আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ২

🟢

অতীত—

১৭ বছরের উমাইরা কলেজ ড্রেস পরে কাঁধে একটি স্কুলব্যাগ নিয়ে, দুই পাশে দুটো বেনি ঝুলিয়ে চঞ্চল পায়ে নামছে।

নিচে নেমে সোজা মার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে উমাইরা। তারপর মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে সে চলে আসে কলেজে।

আজ তাদের এইচএসসি পরীক্ষার শেষ দিন। পরীক্ষার কেন্দ্র এসেই দেখা মিলল তিন বান্ধবী, প্রীতি, লামিয়া, রাইসার। ওদের দেখে উমাইরাও সেদিকেই পা বাড়ায়। তারপর ওদের মাঝে হামলে পড়ে বলতে শুরু করে—

-"কিরে শাকচুন্নিরা! আমাকে ছাড়া কি গল্প করছিস তোরা, হুম?"

উমাইরার কথার প্রত্যুত্তর করলো প্রীতি—

-"আরে না! তোকে ছাড়া কি আমাদের আড্ডা জমে নাকি? তোকে রেখে আমরা কোনো গল্পই করি না।"

প্রীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাইসা, লামিয়া ও একই কথা বলল।

-"হয়েছে! এখন চল, পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে কিছু ক্ষণের মধ্যেই।"

বলেই উমাইরা হাটা ধরলো। সাথে বাকি তিনজনও। চার বান্ধবী মিলে একসাথে ক্লাস রুমে প্রবেশ করল।

পরীক্ষা শেষ, মোটামোটি সবারই ভালো হয়েছে। চার বান্ধবী একসাথে গল্প করতে করতে কেন্দ্র থেকে বের হয়েছে।

চারজন মিলে প্ল্যান করছিল, আজকে যেহেতু শেষ পরীক্ষা, তাই সবাই মিলে ঘুরবে-ফিরবে, বাইরে খাবে, তারপর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরবে।

যেইভাবা সেই কাজ! সকলেই এক মত পোষণ করলো। বাহিরে উমাইরার ভাই দাঁড়িয়ে ছিল উমাইরাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

অয়নকে দেখেই চার বান্ধবী সেইদিকে এগোলো। উমাইরা অয়নকে উদ্দেশ্য করে বলল—

-"দুইনম্বর ভাই, আজকে আমরা একটু ঘুরবো আর বাহিরেই খাবো। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরব। তুমি মাকে গিয়ে বলো, কেমন?"

অয়নের দৃষ্টি প্রীতির দিকে। যেটা কেউ খেয়াল করেনি। খুব সঙ্গোপনেই তাকিয়েছিল অয়ন। দৃষ্টি ঘুরিয়ে উমাইরার দিকে ফিরে অয়ন প্রতিউত্তর করল—

-"চল, আমিও তাহলে তোদের সাথে যাই।"

-"ঠিক আছে দুইনাম্বর ভাই, চলো একসাথে যাওয়া যাক।"

-"ওই শয়তান! তোকে কতোবার বলব আমাকে দুইনম্বার ভাই ডাকবি না। ওয়াসিফ ভাইকে তো ভাইজান ডাকিস, আমাকে ডাকতে কি সমস্যা তোর?"

-"আরে তুমি বুঝবে না, তুমি তো গাধা।"

বলেই মুখ টিপে হাসতে লাগলো উমাইরা। উমাইরাকে দেখে বাকি সকলেও হাসতে লাগলো। অনেকক্ষন যাবৎ হাসার পর সবাই লক্ষ্য করলো, অয়ন রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সেই দৃষ্টি দেখে সবাই শুকনো একটা ঢোক গিলে হাসি থামিয়ে তাড়া দিলো ঘুরতে যাওয়ার জন্য।

তারপর সকলেই বেড়িয়ে পড়ল। সারাদিন ঘুরাঘুড়ি করে বাহিরে খেয়ে সন্ধ্যায় সবাই বাসায় ফিরল। ফ্রেশ হয়ে অয়ন ও উমাইরা নিচে নেমে আসলো। মা ছোট বোন বসে আছে।

উমাইরা আর অয়ন এসে সোফায় গা এলিয়ে বসলো। রুমানা রহমান উঠে গিয়ে হালকা নাস্তা ও চা নিয়ে এসে ছেলে-মেয়েকে দিলেন।

অয়ন, উমাইরা ও স্নিগ্ধা হামলে পড়লো টি টেবিলে রাখা নাস্তার ওপর। তিন ভাই বোনের মধ্যে হাট্টাহাট্টি লড়াই হচ্ছে নাস্তা নিয়ে। দুই মুঠ ভর্তি নাস্তা নিয়ে মুখে পুড়ছে তিনজনই। পাশ থেকে উমাইরা অয়নের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। অয়ন উমাইরার পিছে পিছে দৌড় দিয়েও ধরতে পারে নি একটুর জন্য।

তিন ভাই-বোনের চিল্লাপাল্লায় রুমান রহমান বিরক্ত হয়ে এক ধমক দিয়ে থামতে বলে রান্না ঘরে চলে যান।

---------------------------

রাহেলা বেগমের শরীরটা বেশ কিছু দিন যাবৎ খারাপ যাচ্ছিল। ডাক্তারের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। রাহেলা বেগমের এক সন্তান ওয়াসিফ আয়মান, তিনি বর্তমানে ইতালিতে বসবাস করেন। পড়াশোনার জন্য গিয়েছেন ইতালিতে, বর্তমানে পড়াশোনা শেষ। এখন একটি রিসার্চের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। পাঁচ বছর ধরে ইতালিতে আছে ওয়াসিফ। এর মাঝে বছর তিনেক আগে একবার এসেছিলেন, কিসব প্রয়োজন ছিল তার তাই দেশে এসেছিলেন। এরপর আর আসে নি। তবে সামনে বছর একেবারে চলে আসবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ওসমান আয়মান (ওয়াসিফের বাবা) পেশায় একজন cardiologist। তিনি বেশ কিছু দিন যাবৎ বাহিরে আছেন, একটি সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে গিয়েছেন। ওনার দেশে আসতে আরও বেশ কিছু দিন লাগবে।

রাহেলা বেগমের যেহেতু আর কোনো সন্তান নেই, আর তারা আজাদ রহমানদের খুব কাছেই থাকে। তাই তাদের সব ধরনের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে আজাদ রহমানরাই সব সময়ে পাশে থাকেন। অয়নের ভার্সিটিতে জরুরি ক্লাস ছিল তাই অয়ন আসতে পারে নি। বাড়িতে আর কোনো সদস্য ও ছিল না। অগত্যা রুমানা বেগম উমাইরাকে পাঠিয়েছেন রাহেলা আয়মানের সাথে হসপিটালে যাওয়ার জন্য।

উমাইরাও বাধ্য মেয়ের মতন চলে এসেছে মনিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট নেওয়াই আছে, এখন শুধু সময় মতো পৌঁছালেই হবে। উমাইরা আসার পর রাহেলা বেগম আস্তে ধীরে তৈরি হয়ে নেন। তারপর তারা বেরিয়ে পড়েন হসপিটালের উদ্দেশে।

যেহেতু তাদের অ্যাপয়েনমেন্ট সকালে ছিল তাই হসপিটাল থেকে ডাক্তার দেখিয়ে চেকআপ করে বের হতে হতে দুপুর হয়ে যায়। বেশ খিদেও পেয়েছে তাই তারা বাহিরেই লাঞ্চ সেরে ফেলবেন বলে ঠিক করেন। যেই ভাবা সেই কাজ! দুজনেই একটি রেস্টুরেন্টে চলে এলো। খাবার অর্ডার দিয়ে বসে গল্প করছিল উমাইরা ও রাহেলা বেগম।

হঠাৎ উমাইরার চোখ গেল ভিতরের দিকে কর্ণারের একটি টেবিলে। সেখানে পরিচিত তিনটি মুখ দেখতে পেল উমাইরা। উমাইরাররা সামনের দিকে দুই চেয়ারের টেবিল নিয়েছিল।

উমাইরা বেস অবাক হলো! রাইসা, প্রীতি, লামিয়া—ওদের একসাথে দেখে। কই, তাকে তো কিছু জানানো হয় নি। আজকে কি কোনো প্ল্যান ছিল নাকি?

এইসব ভাবতে ভাবতেই উমাইরা নিজের ফোনটা বের করলো। গ্রুপ মেসেজে গিয়ে দেখলো, আজকের জন্য কোনো প্ল্যান তারা করে নি। তারা সব সময় গ্রুপে একসাথে প্ল্যান করে তারপর কোথাও যায়।

বেশি কিছু ভাবলো না উমাইরা। এমনিতেও আজকে সে আসতে পারতো না, তাই আর মাথা ঘামালো না। ততক্ষণে উমাইরাদের খাবার চলে আসে। তাই সব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে খাওয়ায় মন দিল।

খাবার শেষে যখন বের হবে তখন আবারও দৃষ্টি গেলো ওই কর্ণারের টেবিলটাতে। তারপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে বেরিয়ে গেলো রেস্টুরেন্ট থেকে।

---------------------------------

অন্যদিকে কর্ণারের টেবিলটাতে—

রাইসা প্রীতিকে উদ্দেশ্য করে বলল—

-"কিরে ভাই, তোর জানে জিগার প্রাণের বান্ধবীকে বাদ দিয়ে নতুন গ্রুপ খুল্লি কেনো?"

-"সব কথা ওকে বলতে হবে কেনো? দেখিস তো ও কেমন! সব কথায় নিজেকে জড়িয়ে নেয়। সব কথাতে ওর থাকতেই হবে।"

প্রীতির কথার সাথে তাল মিলিয়ে লামিয়াও বলে উঠলো—

-"হুম একদম যা বলেছিস। আমার এইসব একদম ভালো লাগে না। কেন ভাই, এতো কথা বলতে হবে কেন তোকে? সব বিষয়েই ওর কথা বলতে হবে, মতামত দিতে হবে। কেন, আমরা কি তোর মতামত জানতে চেয়েছি নাকি।"

রাইসাও বলে উঠলো—

-"নারে ভাই! এইভাবে বলিস না। আমাদের সবার বিপদে কিন্তু ওকেই সবার আগে পাওয়া যায়। যেকোনো সমস্যার কথা ওকে জানালে সবার আগে ছুটে আসে।"

-"তাতো আসে! কিন্তু তাই বলে ওকে সব কিছু বলতে হবে কেনো? সব কিছু ও নিজের দিকে টেনে নেয়। এমন ভাব যেন পুরো পৃথিবীটাই ওর চারপাশে ঘুরে।"

প্রীতির কথা শুনে লামিয়া বলে উঠলো—

-"আচ্ছা প্রীতি বাদ দে! এখন বল তোর কি খবর? অয়ন ভাইয়ার সাথে কেমন চলছে? আচ্ছা উমাইরাকে সত্যিই কিছু জানাস নি?"

-"না! ওকে জানানোটা প্রয়োজন মনে করছি না আপাদত। যখন প্রয়োজন মনে করব তখন জনাব।"

এইভাবেই তাদের কথাপকথন চলতে থাকলো। যদি একবার চারিপাশে নজর বুলাতো তাহলে হয়তো দেখতে পেতো, দূরের কর্ণারের টেবিলে বসে থাকা উমাইরাকে।

-------------------------

আজ উমাইরা বাড়ি ফেরে নি। আজকে সে তার মনির বাসায় থাকবে। উমাইরা নিজের জন্য বরাদ্দকৃত গেস্ট রুমে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছিল। হঠাৎ খেয়াল, করলো গ্রুপে কেও মেসেজ করছে না। তাই নিজেই মেসেজ করলো—

-"কিরে শাকচুন্নিরা, আজকে এত নীরব কেনো তোরা?"

-"আর বলিস না কালনাগিনী, ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার জন্য বাসা থিকে চাপ দিচ্ছে। বাবা সেই নিয়ে এতক্ষণ ভাষণ দিচ্ছিল।"

সবাই একই উত্তর করলো। এমন মনে হলো, শেখানো বুলি আওড়াচ্ছে সবাই। উমাইরা আর কিছু বলল না। ফোনটা রেখে রুম থেকে বের হলো, উদ্দেশ্য মনিকে জ্বালাতন করা।

-"মনি ও মনি, কি করছো মনি?"

-"কিছু না রে মা! আয় ভিতরে আয়।"

-"তোমার রাজপুত্তুর কি ফোন করেছিল? নবাব সাহেব তো আমারে মেসেজ সিনই করে না, কল রিসিভ করা তো বিলাসিতা।"

উমাইরার কথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন রাহেলা বেগম। বললেন —

-"এবার ফোন করুক শুধু, আচ্ছামতো বকে দিব। আমার সোনামার মেসেজ ইগনোর করা! হুম!"

-"হ্যাঁ, হ্যাঁ! আচ্ছা মতন বকবে কিন্তু!"

-"আচ্ছা মা! যা, অনেক রাত হয়েছে গিয়ে ঘুমিয়ে পর। আমি তোর বাবাই আসলে ঘুমিয়ে পড়বো।"

-"আচ্ছা! শুভ রাত্রি মনি, এত্তো গুলা ভালোবাসা উম্মা।"

বলেই উমাইরা চলে গেলো ঘুমোতে। যাওয়ার পথে তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেলো একটি কক্ষের দিকে। কক্ষটি আর করো নয়, স্বয়ং ওয়াসিফ আয়মানের।

এদিক ওদিক উকি দিয়েই ঢুকে পড়ল রুমে। বিশাল বড় রুম। এই বাড়ির সব চেয়ে বড় রুমের মালিক ওয়াসিফ আয়মান। ঘরের দেয়াল জুড়ে শুধু তার ছবি। কোনো ছবিতে ফুটবল নিয়ে দাড়িয়ে আছে, অন্যটিতে ম্যাচ জিতে পুরষ্কার গ্রহণ করছে, অন্যটিতে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডায় মত্ত, আবার কোনো টিতে পড়াশোনায় সব সময় আশ্নুরূপের চেয়েও ভালো ফলাফল করার স্বরূপ পুরস্কার নিচ্ছে, গিটার হাতে ছবি, আর নানা রকমের ছবিই রয়েছে, বাবা-মা পারিবারিক ছবিও আছে।

প্রতিটা ছবিতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে উমাইরা। আলমারি ভরা জামা-কাপড় গুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে। বিশাল আকারের বিছানাতে দুই হাত মেলে চোখ বুঝে শুয়ে আছে উমাইরা। বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে।

এটা তার ভালোবাসার মানুষের ঘর। এই ঘরের আনাচে কানাচে বিচরণ করে তার ছোঁয়া, তার সুবাস। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে আলামরি থেকে একটা শার্ট বের করলো উমাইরা, তারপর সেই শার্ট টি বুকে জড়িয়ে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ল।

অথচো ও টেরও পেলো না, কেউ তাকে স্ক্রিনের মাধ্যমে দেখছে। তার প্রতিটা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। ঠোঁটের কোণে অঙ্কিত এক সূক্ষ্ম হাসি। তার চড়ুই তার ঘরে, তার বিছানায়, তারই শার্ট বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে ওয়াসিফের বুকে এক প্রশান্তির ঢেউ খেলা করছে।

- তোর ওই ছোট্ট হৃদ্ধয় জুড়ে বুঝি আমার বিচরণ চড়ুই? তুই কি জানিস সপ্তদশী? আমার হৃদয় জুড়েও শুধু তোর বিচরণ।

----------------------------

বেস কিছু দিন পর—

উমাইরা ওর সব বন্ধু-বান্ধবদের কল, মেসেজ করছে, কিন্তু কেও প্রত্যুত্তর করছে না। বাসায় একা এক বিরক্ত লাগছে উমাইরার। কেউ নেই বাসায়! স্নিগ্ধা স্কুলে, অয়ন ভাই ও ভার্সিটি, মা গেছেন মামার বাসায়। অনেকক্ষণ ধরে সারা বাড়ি পায়চারি করে নিজের রুমে এসে ধাপস করে শুয়ে পড়ল।

কিছু একটা ভেবে কল করলো ওয়াসিফকে, দুঃখের বিষয় ওয়াসিফ কল কেটে দিলো। মনের দুঃখে উমাইর তৈরী হয়ে বাসা থেকে বের হলো। একটু এদিক ওদিক ঘুরে বাহিরে কিছু খেয়ে চলে আসবে বাসায়।

অনেকক্ষণ ধরেই হাঁটছে উমাইরা। হেঁটে হেঁটে চারিপাশের দৃশ্যপট দেখতে ভালো লাগে উমাইরার, তাইতো হাঁটছে।

পিচঢালা রাস্তার দুই পাশে ফুটপাথ। ফুটপাথ দিয়ে মানুষের অবাধ বিচরণ। কেউ যাচ্ছে অফিসে, কেও স্কুলে, আবার কেউ স্কুল থেকে ফিরছে, তো কেউ অফিস থেকে। কোথাও কোথাও ৪-৫ জনের বন্ধু মহল দেখা যাচ্ছে, যেখানে হাসির রোল পড়ে আছে। কোথাও আবার প্রেমিক-প্রেমিকার যুগল। আবার কোথাও ফুটপাথে বসবাস করা বাচ্চাদের খেলতে দেখা যাচ্ছে।

ফুটপাথের দুই পাশে ফুচকার স্টল, কেউবা বেলুন বিক্রি করছে, কেউবা ফুল, টং দোকান, আরও নানা কিছু। এইসব কিছু দেখতে দেখতেই অনেকটা পথ চলে এসেছে উমাইরা।

বেশ অনেকটা সময় হাঁটার দরুন একটু ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে দু'পায়ে। তাইতো কাছেই একটি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করল উমাইরা।

এখন সময় দুপুর ২ টা। রেস্টুরেন্টে অনেক ভিড়। মানুষ জন লাঞ্চ করতে আসছে।

নিজের জন্য ফাঁকা জায়গা খোঁজার জন্য উমাইরার দৃষ্টি পুরো রেস্টুরেন্টটাকে স্ক্যান করছে। হঠাৎ একটি টেবিলে উমাইরার চোখ আটকে যায়। টেবিলে চারজন মানুষ বসে খাবার খাচ্ছে— লামিয়া, রাইসা, প্রীতি আর....আর অয়ন।

উমাইরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অয়ন তো ভার্সিটি গিয়েছিল, তাহলে এখানে কি করছে? আর ওরা তিন জন! ওরা কেউ কেনো আমাকে বলে নি আজকে ওরা দেখা করবে, আবার কেউ আমার কল, মেসেজ এর উত্তর ও করে নি। কেনো?

এইসব কিছু ভাবতে ভাবতে হঠাৎ উমাইরার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। চোখের পানি টুকু মুছে উমাইরা উল্টো ঘুড়ে প্রস্থান করলো। বাড়িতে এসে সোজা নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

বেশ অনেকটা সময় ধরে শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে উমাইরা। নিচে গিয়ে ফ্রিজে যে খাবার ছিল, তাই গরম করে খেয়েছে। তারপর নিজের রুমে গিয়ে ফোন করলো ওয়াসিফকে। কিন্তু আফসোস, ওয়াসিফ ফোন ধরে নি।

হঠাৎ কিছু একটা ভেবে মেসেজ করলো হোয়াটসঅ্যাপে— "ভাইজান, আমি কি খুব খারাপ? আমার সাথে কি কথা বলা যায় না? মেসেজটি সেন্ড করেই ফোনটা বন্ধ করে রাখলো উমাইরা। তারপর উপুড় হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।"

---------------------------------

সন্ধ্যা বেলা—

-"উমু এই উমু দরজা খোল বলছি। মরে গেছিস নাকি?বয়রা? শুনছিস না নাকি?"

সজোড়ে ধাক্কাচ্ছে উমাইরার রুমের দরজা। বেশ অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে অয়ন। কিন্তু এই মেয়ে সাড়া দিলে তো! রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে অয়নের।

অনেকক্ষণ ধরে দরজায় ধাক্কাধাক্কির ফলে ঘুম ছুটে গেছে উমাইরার। অয়নের কন্ঠস্বর! তাই একটু আস্তে ধীরে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলো উমাইরা।

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ভিতরে প্রবেশ করলো অয়ন। ক্ষিপ্ত মেজাজে বলতে লাগলো—

-"মোর গিয়েছিলিস নাকি? কতক্ষন ধরে ডাকছি শুনতে পাস নি?"

-"ঘুমিয়েছিলাম! কি বলবে বলো।"

-"ওয়াসিফ ভাই কল দিয়েছিল, তোকে নাকি ফোন পায়নি। দ্রুত কল কর ভাইকে। আমার মাথা খেয়ে ফেলছে পুরো যত্তসব।"

বলেই গট গট করে হেঁটে চলে গেলো রুম থেকে।

উমাইরা দ্রুত নিজের ফোন হাতে নিয়ে অন করলো। ওয়াসিফ ভাইজান অনেকবার কল দিয়েছে। উমাইরা দেরি না করে কল দিলো ওয়াসিফকে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই ভেসে এলো এক গম্ভীর কন্ঠস্বর—

-"কোথায় ছিলি? সেই কখন থেকে কল করছি আমি।"

-"ঘুমিয়েছিলাম।"

-"এই অবেলায় কেউ ঘুমায়? শরীর ঠিক আছে তোর?"

-"হুম, ঠিক আছি। তুমি আমার কল রিসিভ করে না কেনো? মেসেজের উত্তর দাও না কেনো?"

-"আমি কি এখানে বেড়াতে এসেছি?"

-"না!"

-"তাহলে কেনো এসেছি আমি এখানে?"

-"রিসার্চ করতে!"

-"তাহলে কি আমি সারাদিন রিসার্চ না করে তোর সাথে গল্প করব, বেয়াদব। এত ফোন দেওয়ার কি আছে? কই, আর কেউ তো তোর মতন এত কল দেয় না, মেসেজ দেয় না। তুই কেনো সারাদিন কল, মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করিস আমাকে?" (একটু রাগী ও ধমকের শুরেই বলল ওয়াসিফ)

-"আমি বিরক্ত করি তোমায়? আমি কল করলে, মেসেজ দিলে, তুমি বিরক্ত হও ভাইজান?"

-"হ্যা! বিরক্ত হই আমি। বুঝিস না তুই? তাই তো আমি তোকে ইগনোর করি! কারণ তুই খুব বিরক্ত কর একটা মেয়ে।"

-"বেশ! আমি আর কোনো দিন তোমাকে কোনো কল বা মেসেজ করবো না।"

বলেই কলটা কেটে দিলো উমাইরা। কান্না পাচ্ছে খুব। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে কান্না করছে উমাইরা, আর ভাবছে, কি এমন করেছে উমাইরা? যে সবাই তাকে ইগনোর করছে। কেউ তার সাথে এখন কথা বলতে চায় না।

বন্ধু-বান্ধব গুলোও বদলে যাচ্ছে। কেউ আগের মতন তেমন কথা বলে না। ওকে ছাড়াই সবাই নিজেদের মতন প্ল্যান বানিয়ে ফেলে, ওকে বলার প্রয়োজন মনে করে না।

কি অপরাধ উমাইরার? আগে তো সবাই উমাইরা বলতে অজ্ঞান ছিল। কিছু হলে সবার আগে উমাইরাকে জানাতো। কোনো সমস্যাই হলে সবার সমাধান উমাইরা ছিল। তবে কি হলো এখন? উমাইরা সবার চোখের বিষ হয়ে গেলো।

এইসব কিছু ভাবতে ভাবতে কান্না করছে উমাইরা। অনেক্ষন পর উমাইরার মা খাবারের জন্য ডাকতে এসেছেন। উমাইরা ফ্রেশ হয়ে এসে মাকে দরজা খুলে দেয়, আর বলে—

-"আমি খাবো না মা। সন্ধ্যার আগে খেয়েছিলাম পেট ভরা। তোমরা খেয়ে নাও।"

-আচ্ছা ঠিক আছে।"

বলেই চলে গেলেন রুমানা রহমান। মা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে গিটারটা নিয়ে বারান্দায় চলে আসে উমাইরা। নিকষ কালো আঁধারে ঘেরা আকাশ। মেঘ জমেছে আজ আকাশে, যেমনটা উমাইরার মনে আজ মেঘ জমেছে। সেই মেঘে ঢাকা আকাশ পানে চেয়ে গাওয়া শুরু করলো উমাইর—

কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে

কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে

তোমারে দেখিতে দেয় না

মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না

মোহমেঘে তোমারে

অন্ধ করে রাখে

তোমারে দেখিতে দেয় না

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

ক্ষনিক আলোকে আঁখির পলকে

তোমায় যবে পাই দেখিতে

ওহে ক্ষনিক আলোকে আঁখির পলকে

তোমায় যবে পাই দেখিতে

ওহে হারাই-হারাই সদা হয় ভয়

হারাই-হারাই সদা হয় ভয়

হারাইয়া ফেলি চকিতে

আঁশ না মিটিতে হারাইয়া

পলক না পড়িতে হারাইয়া

হৃদয় না জুড়াতে

হারাইয়া ফেলি চকিতে

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

ওহে কি করিলে বলো পাইব তোমারে?

রাখিব আঁখিতে আঁখিতে

ওহে কি করিলে বল পাইব তোমারে?

রাখিব আঁখিতে আঁখিতে

ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ

এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ

তোমারে হৃদয়ে রাখিতে

আমার সাধ্য কিবা তোমারে

দয়া না করিলে কে পারে?

তুমি আপনি না এলে

কে পারে হৃদয়ে রাখিতে?

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

ওহে আর কারো পানে চাহিব না আর

করিব হে আজই প্রাণপণ

ওহে আর কারো পানে চাহিব না আর

করিব হে আজই প্রাণপণ

ওহে তুমি যদি বল এখনি করিবো

তুমি যদি বল এখনি করিবো

বিষয় বাসনা বিসর্জন

দিব শ্রীচরণে বিষয়

দিব অকাতরে বিষয়

দিব তোমার লাগি বিষয়

বাসনা বিসর্জন

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে?

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে?

তোমারে দেখিতে দেয়না

মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয়না

মোহমেঘে তোমারে

অন্ধ করে রাখে তোমারে

দেখিতে দেয়না

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

চিরদিন কেন পাইনা?

অশ্রুসিক্ত নয়নে ধরে আসা কন্ঠে গান গাইছে উমাইরা। কেউ নেই তার এই খারাপ লাগার কথা শোনার জন্য। তাইতো সে নিজের অনুভূতিগুলো গানে উজাড় করে দিচ্ছে। তার সেই সুর শুনছে শুধু খোলা আকাশ, নীরব প্রকৃতি, গাছের ডালে বসে থাকা কিছু পাখি।

অনেক্ষন ধরে বারান্দায় বসে আছে উমাইরা। কান্না করার ফলে চোখ-মুখ ফুলে রয়েছে। ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগছে উমাইরার। এবার উঠা উচিত! তাই উমাইরা ধীরে ধীরে উঠে ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। ফোনটা হাতে নিয়ে চেক করলো, কেউ কল বা মেসেজ করেছে কি-না। না, কেউ কল বা মেসেজ করে নি।তারপর ফোনটা আবারও বন্ধ করে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল উমাইরা।

পাশের ঘরে অয়ন এতক্ষণ ধরে বোনের গান শুনছিল। এত কষ্ট, এত অভিমান, এতটা বিষাদময় কেনো লাগছিল বোনের কন্ঠস্বর? চোখে অশ্রু দেখলাম। কি হয়েছে উমাইরার?

অয়ন ও উমাইরার রুম পাশাপাসি। বারান্দা টাও মাঝে একটু ফাঁকা রাখা, একটি বারান্দা পর আর একটি। তাই বারান্দা থিকে অন্য বারান্দায় সব দেখা যায়।

অয়ন মূলত এসেছিল উমাইরার ভিডিও ধারণ করতে। সেই ভিডিওটা অয়ন কাউকে পাঠিয়েছে। তারপরই রুমের ভেতরে চলে যায় অয়ন। অপরপ্রান্ত থিকে সিন করা হয়েছে, তবে কোনো উত্তর আসে নি। তাই আর কিছু নাহ ভেবে ফোনটা সাইড টেবিলে রেখে শুয়ে পড়ল অয়ন।

ওপর দিকে ইতালিতে—

ওয়াসিফ ল্যাবে সব কাজ কমপ্লিট করে নিজের বাসায় এসেছে সবে। বাসায় এসে একটু রেস্ট নিয়ে, হাতে ফোনটা নিয়েই দেখলো অয়নের মেসেজ। সাথে সাথে ইনবক্সে ঢুকে দেখল একটি ভিডিও, যেখানে তার চড়ুই খুবই করুন শুরে গান গাইছে। গাল বেয়ে অশ্রুরা গড়িয়ে পড়ছে।

ভিডিওটা দেখে ওয়াসিফের ভিতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। সব কিছু শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে ওয়াসিফের। সামনে থাকা টি টেবিলের ওপর পানির গ্লাস, ফুলদানি সব কিছু হাত দিয়ে ঠেলে ফেলেছে। ঘরের সব কিছু ওলট পালট করে ফেলেছে। তাও যেনও রাগ কমছে না নিজের প্রতি। দুম করে এসে সোফায় বসে, দুই হাত দিয়ে নিজের চুল খামছে ধরেছে, চিৎকার করে বলছে—

-"কেনো, কেনো আমি নিজের রাগ সংবরণ করতে পারলাম না কেনো? অন্যের রাগ আমার ছোট্ট চড়ুইয়ের ওপর দেখিয়েছি আমি। আমার চড়ুই কষ্ট পেয়েছে, কান্না করছে আমার চড়ুই আহহহহ....আইএম সরি চড়ুই। বিশ্বাস কর, আমি তোর ওপর রাগ করতে চাই নি। কেনো বললাম আমি তোকে ওইসব কথা গুলো। তুই একটুও বিরক্তকর না চড়ুই, তুই আমার শান্তির নীড়। তোর কন্ঠস্বর শুনলে, তোকে একপলক দেখলে, আমি শান্তি পাই। তুই আমার সুখ, তুই আমার শান্তি জানপাখি। একবার দেশে আসি জানপাখি, তারপর তোর সব রাগ-অভিমান আমি ভাঙবো, অপেক্ষা কর সোনা।"

কথা গুলো বলতে বলতে ওয়াসিফের চোখ দিয়ে দু'ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তারপর কিছুক্ষণ ঐভাবে বসে থাকল। সারাদিন ল্যাবে কাজ করে বেশ ক্লান্ত ওয়াসিফ। অনেক্ষন ঐভাবে বসে থাকার পর ভাবলো, ফ্রেশ হওয়া প্রয়োজন। তড়িৎ বেগে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

পরদিন উমাইরাকে ওয়াসিফ অনেকবার কল করছে উমাইরা একটি কল ও রিসিভ করে নি।

এইভাবেই চলতে থাকলো বেশ কিছু দিন। উমাইরা ও ওয়াসিফের আর কথা হয় নি। ওয়াসিফ বলতে চাইলেও উমাইরা বলে নি।

------------------------------

অন্যদিকে উমাইরা বুঝতে পারছে না তার বন্ধুদের এই পরিবর্তনের কারণ। কেউ আর তার সাথে তেমন মিশে না, কথা বলে না, অথচো ওরা তিনজন ঠিকই আগের মতন আছে— শুধু নেই উমাইরার সাথে। যেনো ওরা উমাইরার সাথে সকল সম্পর্ক শেষ করে দিতে চাইছে। কিন্তু কেনো? উমাইরা কিছুতেই বুঝতে পারছে না।

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ২ গল্পের ছবি