----
কোচিং টাইম নয়টা।অথচ হাত ঘড়িতে সময় দেখে বুঝতে পারলো আটটা বায়ান্ন বাজে।কোচিং সেন্টারটা বাজারেই।রিক্সা নিলে পাঁচ মিনিটেই চলে যাওয়া যাবে,কিন্তু হাঁটা পথে কমপক্ষে পনেরো মিনিট।
পাঁচতলায় ভাড়াবাসা থেকে অভ্রা নেমে এলো,সাথে তার মেঝো আন্টিও আছে। তিনি চাকুরিজীবি। তাই সময়েই বেরিয়ে পরতে হয়।সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে যখন দোতলায় তখন সেই তলার বাসার দরজা খুলে বেরিয়ে এলো প্রচ্ছেদ বাসু।হাতে একটি ব্যাগ,কিসের?তা জানা নেই অভ্রার।নাম জানলো কি করে?কারন এই লোকটাকে আগেও একবার দেখেছে অভ্রা।দু থেকে তিন দিন আগে।
অভ্রা সবার আগে আগে নামছে,এরপর তার আন্টি,সবার শেষে প্রচ্ছেদ।
"আন্টি,,নিয়নদা কি কাল বাসায় ফিরেছে?"
প্রচ্ছেদের কথায় অভ্রার আন্টিও উত্তর দিলো....
"না,,বললো কাল রাতে নাকি রুমনদের বাড়িতে নিমন্ত্রন ছিলো।"
"হ্যা,আমারও তো ছিলো,যাইনি আমি।''
" ওহ,,আচ্ছা। ছেলে আমার কুলাঙ্গার তৈরি হচ্ছে,ঠিকঠাক বাসায় ফেরেনা,কি করে জানায়ও না।"
ভদ্রমহিলার কথায় আলতো করে হাসলো প্রচ্ছেদ।বললো....
"ও নিয়ে ভাববেন না আন্টি।সময় হলে ঠিক হয়ে যাবে।"
"ঐ আশাতেই আছি বাবা।"
সম্পূর্ণ কথোপকথনে নীরব ভূমিকা পালন করলো অভ্রা।মেয়েটা একটু হলেও চঞ্চল। কিন্তু তা সবার ক্ষেত্রে প্রকাশ্য নয়।আঁড়চোখে বার কয়েক অভ্রাকে পরখ করলো প্রচ্ছেদ বাসু।মেয়েটাও কি তাকে দেখেছে?জানা নেই,সর্বদাই তো মাথা নিচু করে হাটছে।
মূল রাস্তার গোড়ায় আসতেই ভদ্রমহিলা প্রস্থান করলো তার অফিসের উদ্দেশ্যে।প্রচ্ছেদ গিয়ে দাড়ালো রাস্তার বিপরীত পাশে।অভ্রা, প্রচ্ছেদ দুজনারই গন্তব্য দাগনভূইয়ার বাজারে,প্রচ্ছেদের দোকান আর অভ্রার কোচিং।
হাত ঘড়িতে সময়টা একবার পরখ করে নিলো অভ্রা।দুরে তাকিয়ে দেখলো একটা রিক্সারও খোঁজ পেলো না সে।রাস্তার সংস্করণের জন্যই এমন দশা কয়েকদিন ধরে।
নাহ,, আর এভাবে দাড়িয়ে থাকলে চলবে না, ভেবেই হাঁটা ধরলো অভ্রা।হাটা পথে প্রায় দু মিনিটের রাস্তা পাড় করলো।তখনই পেছন থেকে ডাক পড়লো....
"দিদিভাই যাবেন?এই যে দিদিভাই?"
তাকিয়ে দেখলো প্রচ্ছেদ বাসু। একটা রিক্সা থেকেই ডাকছে।অভ্রা তাকিয়ে দেখলো আর কোনো রিক্সার হদিস এখনো পাওয়া গেলো না।ওদিকে কোচিংয়েরও দেরি হচ্ছে।লোকটা আন্টিদের পরিচিত,এডজাস্ট করে যাওয়াই যায়।
অভ্রাকে এগোতে দেখেই প্রচ্ছেদ হালকা হেসে আরেকটু সরে বসলো।অভ্রাও উঠলো রিক্সায়,আলতো হেসে বললো...
"ধন্যবাদ।দেরি হচ্ছিলো এমনিতেই।"
রিক্সা চলছে আপন উদ্দেশ্যে।পেছন সীটে দু রকম অনুভূতি সম্পন্ন দুটি প্রাণের ঠোঁটের কোনে মিষ্টি আর উজ্জ্বল হাসির ফোয়ারা বইছে...
"আমাদের বাসাতেই থাকেন?"
প্রচ্ছেদের কথায় একটু তাকালো অভ্রা।উত্তর দিলো...
"এখনো থাকি না, কিছুদিন পরেই শিফট হবো আন্টির বাসায়।"
"আন্টি বলতে??নিয়ন দা'দের বাসায়?"
"হুম।"
"ওহ,,নিয়নদার কে হন আপনি??"
"মাসতুতো বোন।"
"বুঝলাম,তো এখানে শিফট হচ্ছেন হঠাৎ?"
"আমাদের বাড়ি থেকে রেগুলার কলেজে আসা টাফ,,কোচিংও টাইমলি ধরা যায় না,এই জন্য আর কি।"
"কলেজ?কিসে পড়েন আপনি?"
"ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার এবার।"
হাসিটা একটু বেশি চওড়া হলো প্রচ্ছেদের,বললো...
"আরেহ,,দেখে একদমই মনে হয় না কলেজে।আমি ভাবছিলাম ক্লাস সেভেন কি এইট হবেন।"
হাস্যকর কথায় তাল মিলিয়ে অভ্রাও হাসলো একটু।আস্তে করে বললো..
"এই কথা সবাই বলে।"
প্রচ্ছেদের দোকান আসতেই রিক্সা থামালো সে।নামতে নামতে বললো...
"আপনি তো মেইনরোডে নামবেন না??এগিয়ে দেওয়া লাগবে?"..
" না না ঠিক আছে,আমি পারবো।"
"আচ্ছা। "
নেমেই পকেট থেকে ভাড়া দিতে লাগলো প্রচ্ছেদ।রিক্সাওয়ালাকে বললো..
"উনারটা সহ রাখুন।"
কথাখানা শুনেই বাধা দিলো অভ্রা...
"এই না না দাভাই,,,আমি দিয়ে দিবো। আপনি দেওয়া লাগবে না।"
"সমস্যা নেই,,আমরা তো পরিচিতই তাই না?"
চেয়েও অভ্রা বাধা দিতে পারলো না প্রচ্ছেদকে।ভাড়া মেটাতেই রিক্সা আবারো চলতে শুরু করলো।অভ্রার মনে উৎফুল্লতার এক নতুন গরিমা দেখা দিলো।তা কিসের?কিছুটা টের পাচ্ছে অভ্রা,কিন্তু ভয় পাচ্ছে না।কারনটা সহজ,লোকটা নিতান্তই ভালো একটা মানুষ,কত সুন্দর নম্র ভাবে কথা বলে।অভ্রার থেকে বেশ দূরত্ব নিয়েও বসেছিলো রিক্সায়।এতেই তো বোঝা যায় নাকি?,,,ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসিটুকু আপন চিত্তেই লাজুক হাসিতে পরিনত হলো ষোড়শী কিশোরীর শ্যামবর্নীয় মুখখানা।
****
প্রচ্ছেদের সাথে প্রথম সাক্ষাতের প্রামান্য চিত্রটা চোখের সামনে যেন স্পষ্ট ভাবে ভেসে উঠলো অভ্রার।নেত্রদ্বয় অশ্রুতে ভিজলো মনে হয় একটু খানি।সাদা রঙের প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে বিরস ভাবে প্রকৃতির সাথে অতীতটাও বিলাস করছে অভ্রা।
ড্রাইভ করতে করতে তার ঐ শ্যামসুন্দর মুখখানাই পরখ করছে উষ্ণ। মেয়েটা কেমন গুমোট হয়ে আছে।প্রচ্ছেদের শো রুম থেকে বের হওয়ার পর থেকেই এই অবস্থা। অথচ প্রচ্ছদের সামনে নিজেকে কতটা স্ট্রং দেখালো সে।
মেয়েটা এমন কেন?প্রশ্নটা খুব একটা মাথা চাড়া দেয়নি উষ্ণের।কারন সে জানে,অভ্রার নিজেকে এমন কঠিন স্তুপে পরিনত করার একমাত্র কারন প্রচ্ছদই,এই যে,দুটো বছর পরও আগের মতো হতে পারেনি সে।আগের মতো যে কারোর সামনে নিজের কোমলত্ব প্রকাশও করতে পারে না,,এই এখন উষ্ণের সামনেও পারছে না।
ঠোঁটের কোনে এক তপ্ত হাসি দেখা দিলো উষ্ণের,,ড্রাইভ করতে করতেই খালি গলায় গেয়ে উঠলো...
"তুমি সুখ যদি নাহি পাও..
যাও সুখেরও সন্ধানে যাও.."
কম্পিত নেত্রে অভ্রা ফিরে তাকালো উষ্ণের পানে।উষ্ণও তার দিকে ফিরে আলতো হাসলো...
"কি ম্যাডাম??আমার গান এতোই ভালো লাগলো??"
কিয়াৎক্ষন চুপ রইলো অভ্রা।হয়তো স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা,, একটু পর বলে উঠলো...
"আপনার থেকে আমার প্রচ্ছদ দাভাই ভালো গান গায়।"
হাসিটা আরো একটু চওড়া হলো উষ্ণের।অভ্রার কথায় একটুও খারাপ লাগেনি তার,বরং ভালো লাগছে,,মেয়েটা প্রাণ খুলে অন্তত এই কথাটাতো বললো তাকে,,
"সে আমি জানি ম্যাডাম,,।আমি তো আর কোনো প্রফেশনাল সিঙ্গার নই।"
"প্রচ্ছদ দাভাইও কোনো প্রফেশনাল সিঙ্গার নয়।"
উষ্ণ এবার এক দৃষ্টিতে তাকালো অভ্রার পানে।বললো..
"আপনিও তো প্রফেশনাল সিঙ্গার নন,,কিন্তু আপনি তো প্রচ্ছদের থেকেও ভালো গাইতে জানেন।"
"এটাও জানেন?"
উষ্ণ আবার দৃষ্টি দিলো সামনে..
"যাকে চাই,তার সম্পর্কে এইটুকুও জানবো না?"
চুপ হয়ে গেলো অভ্রা।পাশ ফিরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো উষ্ণের পানে।মিনিট খানেক পর জিজ্ঞেস করলো সেই পুরোনো প্রশ্নখানাই...
"আমাকে চাওয়ার কারন?"
উষ্ণ একটুও বিরক্তবোধ করলো না অভ্রার প্রশ্নে।বরং লম্বা একটা শ্বাস ফেলে গাড়িটা সাইড করে থামালো।তাকালো অভ্রার দিকে। শীতল কন্ঠে বললো...
"তোমার ভালোবাসা,তোমার অভিমানের মতোই তিব্র।
প্রচ্ছদের প্রতি তোমার যে তিব্র অভিমান দেখেছি,তার মতোই তিব্র ভালোবাসা আমার প্রতি দেখতে চাই।এই জন্য তোমায় পুরোটাই চাই।"
অভ্রার নিঃশ্বাসের গতিবেগ প্রবল হলো মনে হয়।আসলেই কি প্রচ্ছদের প্রতি তার শুধু অভিমান??একটুও ভালোবাসা নেই?
ভেবে পেলো না অভ্রা।আর না ভাবতে চাইলো,,শুধু নিজেকে সামলে নিতে চাইলো,,যেমনটা এতোগুলো দিন ধরে করে আসছে।
উষ্ণ আবারো গাড়ি স্টার্ট দিলো,,,
"এইটুকু বলার জন্য গাড়ি থামালেন?"
হাসলো উষ্ণ। জোর কন্ঠে বললো...
"মন উত্তোলন করা কথা গুলো যদি চোখে চোখ রেখেই না বলতে পারি তাহলে নিজস্ব গাড়ি কিনে লাভ কি?"
"আপনার নিজস্ব গাড়ি আছে জানতাম।তবে সেটা যে পাজারো হবে,তা ভাবিনি।"
"তোমার পছন্দ হয়নি??"
"দামটা কখনোই ফ্যাক্ট করে না।আর এমনিতে আমার এসব ভালোও লাগে না।"
"বাইক ভালো লাগে তাইতো?"
"হুম,,"
"লুকিয়ে লুকিয়ে শিখলেও তো,,বাইকিং,ড্রাইভিং।"
"শখের বসে শিখে রাখলাম।কেন?বিয়ের পর ড্রাইভিং করা মানা নাকি?"
মেয়েটা সব সময় এমন এমন কথা বলে না,উষ্ণ না হেসে পারেই না।এই যে এখনো হেসে উঠলো প্রাণ খুলে...
"মানা কেন?,,আরো তো ভালোই হলো,,আমার একটা মাত্র গাড়ি,,শুধু শুধু অন্যলোকের উপর দায়ীত্ব দিতেও ভয় লাগে।এর থেকে ভালো নিজের ঘরনীই গাড়ি সামলাক।"
------
সন্ধ্যার পর বাসায় ফিরে আজ আর রোজকার মতো সোফায় বসলো না প্রচ্ছদ।নিজ কক্ষের দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রীথুলা ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে।হয়তো নিজের প্রসাধনীগুলো গুছিয়ে রাখছে,,
প্রচ্ছদের আজ আর ইচ্ছে হলো না প্রীথুলার নীকট যেতে।নীরব চিত্তে তার মায়ের রুমে গিয়ে ঢুকলো।প্রভাতী বাসু অর্থাৎ প্রচ্ছদের মা এখন রান্নাঘরেই প্রীতির সাথে টুকটাক কাজ করবে।প্রচ্ছদের বাবা নন্দন বাসুও এখন আসবে না রুমে।সবটা জেনেই হালকা করে দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে মায়ের রুমের খাটে উপুর হয়ে শুয়ে পড়লো প্রচ্ছদ।
মাথায় সবটা গোলমেলে ঠেকছে।অভ্রা নামের মেয়েটিকে এক প্রকার ভুলেই গিয়েছে সে।মনে থাকবে কি করে?এতো এতো নারী সঙ্গ ছেড়ে ঐ একটা পুঁটিমাছকে মনে রাখবে প্রচ্ছদ?
কিন্তু আজ আবারো ঐ মেয়েটার মুখোমুখি হলো সে।যা হয়তো কখনোই আশা করেনি সে।মনে পড়ে গেলো আগের সেই নতুনত্বে ঘেরা বন্ধুমহলটাকে।মনে পড়লো নিয়নদা কে।এখানে প্রথম যখন প্রীতি দির বাসায় উঠেছিলো, তখন এলাকায় সম্পূর্নই নতুন ছিলো প্রচ্ছদ।
পাচতলায় ভাড়াটিয়া ছিলো নিয়ন আর তার পরিবার।বয়সে নিয়ন দু বছরের ছোটো প্রচ্ছদের।তবুও সম্মানের খাতিরে দুজনই দুজনকে দাদা বলে ডাকতো।সেই নিয়নের হাত ধরেই নতুন একটা বন্ধুমহলে প্রবেশ প্রচ্ছদের।আস্তে আস্তে অভস্ত্যতা, মেলামেশা,ভালোখারাপের মিসেল একটা মহল।বেশ ভালোই কাটছিলো সবার।একে অন্যের খুঁটিনাটি বিষয়ও জানতো বেশ।
এরপরই আগমন ঘটলো নিয়নদার মাসতুতো বোনের।নাম অভ্রায়ীনি মজুমদার। মেয়েটার দিক থেকেই গ্রীন সিগনাল পেয়েছিলো প্রচ্ছদ।তাকেও যুক্ত করার ফন্দি করলো নিজের জালে।
পিচ্চি মেয়েটা সবে কলেজে পা দিয়েছে বলতে গেলে,প্রীথুলার সাথেই।একই ব্যাচ,একই কলেজ,শুধু বিভাগ আলাদা,প্রীথুলা কমার্স আর অভ্রা সাইন্স।
তারপর যে ধীরে ধীরে কত কিছু,, ভাবতে গেলেই হাসতে মন চায় প্রচ্ছদের।
বাচ্চা মেয়েটার একটা স্মৃতিও টিকিয়ে রাখেনি প্রচ্ছদ।এমনকি সারাদিন 'ভালোবাসি,আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি' বলতে থাকা ফোনের এস এম এস গুলোও নাহ।অথচ প্রচ্ছদ জানতেও পারলো না, সেই বাচ্চা, অপরিপক্ক মেয়েটি তার সমস্ত কিছুই ভীষণ যত্নে রেখেছে।তার হাসি,তার সাদা ফ্রেমের আড়ালে সেই চোখের দৃষ্টি। তার বলা প্রতিটা কথা,প্রতিশ্রুতি।প্রতিটি এস এম এস স্ক্রিনশট নিয়ে তিন চারটে হার্ড কপি করে রেখেছে,যাতে হারিয়ে না যায়,প্রতিটি ভয়েজ এস এম এস স্ক্যানরেকর্ড করে রেখেছে, যেন সময় বা ইচ্ছে হলেই প্রচ্ছদের বলা সেউ মধুর বাক্য গুলো শুনতে পারে।এমন কি যত্ন করে রেখেছে ভাই হিসেবে পড়িয়ে দেওয়া হাতের লাল রঙা রাখিটাও।