আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ৬

🟢

সকালে খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত, শুধু উমাইরা ও ওয়াসিফ নেই। এক ধরনের নিস্তব্ধতা ঘিরে রেখেছে ডাইনিং রুমে। কেউ কারও সাথে কোনো কথা বলছে না। সবাই চুপ চাপ বসে আছে, উমাইরার আসার অপেক্ষায়। রুমানা বেগম রান্না ঘর থেকে সব খাবার এনে টেবিলে রাখছেন, একটু পর পর সিঁড়ির পানে দৃষ্টি তাক করেন।

উমাইরা আস্তে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসেছে। ডাইনিং রুমে সবাই উপস্থিত, উমাইরা গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। তার বেশ কিছুক্ষণ পর ওয়াসিফ ও নেমে আসে একদম পরিপাটি হয়ে। সবাই উপস্থিত হলে রুমানা বেগম ও রাহেলা বেগম মিলে সবাইকে পরিবেশন করছে।

খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হতেই সবাই ড্রয়িং রুমে বসেছেন। আজকে উমাইরার মামারা ফিরে যাবেন। তাই বসে কিছু কথা বলছিলেন। তন্মধ্যে উমাইরা এসে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে শুরু করে—

-"আব্বু তো এখন অনেকটাই সুস্থ! তাই আমি ভাবছিলাম আমি কিছু দিনের মধ্যে কানাডা ফিরে যাব।"

-"কি বলছিস তুই? কখনোই না! আর কোনো দিন ফিরে যাবি না তুই। এখন থেকে আমাদের সাথেই থাকবি, আর কোথাও যাওয়ার নাম যেনো আমি না শুনি।"

আজাদ রহমান বেশ উত্তেজিত হয়ে কথা গুলো বললেন। সবাই মিলে ওনাকে শান্ত করছে। উমাইরার দাদু আরিফ রহমান বলে উঠলেন—

-"এখন এইসব কথা বলার সময় নয় দাদুভাই! মাত্র দুদিন হলো তুমি এসেছো। এইসব নিয়ে আমরা পরে কথা বলব। আজকে তোমার মামারা চলে যাবেন তাদের সাথে সময় কাটাও।"

উমাইরাও দাদাভাইয়ের কথার বিপরীতে আর কোনো কথা বলতে পারল না। নানা-নানী মামা-মামীকে বিদায় দেওয়ার জন্য সবাই সদর দরজায় দাড়িয়ে আছেন। যাওয়ার পূর্বে রফিক আহমেদ (মামা) সবার উদ্দেশে বললেন—

-"সাবধানে থেকো সবাই। নিজেদের খেয়াল রেখো।

উমাইর, মা... যা হবার হয়েছে, । এখন সময় সব ভুলে যাওয়ার। পুরোনো কষ্টগুলো বারবার মনে গেঁথে রেখে আর কিছু হবে না। কারও করা একটি অন্যায়ের জন্য পরিবার থেকে দূরে সরে থাকা কোনো সমাধান নয়। বরং কাছে থেকেই সম্পর্কের জটগুলো খুলে ফেলতে হয়। আশা করি আমার কথাগুলো বুঝতে পেরেছিস।"

রফিক আহমেদ ভাগ্নির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে আদুরে কন্ঠে কথা গুলো বললেন। উমাইরাও মাথা নেড়ে সম্মতি পোষণ করল। তারপর রফিক আহমেদ একে একে সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

মামাদের বিদায় দিয়ে উমাইরা নিঃশব্দে উপরে চলে আসে। রুমে এসেই ফ্রেশ হতে চলে গেছে উমাইরা। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ফ্রেশ হয়েছে উমাইরা। বাথরুম থেকে বের হয়েই উমাইরার চোখ থমকে যায় সামনে থাকা মানবটিকে দেখে।

ছয় ফুট লম্বা সুঠাম দেহ। জিমে তৈরি চওড়া বক্ষ আর মজবুত পেশি, অনুশীলনের ছাপ শরীরের প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠেছে। পরনে ইন করে পরা কালো শার্ট ও ফরমাল প্যান্ট। দুই হাতের হাতা গুটোনো কনুই পর্যন্ত। মুখে একদম ছিমছাম গুছানো ঘন দাড়ি, যা চেহারার আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চুলগুলো স্টাইল করে স্লিক ব্যাক করা, যা তাকে আরও গম্ভীর আর আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ধূসর বাদামি চোখের মনি ঢেকে রেখেছে Rimless Rectangular Eyeglasses এর ধারা (ফ্রেমবিহীন আয়তাকার চশমা)। দুই হাত আড়াআড়ি ভাবে রেখে, কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ওয়াসিফ। চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো কিছু নিয়ে ভীষণ অখুশি সে।

উমাইরা সেই চোখের পানে তাকিয়ে থাকতে পারলো না বেশিক্ষণ। কিছু একটা ছিল ওই চোখে, যা উমাইরার ভেতরে সব নাড়িয়ে তুলেছে। নিজেকে ধাতস্থ করে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সামনে। মাথাটা নিচু, আস্তে ধীরে মাথা তুলে তাকালো সামনে উপস্থিত মানবের দিকে। তারপর তার উদ্দেশ্যে বলল—

-"ওয়াসিফ ভাই, আপনি আমার রুমে?"

ওয়াসিফের কুঁচকানো ভ্রু-জোড়া আরও কুঁচকে এলো। গম্ভীর্য বজায় রেখে, কর্কশ কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর উদ্দেশ্যে—

-"ওয়াসিফ ভাই? আমি কবে থিকে তোর ওয়াসিফ ভাই হলাম?"

মাথাটা নিচু করে নেয় উমাইরা। হাতে থাকা তোয়ালেটা আঙুলের সাহায্যে খুঁটিয়ে যাচ্ছে। সব ভাবনা রেখে চোখ তুলে চাইলো উমাইরা ওয়াসিফের দিকে—

-"কিছু বলবেন?"

-"খুব সাহস বেড়েছে তোর তাই না? নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে একাই নিতে শিখেছিস, কাউকে প্রয়োজন নেই এখন তোর, তাই না? অনেক বড় গেছিস? আমি ছিলাম না বলে চলে যেতে পেরেছিলি, এবার আমি আছি! বাড়ি থেকে এক পা বের কর জাস্ট। এমন হাল করবো তোর আমি, কল্পনাও করতে পারবি না। কেউ বাঁচাতে পারবে না আমার হাত থেকে মাইন্ড ইট।

রাগে চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে ওয়াসিফের। নিজের রাগ সংযত করতে বরাবরই ব্যর্থ সে। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে চোয়াল শক্ত করে কথা গুলো বলে উল্টো হাটা ধরলো ওয়াসিফ। দরজার কাছে এসেই কিছু একটা ভেবে স্থির হলো পদযুগল। ঘাড় ঘুরিয়ে রক্ত চক্ষু নিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো উমাইরার দিকে। শক্ত কন্ঠে

বলল—

-"কোথাও যাওয়ার আশা বাদ দিয়ে দে। মাথায় উল্টো পাল্টা বুদ্ধি আনলে ঠ্যাং ভেঙে ঘরে ফেলে রাখবো। আমার কথার নড়চড় হলে কি হতে পরে তুই খুব ভালো করেই জানিস।

কথা গুলো বলেই গটগট পায়ে হেঁটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো ওয়াসিফ। উমাইরা যখন কানাডা ফিরে যাওয়ার কথা বলছিল তখন ওয়াসিফ দোতলার সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ কথা শুনছে। আর ধীরে ধীরে পায়ের রক্ত মাথায় চড়ে বসেছিল। চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছিল, মুহূর্তেই চোখের রং বদলে লাল বর্ণ ধারণ করেছিল। অপেক্ষায় ছিল উমাইরাকে একা পাওয়ার। তাইতো সবাইকে বিদায় দিয়ে যখন কক্ষে আসে, পিছু পিছু ওয়াসিফ ও চলে আসে। তারপরই রাগের বসে ঝেড়েছে উমাইরাকে। তাও যেনও রাগ কমছে না ওয়াসিফের। তাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।

---------------------------

ওয়াসিফ আর ফিরে আসে নি। ওয়াসিফ ফিরে না আসায় সন্ধ্যার দিকে রাহেলা বেগম ভাই আজাদের কাছে ছেলেকে নিয়ে চিন্তা পরকাশ করেন। তারপর ওসমান আয়মানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বাড়ির উদ্দেশে। ছোট ফুপু রুবায়েত বেগম ও চলে গেছেন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে।

সবাই একসাথে রাতের খাবার খেতে বসেছে। প্রীতি নেই, যেহেতু তাদের আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে হয় নি এখনো, তাই প্রীতি এখানে থাকে না। তবে মাঝে মাঝে অয়নের বায়নায় আসতে হয়, দুই একদিন থেকে আবার চলে যায়। আজকেও সে ফিরে গেছে। উমাইরার দাদু উমাইরার উদ্দেশে বললেন —

-"দিদিভাই, আমাদের বয়স হচ্ছে। তোমার বাপ-চাচারা এত বড় হয়েছে, কিন্তু কোনো দিন আমার কথার অবাধ্য হয়নি। সব সময় আমার কথা শুনেছে, মান রেখেছে। তারা কেউই কখনও দূরে থাকে নি। কাজের সূত্রে বাহিরে যেতে হয় তারপর ফিরেও আসে। তুমি আমাদের অনেক সখের ও আদরের দাদুভাই। তোমাকে ছাড়া বাড়িটা শূন্য লাগে। এই পাঁচ বছর আমরা কিভাবে কাটিয়েছি আমরা জানি। তুমিও যে খুব ভালো ছিলে না সেটাও আমরা বুঝি। তাই বলছি এই বুড়োর কথাটা রাখো, বিদেশে যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। আর কোথাও যাওয়ার নাম মুখে এনো না

শেষের কথা গুলো অনেক করুন ভাবে বললেন আরিফ রহমান। নাতনির কাছে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। নাতনি ছাড়া অনেক কষ্টে দিন কাটিয়েছেন তারা, আর সেই কষ্ট ভোগ করতে চান না। দাদুর চোখে অশ্রু দেখে উমাইরা উঠে গেলো তার কাছে, পেছন থেকে গোলা জড়িয়ে আদুরে গলায় বলল—

-"আহা বুড়ো! কাদঁছ কেনো? আমি কোথাও যাব না, হয়েছো খুশি? এক বউ দিয়ে হয় না তোমার বুঝেছি আমি। তিন বউ একসাথে লাগে তোমার! বুঝলে দাদী তোমার স্বামীর চরিত্রে দোষ আছে। দেখেছো কিভাবে চোখের পানি দিয়ে তোমার সতিনকে আটকে রাখলো

রসিকতার সুরে কথা গুলো বললো উমাইরা, উমাইরার কথা শুনে উপস্থিত সকলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। খাবার টেবিল জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেছে। নাতনির কথা শুনে কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাদী বলে উঠলো—

-"হ্যাঁ! আমার দুঃখ কেউ বুঝল নারে সতীন! কাকে নিয়ে এত বছর ঘর সংসার করলাম দেখরে আজাদ, আজান।"

-"হ্যাঁ, মা তাই তো দেখছি। আসলের চেয়ে শুধের মূল্য বেশি। এখন আমরা হলাম আমের আঠি বুঝলে ভাইয়া।"

-"আহ, কাকুমনী! তুমি তো দেখছি বড্ড হিংসুটে। এত হিংসে করো না শরীরের জন্য ভালো নয়, বুঝলে?"

-"হ্যাঁ! দাদু তো এখন নাতনিকে পেয়ে আমাদের ভুলেই গেছে।"

অয়নের বলা কথায় উমাইরা মুহূর্তেই, দাদুকে ছেড়ে এসে চেয়ার টেনে বসলো। মুখের হাসি মূহুর্তেই মিলিয়ে গেলো। সবাই পরিস্থিতি বুঝল, এই রাগ অভিমান সহজে মিটবার নয়। আজাদ রহমান বললেন —

-"হয়েছে হয়েছে, অনেক হাসি মজা হয়েছে এইবার সবাই খাওয়ায় মন দাও। খাবার সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"

অয়নের মনটা বিষিয়ে উঠলো। বোনটা তার অনেক অভিমান করছে, অনেক রাগ করেছে। যেভাবেই হোক তার অভিমান, রাগ ভাঙাতে হবে, যেইভাবে হোক।

---------------------------

নিস্তব্দ ঘর! বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি মানব। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। একটু পরপর মুখ থেকে ধোঁয়া বের করে উড়িয়ে যাচ্ছে আকাশে। চেহারা কঠিনতায় ঘেরা। চোখে একধরনের প্রশান্তি, যেনো বহু অপেক্ষার পর কোনো কিছুর দর্শন পেয়েছে। পরক্ষণেই চোখ জলে উঠে তীব্র ক্ষোভে। রাগ যেনো তিরতির করে বাড়ছে। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছে ওয়াসিফ। তার চড়ুই আবারও চলে যেতে চায় ভাবলেই রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, মুষ্টিবদ্ধ হয় হাত।

-"অনেক জ্বালিয়েছিস আমকে তুই চড়ুই। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার করেছিস এই ওয়াসিফ আয়মানকে। এবার তোর জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হওয়ার পালা। এইবার আর তোকে আমি কোথাও যেতে দিচ্ছি না চড়ুই। আমার বুকের খাঁচায় তোকে বন্দী বানাবো আমি। তারপর যতো ইচ্ছে তুই উড়িস বাধা দিবো না আমি। আমার মোহনমল্লিকা।"

------------------------

কিছুদিন পর রাইসা, লামিয়া ও প্রীতি উমাইরার প্রিয় ফুল ও পছন্দের চকলেট নিয়ে এসেছে দেখা করতে। উমাইরা দামী, বড় জিনিসের চেয়ে এইসব ছোট ছোট জিনিসে খুশি হয়। সেই জন্যই নিয়ে আসা।

তিনজনেই ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে, উমাইরা এখনো নিচে নামেনি, তার জন্যেই অপেক্ষা। অবশেষে সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নিচে নেমে এলো উমাইরা। সোজা গিয়ে বসলো দূরের একটি সোফায়, যা প্রীতিদের বসার জায়গা থেকে বেশ দূরেই। প্রীতি, রাইসা ও লামিয়া দেখলো, তাদের প্রাণপ্রিয় বান্ধবী যে কিনা তাদের গা ঘেঁষে বিশতে পছন্দ করত, সেই বান্ধবী আজ কতটা দূরত্ব রেখে বসেছে। এই দৃশ্য দেখে তিনজনের বুক হাহাকার করে উঠলো।

অবশেষ সব ভাবনা রেখে প্রীতি ধীর পায়ে এগিয়ে এলো উমাইরার দিকে। চোখেমুখে অনুতাপ আর আবেগের ছায়া। নীরবে হাত বাড়িয়ে দিলো একগুচ্ছ তাজা ফুল। কোমল স্বরে বললো—

-"ফিরে আসার জন্য স্বাগতম, উমাইরা।"

সেই মুহূর্তে চারপাশে যেন নিঃশব্দে ফুটে উঠলো ক্ষমা, মায়া আর নতুন শুরুর সম্ভাবনা।

উমাইরা কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো।

চোখে ছিল এক নিষ্প্রাণ দৃষ্টি, যার ভাষা কেউই পড়ে উঠতে পারলো না। ধীরে উঠে দাঁড়ালো, প্রীতির মুখোমুখি এসে হাত বাড়িয়ে নিলো ফুলের তোড়াটা। একবার তাকালো প্রীতির চোখে, স্নান হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। তবে সে হাসিতে না ছিল উষ্ণতা, না ছিল অভিমান, ছিল কেবল শূন্যতা।

এরপর কোনো কিছু না বলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো ডাস্টবিনের দিকে। প্রীতি, রাইসা, আর লামিয়া অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার পেছনে। তারা কেউই বুঝে উঠতে পারছে না, উমাইরার ভেতরে কী চলছে, সে কি ক্ষমা করতে চায়, না একেবারে শেষ করে দিতে?

উমাইরা ডাস্টবিনের কাছে গিয়ে থামলো। আস্তে করে ঘুরে তাকালো প্রীতিদের দিকে। মুখে টেনে আনলো এক ঠান্ডা, বিস্বাদ হাসি। তারপর স্থির স্বরে বললো—

-"যাকে ঘৃণা করেন, তার জন্য ফুল নিয়ে আসাটা একটু দৃষ্টিকটু না? আর চরিত্রহীন মানুষের জন্য তো ফুল বরাবরই বেমানান।"

কথা শেষ করেই নির্দ্বিধায় ফুলের তোড়াটা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো। তারপর নিস্তব্ধ ঘরে ধীরে পা ফেলে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো।

পাশে জমে রইলো স্তব্ধতা, অপরাধবোধ, আর অনুতাপের ভার। প্রীতি, রাইসা, লামিয়ার মুখে মেঘ জমে গেলো। এটা প্রাপ্য ছিল। তারা যা করেছে তার তুলনায় এটা সামান্য। নিজেদের সামলে নিয়ে প্রীতি বলতে লাগলো—

-"আমাদের ভুল ছিল উমাইরা। তোকে ওইসব কথা আমরা বলতে চাইনি। রাগের বশে কি থেকে কি বলে ফেলেছি আমরা। আমাদের মাফ করে দে প্লিজ!" দুই হাত জোড় করে তিনজন মাফ চাইছে।

তা দেখে উমাইরা হালকা এক তীক্ষ্ণ হাসি হাসলো।

তাচ্ছিল্যের সুরে, ঠান্ডা গলায় বলল—

-"পাঁচ বছর পর বুঝলেন? এই বোধটা হঠাৎ করে কীভাবে হলো শুনি? নিজেদের ভুলটাই বা বুঝলেন কীভাবে? ততদিনে তো আমায় অপমান করে, কাঁদিয়ে, একা করে দিতে কারও দ্বিধা ছিল না!"

তার কণ্ঠে ছিল না চিৎকার, কিন্তু প্রতিটি শব্দ কাঁটার মতো বিঁধছিল চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবার অন্তরে।

প্রীতির গলা কাঁপছে। চোখ ভেজা, কণ্ঠে অনুতাপ জমে আছে। ধীরে ধীরে উমাইরার সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে বলল—

-"অয়ন তোকে থাপ্পড় মারার পরেই আমাদের চোখ খুলেছে, উমাইরা। এইরকম একটা ভালোবাসার মানুষ আল্লাহ আমার জীবনে পাঠিয়েছিল,আর আমি… আমি! শুধু ছোটবেলার একটা সামান্য ক্রাশের রেজেকশন মেনে নিতে না পেরে, নিজের বেস্ট ফ্রেন্ডকে ত্যাগ করলাম?”

তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। পাশ থেকে রাইসা চাপা স্বরে বলল—

-"নিজেদের প্রতিই ঘৃণা জন্মায় এখন। যে ছেলে আমাকে কখনো ভালোবাসেনি, তার বলা মিথ্যে কথা বিশ্বাস করে তোকে ভুল বুঝে কত কিছু বলেছি। একজন বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক প্রেমিক, তার জন্য এমন একজনকে আঘাত করলাম, যে আমাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসত!"

প্রীতি আবার বলল—

-"সত্যি, উমাইরা… আমরা অনেক বড় ভুল করেছি।

দয়া করে আমাদের ক্ষমা করে দে। তোর সাথে এই দূরত্ব… এই দূরত্ব আমাদের আর ভালো থাকতে দিচ্ছে না। তুই না থাকলে সবকিছু অসম্পূর্ণ লাগে।

মাফ করে দে, উমাইরা… প্লিজ।"

তিনজনের মুখেই তখন অপরাধবোধ, অনুতাপ আর কান্না জমে আছে। শব্দের ফাঁকে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছে তাদের অহংকারের দেয়াল।

উমাইরা একদম নিশ্চুপ। পাঁচ বছরের তীব্র যন্ত্রণা, অপমান, একাকীত্ব, অবহেলা, সবকিছু তাকে ধীরে ধীরে পাথর করে তুলেছে। চোখে না ছিল অশ্রু, না ছিল মায়া, ছিল শুধু শীতল নির্লিপ্ততা।

প্রীতি, রাইসা আর লামিয়ার কান্না, অনুনয়— কিছুতেই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে। চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে বলল—

-"আপনাদের সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।

আপনারা এখন আসতে পারেন। আজকের এই দেখা, এই প্রথম, আর এই শেষ। এই মুহূর্তের পর থেকে আপনারা কেউ আমার সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেন না। ভালো থাকবেন।"

তার কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অগাধ বিসর্জনের শব্দহীন হাহাকার। পেছনে পড়ে রইলো নিঃশব্দ এক বুক অপরাধবোধ আর সম্পর্কের শেষ ছায়া।

-------------------------------

এরই মধ্যে কেটে গেছে অনেক দিন। প্রীতি, রাইসা, লামিয়া অনেকবার এসেছিল উমাইরার সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু উমাইরা বার বার একই কথা জানিয়েছে "যারা আমাকে ঘৃণা করে তাঁরা কেন আমার সাথে দেখা করবে? আমি তো চরিত্রহীন, চরিত্রহীন মানুষের সাথে দেখা করতে নেই।" বার বার হতাশ হয়ে ফিরে এসে সবাই। অয়নের সাথে পর্যন্ত কথা বলে না উমাইরা।

অয়ন আর স্নিগ্ধা অনেক চেষ্টা করেছে উমাইরাকে বোঝাতে, ফিরিয়ে আনতে পুরোনো সম্পর্কে। কিন্তু উমাইরা ছিল একরোখা, সে কিছুই শুনতে চায়নি, কারো কথা নয়।

সে নিজের ঘরের কোণে, জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরের হাওয়া ধীরে ধীরে পর্দা উড়িয়ে আনছিল, হঠাৎ কোথা থেকে যেন দুটি রঙিন কাগজ উড়ে এসে পড়ল তার পায়ের কাছে। পাথরে মোড়ানো ছিল কাগজদুটি, নির্বাক, কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল এ যেন নীরব কোনো চিৎকার। উমাইরা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল কাগজগুলো। যেন কিছু একটায় টান আছে। পাথর খুলে প্রথম কাগজটি খুলে দেখে, আর চোখ আটকে যায় সেখানে লেখা কিছু কথায়—

-"প্রিয় আপুই,

তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। সত্যি বলছি, তোমার সঙ্গে যেভাবে ব্যবহার করেছি, সেটা মনে পড়লেই লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়। আমি জানি, আমি তোমার আদরের ছোটবোন, তুমি আমাকে দুচোখ ভরে স্নেহ করেছো, ভালোবেসেছো। অথচ আমি? আমি ছিলাম অবুঝ, গোঁয়ার—তোমার ভালোবাসাটা পর্যন্ত বুঝিনি, বরং তোমাকেই কষ্ট দিয়েছি।

জানি, আমি ক্ষমার যোগ্য নই। তবুও... যদি পারো, যদি কখনো মনের গভীরে জায়গা পাও—তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, আপুই। তোমার ছোটবোন বলে ডেকে নিও আবার... শুধু একবার।

—তোমার ছোটবোন স্নিগ্ধা।

উমাইরার চোখের পাতা কাঁপে। চোখের কোণে কিছু ভিজে ওঠে। এতদিনের জমে থাকা অভিমান যেন একটু নড়ে চড়ে ওঠে। কিন্তু দ্বিতীয় কাগজটি পড়ে কি আরও শক্ত হয়ে যাবে সে, না কি... গলে যাবে পুরোটাই?

কাগজের ভাঁজ খুলে পড়ে দ্বিতীয় চিঠিটি, অয়নের লেখা—

"উমাইরা,

কত কিছু বলার ছিল, অথচ বলা হয়নি। আজ এই কাগজে লেখার ভান করে হলেও একটা সুযোগ চাচ্ছি। তোর চোখে চোখ রেখে মাফ চাওয়ার সাহস হয়নি আমার, তাই এই নীরব কণ্ঠে কথা বলছি।

তোর চোখে জল, আমার বুকের ছ্যাঁকা হয়ে এসেছিল, কিন্তু ততদিনে সব ভেঙে গিয়েছিল। আমি যদি সময়ে বুঝতাম, তবে হয়তো সবটা অন্যরকম হতো।

প্রীতিকে ভালোবেসেছিলাম, কিন্তু তোকে ভুলে নয়। আমার ভুলগুলো এখন তোর প্রতিটি নীরবতা মনে করিয়ে দেয়। শুধু চাইছি... যদি তুই কোনোদিন, কোনোভাবে, আমায় আবার ভাই বলে ডাকিস, তাহলেই আমি বুঝব, আমি নিজেকে কিছুটা ক্ষমা করতে পেরেছি।

তুই জানিস, আমি তোকে কতটা ভালোবাসি। তুই তো আমার রক্তের সম্পর্কের বাইরেও এক ধরণের আত্মার অংশ। আমার রাগটা তুই জানিস, সেদিন ভার্সিটিতে কিছু গণ্ডগোল হয়ে মাথা এমনিতেই বিগড়ে ছিল। রিল্যাক্স হওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে ঢুকেছিলাম, আর ঠিক তখনই তোকে প্রীতির গায়ে হাত তুলতে দেখি…

বিশ্বাস কর, তখন আমার মাথা পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

তুইই বল, যাকে আমি ভালোবাসি, তার গায়ে কেউ হাত তোলার দৃশ্য আমি কীভাবে সহ্য করব? আর যখন দেখি সেটা আমারই ছোটবোন… তখন রাগ, অভিমান, সব একসাথে আমাকে ধাক্কা মারে। তুই আমার বোন, তোকেই তো আমি শাসন করতে পারি, আদর করতে পারি। কিন্তু জনসম্মুখে তোকে আঘাত করে ফেলেছি! এটা আমার জীবনের সবচেয়ে লজ্জার মুহূর্তগুলোর একটা।

রাগের মাথায় কী করেছি বুঝিনি, কিন্তু পরে বুঝেছি। তোর চোখের দিকে তাকানোরই সাহস নেই আমার। তবুও সেদিনই তোকে খুঁজতে গিয়েছিলাম… কিন্তু তুই ততক্ষণে চলে গিয়েছিলি।

আমি জানি না আমি কতটা দোষী, কতটা ক্ষমার অযোগ্য। তবুও, আজ নির্লজ্জের মতো তোর কাছে একটাই প্রার্থনা, মাফ করে দে আমায়। তুই যদি ‘ভাই’ বলে আর একবার ডেকে ওঠিস, আমি বুঝব, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তির শেষ হয়েছে।

— তোর ভাই অয়ন।"

কাগজ দুটি হাতে নিয়েই উমাইরা চোখের কোনে জমে থাকা অশ্রুকণা মুছে, ধীরে ধীরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সন্ধ্যার আলো ঘন হতে শুরু করেছে। ঠান্ডা বাতাস তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অথচ তার চোখে এক ফোঁটা নড়াচড়া নেই।

নিচে চোখ যেতেই দেখতে পায়, স্নিগ্ধা আর অয়ন দুজনেই হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে ঘাসের ওপর। ওদের কণ্ঠ কাঁপছে, কিন্তু তাতে অনুশোচনার কমতি নেই। জোরে জোরে বলছে—

"উমাইরা! প্লিজ… ক্ষমা করে দে!"

"আরেকবার আমাদের ভাই-বোন বানিয়ে নে!"

"শুধু একটা সুযোগ দে!"

চারপাশ স্তব্ধ, শুধু সেই দুটো কণ্ঠের আর্তি যেন বারবার আঘাত করছে উমাইরার হৃদয়ের দেওয়ালে। কিন্তু না, উমাইরার চোখের অভিব্যক্তি একটুও বদলায় না। মুখে কোনো কাঁপন নেই, ভ্রু নড়ে না, ঠোঁট কাঁপে না। ঠাণ্ডা, কঠিন, অনড়।

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায় সে। শব্দহীন পদক্ষেপে নিজের ঘরে ফিরে আসে। বারান্দার দরজাটা ধীরে টেনে বন্ধ করে দেয়, তারপর একে একে সব জানালা বন্ধ করে দেয়, যেন বাইরের কোনো শব্দ, আলো বা অনুভূতি আর ভেতরে না আসে।

নিঃশব্দে পুরো ঘরটা ডুবে যায় নিস্তব্ধতায়। শুধু বুকের ভেতরে জমে থাকে—এক পাহাড় অভিমান।

------------------------

একদিন হঠাৎই ওয়াসিফ এসে হাজির হয় উমাইরার কাছে। দরজাটা একটু খোলা দেখে হালকা কড়া নেড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। ঘরটা নীরব, একরাশ বিষণ্ণতা যেন দেয়ালের গায়ে লেপ্টে আছে।

বারান্দায় চোখ পড়তেই দেখে, উমাইরা একা বসে আছে। মাথাটা সামান্য নিচু, দৃষ্টি অনেক দূরে, যেন শহরের কোলাহল ভেদ করে কোথাও হারিয়ে গেছে সে।

ওয়াসিফ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, চুপচাপ পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে শুধুই দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর শান্ত গলায় বলে—

-"তুই জানিস? তোর চুপ থাকা এখন সবচেয়ে বড় আওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই তোকে বলার চেষ্টা করছে কতটা ভালোবাসে, কতটা অনুতপ্ত, কিন্তু তুই শুনতেই চাস না। তুই ভাবছিস, শক্ত থাকাটা মানে দূরে থাকা, কিন্তু মাঝে মাঝে ক্ষমা করাটাই আসল শক্তি।

তুই তোর রাগের দেয়াল তুলে রাখিস, ঠিক আছে, কিন্তু একটুখানি ফাঁক রাখ। যাতে আলোটা ঢুকতে পারে। যাতে কিছু সত্যি ভালোবাসা তোর গলায় জড়িয়ে পড়তে পারে।

তুই কি জানিস, তোর এই নীরবতা কাউকে কষ্ট দেয়ার জন্য নয়, তুই নিজেই বেশি কষ্ট পাচ্ছিস? একটু ফিরে তাকাস, উমাইরা। সময় তো হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু একটা ইশারার অপেক্ষায়।"

বলেই ওয়াসিফ ভেতরে এসে চেয়ার টেনে বসলো। কিছুক্ষণ পর উমাইরাও এসে নিঃশব্দে বসলো খাটে।

-"দেখ আমি জানি ওরা তোর সাথে যা কিছু করেছে সব অন্যায়। প্রীতির মনে তোর জন্য হিংসে জন্মেছিল। দিনদিন সেটা বেড়েই গিয়েছিল, তাই রাইসা লামিয়াকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়েছে। তোরা ছোট ছিলি। অল্প বয়সে মানুষ ভুল করে বেশি তার ওপর টিনএজার। তুই হয়তো ভাবছিস তুই চলে যাওয়ায় ওরা অনেক ভালো ছিল। কিন্তু সেরকম কিছুই হয় নি।

ওয়াসিফ একে একে সব কথা খুলে বলে।

সে জানায়, কীভাবে প্রীতি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। অয়নের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় ভাঙনের মুখে চলে গিয়েছিল। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবাই তাকে এড়িয়ে চলত, যার ফলে সে একাকীত্বে ভুগতে থাকে। চারপাশের অবহেলা, সম্পর্কের জটিলতা সব মিলিয়ে একসময় প্রীতি আত্মহত্যার চেষ্টাও করে। এই সবকিছুই তুলে ধরে ওয়াসিফ।

তোকে এসব কথা বলা নিষেধ ছিল। প্রীতি বলতে নিষেধ করেছিল, সুস্থ হয়ে নিজেই তোর কাছে ক্ষমা চাইবে, এইসব রোগের দোহাই দিয়ে নয়। কিন্তু তুই এখন যেভাবে ওদের সঙ্গে আচরণ করছিস, সেই কারণেই বলতে বাধ্য হলাম। আল্লাহ দুনিয়াতেই ওদের অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাদের শাস্তিও দিয়েছেন। তাই তোকে বলছি, আর কষ্ট পুষে রাখিস না মনে। রাগ, ঘৃণা এগুলো তোকেই পোড়াবে দিন শেষে।

মাফ করে দে ওদের। মানুষ মাত্রই ভুল করে। ছোটবেলার একটি অন্যায়ের কারণে এত বছরের বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাক, এটা ঠিক নয়। আজ তোর হাতে একটা সুযোগ আছে, তুই চাইলে সব পাল্টে দিতে পারিস। তোর উদারতা, তোর ব্যক্তিত্ব, এসব দিয়েই জয় করতে পারিস সবাইকে। মনে রাখিস, ক্ষমা শুধু দুর্বলরা নয়, বরং সাহসীরাই দিতে পারে।

তুই আমিরা রহমান উমাইরা, তুই ভিন্ন, তুই অনন্য। তোর মধ্যে একধরনের মায়া আছে, যা সবার চোখে পড়ে না। তুই চঞ্চল, তুই দরদী কারো কষ্ট দেখলে তোর মন কেঁপে ওঠে। সবসময় সবার পাশে দাঁড়িয়েছিস, নিজের সাধ্য মতো সাহায্য করেছিস, বিনিময়ে কিছু চাস নি কখনো।

তুই এমন এক মেয়ে, যে নিজের বুক ভরে কষ্ট নিতে পারে, কিন্তু কারও কষ্ট দিতে পারে না। এখন তোর ভেতরে যেসব যন্ত্রণা জমে আছে, সেসব ভুলে গিয়ে নতুন করে সব শুরু কর। পুরোনো ক্ষত নিয়ে আর বেঁচে থাকিস না তুই তো আলো, তুই তো ভালোবাসা।"

কথা গুলো বলে ওয়াসিফ কিছুটা নীরবতা পালন করে। তারপর আবারও বলতে শুরু করে—

-"আমি জানি ওদের সাথে এই ব্যবহার করে তুই নিজেও ভালো থাকছিস না। রাগ আর অভিমনের দেয়াল তোকে ওদের কাছে টানতে দিচ্ছে না। আমার কথা গুলো ভাবিস একবার।"

খুব শান্ত, গভীর স্বরে কথাগুলো বলে ধীরে পেছন ফিরে চলে গেল ওয়াসিফ।

উমাইরা হতবাক। এতদিন ধরে তার কাছ থেকে এত কিছু গোপন রাখা হয়েছে, তাকে জানানো যায়নি!নিজেকেই প্রশ্ন করে তবে কি সে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে? আগে থেকেই ক্ষমা করে দেওয়া কি ঠিক হতো?

বিষয়টা হয়তো এতটা বড় ছিল না, যতটা বড় সে নিজেই বানিয়ে ফেলেছে। হয়তো এ কেবল ভুল বোঝাবুঝি ছিল। আর প্রকৃতি কি আর ছেড়ে কথা বলেছে? যার যার প্রাপ্য শাস্তি তারা পেয়েছে। যেখানে আল্লাহ নিজেই বিচার করেছেন, সেখানে আমি কে? আমি কীসের বিচারক?

মনের ভেতর কথাগুলো ঘুরতে থাকে। একটার পর একটা চিন্তার ঢেউ ধাক্কা মারে মাথায়। কী করবে, কী বলবে উমাইরার মাথা কাজ করছে না। মনে হচ্ছে, সমস্ত কিছু এলোমেলো।

শেষমেশ সবকিছু ছেড়ে গিটারটা নিয়ে বসে বারান্দায়। বিষণ্ণ সন্ধ্যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, আর সেই বিষণ্ণতায় সুরের বড় দরকার ছিল আজ।

----------------------------

ওয়াসিফের বলে যাওয়া কথা অনেক ভেবেছি উমাইরা বেশ কিছুদিন যাবৎ এটা নিয়েই ভাবতে ভাবতে মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার।

দেশে আসার পর থেকে পেইন্ট করে হয়নি উমাইরার। রং তুলি নেই স্টুডিও নেই। তার ওপর বাড়িতে এইভাবে বসে থাকতে থাকতে উমাইরা বর হচ্ছে। বাবাকে জানানোর পর তিনি সাজেস্ট করলেন মাস্টার্স করার জন্য। উমাইরাও রাজি হয়ে গেল। আজকে ভর্তি হওয়ার জন্য যাবে। তাইতো তৈরী হয়ে ড্রয়িং রুমে বসে আছে বাবার অপেক্ষায়। অয়ন নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু উমাইরা তার সাথে যাবে না বলে জানিয়েছে। তাই আজাদ রহমানই নিয়ে যাচ্ছেন। হটাৎ আজাদ রহমান হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন উমাইরাকে বললেন—

-"অফিসে একটু সমস্যা হয়েছে মা! আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারব না। আমি ওয়াসিফকে ফোন করে বলেছি সে তোমাকে নিয়ে যাবে। তুমি একটু অপেক্ষা করো ও এখনই চলে আসবে।"

বলেই উমায়রাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লেন অফিসের উদ্দেশে। উমাইর বিস্মিত নেত্রে বাবার প্রস্থান দেখলো। কিছু বলতে নিয়েও বলতে পারলো না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরই ওয়াসিফ চলে এসেছে। ভেতরে প্রবেশ করেনি সে সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাক ছেড়ে ডাকছে উমাইরাকে। উমাইরাও চঞ্চল পায়ে ছুটে এসেছে।

ওয়াসিফ মেরুন রঙের একটি শার্ট ইন করে ফর্মাল প্যান্টের সাথে পরেছে। চোখে চশমা, হাতে ঘড়ি, গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উমাইরা তাকে দেখে এগিয়ে গেলো। ড্রাইভিং সিটে এগিয়ে যেতে যেতে ওয়াসিফ গম্ভীর গলায় বলে—

-"উঠে বস! সময় কম আমার হাতে, ফাস্ট!"

উমাইরাও মাথা নিচু করে উঠে বসে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে। পুরোটা রাস্তা নিস্তব্দ এসেছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে একবার তাকিয়েছে পাশের সিটে বসে দক্ষ হাতে ড্রাইভিং করা মানবটির দিকে। উমাইর ভাবছে একবারও তার দিকে ফিরে তাকালো না। কোনো কথাও বলছে না। উমাইরাও কিছু বলে নি। নীরবে বসেছিল। এতগুলো বছর পর এসেছে, সেই চিরো চেনা রাস্তা-ঘাট সবকিছু নজর বুলিয়ে দেখে নিচ্ছে।

গাড়ি এসে থামলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। উমাইরা ও ওয়াসিফ গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। ওয়াসিফ উমাইরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে গম্ভীর ভাবে বলল—

-"একা ভর্তি হতে পারবি নাকি আমি যাব সাথে?"

-"আমি একাই পারবো সমস্যা হবে না, আপনি চলে যেতে পারেন।"

ওয়াসিফ ও আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেলো।

উমাইরা তাকিয়ে ছিল সেইদিকে। কি নির্দয় লোক, একবারও বলল না, এত বছর পর এসেছিস তুই তো কিছু চিনতে নাও পারিস চল আমি তোকে ভর্তি করিয়ে দেই! এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই মুখ ভেংচি কেটে ভিতরের দিকে এগিয়ে গেলো উমাইরা।

ভর্তির সব ফর্মালিটি পূরণ করে হাঁটছিল উমাইরা। আপন মনে কিছু একটা ভাবতে ভাবতে মাথা নিচু করে হাঁটছিল সে, হঠাৎই চোখের সামনে তিন জোড়া পা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল উমাইরা। মাথা তুলে সম্মুখে তাকিয়ে থমকে গেলো উমাইরার দৃষ্টি। মুহূর্তেই চোখে ভোর করল কঠোরতা। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।

-"কেমন আছিস উমাইরা?"

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ৬ গল্পের ছবি