানতে বাধ্য হয়ে যায়।
সবার বড় ওয়াসিফ, বুদ্ধিমান হওয়ার সুবাদে মামুর ব্যবসায় অনেক সাহায্য করেছে সে। নিজের বাবার হসপিটাল একা হাতে সামলায়, আবার নিজের রিসার্চ ও সুষ্ঠুভাবে করে।
ওয়াসিফের কথা মেনে যে যার রুমে চলে যায়। রাত প্রায় ১১ টা। কারও চোখে ঘুম নেই। বাড়ির মুরুবিধের ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
ওয়াসিফের জন্য রহমান ভিলায় আলাদা রুম বরাদ্দ থাকে। ওয়াসিফ যখন ইচ্ছে এসে থাকে। অয়ন ও ওয়াসিফের রুমের মধ্যিখানে উমাইরার কক্ষ। নিস্তব্ধতা ঘিরে রেখেছে রহমান ভিলা।
হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এলো এক করুন সুরে গাওয়া গান। উমাইরা গান গাইছে। মেয়েটার কষ্ট হলে, অভিমান হলে, আর খুশি হলেই মেয়েটা গান গায়। আজকে যা হয়েছে এতে খুশি হওয়ার তো কথা না। কষ্ট থেকেই গান গাইছে।
ওয়াসিফ বেরিয়ে এলো নিজের কক্ষ থেকে। উমাইরার কক্ষ থেকে ভেসে আসছে গানের আওয়াজ। ওয়াসিফ দরজা ঘেষে বসে পড়ে, এক পা সোজা টানটান করে অন্য পা গুটিয়ে। গুটিয়ে রাখা পায়ের ওপর এক হাত রেখে দরজায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে শুনতে লাগলো উমাইরার করুন কন্ঠে গাওয়া গান।
নিচের সেই কাণ্ড করে উপরে নিজের রুমে এসে উমাইরা এতক্ষণ যাবত কান্না করছিল। যেই নিচের কোলাহল বন্ধ হলো, উমাইরা বুঝল সবাই শুতে চলে গেছে।
তাইতো গিটারটা নিয়ে দরজার সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে হৃদয়ে, কেউ দেখে না। বুঝে অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে।
নিশুতি রাতে একাকিত্বের সুরে ভেসে যেতে যেতে, বুকভরা হাহাকার আর চোখভেজা অশ্রু নিয়ে সে গেয়ে উঠলো এক করুণ সুরে গান—
একা বসে তুমি,
দেখছো কি একই আকাশ
দিন শেষে তার তারাগুলো দিবে দেখা।
মেঘে ঢাকা তারার আলো,
দেখে থাকো তুমি, দেখো ভালো
হয়তো তার মাঝে খুঁজে পাবে আমায়।
সেই দিনে, এক গানে এক
গল্পকারের গল্প খুঁজে পাবে
খুঁজে পাবেনা সে গল্পকার,
দিনগুলো, খুঁজে পাবে গানের প্রতিটা ছন্দে
শুনতে পাবে মৃত মানুষের চিৎকার।
আমার দেহখান,
নিওনা শ্মশান, এমনিতেও পুড়ে গেছি।
আমার, সব স্মৃতি,
ভুলোনা তোমরা, যা ফেলে গেছি।
দেহ পাশে কেহ কেঁদো না,
গল্পগুলো রেখো অজানা,
গানখানা থেকে খুঁজে নিও মোর সে গল্প।
যাতে লিখা হাজার কষ্ট,
নিজেকে ভেবে নিতাম এক শ্রেষ্ঠ,
যার প্রতিপদে জীবন বিচ্ছেদের স্বপ্ন
প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে তার মনখারাপের দীর্ঘশ্বাস,
প্রতিটি সুরে বাজছে এক নিঃসঙ্গ আত্মার নীরব আর্তনাদ।
কান্নার ফাঁকে ফাঁকে তার কণ্ঠে জেগে উঠলো এক ব্যথাতুর সংগীত,
যা শুনলে মনে হয়— কষ্টও কি এমন করেই গান হয়ে উঠতে পারে?
পাশের ঘরে বসে উমাইরার কাতর কণ্ঠে ভেসে আসা গানের সুর শুনে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো প্রীতি। অয়নের চোখেও অশ্রুর ছায়া।
উমাইরার সেই ভাঙা গলার প্রতিটি শব্দ যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছে হৃদয়ের গভীরতম স্থান।
তারা দু’জনে চুপচাপ বসে আছে—শুধু বুকের ভেতর মোচড়ানো কষ্টটা বুঝিয়ে দিচ্ছে, কতটা আঘাত তারা দিয়েছে। ভাবতেই পারছে না—ভুলগুলো এতটা গভীর জখম হয়ে ফিরবে একদিন।
স্নিগ্ধা বালিশে মুখ গুজে কান্না করছে। এত ভালো বোন যে সব সময় সব আবদার রেখেছে। রাগ অভিমান থাকা সত্ত্বেও মনে করে তার জন্য উপহার এনেছে, সেই বোনকেই কিনা এইভাবে বলল সে।
বোনের ব্যাথাতুর কণ্ঠের গান শুনে মুখ তুললো স্নিগ্ধা। প্রতিটি শব্দে কতটা ব্যথা লুকিয়ে আছে, বুঝতে পারছে স্নিগ্ধা। দুই হাত উঠে সমান তালে নিজেকে থাপ্পড় দিচ্ছে, আর বলছে—
-"আমি খুব খারাপ বোনরে আপুই, আমাকে মাফ করে দে তুই। জানি তুই মাফ করবি। কিন্তু আমরাতো ক্ষমা পাওয়ার অযোগ্য রে। তোর মতন মানুষ জীবনে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা তোর যোগ্য না আপুই।"
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথা গুলো বলছে স্নিগ্ধা।
গান শেষ করে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ ছিল উমাইরা। তবুও সে স্পষ্ট টের পাচ্ছিল, দরজার ওপাশে কারো নিঃশ্বাসের অস্তিত্ব।
দরজার দুই পাশে বসে আছে দুটি হৃদয়। এক প্রান্তে জ্বলছে বেদনার আগুন, অন্য প্রান্তে জমেছে অভিমানের পাহাড়।
একই ভঙ্গিতে দরজার গা ঘেঁষে, দীর্ঘ রাত নির্ঘুম কেটেছে তাদের। অনেক না বলা কথা জমে আছে ঠোঁটের কোণে, তবু কেউ বলে উঠতে পারেনি।
একজন উপলব্ধি করছিল মনের ক্ষরণ,
অপরজন ছিল অভিমানের শেকলে বাঁধা।