পরিপাটি, গোছানো কামরাটায় চোখ বুলিয়ে নিলো উষ্ণ। পুরো নাম উষ্ণায়ন সেনসিংহ।পেশায় একজন সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার।দেখতে শুনতেও সুদর্শন পুরুষ।
চিন্তিত অভ্রা।ভীষণ চিন্তিত,,ছেলেটা বলতে গেলে সব দিক দিয়েই পার্ফেক্ট।চাইলেই আরো ভালো মেয়ের খোঁজে যেতে পারে। সব ছেড়ে এই মধ্যবিত্ত পরিবারের শ্যাম বর্নের মেয়েটির জন্যই কেন সম্মন্ধ নিয়ে এলো?পরিবারের জোরাজুরিতে??হয়তো।,, কিন্তু লোকটা যে তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে।নাহলে কি ঐ দিন হঠাৎ রাস্তায় প্রচ্ছেদ বাসুর সম্পর্কে কথা তুলতো??,,,,
"আমি ভাবি নি আপনার সাথে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হবে।"
মৃদু হাসলো উষ্ণ। বিছানার কোনায় আয়েশ করে বসলো সে। নিচের দিকে তাকিয়ে বললো...
"বলেছিলাম না??আমাদের আবারো দেখা হবে?মিললো তো??"
অভ্রা ঠাই দাড়িয়ে শুনলো।সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পরখ করতে লাগলো সামনে থাকা উষ্ণকে।লোকটা সত্যিই ভীষণ অদ্ভুত। সবটা না হোক,,এটা তো জানে অভ্রা একজন খু*নিরই প্রতিরুপ।প্রচ্ছেদ বাসুকে খু*ন করতে চায়।তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না লোকটি।কি সুন্দর আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে অভ্রার রুমের বিছানার উপর।
অভ্রা চোখ ফিরিয়ে তাকালো দরজা দিয়ে ড্রয়িংরুমে থাকা অতিথিদের দিকে।দিব্বি সবাই খোশগল্প করছে।একটু আগেই তাকে আর এই উষ্ণকে আলাদা করে কথা বলার জন্য রুমে পাঠানো হয়েছে।লোকটা রুমের দরজা খোলা রেখেই দুরত্ব বজায় রেখে কথা বলছে।যেন কেউ খারাপ না ভাবতে পারে।,,
"চাইলে বসতে পারেন মিস।বিছানায় অনেক জায়গা আছে।"
উষ্ণের ডাকে সেদিকে ফিরে তাকালো অভ্রা।বসলো না।তার রুমে তাঁকেই কিনা অতিথি আপ্যায়ন করছে?,,
"তোমার রুমটা বেশ গোছালো।যাক আমারই সুবিধা,এই দিক দিয়ে আমি আবার বেশ আগোছালো বুঝলে।তা তুমি বুঝি একাই থাকো এই রুমে?"
"উহুম,,,ছোট বোন থাকে আমার সাথে।"
"কে অঙ্গ?,,ভারী মিষ্টি তোমার বোনটা।তোমার থেকেও বেশি।"
"তাহলে ওর জন্যই সম্মন্ধ নিয়ে আসতেন??"
অভ্রার বিরক্তিকর কথায় হেসে ফেললো উষ্ণ। মেয়েটাকে রাগাতে বেশ লাগছে তার।স্বভাবত শান্ত মেয়েটির রাগ সত্যিই সুন্দর।,,,
" অঙ্গের বয়সটা আরেকটু বেশি হলে ওকেই বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিতাম।কিন্তু তা তো আর সম্ভব না।দুধের স্বাদ ঘোলেই মেটাই??অঙ্গের বড় বোনই যথেষ্ট। "
অভ্রা বিরক্ত হলো।বুঝলো, এই লোকটার সাথে অযথা তর্কে গিয়ে লাভ নেই।সরাসরিই কথা বলতে হবে।,,,
"এই বিয়েটাতো হবে না তাই না?"
উষ্ণ চোখের ইশারায় বাইরেটা দেখিয়ে বললো...
"বড়রা কথা বলছে তো। দেখোই না কি সীদ্ধান্ত হয়।তারা যদি ঠিক করে ফেলে তাহলে কেন হবে না?"
''আপনি তো রাজি নন,তাই না?"
উষ্ণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো অভ্রার দিকে...
"রাজি না হওয়ার কারন?"
এই লোকটার কথা একটুও ভালো লাগছে না অভ্রার।লোকটা কি বুঝতে পারছে না অভ্রা কেন এই কথাগুলো বলছে?,,,
"আপনি যথেষ্ট সুন্দর। আর আমি কালো।সেটাই কি যথেষ্ট নয়, আপনার আমাকে পছন্দ না হওয়ার জন্য? "
উষ্ণের নড়চড় হলো না।দৃষ্টিও নড়লো না অভ্রার দিক থেকে। চুপটি করে শুনতে লাগলো মেয়েটির অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো। সে কি আর জানে? উষ্ণায়ন সেনসিংহ এই অভ্রায়ীনি মজুমদারের হালচাল জেনেই মাঠে নেমেছে পুরো দমে।,
"বিয়ের পর না হয় ছুরি দিয়ে চামড়া ছিলে ফেলে দেবো?"
অদ্ভুত কথার দরুন অভ্রা চোখ বড়বড় করে তাকালো উষ্ণের দিকে...
"কিহ?"
অভ্রার অবাকতা দেখে ব্যস্ত হলো উষ্ণ..
"আরেহ,টেনশন নট।তোমার কালো চামড়া ছিলবো না।,,আমার সাদা চামড়া ছিলে ফেলবো বললাম।তাহলেই তো সেইম সেইম হয়ে যাবে তাই না??"
"আমি দেখতে সুন্দর না বলেও আপনি বিয়ে করবেন বলছেন?"
বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস ফেললো উষ্ণ।দৃষ্টি দিলো রুমের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা একটা ছবির ফ্রেমের দিকে।যেখানে অভ্রার হাস্যজ্জল মুখটা দৃশ্যমান।সেথায় তাকিয়েই উষ্ণ বলে উঠলো...
"ঘরকুনো,মুখচোরা,অন্তর্মুখী,,,
অন্তরে ভাবনারা বারোমাসই সূর্যমুখী। "
লোকটা বেশ রসিক, তা বুঝতে বিলম্ব হলো না অভ্রার।তবে খুব একটা না ঘেটে নিজের কাজ করতে লাগলো..
"আপনি নিশ্চই জানেন আমি একজন খু*নি?,,একজন খুনিকে তো কেউ জেনে বুঝে বিয়ে করবে না তাই না?"
"খুনি হতে চাও,,এখনো তো হওনি।আর সেটা তো সবার ক্ষেত্রে নয়।"
"এতো কিছু জানেন আমার সম্পর্কে? "
"খুব একটা বেশি না।টুকটাক।"
"আমার পক্ষে বিয়েটা করা সম্ভব নয়।"
"হয়ে উঠবে সম্ভব। "
"আমি একজন কে ভালোবাসি।"
"কিন্তু সে তো অন্যকারোর।"..
অন্তরে আঘাত কাটলো কথাটা। এটা যে নতুন কিছুই নয়,,যতবারই কানে আসে তার প্রচ্ছেদ অন্যকারোর,ততবারই এমন হয়।দুটো বছর আগেও কথাটা অভ্রার নীকট বিষের মতো ঠেকতো।বুক চিড়ে কান্না আসতো। সহ্য করতে না পেরে নিজেকে নিজেই আঘাত করতো। তবে সময়ের আগমনে অভ্রাও শক্ত পাথরে রুপান্তরিত হয়েছে। অন্তর পুড়লেও আগের মতো আর চিৎকার করে কাদে না সে।,,,,কিন্তু এই লোকটি এতোকিছু কি করে জানলো??সে কি নজর রাখছে অভ্রার প্রতিটি কাজের উপর?
" আপনি কি করে জানলেন??"
উষ্ণ হাসলো।বিরল সেই হাসি,,যেই হাসিতে অভ্রা ক্ষনে ক্ষনে ভয় পেয়ে উঠছে।এই না লোকটা আবার এক অদ্ভুত কথা বলে উঠে,সেই ভয়ে।
"প্রচ্ছেদ বাসু দু বছরের দাম্পত্য জীবন পার করছে তার স্ত্রী প্রীথুলা বাসুর সাথে। আইনি কাগজপত্র তো তাই বলছে। "
অভ্রার মনে কু ডাকছে,,লোকটা কি চেনে প্রচ্ছেদকে?,,তারা কি পরিচিত??এই উষ্ণ কি কোনো ভাবে প্রচ্ছেদের লোক? আজ দুটো বছর পর প্রচ্ছেদ আবার অভ্রার পেছনে কেন পড়বে?সে কি মনে রেখেছে অভ্রাকে?,,
"প্রচ্ছেদকে কি করে চেনেন আপনি?"
"অনেকেই চেনে তাকে। তাদের মাঝে আমিও একজন।"
অভ্রা কিছু বলার মতো খুজে পেলো না।লোকটা এমন ভাবে কথা বলে, যে পরবর্তীতে কথা বলার ভাষা থাকে না অভ্রার।,,,
যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো।উষ্ণায়নের পক্ষ থেকে আসা আত্মীয়রাও কথা বার্তা সেরে নিলো।,,প্রস্তুতি দেখে উষ্ণও উঠে দাড়ালো অভ্রার বিছানা ছেড়ে।সামনাসামনি এসে দাড়ালো অভ্রা।নয়নে নয়ন মিলেছে দুজনার,, অভ্রার দৃষ্টিতে পরখ করার চিন্তা,আর উষ্ণের দৃষ্টিতে একরাশ মুগ্ধতা।
" ভেবেছিলাম তোমায় চতুর্থ দেখায় শাড়িতে দেখবো। হলো না,,তবে আমি অপেক্ষা করতে জানি শ্যামা কালি।"
"সব রুপে সবাইকে দেখার অধিকার সবার থাকে না মিঃ উষ্ণায়ন সেনসিংহ।নারীর কিছু কিছু সাজ বিশেষ মানুষের জন্যই তোলা থাকে। "
উষ্ণায়নের কোনো প্রকার ভাবান্তর হলো না।আগের মতোই মৃদু হাসি নিয়ে বলে উঠলো...
"সে তোমায় মায়ায় জড়িয়েছিলো,কিন্তু নিজে জড়ায়নি।
তাকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলো,,অতঃপর সে নিজেই ভালোবাসেনি।,,,
এমন ভালোবাসা ছিন্ন করা খুব জরুরি,, বুঝলে ফুল?,,"
কথাটা বলেই দরজা বরাবর হাটা ধরলো উষ্ণ। একটু গিয়ে থেমে পেছন ফিরে তাকালো আবার অভ্রার দিকে।হাসিটা আরেকটু প্রসারিত করে বললো...
"আমাদের আবারো দেখা হবে শ্যামা ফুল।নিজের খেয়াল রেখো,।আমি বলছি বলে নয়,,,তোমার নিজের প্রয়োজন বলেই।৷,, আসছি।"
অভ্রা তাকিয়ে রইলো উষ্ণের যাওয়ার পানে।মাথায় ঘুরছে উষ্ণের বলে যাওয়া তীরবিদ্ধ কথা গুলি।কোনোটাই মিথ্যা নয়।চোখের পাতায় ভেষে উঠলো প্রচ্ছেদের মুখের আদল খানা।মনে উত্তাল ঝড় নিয়ে বলে উঠলো...
"আপনি জানতেন, আপনার অভাবে আমার মৃত্যু হবে।
এই যে আমি বেচে আছি?
কিভাবে, কেউ না জানুক আপনার তো জানার কথা প্রচ্ছেদ দাভাই।
দেহের দাবি নিয়ে বলতেই পারি, বেচে আছি।কিন্তু মনের খবর রাখে ক'জন,বলতে পারেন??"
-----------
সেদিন রাতটা পার করলো অভ্রা।বিয়ের ব্যপারে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি তার বাবা মা।তবে অভ্রা বেশ ভালো ভাবেই জানে,একটা সময় তাকে ঠিকই জিজ্ঞেস করা হবে এই বিষয়ে।তমা,টুটুল ফোন করে খবর নিলো,,অভ্রা প্রতিদিনের মতোই সবটা জানালো।দেখতে আসাটা এই প্রথম নয় তার।এই নিয়ে ১৮ তম।অভ্রার হিসেব আছে,এর মধ্যে ৭ টা নাকোচ করেছে ছেলেপক্ষ নিজেই।কখনো অভ্রার গায়ের রঙ কালো বলে, আবার কখনো অভ্রার কাজে সম্মতি নেই বলে।আর বাকি গুলো??অভ্রা নিজেই নাকোচ করেছে।বাবা মাকে বলেছে,,ছেলে পক্ষ মানতে না চাইলে সরাসরি ছেলের সাথে কথা বলেছে।প্রতিবারই ঘুরে ফিরে একটা কথাই জানিয়েছিলো অভ্রা,,সে অন্য একজনকে ভালোবাসে।এই কথাটা শুনেই সবাই ফিরে গেছে।কিন্তু এবারের ব্যপারটা ভিন্ন। উষ্ণায়নকে খুবই অদ্ভুত লাগলো অভ্রার নীকট।তবে মনকে শক্ত করে অভ্রা এবারও নাকোচ করার সীদ্ধান্ত নিলো।
পরদিন খুব সকালে অভ্রা যখন কলেজের জন্য রেডি হয়ে নাস্তা করতে টেবিলে বসলো,,তখনই অভ্রার বাবা প্রশ্ন ছুড়লো তার দিকে...
"তুই কি সীদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিস?"
ঢোক গিললো অভ্রা।কিছুই বললো না।সামনে থাকা চায়ের কাপটায় চুমুক দিলো।বিস্কুটের প্লেটটা আস্তে করে ঠেলে দিয়ে বুঝিয়ে দিলো সে খাবে না বিস্কুট।অভ্রার মা বললো....
"বিস্কুট খাবি না??তাহলে বোস,,আমি চিঁড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছি, দুধ চিনি দিয়ে খেয়ে নিস"
সাথে সাথেই মানা করলো অভ্রা...
"না মা,, এখন ওসব কিছু খাবো না।দেরি হচ্ছে।চা টুকু খেয়েই বেরোবো।"
"প্রতিবার না করে দিস তুই।ভেবে দেখেছিস তোর দু'টো ছোট ভাই বোনও আছে। অঙ্গের কথাটা একটু ভাবিস।ছেলেটা ভালো,,একটু ভেবে চিন্তে সীদ্ধান্তটা নিস।"
অভ্রা কিছুই বললো না।চা টুকু খেয়েই রওনা হলো।উদ্দেশ্য কলেজ,,,সামনেই অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের মিডটার্ম এক্সাম। তাই ক্লাস গুলো তে একটু বেশিই মনোযোগ দিতে হচ্ছে এই সময়টায়।ক্লাস শেষ করে একবার "রক্তপ্রমুখ" সংগঠনে যাবে।কোন একটা স্কুলে ক্যাম্পেইন আছে আজ।
পরিকল্পনা মতো এদিক সেদিক সামলে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজলো।এতো রাত হওয়ায় অভ্রার বাবা আর বিয়ের প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলেনি।অভ্রার বাবা অশোক মজুমদার একজন বিচক্ষণ মস্তিষ্কের মানুষ। মেয়েকে শাষণে রাখলেও আদরেও কম রাখেননা তিনি।তার বড় মেয়েটা খুবই স্বল্পভাষী। বিশেষ করে বাবার ক্ষেত্রে।যতই নরম ভাষায় কথা বলুক না কেন,,মেয়েটা সবসময়ই মাথা নিচু করে উত্তর দেয়।কিছু কিছু ক্ষেত্রে মতের অমিল হয় বটে আবার।,,
পরদিন সকালে অভ্রা ভেবে নিলো আজই তার বাবাকে জানিয়ে দেবে বিয়েতে নারাজির কথা।কিন্তু নাস্তার টেবিলে এসে আর পেলো না তার বাবাকে।জিজ্ঞেস করতেই জানালো জরুরি তলবে খুব সকালেই বেরিয়েছে তিনি।ফিরবে বিকেলে।
অভ্রা আর কথা বাড়ালো না।রাতেই বাবাকে জানাবে বলে ধাতস্থ করলো।নাস্তা করেই রওনা দিলো সে।গ্রামের রাস্তা থেকে সি এন জি নিয়ে এসে পৌছালো সেবারহাট বাজারে।এখান থেকেই লোকাল বাস ধরবে সে।উদ্দেশ্য ফেনী, সেখানেই কলেজ অভ্রার।
একটুক্ষণ অপেক্ষা করতেই "সুগন্ধা" লোকাল বাসটি এসে থামলো স্টেশনে।সেটাতেই উঠলো অভ্রা। চোখ বুলিয়ে দেখলো মাঝখানে একটা আর একদম পেছনে একটা সীট খালি।মাঝখানের সীটে একটু নজর বুলিয়ে দেখলো কোনো একটা লোক।পেছনের সীটে মহিলা আছে।সেটির দিকে এগোতে নিবে,তার আগেই অভ্রার পাশ কাটিয়ে আরেকটা মহিলা গিয়ে সেই সীটে বসে পড়লো।,,,
"আমার পাশে বসতে কি খুব সমস্যা হবে ফুল?"
পরিচিত কন্ঠস্বর পেয়ে সেদিকে তাকালো অভ্রা।মাঝখানের দিকের খালি সীটটার পাশের সীটে বসে আছে উষ্ণায়ন।মুখে তার চিরচেনা হাসি।অভ্রা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো....
"আপনি এখানে?"
উষ্ণ হেসে বললো.....
"বসো?তারপর বলছি।"
অভ্রা ধীরে সুস্থে বসলো উষ্ণের পাশে।উষ্ণ জিজ্ঞেস করলো.....
"জানালার পাশের সীট লাগবে??''
মুচকি হাসলো অভ্রা।বললো....
" এটা লোকাল বাস,,বিলাসিতার জন্য নয়।দাঁড়িয়ে যাওয়ারও অভিজ্ঞতা আছে আমার।"
উষ্ণ কিছু বললো না, শুধু হাসলো।
"আপনি এখানে কেন?"
"এটা তো লোকাল বাস ম্যাডাম,,যে কেউই উঠতে পারে।"
"তাই বলে এই বাসেই??"
উষ্ণ ভ্রু কুচকে মাথাটা নাড়িয়ে বললো....
"মনে হয় এটা আমাদের ভাগ্যেই লিখা ছিলো।"
"আপনি কি আমায় ফলো করছেন??"
"এমা না,,এখনো ওসব শুরু করিনি।,,,এটা সম্পূর্ণই আকষ্মিক সাক্ষাৎ। ট্রাস্ট?? আমি জানতামও না তুমি এই বাসেই উঠবে।"
অভ্রা মেনে নিলো।চুপ করে দৃষ্টি সরালো উষ্ণের দিক থেকে।একটু পর উষ্ণ বললো...
"শুনলাম তুমি নাকি এখনো মতামত জানাওনি?"
চুপ রইলো অভ্রা।জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো।পথেই দাগনভূইয়া পাড় করছে বাসটা,,এইতো ফাজিলের ঘাটের ঐ গলিটা দিয়ে গেলেই প্রচ্ছেদের দোকান।প্রচ্ছেদ নিশ্চয়ই এখন সেখানে?,,,
উষ্ণ চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করছে পাশে বসা কিশোরীটিকে।দাগনভূইয়া পাড় হতেই বিরস মুখে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো অভ্রা। উষ্ণ ও চুপ রইলো। প্রায় ২৫ মিনিট পর ফেনীর মহিপালে নামলো অভ্রা,,সাথে উষ্ণও।বাসের ভাড়াটা না চাইতেও উষ্ণই মিটিয়েছে।বিষয়টা মোটেও ভালো লাগেনি অভ্রার।মনে পড়ে গেলো বছর দুয়েক আগে প্রচ্ছেদের সাথে রিক্সায় চড়ার কথা,,এমন কিছুই তো হয়েছিলো সেদিন।
আর ভাবতে চাইলো না অভ্রা।হাটা ধরলো রাস্তার পাশের ফুটপাত ধরে।পেছন পেছন উষ্ণ ও আসছে...
"আজকের ক্লাসটা কি আমার নামে উৎসর্গ করা যায় মিস অভ্রা?"
অভ্রা হাটার গতি কমিয়ে দিলো।আস্তে আস্তে হাটতে হাঁটতেই তাকালে পেছনে থাকা উষ্ণের দিকে,,লোকটা কেমন আবদারি মুখ করে তাকিয়ে আছে।,,,অভ্রা উত্তর দিলো না।সামনে তাকিয়ে হাটতে শুরু করলো।
"তোমার সাথে একান্তে কিছু কথা বলাটা খুব প্রয়োজন অভ্রা।আজ আমাদের দেখাটা অনাকাঙ্ক্ষিত, তবে কথা বলাটা জরুরি।সময় টুকু দেবে আমায়?"
অভ্রা কাঠ কাঠ কন্ঠে বললো....
"আমার ক্লাস আছে।"
"আচ্ছা,,, ক্লাস কয়টায় শেষ হবে বলো?, আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য। "
অভ্রা কিছুই বললো না,হাটতে লাগলো রাস্তার পাশ ধরে।তার পিছু পিছু উষ্ণ ও হাটছে চুপচাপ।কলেজের গেইটের সামনে এসেও অভ্রা ঢুকলো না সেথায়,সেটি পাড় করেই হাটতে লাগলো।তা দেখেই উষ্ণ বিশ্বজয়ের হাসি দিলে।একটু এগিয়ে অভ্রা বললো...
"কোথায় যাবেন?"
উষ্ণ উত্তর দিলো...
"কোথায় যেতে চাও?"
"পাশে আসুন?হাটতে হাটতেই কথা বলি,,যেখানে পা থামবে,,,সেখানে না হয় একটু জিরিয়ে নেবো?"
"আচ্ছা।"
"বিজয়সিংহ দিঘির পাড় যাবো, চলুন।''
মেনে নিলো উষ্ণ।একটু দৌড়ে অভ্রার পাশে এলো।হাটছে দুজনই, নিশ্চুপ হয়ে।পাশ দিয়ে নানান মানুষের কোলাহলে ভরপুর,ব্যস্ত শহরে কেউই কাউকে পর্যবেক্ষণ করার তাগিদায় নেই।কিন্তু উষ্ণ খুব সময় নিয়েই পর্যবেক্ষণ করছে পাশে থাকা শ্যামবতী ফুলটিকে।
ফুলটি নীরব,কখনো সবার সামনে হাসির ফোয়ারা বয়ায় না।হাসি দেখতে চাইলে ঠোটের কোনের তাচ্ছিল্যপূর্ন মুচকি হাসিটাই উপহার দেয় সবসময়। উষ্ণ জানে,তার এই ফুলটির বৃতি খুবই শক্ত,জর্জরিত হয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখা ফুল সে।কোমলত্ব তার প্রকাশ্য নয়।তবুও উষ্ণ এই শ্যামা ফুলটিই চায়।মনের মাঝে লুকিয়ে নিয়ে ফুলটির অন্তঃকরনের বিষাক্ত অনুভূতি গুলো আত্তিকরন করতে চায়।তার অতীত থেকে ফিরিয়ে আনতে চায়,,ফিরিয়ে আনতে চায় প্রচ্ছেদ বাসুর প্রতি ভালোবাসার থেকে।
"কি বলবেন বলুন?"
একটা ঘন নিঃশ্বাস ফেললো উষ্ণ। আবদারের সুরে বললো...
"আমার হয়ে বাকিটা জীবন থেকে যাওনা প্লিজ?"