তুমি কোন কাননের ফুল

পর্ব - ৩৩

🟢

শ্যামবর্ণীয় নারীটি একটা সময় প্রচ্ছদের অন্তকোনে বসবাসের সুজোগ পায়নি। তাই যেন আজ সুযোগ পেয়ে লুফে নিচ্ছে।ভোরের মিষ্টি আলো চোখে পড়লেও বিছানা ছাড়ার প্রয়াশ চালালো না সে। মুচকি হেসে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিলো অভ্রাকে।

একটা সময় কত অবহেলা করতো এই নারীটিকে,কিন্তু ভালোবাসার অনুভুতিটা দেরিতে হলেও জন্মেছে তার প্রতিই।ততদিনে অভ্রা যে অন্যের বুকে মাথা রাখার প্রয়াশ চালাচ্ছিলো। ঘুমের মাঝেই চিন্তা করলো প্রচ্ছদ,আচ্ছা,এতো কিছুর পরেও কি করে অভ্রা আজ তার হলো?

ভাবনারা বন্ধি হয়ে আছে যেন,কিছুতেই আজ অভ্রার বাহুডোরের আড়ালে গিয়ে অন্যকিছু চিন্তা করবে না যেন।

আজকের মিষ্টি সকালটা শুরু পবিত্রতা দিয়ে।ছুঁয়ে থাকলেও আজ প্রচ্ছদের মাঝে কোনো দেহ আকাঙ্খা নেই।আছে শুধু বিশাল এক মনের প্রশান্তির নিবাস,যেই প্রশান্তিটা তার জীবনে এসেছে অভ্রার নাম নিয়ে।

অতীতের প্রচ্ছদ পরিবর্তন হয়েছে।তাও সেই অভ্রারই কারনে।সিগারেট ছেড়েছে, নিজের ভীরুতা ছেড়ে জবাব দেওয়া শিখেছে,সব চেয়ে বড় কথা,প্রতিদিনের নিয়মের নারী দেহ ছেড়েছে প্রচ্ছদ।এখন আর গভীর রাতে নিজের পৌরুষত্ব জাগ্রত হয় না।নির্ঘুম রাত পাড়ি দেওয়ার চিন্তাও হয় না।নাহ,অভ্রা তাকে সেই দেহী সুখ দেয়না,মূলত প্রচ্ছদ কখনো চায়ও না তা। প্রেমিক -প্রেমিকার সম্পর্কে থেকে তো কতশত বার মেয়েটির দেহের প্রতি নজর দিয়েছে সে।এবার বৈবাহিক সম্পর্কটা না হয় গভীর ভাবে দেহ ছোঁয়া বিহীনই হোক,গভীর ভাবে মনটাই ছুঁতে চায় এবার প্রচ্ছদ।এতো প্রশান্তি,এতো ক্লান্ততার পরেও ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি সব কিছুর কারন হিসেবে অভ্রার মাথাখানা নিজের বুকে টেনে ধরলেই যথেষ্ট মনে হয় এখন। আগে যেই দৃষ্টি জোড়া, সামনে পেলেই মেয়েদের সারা দেহে বিচরন করতো,এখন সেই দৃষ্টি জোড়াই নিবন্ধ থাকে শুধু মাত্র শ্যামবর্ণীয় ঐ নারীর চোখে।ডাগর ডাগর চোখ দুটিকে উপেক্ষা করে কঞ্চি শিখার ন্যায় কপি কালালরের ঠোটেও পড়ে না আজকাল।ঐ চোখেই যেন জন্মের প্রশান্তি।

ঘুমের ঘোরে অনুভব করলো তাকে তার সুশ্রী বউ নামন রমনীটি ডাকছে। হাতে ধোয়া উঠা চায়ের কাপ,ভেজা চুল থেকে মাতাল করা ঘ্রাণটা সরে না যে কখনোই।কি মিষ্টি মধুর রিনরিন কন্ঠের ডাক..

"এই যে শুনছেন?উঠুন এবার?অনেক বেলা হয়েছে তো।"

প্রচ্ছদও প্রস্তুতি নিলো চোখ খুলে তার ইহ জনমের সোনার কাঠিকে দেখার।যে চোখ খুলতেই প্রচ্ছদকে উপহার দেবে নির্মল সেই মিষ্টি হাসি।তারপর প্রচ্ছদ উঠে বসলে তার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দেবে।তারপর দুজন মিলে বারান্দার দোলনায় বসে কুয়াশায় ঘেরা ভোরের আমেজ নেবে ধোঁয়া উঠা চায়ের স্বাধের সাথে।গল্প করবে কত শত,জানা গল্প বলবে বারবার।মাঝখানের স্মৃতি টুকু ভুলে অতীত থেকেও অতীতের সুন্দর মুহুর্ত গুলো মনে করবে।সর্বশেষ চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে অভ্রা মাথা রাখবে প্রচ্ছদের প্রসস্থ বুকে।আলতো কন্ঠে শুধাবে...

"আজও ভালোবাসি।ভীষন ভালোবাসি।"

প্রচ্ছদও মুচকি হেসে উত্তর দেবে..

"অভ্রা গো,,এবার আগলে রাখবো তোমার এই সীমাহীন ভালোবাসাকে আমি।আজীবন,আজীবনের থেকেও বেশি সময় ধরে।"

চিন্তার শেষে ঘুম ভাঙলো ঠিকই।অভ্রাকেও দেখলো ঠিক স্বপ্নের মতোই। তবে তার পাশে উজ্জল হয়ে উঠলো উষ্ণের মুখটিও।হ্যা,অভ্রার স্বামী উষ্ণ। ভাগ্যক্রমে সে প্রচ্ছদেরই ভাই।

দেরিতে ভালোবাসার মানুষটি আজ শুধু স্বপ্নেই প্রচ্ছদের বাহুডোরে আবদ্ধ থাকে,বাস্তবে সে উষ্ণ নামের উষ্ণতায় ডোবে বারবার, বহুবার।

উঠে বসতেই পরিবারের সবাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো প্রচ্ছদকে।তা নিয়ে খুব একটা আমেজ নেই তার মধ্যে। যেখানে জন্মটাই বৃথা,সেখানে প্রতিবছর জন্মদিন পালন করাটা শুধুই মনের কোনের বিলাসীতার লেশ।

সবাই চলে যেতেই অভ্রার দেওয়া জন্মদিনের উপহারের বাক্সটি নিয়ে সেই কুয়াশা ঘেরা বারান্দার দোলনায় বসলো প্রচ্ছদ,তবে স্বপ্নের মতো অভ্রা পাশে নেই।বাক্সটা খুলে একটা কাচের ছবির ফ্রেম পেলো।যেটার এক পাশে প্রচ্ছদের হাস্যজ্জল মুখের একটা ছবি আর অন্যপাশে উইশ হিসেবে শুদ্ধ বাংলায় লিখা কয়েকটি বাক্য।

"শত নারী আশক্ত পুরুষটিকে আমি নিজের জীবনের ভাগ দ্বিতীয়বার দিতে পারিনি। উপরওয়ালা আমাকে প্রাণবন্ত ভাবে বাঁচার একটা সুযোগ দিয়েছেন,যার নাম উষ্ণ। সে আমার বাগে পাওয়া ভাগ্য,তাকে আমি জেনে বুঝে পায়ে ঠেলতে পারবো না।,,

আপনার জন্মটা শুভ ছিলো।মাঝের কিছু সময় নিজেই নিজেকে পরিত্যক্ত করে, নোংরা করে ফেলেছেন।তাই আশা করবো এই জন্মদিনে আবার আপনার একটা নতুন জন্ম হোক।যেন মৃতু্টাও জন্মের মতোই শুভ হয়।শ্যামবর্ণীয় নারীটিকে ভুলে নতুন একজনের মায়ায় আটকান।দেখবেন,সে আমার থেকেও বেশি পারবে আপনার জীবন গুছিয়ে তুলতে।

শুভ জন্মদিন আমার এক পাক্ষিক ভালোবাসা।"

ঠিক একই রকমই উপহার কয়েকবছর আগে অভ্রা তাকে দিয়েছিলো।শুধু লিখাটাই ছিলো ভিন্ন। সেই উপহারটা প্রচ্ছদ তাচ্ছিল্য করে ফেলে দিয়েছিলো পুকুরপাড়ে।আজ আর তার অস্তিত্ব নেই।

ঘন ঘন কয়েকটা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বুজলো প্রচ্ছদ।অন্তরের কষ্টটা আজকাল একটু বেশিই পোড়ায় তাকে।তার কেউ নেই নিজের বলতে,,তাই তো আপন চিত্তেই বলতে লাগলো...

"তোমার ভালোবাসাকে আমি খেলনা হিসেবে নিয়েছি।অহংকার করেছিলাম,নারী ছুতে পেরেছি বলে,কিন্তু আমি ভাবিনি আমি শুধু নারী শরীর ছুঁতে পেরেছি,নারী নয়। আজ বুঝি,নারী ছোঁয়া এত সহজ নয়,,সেটা পেরেছে আমার প্রিয় ভাই উষ্ণ।

ভালোবাসার নামে নীরব ধর্ষ*ক হয়েছি তোমার।তারপর ছুড়ে ফেলে দিলাম তোমায়।কিন্তু আজকাল তোমার ভালোবাসাটা আমার হয়ে গিয়েছে।আবারও চেয়েছি তোমায় তোমার থেকে।তুমি দাওনি আমায় দ্বিতীয় বার সুযোগখানা।এত খারাপ কেন ছিলাম আমি?এতো নিকৃষ্ট ছিলো কেন আমার চিন্তাধারা?

দুঃখীত অভ্রা,আমি তোমার কথাখানা রাখতে পারলাম না।পারবো না আমি তোমায় ভুলে যেতে,পারবো না আমি আর কারোর মায়ায় আটকাতে।তুমি আমার না হয়েও আজীবন আমারই থাকবে।প্রথমে ভালোবাসাটা তোমার দিক থেকে একপাক্ষিক ছিলো।আর এখন তা আমার দিক থেকে।আজ তুমি ভালোবাসলেও আমায় আর চাও না।কিন্তু আমি চাইবো আজীবন।নাহ,তোমায় ছিনিয়ে নিতে নয়,তোমায় সুখী দেখতে উষ্ণের বাহুডোরে।বাস্তবে না হলেও প্রতিদিনের কল্পনায় তুমি তো আমারই তাই না? আমি এতেই খুশি।অনেক খুশি।

তুমি রোজ আমার কল্পনার বঁধু হিসেবেই থেকো,বাস্তবে না হয় তুমি উষ্ণের শ্যামাফুল।

তুমি কোন কাননের ফুল গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক রোমান্টিক গল্প