অভ্রাকে কোনো প্রকারেই উষ্ণের জীবনে আসতে দেওয়া যাবে না।,কথাখানা যেন মস্তিষ্ক গ্রাস করে নিয়েছে প্রচ্ছদের।ঐ মেয়ের প্রতি তার কোনো ফিলিংস নেই, কিন্তু ভয় হয়।মনে হয় এই বুঝি অভ্রা তার রহস্যময় সত্যটা জানিয়ে দিলো তার মা বোনকে।
কিন্তু প্রচ্ছদ জানে,অভ্রা এতো তারাতারি এই কাজ করবে না।সে মোটামুটি ধারনা করেই নিয়েছে,,অভ্রা কোনো সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আসে নি এখানে।সম্পূর্ণই প্রচ্ছদকে ফাসানোর ফন্দি।
তাই কোনো ভাবেই অভ্রার সাথে উষ্ণের বিয়ে হতে দেওয়া যাবে না।এতে অবশ্য প্রীতি আর প্রনতি দেবী বেশ সহযোগিতাই করছে তাকে, নিজেদের অজান্তেই।
আজ বিকেলেই সবাই উপস্থিত হয় উষ্ণের মামার বাড়িতে। আগামী এক-দের মাস সবাই একত্রে এখানেই থাকবে। উর্মির বিয়ের দিন এগিয়ে আসছে। উষ্ণদের একমাত্র মামা প্রবন সেন।সেই ঘরেই একটি কন্যা রজনী। বয়সে উষ্ণ প্রচ্ছদের সমানই প্রায়।কিন্তু ভালোবাসার টানে তিন বছর আগে পরিবারের কথা না ভেবেই পালিয়েছে নিজের প্রেমিক পুরুষের সাথে। এক বছর পরে অবশ্য তাদের মেনেও নেয় প্রবন সেন।কারন রজনীর স্বামী রুপি লোকটা সত্যিই তার যোগ্য, এছাড়াও ঐ সময় তাদের কোল আলে করে এলো ছোট্ট কন্যা শিশু রাজভী।মূলত নাতনির টানেই মেয়ে, জামাইকে মেনে নেন প্রবন সেন।
এতো এতো কিছুর মাঝে অনুষ্ঠান করে বিয়েই হয়নি রজনীর।তাই প্রবন সেনের বড় ইচ্ছে তার ছোট বোন প্রনতীর এক মাত্র মেয়ে উর্মির বিয়ে এই বাড়ি থেকেই আয়োজন করা হবে।সেই কথা রাখতে গিয়েই উর্মির বিয়ে খানা নিজের বাড়ি না হয়ে মামার বাড়ি থেকে হবে।
উষ্ণদের মায়েরা দু বোন এক ভাই। প্রবন,প্রভাতী আর প্রনতী।সবারই এক ছেলে এক মেয়ে।তাদের মধ্যে সব থেকে বড় প্রীতি,যার ঘরে জন্ম নিয়েছে মেয়ে বেলি আর ছোট্ট ছেলে বৃক্ষ। প্রীতির পরে প্রবন সেনের ছেলে রাজীব,এরপর প্রচ্ছদ,উষ্ণ, রজনী।এবং সর্ব কনিষ্ঠ উর্মি।।
সেই ছোট্ট উর্মিরই কিছুদিন পর বিয়ে। বাবা নেই হিসেবে ভাই হয়ে যতদুর সম্ভব করছে উষ্ণ। বোনের বিয়েতে কিছুরই কমতি রাখছে না সে।বোনের বিয়ের জন্য এখানে আসতে গিয়েই এক অবেলায় দেখা হলো তার শ্যামা ফুলের সনে। একসাথে প্রায় পনেরো মিনিটের মতো ছিলো,,,তবে কোনো কথা হয়নি,।হুট করেই ভালোলাগা হতে সেই শ্যামা ফুলটির দিকে অপলক তাকিয়ে ছিলে উষ্ণ, অথচ তার শ্যামা ফুলটি আজও জানতে পারলো না তাদের প্রথম সাক্ষাৎ কোথায় হয়েছিলো।ঠিক সেই দিনই উষ্ণ ঠিক করে রেখেছিলো এই ফুলটিই তার ঘরণী হবে। কিভাবে?তা জানা নেই,তবে হতেই হবে।
বেশ কাঠ খোর পুরিয়েই খোঁজ পেলো সেই শ্যামা ফুলটির।নাম জানলো,পেশা জানলো,ঠিকানা জানলো,আরো জানলো তার জর্জরিত অতীতখানাও।সব জেনেও মুচকি হাসলো উষ্ণ, কারন নির্বোধ শ্যামা ফুলটি তার উষ্ণতার জন্যই যে এতোটা জর্জরিত হয়েছে অতীতে।
সন্ধ্যার কিছু মুহুর্ত আগে উষ্ণ এসে হাজির হয় প্রচ্ছদ আর প্রীথুলার জন্য নির্ধারিত রুমের দরজায়।বাড়ির সকল মেয়ে সদস্যটাই উঠোনে নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেও সেই সংকীর্ণ আনাগোনায় নিজেকে সামিল করার মতো ইচ্ছে প্রকাশ করলো না প্রীথুলা।নিশ্চিন্তে কক্ষে বসে প্রযুক্তির দিকে মন দিয়েছে।
প্রচ্ছদ একটু আগেই দোকান থেকে সোজা মামার বাড়ি এলো।এই এক মাস এখান থেকেই যাতায়াত করবে।মাত্রই শার্টটা বদলাতে যাচ্ছিলো সে।দরজায় উষ্ণকে দেখে তা থামিয়ে মুচকি হেসে এগিয়ে এলো।
"কিরে?তুই হঠাৎ?''
উষ্ণ একবার নজর দিলো প্রচ্ছদের উপর পুরোটা।বললো...
" এখনো তো চেঞ্জ করিসনি।ভালো হয়েছে,চল একটা জায়গায় যাবো।"
প্রচ্ছদ সময় দেখে বললো..
"এই সন্ধ্যায়??কোথায় যাবি??"
উষ্ণের চোখেমুখে উৎফুল্লতা দেখা দিলো।বললো...
"ফেনী কলেজে কনসার্ট আছে। ব্যান্ড আসছে নাম করা।চল??মজা হবে।"
প্রচ্ছদ উত্তর দেওয়ার আগেই বিছানা থেক তড়িৎ গতিতে নেমে এলো প্রীথুলা।উৎফুল্ল কন্ঠে বললো...
"আমি যাবো কনসার্টে।"
বিপ্রকর্ষে বলে উঠলো প্রচ্ছদ...
"তুমি??এখন??আমি নিতে পারবো না।"
সাথে সাথেই প্রীথুলা জবাব দিলো...
"তোমার নেওয়া লাগবে না।আমি উষ্ণদার সাথে যাবো।"
প্রীথুলার কথায় উষ্ণ বেশ মিটিমিটি হেসে প্রচ্ছদকে বললো...
"দয়া কর ভাই।আমি বৌদিকে নিতে পারবো না।তুই-ই চল নিয়ে।"
প্রীথুলার ছিচকাদুনে স্বভাবের কাছে হার মানলো প্রচ্ছদ।রাজি হলো যাওয়ার জন্য।প্রীথুলাকে পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হলো রেডি হওয়ার জন্য। কিন্তু সেখানে সে আধঘন্টা সময় ব্যয় করেছে।বেরোনোর পর দেখে মনে হলো কোনো কনসার্ট নয় বরং বিয়ে বাড়ি যাচ্ছে সে।হাফ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে প্রচ্ছদ ঐ সঙ কে নিয়েই উষ্ণের সাথে রওনা দিলো।
হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা কলেজ মাঠে।স্টেজ কাঁপাচ্ছে বাংলাদেশের নাম করা একজন সঙ্গীত শিল্পী মাহবুব শাফেদ ও তার নিজস্ব ব্যান্ড।
ঠেলেঠুলে স্টেজের কিছুটা সামনে এগোলো উষ্ণ, প্রচ্ছদ ও প্রীথুলা।উষ্ণের ঠোঁটের কোনে প্রগাঢ় হাসি।কারন??কারনটা আর কিছুি নয়, তার শ্যামা ফুল।এই যে তারই সামনে।
অভ্রা অবাক হয়েছে বটে উষ্ণকে দেখে।এরপর রেশ কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলো...
"আপনি এখানে?"
উষ্ণ মাথাটা একটু অভ্রার দিকে ঝুঁকে বললো...
"আসা বারণ?"
"তা বলিনি।"
পাশে থাকা প্রচ্ছদ আর প্রীথুলার দিকে চোখ যেতেই বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো অভ্রার।সন্তর্পণে আড়াল করে নিলো নিজের দূর্বল দৃষ্টি। প্রচ্ছদ যে তার দিকেই তাকিয়ে।
একটু দুর থেকেই উষ্ণের সহীত অভ্রাকে দেখে অন্তর খানা ছাই হলো টুটুলের।কালো অভ্রাকে কি সুন্দর মানিয়েছে ঐ ফর্সা ছেলেটার পাশে।আচ্ছা, টুটুলের পাশেও কি অভ্রাকে এরকমই মানায়?
ভাবনা গুলোয় নিজের মস্তিষ্ক নিষেধাজ্ঞা দিলো,,চিৎকার করে যেন বলে উঠলো..
"ওকে নিয়ে ভাবিস না টুটুল,,ও আজীবনের জন্য তোর,,কিন্তু তুই কখনোই ওর হতে পারবি না।,,আচ্ছা,, উষ্ণ কি ওর হতে পারবে?নাকি মনের কোনের লুকায়িত জায়গাটায় অভ্রা শুধু প্রচ্ছদকেই রাখবে?
প্রচ্ছদের দিকে চোখ যেতেই মাথাটা গরম হয়ে গেলো টুটুলের।কেমন তার অভ্রার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা।এখন কেন এভাবে তাকিয়ে থাকে??অভ্রা যখন কাঙালিনীর মতো ওর পেছন পেছন ঘুরতো,তখন তো এতো কাতরতায় তাকায়নি।যখন ছোট্ট অভ্রা পাগলের মতো সারাদিন জপ করতো'ভালোবাসি প্রচ্ছদ দাভাই,,ভালোবাসি, ভালোবাসি' কই তখনও তো এই কুলাঙ্গারটা এভাবে তাকাতো না অভ্রার দিকে।তাহলে আজ কেন তাকায় সে?দু বছর পর কেন সে অনুধাবন করতে আসে অভ্রার ভালোবাসাকে??
টুটুলের ভয় হচ্ছে। মন, মস্তিষ্ক দুটোই বলছে,উষ্ণ কাঁদবে। হারিয়ে ফেলবে তার শ্যামাফুলটিকে।তার শ্যামাফুলটি তারই চোখের সামনে প্রচ্ছদের হবে, উষ্ণ কিছুই করতে পারবে না।চোখের সামনেই অভ্রাকে নিজের করে নেবে প্রচ্ছদ সারা জীবনের জন্য।
কিন্তু টুটুল তা চায়না।অভ্রা তার নিজের না হোক,কিন্তু ঐ প্রচ্ছদেরও না হোক।ভালোবাসে সে অভ্রাকে,এটা জেনেও যে অভ্রা তার হবেনা।তাই বলে কি টুটুল তার ভালোবাসাকে এক কুলাঙ্গার, চরিত্রহীনের হাতে তুলে দেবে?,কখনোই না।সে খুব করে চায়,তার ভালোবাসা ভালো থাকুক।কেউ একজন তার ভালোবাসাকে ভীষন ভালোবাসুক,ভালো রাখুক।কিন্তু সেই কেউ একজন প্রচ্ছদ কখনোই হয়ে উঠতে পারবে না।
ঢোক গিলে অভ্রাদের কাছে এগিয়ে গেলো টুটুল।এসেই তড়িৎ গতিতে অভ্রার মাথায় ছোট্ট করে একটা গাট্টা মারলো।অভ্রা উফহ করে মাথাশ হাত দিয়ে একটু ঝুঁকে তাকালো টুটুলের পানে।হিসহিস করতে করতে বললো...
"শয়তান,,,মারলি কেন??"
টুটুলও তড়িৎ গতিতে তেতে উঠলো...
"তো কি করবো??তোকে পুজো করবো??কতবার বলেছি এসব ভারি জিনিস তুলিস না তুই?তাও কেন করিস??"
অভ্রার হাতে থাকা একটা ব্যাগকে ইঙ্গিত করে কথা খানা বলেই তা নিজ হস্তে তুলে নিলো টুটুল।স্টেজ ডেকোরেশনের দায়ীত্ব তাদেরই পড়েছে।তাই তো এই ভারি ব্যাগটায় জিনিসপত্র ভরতি।টুটুল আবারো বলে উঠলো...
"কি ভেবেছিস তুই?তোর হবু বর সামনে আছে বলে আমি ভয় পাবো??ওসব হবে না।শুনেন নতুন দুলাভাই...আপনি আমায় মারেন কাটেন যা ইচ্ছে করেন, তবে এই গাঁধিটার এসব কাজে আমি কিন্তু ওকে মারবোই।"
উষ্ণ কিচ্ছুটি বললো না,শুধু একটু হাসলো।অভ্রা টুটুলকে উদ্দেশ্য করে বললো...
"ওখানে আরো কয়েকটা হোল্ট লাইট পড়ে আছে।ওগুলো নিয়ে আসতে হবে।"
টুটুল উত্তর দিলো...
"ওসব আমি, তুহিন,ওমর ওরা মিলে করে নেবো,তোর আর কিছু করা লাগবে না।উষ্ণ ভাইয়া এসেছে।উনাকে টাইম দে একটু,,কনসার্ট এনজয় কর গিয়ে।যাহ।"
আর একটি মুহুর্তও দাড়ালো না টুটুল,,ভারি ব্যাগটা নিয়ে পগারপার। অভ্রা তাকালো উষ্ণের পানে।তা দেখে উষ্ণ বললো...
"চলো,,সামনের দিকটায় গিয়ে দাড়াই।প্রচ্ছদ ভাই,তোরাও চল।"