"বাহ উষ্ণ। বউকে এখন থেকেই সরি, প্লিজ বলতে হয় দেখি তোর।ভবিষ্যৎ কি হবে ভাই?"
প্রচ্ছেদের হাস্যরসাত্মক কথায় উষ্ণ নিজেও হাসলো শব্দ করে।পরে বললো....
"এরম কিছুই না।ম্যাডাম ভিষণই কঠিন স্বভাবের কিনা।মসকরা খুব একটা ভালোভাবে নেয় নি। আর এখনো ঠিক করে নর্মাল হতে পারে নি আমার সাথে।"
"তা বেশ৷ বিয়ের আগে সব মেয়েরাই একটু আকটু এমন থাকে। বিয়ে কর,তারপর বুঝবি।"
"কেন রে?বৌদি কি বদলে গেলো নাকি?"
প্রশ্নটা কেমন যেন মনের মতো পড়ে গেলো প্রচ্ছেদের।মন থেকে উত্তরটা আসতে চাইলো,হ্যা,পিতু সত্যিই বদলে গেছে,অনেকটাই বদলে গেছে ও।আসলে বদলায় নি, ও আগেই এমন ছিলো,আমিই চিনতে পারিনি।
মনের কথাখানা মুখে আর উচ্চারণ করতে পারলো না।মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে বললো...
"ধুর,রাখতো তোর বৌদির কথা।তুই তোর হবু বৌয়ের কথা বল।নাম কি?আর দেখতে কেমন?নিশ্চয়ই কোনো রাজকুমারীর চাইতে কম না,আফটার অল উষ্ণায়ন সেনসিংহের বউ বলে কথা।"
"আরে ভাই,ধৈর্য। আসছেই তো একটু পর।এলেই দেখে নিস কেমন দেখতে।"
"তা ঠিক,,আসুক,,দেখি আমার ছোট ভাইয়ের বউ কেমন।তবে ডাউটের বিষয় কি জানিস?,পুরো কুমিল্লা ছেড়ে তোর এই এলাকার মেয়েই পছন্দ হলো?বুঝতে হবে,,ঐ মেয়ের মধ্যে কিছু তো স্পেশাল আছে।"
উষ্ণ হাসি হাসি মুখ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। একটু আনমনা হয়ে বললো..
"তা ঠিক। কিছু নয়,অনেক কিছুই স্পেশাল আমার শ্যামা ফুলের।"
প্রচ্ছেদ চোখ ছোট ছোট করে মাথা নাচিয়ে বললো....
"উমমম,,উষ্ণ ভাই??প্রেমে তো দেখি হাবুডুবু খাচ্ছো তুমি??একটু সামলে হ্যা,,বিয়ের আগে মিট করা তো বিপদজনক তোর জন্য। "
হাসির ফোয়ারা বইলো দুজনার মাঝেই।প্রচ্ছেদও যেন আজ একটু প্রাণ খুলে হাসছে।তবে হাসিটা যে খুবই ক্ষনস্থায়ী তার জন্য।
সো রুমের পরিষ্কার কাচের দরজাটা ঠেলে একটি পরিচিত চেহারার মানুষকে ঢুকতে দেখেই থমকে গেলো প্রচ্ছেদ।মুখ থেকে হাসির রেখা সরে গিয়ে ভর করলো একরাস অবাকের রেশ।সে কি সত্যিই দেখছে তার স্বল্পদিনের পরিচিত এক রমনীকে?,,কি যেন নাম মেয়েটার?,,আরভি '?অর্পা'? অভ্রা,,হ্যা।অভ্রাই তো ওর নাম।এখানে কেন ও?দু দুটো বছর পর,কেন আবার এলো সে প্রচ্ছেদের সামনে?,
দুটো বছর পর এতোটা কাছ থেকে প্রচ্ছেদকে দেখে থমকে গেলো অভ্রার পা।বুকের ভেতরটা যেন দামামা বাজতে লাগলো ভয়াবহ সুরে।আচ্ছা, কেউ কি শুনতে পাচ্ছে সেই বিকট শব্দ? জানা নেই অভ্রার।
অনুভব করলো আবারও সেই হৃদপিন্ডের ধুকধুক শব্দ,যেমনটা ঠিক দুবছর আগে কারোর ঐ সাদা ফ্রেমের চশমার ফাকে লুকিয়ে থাকা আঁখি দুটোতে দৃষ্টি মিলতো অভ্রার।নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো,এখনো কি আগের মতো প্রচ্ছেদের প্রতি তার ভালোবাসাটা তাজা রয়ে গেল?
উত্তর পেলো না,পেতে চাইলো ও না।অভ্রা জানে উত্তর টা হয়তো হ্যা হবে,তাহলে তো অভ্রা আর এগোতে পারবে না তার ভবিষ্যতে। পারবে না তার জীবন তরীটাকে বইয়ে নিতে।নাকি পারবে উষ্ণের হাত ধরে এগোতে?
উষ্ণের কথা মাথায় আসতেই তার দিকে ফিরে তাকালো অভ্রা।লোকটা কেমন হাসি হাসি মুখ করে দেখছে তাদের দুজনকে।আচ্ছা,এই লোকটার কি একটুও খারাপ লাগছে না বিষয়টা?কি দিয়ে তৈরি ইনি?
প্রচ্ছেদের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়েই ধীর পায়ে এগোতে লাগলো উষ্ণের কাছে সে।কিন্তু প্রচ্ছেদের বেহায়য়া চোখের দৃষ্টি একটুও নড়লো না অভ্রার দিক থেকে।অভ্রার সাথে সাথেই এগিয়ে গেলো তার দৃষ্টি। এইবার দৃষ্টিতে নিবদ্ধ হলো অভ্রা উষ্ণ একত্রে।
"মিট মাই ফিয়ন্সে,অভ্রায়ীনি মজুমদার।"
কানের মধ্যে মনে হলো যেম কেউ পারমানবিক বোমা ফাটালো।হ্যা,,উষ্ণের কথা খানা প্রচ্ছেদের নীকট পারমানবিক বোমার চাইতে কম কিছুই নয়।অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলো....
"ও তোর হবু ব্ বউ?"
উষ্ণ ঠোঁটের কোনে আগের মতোই হাসি নিয়ে বললো...
"হ্যা,,,ও-ই। আমার শ্যামা ফুল।"
এলোমেলো দৃষ্টি ফ্লোরে নিক্ষেপ করলো প্রচ্ছেদ।বুঝতে পারলো এতোক্ষণ কি বেহায়য়াপনাই না করে ফেললো নিজের অজান্তেই।তাই তো উষ্ণের দিকে তাকিয়ে মেকি হাসার চেষ্টা করলো একবার।
উষ্ণ এবার অভ্রার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো...
"ফুল?ও হলো আমার মাসতুতো ভাই প্রচ্ছেদ বাসু।সম্পর্কে তোমার ভাসুরঠাকুর।যদিও আমাদের বয়সের ডিফারেন্স মাত্র দু মাস। "
এতোক্ষনের ভাবনারা যেন উভে গেলো অভ্রার মন থেকে। অবিশ্বাসের চোখে তাকালো উষ্ণের পানে। কি বললো উষ্ণ এটা?প্রচ্ছেদ সম্পর্কে উষ্ণের মাসতুতো ভাই?এতো বড় সত্যটা উষ্ণ লুকিয়ে নিলো অভ্রার থেকে?,,তার মানে,অভ্রা যা ভেবেছিলো,তাই ঠিক?উষ্ণও প্রচ্ছেদেরই লোক।উষ্ণও তাকে ঠকানোর জন্যই এসেছে?...
"প্রচ্ছেদ,আমাদের এঙ্গেজম্যান্টের জন্য রিং দেখবো।ডায়মন্ড রিং,রাউন্ডটা যাতে প্ল্যাটিনামের হয়।"
উষ্ণের কথায় শুকনো ঢোক গিললো প্রচ্ছেদ।বিচলিত দৃষ্টি নিয়েই বললো..
"ত্ তোরা ওয়েট কর,আমি গোডাউন থেকে নিয়ে আসছি।"
আর একটা মুহুর্তও দাড়ালো না প্রচ্ছেদ।দ্রুত পায়ে কাচের দরজাটা টেনে বেরিয়ে গেলো দোকান থেকে।এক্ষুনি গিয়ে এক গ্লাস পানি খেতেই হবে তাকে।
''""
"আমার পক্ষে আপনাকে বিয়ে করা সম্ভব নয় উষ্ণায়ন। আজই আমি আবার না করে দেবো বাড়ি তে। আসছি,ভালো থাকবেন। আর কখনো আমার সামনে না আসলেই খুশি হবো "
কঠোর ও প্রখর কন্ঠে সূর্যের মতো দ্যুতিমান কথা গুলো বলেই প্রস্থান করতে নিলো অভ্রা।অপেক্ষা করলো না উষ্ণের প্রতিত্তোরের।
"আরেহ,,ফুল,শোনো তো?"
তারাহুরোয় পেছন থেকে হুট করেই অভ্রার বা হাতের কব্জি চেপে ধরলো উষ্ণ। অভ্রার গতি স্থিতিতে পরিনত হলো। পেছন ফিরে ঘার কাত করে তাকালো উষ্ণের দিকে।
কি সাংঘাতিক বিভৎস দৃষ্টিজোড়া।মুহুর্তেই উষ্ণকে পুড়িয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে মনে হয় সেই দৃষ্টি।
এই মুহুর্তে অভ্রার দৃষ্টিজোড়ার খপ্পরে যে একবার পড়বে, সাথে সাথেই এসে অভ্রার দু পা চেপে ধরে হয়তো বলবে..
"হে মাতা চন্ডী,,ক্ষমা করো আমায়।আমায় পাতালপুরির পথ দেখিয়ে দাও,তবুও তোমার ঐ অগ্নির মতো দৃষ্টিতে আমায় ঝলসে দিও না।"
কিন্তু উষ্ণ ভয় পেলো না বেশি।আবার খুব একটা সাহসও দেখালো না।করলো এক বাচ্চামো কাজ। বাচ্চাদের মতো করেই ঠোঁট গোলগোল করে টেনে টেনে বললো...
"ওভাবে তাকায় না প্লিজ।আমি সাক্ষাৎ রণকালীর দেখা পাচ্ছি। "
তরতর করে বেড়ে উঠলো অভ্রার রাগ।দাতে দাত চেপে বললো...
"খোলা বাজারে আমি সিনক্রিয়েট করতে চাইছি না।আমায় যেতে দিন।আপনিও একজন প্রতারক।কি মজা পান বলুন তো আপনারা দু ভাই মিলে আমায় বারবার ভেঙে দিয়ে?"
"এখনো তো তুমি হৃদয়ের জোড়াটাই বাধোনি আমার সাথে,ভাঙবো কি করে বলো?"
উষ্ণের কথায় ম্যাজিক আছে নিশ্চয়ই। না হলে কি অভ্রা এই কঠিন মুহুর্তেও নিজের রাগকে সামলে নিতে পারতো?
দম ফেললো অভ্রা।লোকটার সাথে এবার সরাসরিই কথা বলতে হবে।
"দেখুন?আপ..."
"দেখছিই তো,আমার ফুলকে।"
বিরক্ত লাগছে অভ্রার।তবুও কিচ্ছুটি বললো না এই নিয়ে,,আসল কথায় ফেরা যাক।..
"শুনুন,,,আপনার আসল উদ্দেশ্য কি তা সত্যিই আমি জানি না।আপনি যদি প্রচ্ছেদের হয়ে কাজ করেন,তাহলে দুঃখিত, আমি আর ফাঁদে পড়ছি না।আর যদি তা নাও হয়,তাহলেও দুঃখিত,আমি এবারও আপনাকে বিয়ে করতে পারছি না।কারন আপনি প্রচ্ছেদের ভাই।"
উষ্ণ দ্রুত দু পাশে মাথা নেড়ে বললো...
"শুধু ভাই নয়।মাসতুতো ভাই।"
"সে যাই হোক,আপনি প্রচ্ছেদের পারিবারিক লোক এটাই অনেক।আমি চাই না আমার ভবিষ্যৎ উনার সামনে শুরু হোক।"
মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হলো উষ্ণের।একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বললো...
"গতকাল রাতেই বলেছিলাম,আজই শেষবারের মতো তোমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করবো।আর কখনো না।"
"আগে কেন জানান নি যে উনি আপনার ভাই?"
"এখন তো জানালাম।একেবারেই যে গোপন করেছি তা তো নয়। "
অভ্রা নীরবে ভাবলো কিছুক্ষণ। পরক্ষনেই হালকা কাতর কন্ঠে নিচের দিকে তাকিয়ে বললো...
"আপনিও প্রচ্ছেদ দাভাইয়ের মতো আমায় ছুঁয়ে দেখে ছুঁড়ে ফেলবেন?"
কতটা গভীর ক্ষত থাকলে একটা নারী এমন একটা কথা বলতে পারে জানেন?,,হয়তো না,আমি, আপনি কেউই উপলব্ধি করতে পারি না।যার ব্যথা,শুধু সেই বোঝে।আর হয়তো বোঝে তাকে সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষটি।
উষ্ণ অভ্রার হাতের বাধন হালকা করলো।আস্তে করে এক কদম এগিয়ে এলো অভ্রার নীকট।কন্ঠ কেমন বরফ শীতল হয়ে এলো তার।অভ্রার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে বললো...
"বিয়ের আগে যদি কখনো ওর মতো তোমায় ব্যাডটাচ করার চেষ্টাও করি,তাহলে তোমায় আমার দিব্বি শ্যামাফুল।তুমি ভরা বাজারে আমার গালে থাপ্পড় বসিয়ে,মুখে থুথু মেরে চলে যেও।এরপর আর কখনোই ফিরে এসো না আমার কাছে,আমি ডাকলেও না,,মরলেও এসো না তুমি।"
লোকটার কথার জোর প্রচুর।অভ্রাকে কেমন দমিয়ে নিলো একটি কথা দ্বারাই
প্রচ্ছেদ ফিরে এলো হাতে মাঝারো সাইজের একটি বাক্স নিয়ে।উষ্ণের হাতের বন্ধনে অভ্রার হাতখানায় চোখ পড়তেই মনের ভেতর উড়াল দিয়ে উঠলো এক টুকরো অতীত।
দু বছর আগে কিছু মুহুর্তের জন্য ঐ হাত খানা তো তার হাতের দখলেই ছিলো।কিন্তু সে কি উষ্ণের মতোই স্বাভাবিক আবেশে ধরেছিলো?,নাকি পৌরুষচিত্তের কামনা, বাসনার লোভে?
চোখ সরিয়ে নিজের জায়গায় দাড়িয়ে বাক্সটা খুলে উষ্ণের সামনেই রাখলো।মিথ্যা হাসি দিয়ে বললো...
"যেমনটা তোর পছন্দ। "
উষ্ণ হেসে একে একে হাতে তুলে দেখতে লাগলো আংটিগুলো।দু তিনটে নাড়াচাড়া করার পর অভ্রার উদ্দেশ্যে বললো...
"অভ্রা,দেখো তো কোনটা তোমার পছন্দ? "
অভ্রা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে দেখতে নিলো আংটিগুলো।জিজ্ঞেস করলো...
"কিসের জন্য?"
"আমাদের আশীর্বাদের জন্য। তোমার যেটা পছন্দ সেটাই নেবো।"
"সত্যিই?"
অভ্রার প্রশ্নে হাসলো উষ্ণ। বললো...
"শত সত্যি।কস্ট নিয়ে ভেবো না।তোমার যেটা ভালো লাগে, দেখো।"
অভ্রা কোনা চোখে তাকালো উষ্ণের দিকে।জিজ্ঞেস করলো...
"আমি যেমনটি পছন্দ করবো,ঠিক তেমনই নেবেন তো?"
উষ্ণ চোখ ছোট ছোট করে হাসলো।পালটা প্রশ্নে জিজ্ঞেস করলো...
"কি করতে চাইছো,বলোতো তুমি?"
অভ্রা সেকেন্ড কয়েক চুপ রইলো।পরে বললো...
"আমার পছন্দ সই-ই নিলাম তাহলে.."
বলেই এবার সরাসরি দৃষ্টি দিলো প্রচ্ছেদের দিকে।বললো...
"দাভাই, এগুলো সাইডে রাখুন।আর কিছু রুপার কালেকশন দেখান। "
দুটো বছর পর আবারো সেই পুরোনো ডাকটা।সুরেও কোনো পরিবর্তন নেই যেন।প্রচ্ছেদ এতোটা বিচলিত,কিন্তু অভ্রা কি নিদারুন স্বাভাবিক কথা বলছে প্রচ্ছেদের সাথে,ঠিক দুটো বছর আগের মতোই।এর মানে কি?অভ্রা কি উষ্ণকে কিছু না বুঝতে দেওয়ার জন্য এমন ভাব করছে?নাকি সত্যিই ওর কোনো প্রভাবতা আসছে না,মেয়েটি কি সত্যিই ভালোবাসতো প্রচ্ছেদকে।সবটাই মিথ্যা নাটক ছিলো,।
অথচ প্রচ্ছেদ জানতেও পারলো না যে কতটা কষ্ট বুকে পাথর চাপা দিয়ে এতোটা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে অভ্রা।
"রুপা দিয়ে কি করবা ফুল?এগুলোর মধ্যেই দেখো না?এটা আজীবন বহন করার জিনিস।"
অভ্রা শান্ত দৃষ্টি দিলো সামনে থাকা বাক্সটির দিকে।বললো....
"যত্ন করে রাখতে জানলে রুপাও হিরার থেকে বেশিদিন টিকে উষ্ণায়ন। "