আধফোটা প্রেমের ফুল

পর্ব - ১১

🟢

-"এই রূপের অর্থ কী? এটা কি আমাকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যই?" নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে ওঠে ওয়াসিফ।

-"ভাই, নিজেকে শামলাও!"

ওয়াসিফের বেসামাল অবস্থা দেখে পাশ থেকে অয়ন বলে উঠল। রাফসান, এহসান, মেহরাব আর অয়নের বাকি বন্ধুরা হেসে ওঠে।

-"থামবি তুই? আমি যে তোদের বড় ভাই, আর ও যে তোদের ছোট বোন, এইটা ভুলে গেছিস?"

-"না ভাই, ভুলি কীভাবে? কিন্তু আপনার এই অবস্থা দেখে আমার বোন তো হঠাৎ করেই বুঝে যাবে আপনি ওকে ভালোবাসেন! নাকি আপনি চান, ও যেন জেনে যায়?"

-"না, না! এত তাড়াতাড়ি কিছু না। পাঁচটা বছর পুড়েছি আমি, আর একটু শাস্তি তো ওর প্রাপ্য।"

-"ভাই, এটা বেশি হয়ে যাচ্ছে না? দোষটা তো আমাদেরই ছিল। আমাদের জন্যই তো...."

-"কারণ যেটাই হোক, ভুগেছি তো আমি।"

-"আচ্ছা ঠিক আছে, বাদ দাও এসব। চলো, মেহেন্দির দিকে যাই।"

------------------------

ছেলেরা সবাই এসে পড়েছে মেয়েদের মহলে। চারপাশে হাসি-ঠাট্টা, আনন্দের হুল্লোড়। মেহরাব এসে স্নিগ্ধার পাশে বসে পড়ে। বাধ্য হয়ে এহসানকে বসতে হয় উমাইরা আর নিধীর মাঝখানে। ওয়াসিফ ও রাফসান এক কোণে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা করছে। অয়ন বসেছে প্রীতির পাশে, তার বন্ধুরাও এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। প্রীতির কাজিনরাও পাশে বসে আড্ডায় মেতে উঠেছে।

মুরুব্বিরা একটু দূরে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছে।

মা, চাচি, ফুপু, মামি, দুই পক্ষেরই অনেক ইয়াং গেস্ট এসেছে মেহেন্দি দিতে। তাদের দিয়েই শুরু হয়েছে হাতে রঙ লাগানো। পাশেই চলছে নাচ-গান, তালে তালে নাচছে ছোট-বড় সবাই।

উমাইরা বক্সের গান বন্ধ করে দিল। সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল,

-"চলো সবাই একত্রে বসি, সবাই মিলে গান গাইব!"

একটু হইচই শুরু হলো। সবাই জড়ো হয়ে গোল হয়ে বসছে তখনই স্নিগ্ধা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল—

-"আপুই, তুমি গান পারো দেখে সবাই যে পারে এমন না! আমি তো পারি না!"

মুখটা কাঁচুমাচু করে কথাটা বলল স্নিগ্ধা।

উমাইরা হেসে বলল—

-"আরে ব্যপার না! তোর গাইতে হবে না। তুই আর নিধী বরং একটা নাচ করে দে। নিধিও তো গাইতে পারে না।"

নিধী সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে বলে উঠল—

-"হ্যাঁ আপু! এটা তো একদম বেস্ট হবে। আমরা দু’জনেই ভালো নাচতে পারি!"

সবাই যার যার জায়গায় গিয়ে বসল। প্রীতির কাজিনরা প্রথমে শুরু করল। গান চলতে চলতে রাত অনেক হয়ে গেল। এর মধ্যেই প্রীতির মেহেদি দেওয়া শেষ। বাকি আছে স্নিগ্ধা, নিধী আর উমাইরা।

মেহেদি দেওয়ার যারা এসেছে, আপাতত তাদের বিশ্রামের সময় দেওয়া হয়েছে। তাদের কিছু খাবারও দেওয়া হয়েছে খাওয়ার জন্য। রাত গভীর হওয়ায় বড়রা সবাই ভেতরের ঘরে চলে গেছেন বিশ্রাম নিতে।

প্রীতির কাজিনদের পালা শেষ হতেই স্নিগ্ধা আর নিধী নেমে পড়লো নাচতে। এর পর আবার মেহেন্দিও পড়তে হবে। উমাইরা গিয়ে গান বাজিয়ে দিলো—

Saanson mein piro le tu

Hothon se choo le tu

Apna bana le mujhe pyaar se

Seene se laga ke rakh

Kare jiya dhak dhak

Door nahi rehna yaar se

Jab mujhse piya roothe

Paayal ke ghoongru toote

Oh naachke manaau piya re

Khan khan choodi khanke

Rahu heer teri banke

Tu raanjha mera jiya re

গানের তালে তালে স্নিগ্ধা আর নিধী নেচে চলেছে। তাঁদের প্রাণবন্ত নাচ দেখে সবাই বেশ উচ্ছ্বসিত। এদিকে মেহরাব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্নিগ্ধার দিকে। চোখ ফেরানো যেন দায় হয়ে গেছে তার জন্য। প্রতিটি স্টেপ, প্রতিটি ভঙ্গিমা যেন স্লো মোশনে চলছে, শুধুই তার জন্য। বিমুগ্ধ নয়নে চেয়ে ছিল সে। কখন যে মুখটা অবাক হয়ে হা হয়ে গেছে, টেরই পায়নি।

পাশ থেকে হঠাৎ ওয়াসিফ আলতো করে তার চোয়াল ছুঁয়ে মুখটা বন্ধ করে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল—

-"আমার অবলা শালির দিকে নজর দিস না। তোকে আমি দিচ্ছি না আমার সালি!"

ওয়াসিফের কথা শুনে প্রথমে খানিকটা ঘাবড়ে গেলো মেহরাব। তারপরই বুঝে গেলো, ভাই তার চোখের ভাষা বুঝে ফেলেছে। সেজন্য বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে গাল ফুলিয়ে বলল—

-"ভাইয়া!"

-"ভাইয়া ভাইয়া করে লাভ নেই। আমার সালি তোকে চাইলে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু যদি না চায়, তাহলে একবারও ওর কথা মুখে আনবি না, সাবধান করে দিলাম।"

-"দেখো না, একদিন তোমার সালিই এসে বলবে, সে আমাকে চায়। তখন যেন বলে না, 'আমি আগে থেকে জানতাম'।"

বলে ঠোঁট উল্টে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো মেহরাব। আর ওয়াসিফ? ছোট ভাইকে জব্দ করতে পেরে মুখ টিপে হেসে ফেলল। পাশে থাকা রাফসানও হেসে কুটি কুটি হচ্ছে।

অবশেষে নিধীদের নাচ শেষ হলো। নিধীদের নাচ শেষ হওয়ার পর অয়ন ও প্রীতি এক সাথে গান ধরলো—

Sharm Aa Gayi Toh Aaghosh Mein Lo

Ho Saanson Se Ulajhi Rahein Meri Saansein

Bol Na Halke Halke, Bol Na Halke Halke

Honth Se Halke Halke, Bol Na Halke

Aa Nind Ka Sauda Karein, Ik Khwaab De, Ik Khwaab Le

Ik Khwaab Toh Aankhon Mein Hai, Ik Chaand Ke Takiye Talein

Kitane Dino Se Yeh Aasamaan Bhi Soya Nahi Hai, Isako Sula De

Bol Na Halke Halke, Bol Na Halke Halke

অয়ন ও প্রীতির মধুর রোমান্টিক গানে মুহূর্তেই পরিবেশটা রোমান্টিক হয়ে গেলো। হালকা বাতাসে গাছের ডালাগুলো যেন তাল মিলিয়ে নাচছিল, ঝুলন্ত গাঁদা ফুলের মালাগুলোও দোল খাচ্ছিল এক ছন্দে। দূরে কোথাও পাখির ডাকে যেন সুরের মিষ্টি প্রতিধ্বনি পড়ছিল। প্রীতি গানের মাঝে চোখ তুলে একবার অয়নের দিকে তাকালো। অয়নের চোখে ছিল প্রশ্রয়, স্নেহ আর অব্যক্ত ভালোবাসার ঝিলিক। প্রীতি একটু লাজুকভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিলেও ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছিল একটি নরম হাসি। চারপাশটা যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল তাদের এই নিঃশব্দ ভালোবাসার মুহূর্তে।

সবার মনেই অনুভূতিরা খেলা শুরু করে দিলো।

ওয়াসিফ তাকিয়ে ছিল উমাইরার দিকে। কিন্তু উমাইরা টেরই পায়নি, সে তো ব্যস্ত ভাইয়ের গান শুনতে। ওয়াসিফের দৃষ্টি ছিল স্থির, অথচ চোখের গভীরে চলছিল টানাপোড়েনের এক স্রোত। চারপাশে হাসি-আনন্দের ভিড়, প্রেমের ঝিলিক, গানের সুরে যখন সবাই হারিয়ে যাচ্ছে, তখন তার মন খুঁজে ফিরছে একটিমাত্র মুখ, উমাইরা। এই মুহূর্তে ওর চঞ্চলতা, উচ্ছ্বাস, মুগ্ধতা, সব কিছু যেন একসাথে ভালো লাগার রঙে রঙিন লাগছে ওয়াসিফের চোখে। তবে তার ভালোবাসাটা মুখে বলা নয়, বরং চোখের ভাষায় প্রকাশ পাওয়া এক নিঃশব্দ অনুভব। সে জানে, উমাইরা এখনো টের পায়নি। তবু সে চুপচাপ দেখে যাচ্ছে, যেন প্রতিটি মুহূর্ত মনেই গেঁথে রাখছে।

মেহরাব ও স্নিগ্ধার চোখাচোখি হচ্ছিল। মেহরাবের দৃষ্টি দেখে স্নিগ্ধা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার চোখ তুলে তাকাবার সাহস হয় না তার।

এদিকে এহসানের মনে হলো, কেউ যেন তার দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ অয়ন ও প্রীতির দিক থেকে চোখ সরিয়ে দেখে, নিধী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। চোখে অনুভূতির জোয়ার। এহসান তৎক্ষণাৎ পড়ে নিল সেই চোখের ভাষা। গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে ছিল সেই চোখে।

অয়ন ও প্রীতির পালা শেষ। চারপাশে হাততালি আর উচ্ছ্বাসের রেশ এখনো কাটেনি। এবার পালা উমাইরার।

বুক ভরা অনুভূতি নিয়ে সে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে গিটারটা হাতে তুলে নেয়। উমাইরা একবার তাকায় চারপাশে, তারপর থেমে যায় ওয়াসিফের দিকে চোখ রাখতেই। তারপর সে গেয়ে উঠলো গলার সুরে ছিল স্নিগ্ধতা, প্রেম আর এক ফোঁটা সাহস।

Pal pal yeh dil ghabraaye

Pal pal yeh dil sharmaaye

Kuchh kehta hai aur kuchh kar jaaye

Kaisi yeh paheli moh dil mar jaana

Ishq mein jaldi bada jurmana

Tu sabra to kar mere yaar

Zara saans to le dildar

Chal fikar nu goli maar

Yaar hain din jindadi de chaar

Haule haule ho jaayega pyaar chal yaar

প্রতিটি লাইন উমাইরা যেন ওয়াসিফের দিকে তাকিয়েই গেয়েছে। চোখে চোখ রেখে যেন বলছিল, "দেখো, আমি কেবল তোমার জন্যই গাইছি।" ওয়াসিফ দেখেছে সেই দৃষ্টি। গভীরভাবে দেখেছে। কিন্তু বুঝতে দেয়নি কিছুই। মুখে ছিল এক অচেনা নির্লিপ্ততা, যেন কিছুই টের পায়নি। উমাইরা তাকিয়েছিল, শুধু একবার, একবার যদি ওয়াসিফ তাকায়! একবার যদি তার চোখে চোখ রাখে, তাহলেই সে বুঝে নিত, এ দৃষ্টি কি শুধু তার জন্য? কিন্তু না....ওয়াসিফ তাকায় না।

তাকে হতাশ করে মাটির দিকে চেয়ে থাকে, যেন কিছুই জানে না, বুঝে না। অথচ উমাইরা জানতেই পারলো না, তার রাজপুত্তুরের দৃষ্টি, যাকে সে নিজের মনে রাজসিংহাসনে বসিয়ে রেখেছে, সে দৃষ্টি কেবল মোহনমল্লিকার দিকেই থেমে থাকে। উমাইরার হৃদয় তখনও গাইছিল, কিন্তু কণ্ঠে আর সুর নেই। উমাইরার গান গাওয়া শেষ হলে তিন বোন মিলে বসে পড়ে মেহেন্দি লাগাতে। পরিবেশটা একটু কেমন কেমন হয় যায়। তন্মধ্যে এহসান গেয়ে উঠে—

Yeh pehle bataate

Baarat leke aate

Hum pyaar karne

Waale hai koi gair nahin

Arre hum tum pe marne

Waale hai koi gair nahin

নিধী মেহেন্দি পড়ছিল, মনটা ছিল রঙে-সুগন্ধে ব্যস্ত। ঠিক তখনই এহসানের গলায় ভেসে এলো এক সুরেলা গান। হঠাৎই চমকে উঠলো নিধী। গানের সেই আকস্মিক সুর যেন ওর মন ছুঁয়ে গেল। সে তাকাল, এহসানের দিকেই। এহসানের দৃষ্টি তখনও স্থির, গভীর, ঠিক নিধীর দিকেই তাক করা।

চোখাচোখি হয়ে যায় হঠাৎ। মুহূর্তটা থেমে যায় যেন। নিধীর হৃদয় ধকধক করতে থাকে, সে বুঝে উঠতে পারছে না, এই গানটা কি শুধু তালের জন্য? নাকি কোনো না বলা অনুভব লুকিয়ে আছে এর ভেতর? তার জন্যই কি এই গান? নাকি নিছক এক মুহূর্তের কাকতালীয় মিল?

সবাই বসে আছে, চারপাশে এক মধুর আনন্দঘন পরিবেশ। উমাইরা মেহেন্দি দিচ্ছে, হাতে গন্ধ উঠছে মেহেন্দির। পাশে বসে থাকা মেয়েরা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল। হালকা হাসাহাসি, ফিসফিসানো কানে কানে কথা।

রাত অনেক হয়েছে, ছোট কাজিনরা একে একে ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রীতির কাজিনরাও নিজেদের কক্ষে ফিরে গেছে। এই নিরালায় যেন একটু স্নিগ্ধতা নেমে এসেছে।

এমন সময় অয়নের হঠাৎ খেয়াল হলো, এই পুরো অনুষ্ঠানে সবাই একবার করে গান গেয়েছে, কেউ নেচেছে, কেউ তাল দিয়ে মজা করেছে। কিন্তু একটা মানুষ এখনো নীরব, ওয়াসিফ।

অয়ন হেসে বলে উঠল—

-"ভাই, তুমি তো এখনো গান গাইলে না? বিষয়টা ঠিক জমলো না কিন্তু!"

সবাই এক সঙ্গে ওয়াসিফের দিকে তাকালো। মুহূর্তেই সবাই মিলে তাকে ঘিরে ধরল।

-"গান! গান!"

-"একটা গান না শুনলে ছাড়ছি না!"

ওয়াসিফ একটু বিরক্ত মুখ করে চোখ রাঙালো, যেন ভয় দেখানোর চেষ্টা। বলল—

-"তোমরা একটা চুপ করবা?"

কিন্তু কেউ পাত্তা দিল না। সবাই উচ্ছ্বসিত, হাসছে, উচ্ছ্বাসে তালি দিচ্ছে। প্রীতি হেসে বলল—

-"আজকে গান না গেয়ে উপায় নাই ভাইয়া!"

অগত্যা, ভেঙে পড়লো ওয়াসিফের ভাবভঙ্গি। হালকা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে একপাশে তাকিয়ে বলল—

-"আচ্ছা, তোমাদের শান্ত করার জন্যই গাইছি, কিন্তু হাসলে কিস্সা শেষ!"

সবাই চুপ। মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ।

ওয়াসিফ চোখ বন্ধ করে শুরু করল গাওয়া।

Hain Jo Iraaden Bata Doon Tumko Sharma Hi Jaaogi Tum

Dhadakanen Jo Suna Doon Tumko Ghabraa Hi Jaaogi Tum

Hamko Aata Nahi Hain Chhupana Hona Hain Tujhmein Fanaa

Chaand Sifarish Jo Karta Hamari Deta Woh Tumko Bata

পুরোটা সময় ওয়াসিফের দৃষ্টি এক জায়গাতেই, উমাইরার দিকে। যে মেহেন্দির ডিজাইনে ব্যস্ত, কিন্তু চোখের কোণে খেলে যায় এক মুচকি হাসি। শুনছে সে, কিন্তু ফিরছে না। কেনো তাকাবে? যখন সে গেয়েছিল, তখন তো ওয়াসিফও তাকায়নি। যেন এক নিঃশব্দ প্রতিশোধ, এক অভিমানের খেলা।

তবুও ওয়াসিফ থেমে যায় না। তার কণ্ঠে ভেসে আসে একরাশ ভালোবাসা, নিঃশব্দ আকাঙ্ক্ষা, স্নেহের এক কোমল স্পর্শ। চোখে ছিল আবেগ, ঠোঁটে সুর, আর মন জুড়ে, শুধু উমাইরা।

-------------------------

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। সবার গান গাওয়া শেষ, মেহেন্দি পরাও। কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও মেয়েদের খাওয়া হয়ে ওঠেনি। হাতে মেহেন্দি, তাই কেউ নিজে খেতে পারবে না। আবার মেহেন্দি উঠানোও যাবে না। তখনই অয়ন প্রীতির জন্য খাবার নিয়ে এল। সবার সামনে সে প্রীতিকে খাইয়ে দিচ্ছে।

ওদিকে বাকি তিন মেয়ে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো। উমাইরা হঠাৎ বলে উঠল—

-"দেখলি রে নিধী, আজ আমাদের কপালে যদি একটা জামাই থাকতো, আমরাও এইভাবে খেতে পারতাম! কপালই খারাপ আমাদের।"

-"হ্যাঁ আপু, যা বলেছ!" তিন বোন মুখটা লটকে রাখল।

ঠিক তখনই স্নিগ্ধার সামনে হঠাৎ এক লোকমা খাবার ধরা হলো। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে, মেহরাব! স্নিগ্ধা অবাক, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এত লোকের সামনে এমন কি করে সম্ভব! লজ্জায় লাল হয়ে যায় সে।

নিধী পাশ থেকে খোঁচা দিতে দিতে ফিসফিস করে

বলে—

-"নিয়ে নে মা, না হলে আমার এহসানের হাতে খাওয়া হবে না!"

স্নিগ্ধা করুন চোখে তাকায়, নিধীও পাল্টা একই রকম চোখ করে। শেষমেশ বাধ্য হয়ে স্নিগ্ধা লোকমাটা নিয়ে ফেলে।

নিধী এবার এহসানের দিকে তাকিয়ে বলে—

-"ভাইয়া, আমাকে একটু খাইয়ে দেন না?"

শিশুর মতো মুখ করে বলে সে। এহসান কিছুটা ইতস্তত করে, চারদিক দেখে নিয়ে বলল—

-"উমাইরাকে কে খাওয়াবে তাহলে?"

সত্যিই তো! সবার দৃষ্টি যায় উমাইরার দিকে। উমাইরা শান্ত গলায় বলে—

-"ওকে আগে খাইয়ে দাও, পরে আমাকে দিও।"

-"আচ্ছা ঠিক আছে।"

এহসান উঠে গিয়ে খাবার এনে নিধিকে খাওয়াতে শুরু করল।

অয়ন তখন ওয়াসিফের দিকে তাকিয়ে বলে—

-"ভাই, উমাইরাকে খাইয়ে দাও। অনেক রাত হয়ে গেছে। আর দেরি করলে তো আরও রাত বাড়বে।"

সবাই একসাথে সায় দেয় কথায়। ওয়াসিফ একবার তাকায় উমাইরার দিকে, সে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বসে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে, চুপচাপ উঠে যায় ওয়াসিফ। খাবার এনে উমাইরার সামনে ধরে—

-"হা কর!"

উমাইরার যেই খাবারটা মুখে নিয়ে যাবে অমনি তার মেজাজটা বিগড়ে গেলো। কপাট রাগ দেখিয়ে বলল—

-"দই দিয়েছেন কেন? আমি খাব না!" রেগে ওঠে উমাইরা।

-"কথা কম বল, হা কর। দই খেলে পেট ঠান্ডা থাকে। তাড়াতাড়ি হা কর!"

-"না, আমি দই খাই না, আপনি জানেন না? ইচ্ছে করেই এনেছেন! ভালো লাগে না এসব!"

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে চলে যায় উমাইরা।

সবাই হতভম্ব। কে কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। ওয়াসিফের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকায় সবাই। কিন্তু সে-ও কিছু না বলে উঠে চলে যায়।

চারদিক যেন এক নিমিষে চুপসে যায়। সবাই শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

----------------------

রাত্রির তৃতীয় প্রহর।

নিরব নিস্তব্ধতা চারপাশে ছড়িয়ে। হঠাৎই ঘুম ভেঙে যায় উমাইরার, খিদেয় পেট কাঁদছে। ধীরে ধীরে উঠে বসে সে। পাশে নিদ্রামগ্ন স্নিগ্ধা, নিধী আর মামাতো বোন মিমি। নিঃশব্দে ফ্রেশ হয়ে এসে পোশাক বদলে নেয়। মেহেদি উঠিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে।

চুপিচুপি বাইরে এসে ফ্রিজ খুলে খাওয়ার কিছু খুঁজছে, ঠিক তখনই মুখের সামনে এক প্লেট রোস্ট আর পোলাও এসে ধরা পড়ে। চমকে উঠে তাকায় উমাইরা।

ওয়াসিফ!

উমাইরার মুখ রাগে লাল হয়ে ওঠে। গম্ভীর গলায়

বলে—

-"নাটক করছেন? খাবো না আপনার আনা খাবার। যান এখন থেকে!"

ওয়াসিফ শান্তভাবে জবাব দেয়—

-"খেতে হলে এটুকুই খেতে হবে। বাকি সব খাবার হোটেলের স্টাফদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর কিছু নেই।"

উমাইরার মন খারাপ হয়ে গেলেও মুখে তিরিক্ষি ভাব নিয়ে সে প্লেটটা নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসে পড়ে। রাগ করেই খাওয়া শুরু করে।

ওয়াসিফ পাশের চেয়ার টেনে বসে। এক হাত টেবিলে রেখে মাথা ঠেকিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে উমাইরার দিকে।

উমাইরা আড়চোখে দেখে বার কয়েক। মুখে খাবার দিয়েই বলল—

-"এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? খাবেন আপনি? নিন খান, নইলে পরে আমার পেট খারাপ হবে!"

বলেই এক লোকমা খাবার ওয়াসিফের মুখের সামনে ধরে।

ওয়াসিফ কিছুক্ষণ চুপ করে একবার তাকাল খাবারের দিকে, একবার উমাইরার দিকে। তারপর মুখটা এগিয়ে এনে লোকমাটা খেয়ে নিল।

এক সঙ্গে গিলে নেয় খাবার আর উমাইরার আঙুলের ছোঁয়াও। ওর ঠোঁটের উষ্ণতা উমাইরার আঙুল বেয়ে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে উমাইরার, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়।

ওয়াসিফ ঠিক সেই কম্পনটুকু টের পায়। ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।

উমাইরা দেখতে পায় না সেই হাসি। কিন্তু বুঝতে পারে, কিছু একটা হচ্ছে। যতবার খাবার মুখে দেয় সে, ওয়াসিফ একই ভঙ্গিতে নেয়, আর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার চোখে।

লজ্জায় কাঁপতে থাকে উমাইরা। আর খাওয়া হয় না তার। শেষমেশ শুধু ওয়াসিফকেই খাইয়ে যেতে থাকে।

দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দাঁড়িয়ে দেখছিল অয়ন, মেহরাব, রাফসান আর এহসান। ওরা একে একে সব বুঝে গেল, কেন ওয়াসিফ তখন উমাইরার জন্য দই মাখা খাবার এনেছিল। মেহরাব ফিসফিস করে বলে উঠল—

-"তোলে তোলে এত কিছু চলে, আর আমরা কিছু করলেই হরতাল পড়ে যায়!"

অয়ন মুখ বাঁকিয়ে বলল—

-"হুম, ঠিক বলেছিস। ওই নাটক করল শুধু যেন নিজে আমার বোনের হাতে খেতে পারে। নিজেও খেল না কিছু। এতক্ষণ চুপচাপ বসে শুধু ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। এখন দেখ, কেমন গিলছে!"

এবার মুখ গম্ভীর করে রাফসান বলে—

-"আরে ভাই, একটু লজ্জা কর তোরা! তোদেরই তো ছোটবোন! তার রোমান্স দেখে মুখ টিপে হাসছিস, ছিছি! গিয়ে শুয়ে পড় এবার।"

রাফসানের কথা শুনে তিনজনই একে একে চুপসে যায়। মুখটা গম্ভীর করে একটু লজ্জা লজ্জা হেসে নিঃশব্দে সরে যায় ওরা। চারপাশে আবার নেমে আসে গা ছমছমে নিস্তব্ধতা।

----------------------

সকাল থেকেই গায়ে হলুদের তোড়জোড়ে মুখর ছিল চারদিক।

খোলা আকাশের নিচে বসেছে উৎসবের বর্ণিল আসর। রঙিন ত্রিভুজাকৃতি পতাকা, লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি, কমলা, সারি সারি ঝুলে আছে মাথার উপর। রোদের আলোর সঙ্গে মিশে এই রঙগুলো যেন আরও উজ্জ্বল, আরও প্রাণবন্ত। পাশে টাঙ্গানো আলোকবাল্বগুলো দিনের আলোয় চোখে পড়লেও, তাদের আলো নয়, বরং রঙিন পতাকার সঙ্গে মিলেমিশে সাজের অংশ হিসেবেই তারা উপস্থিত।

এক পাশে স্থাপন করা হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন কাঠের ফ্রেম, ত্রিপায়ের উপর দাঁড়ানো। গোলাপি ও হালকা গোলাপি ফুল দিয়ে শোভিত এই ফ্রেম যেন ভালোবাসার এক নরম ছোঁয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। ফ্রেমের ভেতরে সুতো টেনে ক্লিপ দিয়ে টাঙানো অসংখ্য পোলারয়েড ছবি, স্মৃতি, অনুভব, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার গল্প যেন প্রতিটি ছবির মধ্যেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এটি এক 'মেমোরি কর্নার', যেখানে অতীত আর বর্তমান হাত ধরে এগিয়ে চলেছে এক অনন্য মুহূর্তের দিকে।

পুরো স্থানজুড়ে ঝোলানো আছে গাঁদা ফুলের খোলা ফ্রেম, হলুদ ও কমলা রঙে ভরা, যেন বাতাসে দুলে দুলে স্বপ্নের ছোঁয়া ছড়াচ্ছে। কোথাও রঙিন পর্দা, কোথাও সাজানো চেয়ার আর তাদের মাঝে অতিথিদের হাসিমুখে ভরা উপস্থিতি। এই ফ্রেমগুলোকেই রূপ দেওয়া হয়েছে ফটোবুথে, যেখানে মাঝখানে দাঁড়ালেই ফ্রেমবন্দি হয়ে যাচ্ছে একটুকরো আনন্দের মুহূর্ত। রোদের ঝিলিক আর আশেপাশের সবুজ প্রকৃতি মিলে পুরো পরিবেশকে করে তুলেছে প্রাণবন্ত ও মুগ্ধকর।

চারপাশে মানুষের কোলাহল, কেউ গল্পে ব্যস্ত, কেউবা হাঁটছেন হাতে পানীয় বা খাবারের প্যাকেট। স্টেজের পেছনে নেই কৃত্রিম কোনো ঝলক, দিনের স্বাভাবিক আলোতেই চারদিক স্পষ্ট, খোলা ও মুক্ত। গাছের পাতাগুলো ঝলমল করছে নিখাদ সবুজে, প্রকৃতির নিজস্ব রঙে।

হলুদের আয়োজন রাখা হয়েছে দিনের বেলাতেই, সবার ইচ্ছাতেই।

আলো-ছায়ায় মাখামাখি এই আনন্দময় দিনে প্রীতিকে স্টেজে এনে বসিয়ে দিলো তার কাজিনরা। তার হাসিতে মিশে গেলো সূর্যের আলো, আর চারপাশ জুড়ে যেন নেমে এলো এক অপূর্ব উল্লাস।

মেহরাব, ওয়াসিফ, এহসান, রাফসান আর অয়নের কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিলে একজোট হয়ে অয়নকে এনে প্রীতির পাশে স্টেজে বসিয়ে দিল। মুহূর্তটা যেন আনন্দে, আবেগে ও বন্ধুত্বে ভরা এক নিখুঁত দৃশ্য।

প্রীতি আজ একেবারে বাঙালি সাজে, সাদা রঙের শাড়িতে অনবদ্য লাগছে তাকে। মাথায় কাঁচা হলুদের দোপাট্টা, আর গলায়, হাতে, কপালে খাঁটি কাঁচা ফুলের গহনায় সে যেন এক অপ্সরী। ফুলের গন্ধ আর রঙ প্রীতির সৌন্দর্যকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।

অয়নের পরনে সাদা পাঞ্জাবি, প্রীতির সঙ্গে মিলিয়ে। তাকে দেখতেও দারুণ লাগছে, সহজ, সুন্দর আর পরিপাটি। দু’জন একসঙ্গে বসে যেন পরিপূর্ণ এক চিত্র, একটি শুভ সূচনার নিঃশব্দ বার্তা।

অয়ন-প্রীতি বাদে বাকি সবাই পরেছে কাঁচা হলুদের রঙে, মেয়েরা শাড়িতে, ছেলেরা পাঞ্জাবিতে। এই এক রঙের সমারোহ যেন গায়ে হলুদের আনন্দকে ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে। পুরো দৃশ্যটাই প্রাণবন্ত, রঙিন আর হৃদয়ছোঁয়া।

এহসান, মেহরাব, ওয়াসিফ আর রাফসান একপাশে দাঁড়িয়ে বিয়ের পরবর্তী কাজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিল। কে কী দেখবে, অতিথিদের দেখভাল, খাওয়া-দাওয়ার সময়সূচি, সবই নিয়ে ব্যস্ত তারা।

ঠিক তখনই ধীরে ধীরে সেখানে প্রবেশ করে তিনজন শাড়ি পরিহিত নারী। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সুরের তালে বাঁধা। ঝিরঝিরে বাতাসে শাড়ির আঁচল দুলছে, চুলের পাশে দোলা দিচ্ছে কাঁচা ফুলের সাজ।

তিনজনকে একসঙ্গে দেখে হঠাৎ করেই থমকে যায় ওয়াসিফ, মেহরাব ও এহসান। কথার খেই ছুটে যায়, চোখ যেন কিছু সময়ের জন্য আর নড়তে পারে না। চারপাশের কোলাহল তখন তাদের কাছে ফিকে, শুধু সেই তিন নারীর উপস্থিতিই যেন মুহূর্তটিকে ভরিয়ে তোলে এক নীরব চমকে।

সবার চোখে-মুখে একরাশ বিস্ময়, মুগ্ধতা আর এক অজানা টান।

আধফোটা প্রেমের ফুল পর্ব ১১ গল্পের ছবি