পরদিন সকালে প্রীতি ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুতে আসলেই রান্নাঘরে দেখা মিললো উষ্ণের।তাকে দেখে প্রীতি এগিয়ে গেলো সেখানে।
"তুই এতো সকালে রান্নাঘরে? "
জিজ্ঞেস করতে করতেই নজর বুলিয়ে নিতেই ভ্রু কুঁচকে এলো প্রীতির...
"ওমাহ,তুই রান্না করছিস যে, তাও আবার এতো ভোরে ভোরে?"
উষ্ণ মুখে সেই চির পরিচিত হাসি এনে বললো...
"অফিস যেতে হবে রে আজ।তাই তারাতারিই করে রাখছি রান্নাটা।"
প্রীতি একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো ....
"তা তুই কেন করছিস রান্না সেটা তো বল?বাড়িতে তো আমরা সবাই আছি।"
উষ্ণ ব্যস্ত হাতে কাজ করতে করতে বললো...
"আসলে, ফুলের এই অবস্থা, আমি চাই না রান্না ঘরের ঝামেলায় এসে আরো বিপদ বাড়াতে।আর মায়েরও বয়স হচ্ছে, এসব করলে তারও শরীর খারাপ হবে।তাই আমি...."
"তাই তুই বাসার সব কাজ করিস?"
"আরে না নাহ।কাজ করার জন্য তো একজন লোক রেখেছি।একটু পরেই চলে আসবে,সব কাজও করে দেবে।শুধু রান্নাটাই করে যাই আমি,আসলে মা যার তার হাতের রান্না খেতে পারবে না তো,তাই আরকি।"
প্রনতি প্রভাতিও মাত্রই উঠে এসেছে এইদিকে। প্রীতিকে এই বিষয়ে কথা বলতে দেখে প্রনতি বলে উঠলো...
"ছেলেটাকে আমি বলেছি।রুম্মি এগিয়ে দিলে রান্নাটা আমি ঠিক করে নিতে পারবো কয়েকটা দিন।আগে তো বৌমাই করতো।,তা না ছেলে তো আমাদের কাউকে,রান্না ঘরের কাছেও ঘেষতে দেয় না।বউমাও ওকে কত বারণ করলো। কে শুনে কার কথা।"
প্রীতি হাসলো উষ্ণের দিকে তাকিয়ে।মনে মনে যে খুব প্রশান্তিও অনুভব করলো। তার মাসিমনি খুব লাকি এমন একটা ছেলে গর্ভে ধরে,আর অভ্রাও যে লাকি,এমন বর পেয়ে।শুধু আগলে রাখতে জানলেই হয়।
একটু পরেই প্রচ্ছদ প্রীথুলাও এসে উপস্থিত হয় নাস্তা করার উদ্দেশ্যে।টুকটাক কথাবার্তার মধ্যেই ধীরে ধীরে নিজের ভারী শরীর নিয়ে হেঁটে আসে অভ্রা।দূর থেকে উষ্ণের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই এক মন মাতানো হাসি দেয় উষ্ণ, এটা তার রোজকার নিয়ম।শত চিন্তা মাথায় থাকলেও তার ফুলের সামনে সে স্নিগ্ধ হাসিখানা রাখে।আজও তাই।পরক্ষনেই আবার হাতের কাজটা নিয়ে ব্যস্ত হলো সে।ওদিকে প্রনতি,প্রভাতি, প্রীতিও টুকটাক কাজে লেগে পড়লো,নাস্তা বানানোর জন্য।
ঠিক ঐ সময়ই সবার মাঝে থেকেই প্রীথুলা করে বসলো এক বিপদজনক কাজ।অভ্রা যখনই তাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলো চেয়ারের কাছে,তখন প্রীথুলা নিজের একটা পা এগিয়ে দিয়ে তড়িৎ গতিতে ল্যাং মারলো অভ্রাকে।
পায়ের গতিতে রোধ পড়তেই অভ্রা কিছু বুঝে উঠার আগেই হুমড়ি খেয়ে ঝুকে পড়লো সামনে।মাটি ছুঁই ছুঁই এমন অবস্থায় কোথা থেকে যেন উপরওয়ালার আশীর্বাদ হয়ে দুটো হাত এসে আগলে ধরলো অভ্রাকে।
মেয়েটার মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠলো। এই বুঝি সব শেষ।এই বুঝি উষ্ণের দেওয়া ভালোবাসার আমানত সে হারিয়ে ফেললো।
পরিস্থিতি অনুমান করতেই সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো। দৌড়ে কিচেনরুম থেকে ছুটে এলো উষ্ণ। অভ্রার পাশে ছুট্টে গিয়ে বসে সামলে ধরলো তাকে।উষ্ণকে দেখে প্রচ্ছদও অভ্রাকে স্বযত্নে তুলে দিলো উষ্ণের হাতে।
প্রচ্ছদেরও বুক কাঁপছে। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে তার।কিছু মুহুর্তের জন্য যেন হৃদপিণ্ডটা লাফিয়ে উঠলো তার।ভাগ্যিস সেই সময় পুরোটা জুড়েই তার দৃষ্টি নিবন্ধ ছিলো অভ্রাতে।তাইতো পড়তে গেলেই দ্রুত হাতে ধরে নিলো তাকে প্রচ্ছদ।
উষ্ণের ব্যাকুলতা বাড়ছে। অভ্রাকে সামলাতে গিয়ে অনুভব করলো,তার ভেতরটাও কেমন কাঁপছে। মেয়েটা কেমন ঘোরের মধ্যে আছে যেন এখনো।সারা শরীর দিয়ে চিকন ঘাম দিচ্ছে তার।নিশ্বাস পড়ছে ঘন,একপ্রকার হা করেই নিশ্বাস নিচ্ছে সে।হাত পা গুলোও কাঁপছে অভ্রার।
উষ্ণ বারবার ব্যস্ত হয়ে অভ্রার কম্পমান হাত পা,থুতনি চেপে চেপে ধরছে,কাঁপা থামানোর জন্য। মুখেও বারবার বলে যাচ্ছে...
"কিচ্ছু হয়নি ফুল,,,শান্ত হও,,সব ঠিক আছে।তুমি ঠিক আছো ফুল?দেখি তাকাও আমার দিকে।"
অভ্রা ঘোরের মধ্যে থেকেই গোলগোল দৃষ্টি দিলো উষ্ণের পানে।পরক্ষণেই আবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো সে প্রীথুলার দিকে।কেমন যেন জ্বলছে সে।অভ্রা বলতে পারলো না কিছুই,আপন মনে নিজের পেটে হাত রেখে তাকালো সেথায়।কাঁপা কাঁপা আরেকটি হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো উষ্ণের হাত।
মেয়েটির হাবভাব বুঝতে না পেরে উষ্ণ কোমল স্বরে ডাকলো তাকে..
"ফ্ ফুল?"
হঠাৎই চোখের কোন বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো অভ্রার।মেয়েটা সহজে কাঁদে না।তাইতো তার অল্প কান্নাতেই উষ্ণ বুঝে যায়,কষ্টটা তার ফুল সইতে পারছে না।অভ্রা কাঁপা কন্ঠে বললো...
"উষ্ণায়ন? আ্ আমার বাচ্চা..."
বলতে বলতেই ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। অন্তর কেঁপে উঠলো উষ্ণের।দ্রুত অভ্রার মাথাটা চেপে ধরলো নিজের বুকে।গালে,চুলে বারবার হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো...
"ত্ তুমি ব্যথা পেয়েছো ফুল?পেটে ব্যথা করছে তোমার?টান পড়ছে?আমায় বলো??"
অভ্রা সামলে নিলো নিজেকে।বাকিরাও এসে অভ্রাকে সামলাতে লাগলো। উষ্ণের প্রশ্নে নিজেকে সামলে অভ্রা দু পাশে মাথা নাড়লো।সুস্থির নিশ্বাস ফেললো সবাই। উষ্ণ ঢোক গিলে নিয়ে,অভ্রাকে সামলে নিয়ে বললো...
"দেখি, এখন ফ্লোর থেকে উঠো,ঠান্ডা লেগে যাবে এভাবে বসে থাকলে।সোফায় বসবে চলো।"
বলতে বলতেই অভ্রাকে উঠাতে লাগলো।সোফায় নিয়ে বসালো তাকে।প্রীতি একগ্লাস পানি অভ্রার দিকে এগিয়ে দিতেই উষ্ণ তা নিয়ে একটু খাইয়ে দিলো অভ্রাকে।
পুরোটা সময় প্রচ্ছদ সেই আগের জায়গায় বসেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অভ্রার দিকে।চোখ দুটি তার টকটকে লাল রূপ ধারন করেছে। ভেতরে ভেতরে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উত্তপ্ত হচ্ছে সে।নীরবতা যে ঝড়ের পূর্বাভাস। হলোও ঠিক তাই।
অভ্রাকে একটু স্বাভাবিক হতে দেখেই প্রচ্ছদ উঠে দাঁড়ালো। বাঘের মতো ক্রুদ্ধ দৃষ্টি প্রীথুলার দিকে নিক্ষেপ পরে হনহনিয়ে এগিয়ে গেলো তার কাছে।সবার ভাবনার সুতো ছিড়ে হঠাৎই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে প্রীথুলার গালে ঠাটিয়ে এক থাপ্পর বসিয়ে দিলো প্রচ্ছদ। সবার কাছে এ যেন পশ্চিম আকাসে সূর্যোদ্বয়।
"তোর সাহস কি করে হয় অভ্রার ক্ষতি করার?"
প্রীথুলা আজ নিজেও স্তব্ধ। প্রচ্ছদ তার গায়ে হাত তুললো?এটা কি করে হতে পারে?
"তু্ তুমি আমাকে মারলে?"
"হ্যা মারলাম।এই থাপ্পরটা তোর আরো আগেই পাওয়া উচিৎ ছিলো।তোর কি ক্ষতি করেছে অভ্রা?কেন ওর এতো বড় কৃষতি করতে গেলি তুই?"
প্রীথুলা বুঝতে পারেনি,প্রচ্ছদ যে তার করা কাজটা দেখে ফেলবে।এখন যেহেতু জেনেই গেলো,প্রীথুলা আর লুকালো না।বরং জোর গলায় বলতে লাগলো...
"বেশ করেছি ফেলে দিয়েছি আমি।খুশি হতাম যদি ওর পেটের বাচ্চাটা আজ ম*রতো.."
সজোড়ে আরো একটা থাপ্পড় মারলো প্রচ্ছদ প্রীথুলাকে।তবুও প্রীথুলা দমে গেলো না।চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলো...
"আমার সহ্য হচ্ছে না তোমাদের সবার ওকে নিয়ে এতো মাতামাতি। ছোট বাচ্ছা নাকি ও,যে সবাই এতো এতো আদিক্ষেতা দেখাচ্ছো ওর জন্য?আরে বাচ্চা কি একা ও এ পেটে ধরছে নাকি?পৃথিবীতে আর কারোর বাচ্চা হয়নি,এতো বাড়াবাড়ি কে করে হ্যা?"
এরপরই প্রীথুলা রাগে ফুঁসতে ফুসতে অভ্রার দিকে তাকিয়ে বললো...
"আর এই মেয়েটা?এতো ঢং কি করে করো তুমি হ্যা?আরে মাত্র তো সাতটা মাসই হয়েছে।এখনই হাটতে পারো না,নিচে বসতে পারো না,রান্না করতে পারো না।তোমার এসব ঢং সহ্য হচ্ছে না আমার।"
প্রচ্ছদের সহ্য হলো না প্রীথুলার কথা গুলো।হুট করেই ও প্রীথুলার গলা চেপে ধরলো নিজের এক হাতের সর্বশক্তি দিয়ে।রাগে ফুসতে ফুসতে বলতে নিলো...
"অনেক সহ্য করেছি তোকে।আজ তো তোকে আমি..."
সময়ে প্রূতি এসে ছাড়িয়ে নিলো প্রচ্ছদের থেকে প্রীথুলাকে।প্রীথুলা হাঁপাচ্ছে, তবুও যেন তেজ কমছে না।আঙ্গুল উচিয়ে প্রচ্ছদকে বললো...
"তোমাকে আমি দেখে নেবো। "
প্রীতি ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বললো...
"তুমি কি করে বুঝলে অভ্রা ঢং করছে এসব?মা হয়েছো আগে??বিয়ের এতগুলো বছর পাড় হতে চললো,,একটা বাচ্চা পেটে ধারণ করেছো নিজের?এখন এসব বলছো যে?তুমি জানো এই সময় মেয়েদের কতরকমের সমস্যা হতে পারে?"
প্রীথুলা প্রীতির কথার জবাবে বললো...
"আরেহ,,আমি কেন শুধু শুধু এসব বিচ্ছিরি বাচ্চা কাচ্চার নেওয়ার ধান্দায় নিজের সৌন্দর্য নষ্ট করবো?সবার মতো পাগল আমি?, আর আমাকে শেখাচ্ছেন হ্যা?কত মহিলাকেই তো দেখলাম আমি,সাত মাসেও দৌড়ে দৌড়ে কাজ করে,স্বাভাবিক চলতে পারে,তাহলে ও কেন এসব পারবে না?"
প্রভাতি এগিয়ে এসে বললো...
"চুপ করো তুমি,সবার শরীরের অবস্থা একই নয়।অভ্রা এমনিতেই নড়বড়ে শরীরের মেয়ে।তারউপর তুমি দেখতে পাচ্ছো না ওর অবস্থা? ওর পেট দেখে তোমার ওকে স্বাভাবিক লাগছে?বুঝতে পারছো না ওরও কষ্ট হচ্ছে যে?"
প্রীথুলা এবারও ঘৃনা নিয়ে বলে উঠলো..
"সেটাই তো?ও আলাদা কেন সবার থেকে??এই অভ্রা,,,সাত মাসেই এতো বড় পেট কেন তোমার??কোনো বড় আকারের ডাইনি পেটে ধরেছো নাকি গো তুমি?"
কেমন যেন বিষবান ছুড়ে মারলো অভ্রার হৃদয়ে।শক্ত হাতে খামছে ধরলো উষ্ণের কোমরের দিকের টি শার্টটা।মেয়েটার থুতনি কাঁপছে অনবরত।এই বুঝি ডুকরে কেঁদে উঠলো ।উষ্ণের মাথায় যেন রক্ত উঠে আছে।চিৎকার করে প্রীথুলার দিকে আঙুল তাক করে বললো....
"খবরদার প্রীথুলা,, আমার সন্তানকে নিয়ে এসব বাজে কথা বলার কোনো অধিকার আমি তোমায় দিই নি। জানে মে*রে ফেলবো একদম।"
উষ্ণের কতা শেষ হতে না হতেই প্রচ্ছদ এগিয়ে গিয়ে আরো একটা থাপ্পড় মারলো প্রীথুলার গালে।গনঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে বললো...
"অনেক আশকারা দিয়ে ফেলেছি তোকে আমি। তোর মতো কাল সাপকে আর আমাদের সাথে রাখা যাবে না।খুব শিগগির আমি ব্যবস্থা করছি তোর।"
প্রীথুলাও উত্তর দিলো...
"তোমার মতো কাপুরুষ লোকের সাথে আমিও থাকতে চাই না আর। নেহারই সময়ে সময়ে যা চাই তা দাও বলে,,এছাড়া আর কিই বা আছে তোমার মধ্যে? আরেহ,নিজের বউকে খুশি করার সামর্থ্য টুকুও তো নেই তোমার।হুহ।"
আর দাঁড়ালো না প্রীথুলা সেখানে।হনহনিয়ে নির্ধারিত রুমে চলে গেলো।উপস্থিত সবার মধ্যে পিনপতন নীরবতা।একটু পরে সেই নীরবতা ছাড়িয়ে প্রচ্ছদ টেবিল ড্রয়ার থেকে ফাস্টএইড বক্স এনে অভ্রার পায়ের কাছে বসলো।কম্পমান হাতে অভ্রার বাম পা টি নিজের হাতে তুলে নিলো।
পায়ে কারোর স্পর্শ পেয়ে অভ্রা মুখ তুলে তাকালো সেখানে।প্রচ্ছদকে দেখেই পা খানা সরিয়ে নিতে চাইলে উষ্ণও অভ্রার হাটুর দিকটায় ধরে বাঁধা দিলো।পায়ে দৃষ্টি রেখেই বললো...
"নড়বে না ফুল।,,পা কেটেছে তোমার,আর এতক্ষণ তুমি আমাকে বলছোও না?কি গো তুমি হ্যা?"
প্রচ্ছদ কিচ্ছু বললো না।আপন মনেই নিচের দিকে তাকিয়ে অভ্রার পায়ের রকৃত গুলো তুলো দিয়ে মুছে দিতে লাগলো।অল্প একটুই কেটেছে।রক্ত বেরিয়ে এতোক্ষণে শুকিয়েও গিয়েছে।চিন্তায় মেয়েটি হয়তো শরীরের ব্যাতাখানা অনুভবই করে নি।
উষ্ণ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অভ্রাকে ছেড়ে বললো...
"বসো তুমি একটু।আমি নাস্তাটা নিয়ে আসছি তোমার।খিদে পেয়েছে না?"
অভ্রা আস্তে করি উপর নিচ মাথা ঝাকালো।ইদানিং একটু পরপরই খিদে পায় অভ্রার।বিষয়টা এই অবস্থায় স্বাভাবিক।তাই আর মিথ্যা বললো না উষ্ণকে।উষ্ণ উঠে চলে গেলো খাবার আনতে।অভ্রা নীরবে তাকিয়ে রইলো নিজেড পায়ের দিকে।যেখানে খুব যত্ন করে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে, তার কিছু মুহূর্তের ভালোবাসার মানুষটি।
ওভাবে থেকেই হঠাৎ প্রচ্ছদ বলে উঠলো...
"আমার একটা কথা রাখবে অভ্রা?"
প্রচ্ছেদের কথাখানায় ভাবনায় পড়লো অভ্রা।মন জানতে চাইলো,কি চাই প্রচ্ছেদের?,,নিজেকে সংযত করে বললো..
"বলুন?"
"প্রতিদিন স্নানের পর কষ্ট করে তোমার কানের পেছনে কাজলের কালো টিকা লাগাবে একটু?,,আসলে তোমার ফোলা ফোলা পা দুটোর দিকে তাকালে আর আমি চেষ্টা করেও চোখ ফেরাতে পারি না।,তাই বলছি,যদি আমার কু-নজর পড়ে তোমার উপর?"
কন্ঠের প্রখরতায় অভ্রার উত্তর দেওয়ার জো রইলো না।কি বলবে সে উত্তরে? এক ভালোবাসা আজ কতজনকেই না পোড়াচ্ছে।আচ্ছা, প্রচ্ছদ কি তাকে এখনো ভালোবাসে?এতোগুলো বছর পরও?...
সেদিন আর অফিসে যাওয়া হয়নি উষ্ণের।অভ্রাকে ছাড়তে চায়না কিছুতেই।বিকেলের দিকে রুমে এসে অভ্রাকে না পেয়ে আবার বের হলো উষ্ণ। ফ্ল্যাটের মধ্যমনি হয়ে থাকা করিডোরে অভ্রাকে আনমনা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে গেলো সেদিকে উষ্ণ। ভাবলো,হয়তো একা আছে মেয়েটা।তবে একটু এগিয়ে যেতেই দেখলো একটু সামনেই প্রীতি আর বেলিও আছে।তবুও উষ্ণ এগিয়ে গিয়ে অভ্রার মাথায় আদুরে হাত রেখে ডাকলো...
"ফুল?"
তবে এই মুহুর্তে অভ্রার উল্টো আচরন আশা করে নি সে।হুট করেই অভ্রা উষ্ণের হাতটা নিজের মাথা থেকে ছাড়িয়ে নিলো।পেচন ফিরে বললো...
"ছুবেন না আপনি আমায়।দুরে থাকুন আমার থেকে আপনি।"
অভ্রার কন্টের তীব্রতা পেয়ে প্রীতি আর বেলিও তাকালো সে দিকে।চেচামেচি করতে দেখে বেলি এগোতে নিলেই প্রীতি বাঁধা দিলো তাকে।তাদের নিজেদের ব্যপার,থাক না,দুর থেকে দেখাই ভালো। আর গেলো না বেলি,শুনতে লাগলো দুর থেকেই সব।
"কি হয়েছে ফুল?এমন করছো কেন?"
বলতে বলতেই উষ্ণ অভ্রার দিকে এগোতে নিলে অভ্রা আবারও চেচিয়ে উঠলো...
"বললাম না ছুবেন না আমায়?যান তো এখান থেকে আপনি?"
"ফুল?আমায় বলো কি হয়েছে,কি করেছি আমি?এমন করছো কেন?"
"কি করেছেন?আপনি জানেন না কি করেছেন?আমাকে সত্যিটা বলছেন না কেন?আমার সন্তান ছেলে না মেয়ে বলছেন না কেন?আ্ আর আমার অবস্থা এমন অস্বাভাবিক কেন?আপনি তো সবটাই জানেন,,আমায় বলছেন না কেন?আমার ভালে লাগছে না এই লুকাচুরি। এমন কেন করছেননআমার সাথে?কি হয়েছে আমার?"
চেঁচাতে চেচাতে ক্লান্ত অভ্রা।উষ্ণ চুপ করে তাকিয়ে রইলো অভ্রার দিকে,কোনো উত্তর দিলো না।নিশ্বাস ফেলে বললো...
"ওকেয়,,আমি চলে যাচ্ছি এখান থেকে,তুমি প্লিজ শান্ত হও।আর ওসব নিয়ে ভেবো না,,সব নর্মাল,তোমার কিচ্ছু হয়নি।ঠিক আছো তুমি।"
আর দাঁড়ালো না উষ্ণ। চোকের ইশারায় প্রীতিকে অভ্রার কাছে থাকতে বলে বারান্দা ত্যাগ করলো।আড়াল থেকে ঘটনাটা দেখে চিন্তার ভাজ পড়লো প্রচ্ছদের কপালেও।
-----
রাতের প্রায় তিনটা,প্রচ্ছদের চোখে ঘুম নেই বলতে গেলে।বারান্দার সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে চিন্তায় বিভোর সে।সবটা ভাবাচ্ছে তাকে।কি এমন হলো তার অভ্রার,যে উষ্ণ তা লুকাচুরি করছে সবার থেকে?
হুট করেই খটখট আওয়াজ পেতেই পেছন ফিরে তাকালো প্রচ্ছদ।উষ্ণকে রুম থেকে বের হতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো।উষ্ণও তাকে দেখে এগিয়ে এলো...
"প্রচ্ছদ ভাই?এখনো ঘুমাসনি তুই?এতরাত হলো?"
"ব্যাস এমনিই,ঘুম আসছে না।তুই এতো রাতে বের হলি?কোনো সমস্যা? অভ্রা ঠিক আছে?"
"ও ঠিক আছে।একটু বাইরে যাবো।"
"এখন কেন?,আর অভ্রাকে একা রেখে?"
"মাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম কিছুক্ষণ ওর কাছে থাকতে।''
" তুই কি বিকেলের বিষয়টা নিয়ে অভ্রার উপর রাগ..."
"আরে না না প্রচ্ছদ ভাই।ওসব কিছুই না।প্রেগন্যান্সির সময়টায় ফুলের বেশ মুড সুইং হচ্ছে। এই মেজাজ গরম,তো এই কেদে কেটে ভাসাবে।তখন কি না কি বলেছে, ওসব গায়ে মাখতে নেই।আমি জানি ও ওসব এমনি এমনি বলেনি।তেমন ব্যাপার নাহ।যাচ্ছিলাম ওর জন্যই ফুসকা খুজতে।ফুলের মন চেয়েছে এই রাতে ফুচকা খাবে। "
প্রচ্ছদ স্বস্তি পেলো যেন কিছুটা।উষ্ণের দিকে আপন মনে তাকিয়ে ভাবলো"উষ্ণের মতো করে হয়তো আমি অভ্রার এতটা যত্ন নিতে পারতাম না।"
"এতো রাতে পাবি ফুচকা?"
"আআআ পেতে তো হবেই না হলে এসে নিজেই ঘরে বানিয়ে নেবো।,,আচ্ছা,তুই যেহেতু জেগেই আছিস,একটু ফুলের কাছে থাকবি কিছুক্ষণ? ওকে একা রাখতে চাইছি না আমি।মাকেও তাহলে আর এতরাতে বিরক্ত করা লাগতো না আরকি।"
প্রচ্ছদ মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।উষ্ণ হেসে চলে যেতেই প্রচ্ছদ গভীর একটা নিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলো অভ্রার রুমের দিকে।দরজা খুলতেই চোখের সামনপ ভাসমান হলো অভ্রার ঘুমন্ত মুখখানি।কি মায়া,কি মায়া।পড়নে ছাই রঙা একটা নাইটি,,আজকাল সারাদিনই এসব পড়তে হয় অভ্রাকে।অন্য কিছুতে পেটে ভীষন চাপ পড়ে।
একপাশ ফিরে টেডি জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা।পেটের নিচ দিয়ে পাতলা একটা বালিশ দিয়ে রাখা।হয়তো উষ্ণই দিয়ে গেছে অভ্রার সুবিধার্থে।
মায়া মুখটার দিকে তাকিয়ে যে প্রচ্ছদের পা থামলো,তা আর রুমের ভেতরে নিতে পারলো না।বাইরে দাঁড়িয়েই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার অভ্রার দিকে।ওভাবে ঠিক কতটা সময় পাড় হলো জানা নেই।হঠাৎই পেছন থেকে প্রচ্ছদের কাঁধে হাত দিয়ে উষ্ণ বললো...
"কিরে,তুই রুমে না গিয়ে এখানে কেন দাঁড়িয়ে ছিলি?"
প্রচ্ছদ ঘোর কাটিয়ে উষ্ণের দিকে তাকালো।ফুসকা গুলো একেবারে প্লেটে সাজিয়েই নিয়ে এসেছে সে।
"এতো রাতে কোথায় পেলি?"
"আরেহ,,দিঘীর পাড়ে পার্কে এই ফুচকাওয়ালা মামাটার টং দোকান আছে।ভাগ্য ভালো,দোকান বন্ধ থাকলেও তাকে পেয়ে গেলাম।উঠে বানিয়ে দিলো।,,আচ্ছা,থ্যাংকস ভাই,এতোক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলি।"
প্রচ্ছদ মুচকি একটা হাসি দিলো শুধু। উষ্ণ আর কিছু না বলে এগিয়ে গিয়ে প্লেটটা টেবিলে রেখে বসলো অভ্রার মাথার কাছে।ডাকলো না,বরং আস্তে আস্তে অভ্রার চুলে বিলি কাটতে লাগলো।একটু পরেই পিটপিট করে চোখ খুললো অভ্রা।মুচকি হেঁসে উষ্ণ বললো...
"সরি বউ,ডিস্টার্ব করলাম তোমার ঘুমে।"
ঘুমের ঘোরে অভ্রা ঠিক মনে করতে পারলো না এখন কেন উষ্ণ তাকে ডাকছে।বিষয়টা বুঝতে পারলো উষ্ণ, ফিক করে হেঁসে বললো...
"ফুকচা খাবে বললে না?খেয়ে নাও,তার আগে দেখি তো?ইশশ,এইটুকু সময়ে আমার বউটার ঠোঁটখানি কেমন শুকিয়ে গেছে। দেখি তো একটু ভিজিয়ে দিই।"
বলেই অভ্রাকে একটু তুলে নিজেই ঝুকে অভ্রার ঠোঁটে ঠোঁট মিলালো উষ্ণ। আবেশে আজও অভ্রা কেঁপে উঠে,চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো,খামছে ধরলো উষ্ণ শার্ট।
এদিকে যাবে যাবে করেও এই মুহুর্তটা পর্যন্ত যাওয়া হলো না প্রচ্ছদের।উষ্ণের ঠোঁটে অভ্রার ঠোঁট মিশতে দেখে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো।আর দাঁড়িয়ে না থেকে ধীরে ধীরে হাটা ধরলো নিজ পথে।মাথায় তাচ্ছিল্যকর কথাগুলো বারবার ঘুরতে লাগলো...
"আজও মেয়েটা প্রথম ছোঁয়ায় অনুভুতির মতো লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে কেঁপে উঠে।নারীর ভূষণ লজ্জা,সেই অঙ্গ কম্পিত লজ্জা খানা যদি বিয়ে এত বছর পরেও পুরুষ সেই প্রথম রাতের মতো করেই পায়,তাহলে সেই পুরুষ কখনোই সেই নারীকে ত্যাগ করবে না,হোক সে অতিসুন্দরী কিংবা শ্যামা সুন্দরী।আর আমি, প্রচ্ছদ বাসু,লজ্জাহীন শত নারীর জন্য লাজুকলতা কন্যাকে দুরে ঠেলে দিলাম।এতটাই দুরে করলাম,যে এখন হাজার কদম এগিয়েও আমি আর সেই লাজুকলতার সান্নিধ্য পেতে পারলাম না।এক জীবনে কি মস্ত ভুলটাই না করলাম আমি বোকাটা।"
-----
পরদিন সকাল হতেই কাছের একটা মন্দিরে পূজা দেওয়ার জন্য গেলো প্রভাতি,প্রনতি,প্রচ্ছদ আর উষ্ণও।অভ্রাকে বাড়িতে একা রেখে উষ্ণ যেতে চায়নি,প্রীতিই জোর করে তাকে বললো...
"মেয়েটার শরীরের অবস্থা ভালো না।স্বামী হিসেবে ওর জন্য ঈশ্বরের কাছে ওর মঙ্গল কামনা টুকু কর?আর বাড়িতে আমি,বেলির বাবা,বেলি তো আছিই।কিচ্ছু হবে না অভ্রার।আমি খেয়াল রাখবো ওর।ঘন্টাখানেকেরই তো ব্যপার।"
প্রীতির ভরসাতেই উষ্ণ গেলো মন্দিরে।পুজো শেষে সবাই গেলো একটা বড় বট গাছের নিচে।হিন্দু মতে কিছু কিছু স্থানে এমন কিছু গাছ থাকে, যেখানে মানুষ নিজের মনের বাসনা চেয়ে লাল সুতোর গিট দেয় গাছটায়।পরবর্তীতে যদি সেই বাসনা পুরন হয়,তাহলে আবার সেই স্থানে গিয়ে পুজো দিয়ে গাছ থেকে লাল সুতোর গিট খুলে।তেমনি করেই আজ সেই গাছটিতে আবার নতুন করে তিন তিনটে গিট পড়লো লাল সুতোর।তিনজনের মনের চাওয়া খানাই একজনকে নিয়ে,তবুও যেন কত ভিন্নতা।
প্রনতি মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলো...
"আমার বংশখানা টিকিয়ে রেখো ঈশ্বর। আমার ছেলে আর বউমার প্রথম সন্তান যেন ছেলেই হয়,আমার কোলে যেন একটা নাতি আসে।"
প্রচ্ছদও চাইলো কিছু, তার অভ্রার জন্য...
"আমি জানি ঈশ্বর, আমার অভ্রার খুব সখ জমজ মেয়ের।তুমি ওকে ওর খুশিটা দিও, ওর গর্ভে যেন একজন না,বরং দুজন বেড়ে উঠে,ওর কোলে যেন তার জমজ দুটো মেয়ে এসে হাতছানি দিয়ে ধরা দেয়।"
সর্বশেষ উষ্ণও চাইলো কিছু তার ফুলের জন্য...
"যাই হয়ে যাক ঈশ্বর। আমার ফুলকে তুমি সুস্থ রেখো।সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা দিয়েছো তুমি ওকে,কিন্তু সন্তান জন্ম দানের সময় আমার ফুলটার যেন আঘাত না লাগে।যত যাই হয়ে যাক,আমি মেনে নেবো,তুমি শুধু আমার ফুলটাকে অক্ষত রেখো,ওর যেন কিছু না হয় ঈশ্বর, আমার ফুলটাকে সুস্থ রেখো তুমি।"