দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বাড়ির বড় মেয়ে বাড়িতে ফিরছে। রহমান ভিলার প্রতিটি কোণে সাজসজ্জার ছোঁয়া লেগেছে আজ। বাড়ির সবার চোখেমুখে যেন আনন্দের আলো জ্বলজ্বল করছে। বড় মেয়ে ফিরছে!
সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত রুমানা বেগম। মেয়ের প্রিয় খাবারের তালিকাটা যেন ফুরোচ্ছে না কিছুতেই। মেয়ে ফিরে আসবে বলে কতদিন ধরে যে এই সব পরিকল্পনা করছেন তিনি! নিজের হাতে রাঁধবেন বলে সকাল হতে না হতেই রান্নাঘরে নেমে পড়েছেন। সুগন্ধ ছড়িয়েছে রান্নাঘর জুড়ে। বসার ঘরে পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে সেই ঘ্রাণ।
বড় ভাই অয়ন নিজে দায়িত্ব নিয়ে ঘর, বারান্দা, ড্রইংরুম সবখানেই সাজিয়েছে বাহারি ফুল আর রঙিন বেলুনে। যেন বাড়ি নয়, কোনো উৎসবের প্রাঙ্গণ। ছোটবোন স্নিগ্ধা সে তো ভেবেই পাচ্ছে না কোন ড্রেস পরবে, এই নিয়ে তার মন খারাপের অন্ত নেই।
এদিকে আজাদ রহমান অসুস্থ শরীর নিয়েই সকাল থেকে মেহমানদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। আত্মীয়-স্বজন সবাই হাজির হয়েছেন রহমান ভিলায়। বড় ফুপু তার স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছেন, ছোট ফুপুও তার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এসেছেন। মামা ও চলে এসেছেন নিজের সহধর্মিনী ও বাবা-মাকে (নানা-নানী) নিয়ে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর রহমান পরিবারের আদরের বড় মেয়ে ফিরে আসছে।
সবাই অপেক্ষায় আছে সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্তটির জন্য, যখন প্রিয় মেয়ে রহমান ভিলার দরজায় পা রাখবে!
---------------------------
সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাড়িতে পা রাখলো আমিরা রহমান উমাইরা। পাঁচ বছর পর সে ফিরেছে তার নিজ বাড়িতে। পাঁচ বছর পর নিজের আপন মানুষদের দেখছে, চোখের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে। এই তো ড্রইংরুমে সবাই উপস্থিত, উমাইরার কাছের মানুষ, রক্তের আপনজনরা সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে।
ছুটে গিয়ে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরেছে উমাইরা। মায়ের কান্না যেন থামার নামই নিচ্ছে না। ওইদিকে বাবাও নীরবে তার চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছেন সবার অগোচরে। মাকে ছেড়ে বাবার দিকে দৃষ্টি গেল উমাইরার। এগিয়ে গেল বাবার কাছে, মেয়েকে সযত্নে আগলে নিলেন আজাদ রহমান।
বড় ভাই অয়ন কাছে আসার সাহস পাচ্ছে না। এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করছে তার মধ্যে। সেই অপরাধবোধই তাকে আটকে রাখছে বোনের কাছে যাওয়া থেকে।
ছোটবোন স্নিগ্ধা ছুটে এসেছে বোনকে দেখার জন্য। উমাইরাকে দেখেই জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু উমাইরা ভালোবেসে ছোট বোনটাকে কাছে টানতে পারছে না, মনের মধ্যে অভিমান জমে আছে। নিহাত বাড়িতে এত আত্মীয়স্বজন আছে বলেই বোনকে আগলে নিয়েছে।
একে একে সবার সাথেই কুষোল বিনয় করেছে উমাইরা। তারপর সবাই তাকে উপরে পাঠিয়েছে ফ্রেশ হয়ে নিতে। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে ক্লান্ত থাকায় উমাইরাও আর দ্বিমত করেনি, চলে গেছে নিজের ফেলে আসা সেই ঘরে।
পাঁচ বছর পর নিজের সেই চিরচেনা ঘরে ফিরে এসেছে উমাইরা। ঠিক যেভাবে রেখে গিয়েছিল আজও তেমনই আছে। এতে অবশ্য কৃতিত্ব তার মায়ের। মেয়ে নেই বলে কি তার রুমটাও অবহেলায় রাখবেন? না, কখনোই না। তাই তো নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে রুমটা নিজ হাতে পরিষ্কার করতেন তিনি।
সবাই খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছে উমাইরার জন্য। সিঁড়ির দিকে যখন সবার নজর পড়ল, উমাইরা নেমে আসছে। উমাইরাকে নামতে দেখে রুমানা বেগম এগিয়ে এসে মেয়েকে ধরে ডাইনিং টেবিলের সামনে নিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসাতে বসাতে বলেন—
- আয় মা, বস এখানে।
গল্প করতে করতে সবাই খাওয়া শুরু করে দেয়। রাহেলা বেগম ( বড় ফুপু) খেয়াল করলেন উমাইরা চুপচাপ। কিন্তু উমাইরা ও তো চুপচাপ থাকার মেয়ে নয়। ওতো চঞ্চল, আপন ও ভালোবাসার মানুষদের আসে পাসে থাকলে ওর মুখ কখনও বন্ধ থাকে না। সবার কথা ভাবা, সবার জন্য চিন্তা করা, সবার খেয়াল রাখা, কার কি হলো, করো মুখে হাসি নাহ দেখলে চিন্তিত হওয়া, সবার পাসে থাকা সাহায্য করাই তো ওর ধাঁচ।
তাহলে কি পাঁচ বছর আগের ঘটনায় মেয়েটা এত চুপ চাপ হয়ে গেছে। সেই ঘটনার পর হুট করেই দেশ ছেড়ে চলে গেলো। এমনকি কারো সাথে কোনো দিন ফোন করে কথা অব্দি বলে নি, যদি না কেউ নিজ ইচ্ছায় ওকে কল দিয়ে খোঁজ নিতো। তাছাড়া ও নিজের খোঁজটাও দিতো না করো খোঁজ ও নিতো না।
এইসব কিছু ভাবতে ভাবতেই রাহেলা বেগম উমাইরাকে জিজ্ঞাসা করলেন—
- কিরে মা, কি হয়েছে তোর? কোনো কথা বলছিস না কারো দিকে তাকাচ্ছিস না। কারো কথা শুনছিস ও না। শরীর খারাপ লাগছে?
- না মনি! অনেকটা পথ এসেছি তো তাই অনেক ক্লান্ত লাগছে একটু ঘুমোলে ভালো লাগতো।
- বেস তো! খাওয়া হয়ে গেলে যা গিয়ে ঘুমিয়ে পর। আমরা তো আর কোথাও যাচ্ছি না এখানেই আছি, সকাল হলেই একে অন্যের মুখ দর্শন হয়ে যায়। তুই যা গিয়ে ঘুমিয়ে পর। আমরা সবাই কালকে তোর সাথে গল্প করব। ঠিক আছে মা!
- ঠিক আছে মনি। মা, আমি তাহলে ওপরে গেলাম ঘুমোতে। কানাডা আর বাংলাদেশের তো সময়ের ব্যবধান অনেক। আর এত দিন কানাডা থেকে ওই দেশের সময়ের অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই ঘুমোলে আমাকে ডেকো না। দেশের সময়ের সাথে খাপ খাওয়াতে সময় লাগবে।
বলেই উমাইরা হাত ধুয়ে চলে গেলো নিজের রুমে। একে একে সবার খাওয়াই শেষ। অনেক রাত হয়েছে বিধায় উমাইরার ফুপুরা নিজেদের বাড়ি চলে গেছে। তাদের বাড়ি আসে পাশেই, খুবই কাছে, দুই এক গলি পরই। শুধু থেকে গেলো উমাইরার মামা-মামী ও নানা-নানীরা।
উমাইরার দাদা-দাদী, কাকুমনি-কাকিমনি আর কাকাতো ভাই গেছেন বেড়াতে, কালকেই চলে আসবে তারা। উমাইরার আসার খবর শুনেই তাঁরা সময়ের আগেই চলে আসছেন।
------------------------------
গভীর রাত, নিস্তব্দ চারিপাশ। নিজের ঘরের বারান্দায় গিটারটা নিয়ে বসে আছে উমাইরা। আজ দুটো বছর পর ছুঁয়ে দেখলো গিটারটা। অনেক পরিবর্তন হয়েছে, মানুষ ঘরবাড়ি সব কিছুই। বার বার অতীত মনে পরছে আজ। যেই অতীতের আঘাতে পাড়ি জমিয়েছিল কানাডায়।
অয়ন ভাইয়া, চোখের দিকে তাকানোর সাহসটা পেলো না। তবে কি অপরাধবোধ জেগেছে তার মনে? কে জানে!
প্রীতি, না না ভাবী! আকদ হয়েছে তাদের। আসিনি আমি। কেন আসব? কে আমি তাদের? কেউ না।
ভাইজান, তোমার ওপর ও অনেক অভিমান আমার। তুমি কি বুঝেছো কখনও? সবাই আমাকে কষ্ট দিয়েছে কেও বোঝেনি আমাকে, কেউ না।
কথা গুলো আপন মনে ভাবতে ভাবতেই চোখ বেয়ে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়লো উমাইরার। কখন যে ফজরের আজান দিয়েছে বুঝতেই পারে নি। আযানের শব্দ পেয়ে উঠে রুমে চলে এসেছে, ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নামায পড়তে বসেছে উমাইরা।
নামাজ শেষে একটু ঘুমিয়েছিল উমাইরা। সকাল গড়িয়ে এখন দুপুর। স্নিগ্ধা ডাকছে। হয়তো মা পাঠিয়েছে। আড়মোড় ভেঙে বিছনা থেকে উঠে দরজাটা খুলে দিলো উমাইরা। দরজা খুলতেই স্নিগ্ধা ভিতরে প্রবেশ করে বলতে লাগলো—
- আপুই, এখনো ঘুমাও তুমি! সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি আমি কখন তুমি উঠবে। জানো, আজকে কলেজেও যাই নি আমি।
স্নিগ্ধার কথা শুনে উমাইরা ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাথরুমের দিকে যাচ্ছিল, যাওয়ার সময়েই স্নিগ্ধাকে উদ্দেশ্য করে বলল—
- কেন যাও নি? আমি কি তোমাকে যেতে বারণ করেছিলাম?
বলেই উমাইরা ফ্রেশ হতে চলে গেলো। বোনের এরূপ আচরণ স্নিগ্ধাকে বিচলিত করল। বোন কি তার পাঁচ বছর আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা ভুলে নি? নিজের মনের মধ্যে কি আমাদের জন্য রাগ, অভিমান পুষে রেখেছে? সেই জন্যই কি আমাদের সাথে দূরত্ব বজায় রেখেছে? স্নিগ্ধা খেয়াল করেছে, কাল যখন আপুকে জড়িয়ে ধরেছিল, আপু তাঁকে কাছে টেনে নেয়নি। মানুষজন ছিল বলেই হয়তো স্নিগ্ধাকে ফিরিয়ে দেয় নি। স্নিগ্ধা আর অপেক্ষা করলনা উঠে দাঁড়ালো, বোনের উদ্দেশে মলিন সুরে বলল—
- মা তোমাকে নিচে যেতে বলেছে, তাড়াতাড়ি আসো।
বলেই স্নিগ্ধা চলে গেলো। উমাইরা ফ্রেশ হয়ে সোজা নিচে চলে গেলো তার মায়ের কাছে। আজকে বাড়িতে সকলেই আছে উমাইরার আসা উপলক্ষে। তার কাকুমনি-কাকিমনি, দাদু-দাদিন ও চাচতো ভাই এহসান ও চলে এসেছে।
সকলেই উমাইরার সাথে দেখা করেছে। দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছে। আবার বিকালে ফুপুরা সবাই আসবে। তারপর কালকেই মামারা চলে যাবেন তাদের বাসায়।
----------------------
বিকেল বেলা সবাই ড্রয়িং রুমে বসে গল্প করছিল এর মধ্যে স্নিগ্ধা এসে উমাইরাকে বলছে—
- আপুই, তুমি কি আমাদের জন্য কোনো গিফট আনোনি?
- হ্যা, এনেছি! তুমি বসো, আমি নিয়ে আসছি।
নিজের রুম থিকে একটি লাগেজ নিয়ে নিচে আসলো উমাইরা। এখানে সবাই উপস্থিত আছে।
উমাইরা ফ্লোরে বসে সবাইকে সবার গিফট বুঝিয়ে দিয়েছে। এখন শুধু বাকি আছে, স্নিগ্ধা, অয়ন, প্রিতি, এহসান। আগে স্নিগ্ধাকে উপহারটা দিলো উমাইরা। স্নিগ্ধা ফটাফট গিফটটা খুলে দেখতে লাগল দেখেই চোখ মুক কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলতে লাগলো—
- এটা কি এনেছো আপুই! এটা কোনো উপহার হলো। এর চেয়ে দামী মেকআপ তো আব্বুই আমাকে এনে দেয়। ধুর! আমি আরও ভাবলাম, বিদেশ থিকে দামি দামি মেকআপ, ব্র্যান্ডের বেগ, ড্রেস এইসব কিছু নিয়ে আসবে, তা না করে শুধু কিছু কম দামি মেকআপ নিয়ে আসছো তুমি।
ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলেই বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল স্নিগ্ধার দিকে। কী বলল সে! এত মূল্যবান মেকআপ তার কাছে যেন সামান্য ঠুনকো মনে হলো!
স্নিগ্ধর কথা শুনে উমাইরা স্নিগ্ধার দিকে শীতল চাহনি নিক্ষেপ করল । বাকি গিফট গুলো দেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছিল। থেমে গেছে সেই হাত। গিফট গুলো ব্যাগে রেখে উঠে দাড়ালো উমাইরা। খুবই শান্ত ভাবে স্নিগ্ধাকে জিজ্ঞাসা করলো—
- পছন্দ হয় নি তোমার?
- একদমই না! এর চেয়ে ভালো ও দামি মেকআপ আব্বুই এনে দেয় আমাকে।
- ওহ, আচ্ছা! ঠিক আছে তাহলে।
বলেই উমাইরা স্নিগ্ধার হাত থিকে মেকআপ গুলো নিয়ে নিলো। সেই সাথে প্রিতি ও অয়নের গিফট গুলো ও ব্যাগে ভরে রাখলো। শুধু এহসানকে দিলো।
এহসানকে গিফট দেওয়ার পর উমাইর রান্না ঘর থেকে ম্যাচ বক্স এনে ওদের তিন জনের জন্য আনা গিফটে আগুন ধরিয়ে দিলো, ওদের তিন জনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—
- নিজের পরিশ্রম করে আয় করা টাকা দিয়ে কিনেছি সব কিছু আমি। তোমার চোখে তা হয়ে গেল নিতান্তই সস্তা? তোমার আব্বুই তোমাকে দামি জিনিস এনে দিক তাহলে।
যেহেতু ওর পছন্দ হয় নি কম দামি বলে সেহেতু ভাই ভাবী আপনাদেরও যে পছন্দ হবে না সেটা আমি জানি।
অতএব, আগুনে ভস্ম করলাম সেই সবকিছু। আমার শ্রমের ফলের অবমূল্যায়ন আমি কখনোই মেনে নেব না।
ভাই-বোন ও এক সময়ের প্রিয় বান্ধবীর ওপর আকাশসম অভিমান নিয়ে কথাগুলো বলে স্থান ত্যাগ করল উমাইরা। সোজা নিজের রুমে গিয়ে দরজাটা শব্দ করে বন্ধ করে দিল।
এতসব কিছুর মাঝে কেউ খেয়ালই করল না যে সদর দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। মানবটি এতক্ষণ যাবৎ সবকিছু শীতল দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল।
সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল সুঠাম দেহীর অধিকারী একজন মানব। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে মানবটির। ফরসা মুখশ্রী মুহূর্তেই লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সোজা গিয়ে স্নিগ্ধার সামনে দাঁড়াল মানবটি। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে স্নিগ্ধার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো—
- নিজে কখনো এক টাকা উপার্জন করেছিস নিজের যোগ্যতায়? তাহলে কোন সাহসে অন্যের পরিশ্রমকে অপমান করিস তুই? কে দিয়েছে তোকে এই স্পর্ধা?
স্নিগ্ধার থেকে মুখ সরিয়ে বাড়ির লোকেদের উদ্দেশে বলল—
আর তোমরা, তোমরা সবাই চুপচাপ বসে দেখছিলে? কেউ কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করো নি? সকলেই মাথা নিচু করে নেয়। কি বলবে? সত্যিই তো স্নিগ্ধার ঐরূপ আচরণের প্রতিবাদ করা তাদের উচিত ছিল। এত বছর পর মেয়েটা এসছে! আবারও যদি অভিমান করে চলে যায়? আর ফিরে না আসে? না না আর ভাবতে পারল না কেউ। আজাদ রহমান ছোট মেয়ের উদ্দেশে কিছু বলতে নিবেন তার আগেই মানবটি স্নিগ্ধার দিকে ফিরলো চোয়াল শক্ত করে বলল—
- তুই জানিস, ওখানে প্রায় লাখ টাকার মেকআপ ছিল?
অবাক হয়ে তাকালো স্নিগ্ধা মনবটির মুখপানে। স্নিগ্ধার মুখের অবস্থা দেখে যা বোঝার বুঝে গেল মানবটি। স্নিগ্ধা জানতো না তাই অমন ব্যবহার করেছে।
- তুই জানতিস বা না জানতিস, বড় বোনের আনা এক টাকার উপহারও তোর কাছে লাখ টাকা সমন হওয়া উচিত ছিল। আর তুই কি-না তাকে অপমান করলি।
স্নিগ্ধা কিছু বলতে চাচ্ছিল, কিন্তু তাকে সেই সুযোগ না দিয়েই মানবটি রুমানা বেগমের কাছে গেলেন, হাঁটু গেড়ে বসলেন রুমানা বেগমের সম্মুখে। রুমানা বেগমকে জিজ্ঞাসা করলো—
- কি হয়েছে তোমার মেয়ের? ও তো এমন ছিল না। ওর আনা কিছু কারও পছন্দ না হলেও ও তো এমন ব্যবহার করার মেয়ে না।
মানবটির কথা শুনে সকলেই দৃষ্টি স্থির করলেন রুমানা বেগমের পানে। সবাই জানতে আগ্রহী, সত্যিই তো! কি এমন হয়েছিল, উমাইরা দেশ ছেড়েই চলে গেল। আর ফিরে আসতে চাইলো না। সবাই উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলেন আজাদ রহমান ও রুমান বেগমকে।
রুমানা বেগম কান্নায় ভেংগে পড়লেন। রুমানা বেগমকে কাদতে দেখে সবাই বিচলিত হয়ে পড়ল। আযাদ রহমান, রাহেলা বেগম উমাইরার মামা-মামী, বাকি সবাইও রুমানা বেগমকে শান্ত করায় ব্যস্ত হয়ে উঠল। সবাই বলতে লাগলো—
- কি হয়েছে? আমাদের বলো তোমরা।
রুমানা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালেন ছেলের দিকে। ছেলে ছেলের বউ দুজনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কারও দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না।
রুমানা বেগমের দৃষ্টি লক্ষ্য করে মানবটি সেই দিকে তাকালো। সোজা উঠে গিয়ে অয়নের মুখোমুখি দাঁড়াল। অয়ন চোরা চোখে তাকিয়ে দেখলো একবার তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানবটিকে। তার কঠিন মূখবয় দেখে ঘাবড়ে গেল অয়ন।
- তোরা কি কিছু বলতে চাস না, অয়ন?
অয়ন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল—
- উমাইরার এই পরিবর্তনের কারণ আমরা। সত্যি বলছি, আমরা ইচ্ছে করে কিছু করি নি। আমার বুঝতে পারি নি বোনু এইভাবে বদলে যাবে। আমাদের সবাইকে রেখে দূরে চলে যাবে।
কথা গুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েছে অয়ন। অয়নের সঙ্গে প্রীতিও কান্নায় ভেঙে পড়ছে। প্রাণপ্রিয় বান্ধবী, বিপদের সঙ্গী, সব সময় সব কিছুতে সাপোর্ট দেওয়া, সব সময় পাশে থাকা বান্ধবীটাকে তো সব চেয়ে বেশি আঘাত সে-ই করেছে। তার জন্যই তো আজকের এই পরিস্থিতি। কিভাবে নিজেকে ক্ষমা করবে প্রিতি।
অয়ন ও প্রীতির কান্নাকে উপেক্ষা করে চোয়াল শক্ত করে জিজ্ঞাসা করল—
- কী করেছিলি তোরা, আমি কিন্তু সব জানি অয়ন! বাড়ির বাকি সদস্যরা কিছুই জানে না। তুই হয়তো ভাবতে পারিস, আমি সব কিছু যেনও চুপচাপ ছিলাম কিভাবে? উমাইরার জন্য। আমি ওর অপেক্ষা করছিলাম। এখন ও এসে গেছে, সবাইকে সবার প্রাপ্যটা এইবার বুঝিয়ে দেব।
তার কথা শুনে অয়ন ভয়ার্ত চোখে তাকায় তার দিকে। শুকনো ঢোক গিলে অয়ন। সব কিছু কিভাবে জানলো? এতদিন কিছু বলল না! গলা শুকিয়ে যাচ্ছে অয়নের। মানবটির রক্ত চুক্ষ দেখে আর চুপ থাকতে পারলো না। তারপর অয়ন একে একে সব ঘটনা বলতে শুরু করল।