তিনদিন,চারদিন,পাঁচদিন করে কখন যে সময়টা পেরিয়ে যায় তা লোকচক্ষু টেরও পায়না।এই যে কতগুলো দিন কেটে গেলো। এর মধ্যে আবার উর্মির বিয়েটাও বেশ জাঁকজমক ভাবেই সম্পন্ন হলো।অভ্রা নিজ বাড়ি ফিরেছে উর্মির বিয়ের পরেই।দেখতে দেখতে আরো একটা বিয়ের রেশ পড়লো সবার মাঝে।বিয়ে? হ্যা বিয়েই,,অভ্রা আর উষ্ণের বিয়ে।উচ্ছাসে ভরা উষ্ণ আজ পেতে চলেছে পূর্ণতা।আর অভ্রা?তার আর কি,,মনের মানুষ মনেই রইলো,বাস্তবে না হয় এক উষ্ণের সাথেই বাকিটা জীবন পাড়ি দিক।
একটু আগেই বরযাত্রী হয়ে দ্বিতীয় বারের মতো অভ্রাদের বাড়িতে এলো প্রচ্ছদ।ইশশ, ভুল না করলে হয়তো আজ সে বর হয়ে আসতো এই বাড়িতে। উষ্ণের ফটোশুট চলছে।একটু পরেই উর্মি এসে প্রচ্ছদকে বললো....
"কিরে,সবাই তো নতুন বউ দেখতে গেলো।তুই যাবি না?"
প্রচ্ছদ এক মিথ্যা হাসি দিয়ে বললো...
"তোরাই দেখ,আমি পরে যাবো ক্ষণ।"
উর্মি আর কথা বাড়ালো না।নিজেই গেলো অভ্রাকে দেখতে।এদিকে প্রচ্ছদ দাঁড়িয়ে রইলো সেই বিয়ের মন্ডপের সামনেই। আমার অভ্রা বউ সেজেছে আজ।টকটকা লাল বেনারসী পড়েছে। মাথায় দিয়েছে নতুন বিয়ের ওড়না।বউ মুকুট আর চূড়াও পড়েছে নিশ্চই।ইশশ,প্রচ্ছদের জন্য আজ সাজলো না মেয়েটি।কি হতো একটিবার আমার জন্য বউ সাজলে?মালাবদলের আগে পানপাতা মুখ থেকে সরিয়ে শুভদৃষ্টিটা না হয় এই চরিত্রহীন প্রচ্ছদের সাথেই করতো? কিন্তু তা তো হওয়ার নয়,,
উৎফুল্ল প্রীথুলা আজ বেজায় খুশি,,অভ্রা নামের কাটা নিজেদের পরিবার থেকে না দূর করতে পারলেও প্রচ্ছদের জীবন থেকে তো দূর করতে পেরেছে।এতেই অনেক।গদগদ হয়ে এসে প্রচ্ছদের হাত ঝাঁকি দিয়ে বললো...
"এই এই চলো না কয়েকটা ছবি তুলি?আমাকেও কয়েকটা ছবি তুলে দাও?"
প্রচ্ছদ বিরক্তির স্বরে বললো...
"ক্যামেরা ম্যানকে বলো যাও।"
প্রীথুলা মুখ কুঁচকে চলে গেলো সত্যিই।উষ্ণের ডাক পেয়েই প্রচ্ছদ গিয়ে বসলো স্টেজে তার পাশে।উষ্ণ তাকে বললো...
"কখন থেকে ডাকছি তোকে।শুনিসই না।তুই কোথায় আমার সাথে সাথে থাকবি তা না,,"
প্রচ্ছদ কিঞ্চিৎ হাসলো,বললো...
"এসে পড়েছি তো। আছি আমি,চিন্তা করিস না।তোর জুতো আজ নিতে দেবো না শালিদের।"
প্রচ্ছদের কথায় উষ্ণও চওড়া হাসলো।
---
পিড়িতে করে আনা হলো অভ্রাকে।মুখের উপর থেকে পানপাতা সরিয়ে সে চাইলো উষ্ণের পানে।দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলেই হলো শুভ দৃষ্টি। ওদিকে চাতকের ন্যয় তৃষ্ণায় ভরা দুটি চোখ দেখতে ব্যস্ত বধূ রূপের অভ্রাকে।যতটা ভেবেছিলো তার থেকেও সুন্দর লাগছে অভ্রাকে।উষ্ণ নিশ্চই আজ অভ্রার সৌন্দর্যের তারিফ করতে করতে কুপোকাত হয়ে যাবে। কিন্তু এই সৌন্দর্য যে প্রচ্ছদের নামে হলো না,উষ্ণ ঠিকই বলে, অভ্রা একটা জীবন্ত ফুল। শ্যামা ফুল,আজ মনে হচ্ছে, অভ্রা বোধ হয় আরেকটু ফর্সা হলে এতোটা সুন্দর লাগতো না তাকে।ঐ শ্যামা রঙের মায়ায় আটকানোর স্থান থাকতো না।অভ্রা তো সুন্দরীই বটে,,উষ্ণের শ্যামা সুন্দরী।
আজ প্রচ্ছদকে ভালোবাসতে থাকা মেয়েটি একবারও ফিরে চাইলো না এলোমেলো প্রচ্ছদের দিকে। আজ সে যে শুধু উষ্ণকেই সঙ্গ দিতে ব্যস্ত। কিন্তু এটা যে সইতে পারছে না প্রচ্ছদ।এতো কেন কষ্ট, এতো দুরন্ত যন্ত্রণা, ছাব্বিশ বছরের জীবনে আগে তো কখনোই এতো যন্ত্রণা অনুভব হয়নি। ঠোঁট দুটো তীরতীর করে কাঁপছে আজ প্রচ্ছদের,কান্না করতে চাইছে সে ভীষণ, কিন্তু আজ কান্নারাও যেন তাকে সতর্ক বানী দিচ্ছে,, 'এই,,অভ্রার শুভ দিনে একদম অলক্ষুণের মতো চোখের পানি ফেলবি না।এতে অভ্রার অমঙ্গল হবে।'.
আর প্রচ্ছদ এই অমঙ্গলটাই চায় না অভ্রার।কন্ঠনালীতে কতগুলো কথা এলোমেলো ভাবে জমা হচ্ছে, তবুও যেন বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে।অভ্রাকে আজ একটা সহজ সাবলীল শিকার উক্তি দিতে ইচ্ছে করছে খুব করে তার...
"অভ্রা গো,তুমি যা চাইলে তা তুমি পাওনি,বরং তার থেকেও ভালো কিছু পেয়ে গেছো না চাইতেই।আর আমি যা চেয়েছি,ঠিক তাই পেয়েছি।কিন্তু আমার তা চাওয়া উচিৎ হয়নি।একদম উচিৎ হয়নি তা চাওয়া।"
হিন্দু বিয়ের কত কত নিয়ম,,সব গুলো একটার পর একটা পাড় হতে লাগলো,অভ্রা আর উষ্ণ ধীরে ধীরে আরো এক হতে লাগলো,এদিকে প্রচ্ছদও আজ ধীরে ধীরেই কিছু তথাকথিত অধিকার হারাতে লাগলো।আর কখনো সে ভালোবাসার দাবি নিয়ে অভ্রার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না,এই জীবনে আর কখনো অভ্রাকে জিজ্ঞেস করা হবে না,'অভ্রা গো,তুমি তো আমায় ভালোবাসো তাই না?'
সম্পর্কের মোড়টাই যে বদলে গেলো।অভ্রা তার ছোট ভাইয়ের বউ,আর সে অভ্রার তথাকথিত ভাসুরঠাকুর।ইশশ,কি যন্ত্রণাদায়ক শব্দ,ভাবতেই ছুরিকাঘাত লাগার মতো চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেললো প্রচ্ছদ।
সবগুলো নিয়মের পড়ে যখন উষ্ণ কোমল চিত্তে অভ্রার টানটান সিঁথিতে কৌটো ভর্তি সিঁদুর দিয়ে রাঙিয়ে দিলো তখনই আর সইতে পারলো না প্রচ্ছদ।আশপাশের জনবহুল পরিবেশ,ব্যান্ডপার্টির সুরেলা বাজনা,উলুধ্বনি,সব কিছু সামনে রেখেই এক পা একপা করে পেছনে যেতে লাগলো প্রচ্ছদ।যাওয়ার আগে নিজের কোটর ভর্তি দৃষ্টি নিয়ে একবার তাকালো রাঙা সিঁদুরে রঞ্জিত বধূ অভ্রার পানে,যে এই মুহুর্তে লাজুক হেসে মাথা নুইয়ে রেখেছে বিশেষ এক অনুভুতি নিয়ে।তার মাথায় পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে লজ্জা বস্র।
"সে হাসছে,আমার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে অজানা এক অগ্নিদহনে।"
সেই দহনের এতো জ্বালা,,এতো জ্বালা আর সইতে পারলো না প্রচ্ছদ।মিলিয়ে গেলো অন্ধকারে। ভরা মানুষে ঘেরা চকচকা রঙিন জায়গাটায় আর হদিস পাওয়া গেলো না প্রচ্ছদ নামক এক অকাল প্রেমের বৈধিককে।সে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো,অভ্রার সিঁথি ভর্তি টুকটুকে লাল সিঁদুরের সাথেই।
-----------
কুমিল্লা শহরের আটতলার ফ্ল্যাটটির ছয় তলা পুরোটা ছাড়া আর সবগুলোই ভাড়া দেওয়া।সেই ছয় তলার ফ্ল্যাটেই নববধূর গৃহপ্রবেশ হলো। এই এতো এতো আচার অনুষ্ঠানে আর দেখা পাওয়া গেল না প্রচ্ছদের।অভ্রার কাঙাল মন দু একবার এদিক ওদিক ফিরে তার না পাওয়া ভালোবাসাকে খুঁজলেও পরবর্তীতে নিজেই নিজেকে সামলে নিলো,মনে একজন রেখে অন্যজনের সাথে ঘর করা যে অসম্ভব। আচ্ছা উষ্ণ কি সব সময়ই একই রকম থাকবে? কখনো ওর মনে হবে না অভ্রা দুপাক্ষিক হয়ে চলছে?
বিয়ের রাতটুকু নির্ঘুম কাটানোর ফলে ক্লান্তিতে ঘুম নেমে এলো অভ্রার চোখে।ফ্ল্যাটের বেশ কোনের একটা রুমেই তাকে থাকতে বলা হয়েছে।যদিও বাড়ির সকলেই তার পূর্ব পরিচিত, কিন্তু এলাকার প্রতিবেশিরা তো আর নয়।এমনকি বাকি আত্মীয়দের কাছেও অভ্রা নতুন।
প্রীতির সাথে এখন অভ্রার বেশ ভাব।পুরোনো রেসারেসি আর নেই বললেই চলে।এই যে একটু আগেই সে অভ্রাকে বিয়ের সাজ তুলতে সাহায্য করলো।এরপর নিজেই কত সুন্দর করে অভ্রাকে বললো...
"তুই কেমন তা আমরা জানি।কিন্তু আত্মীয়রা তো আর জানে না।এই কয়েকদিন একটু কষ্ট করে মাথায় ঘোমটা দিয়ে রাখবি সারাক্ষণ। অতিথি কমে গেলে আগের মতোই চলতে পারবি।হুম?"
অভ্রা মাথা কাত করে সম্মতি দিলো।প্রীতি যাওয়ার আগে রুম থাকা বাকিদের সতর্কও করে দিলো যাতে কথা কম বলে,অভ্রা ঘুমিয়ে নিক একটু।
নতুন বউ দেখার আগ্রহ প্রাচীন কাল থেকেই সবার মধ্যে থাকে।তাই তো একটু পর পরই কেউ না কেউ আসছে অভ্রাকে দেখতে।এই বলছে,সেই বলছে।কেউ এসে অভ্রাকে লক্ষীমন্ত বলছে,তো আবার কেউ এসেই কটাক্ষ করে বলছে,,
'ওমাহ,মেয়ের রং তো কালো।উষ্ণের সাথে এই মেয়ে যায়?'
নিজের রুপের বিদ্রুপ শুনেও চুপ রইলো অভ্রা।পরিস্থিতিটাই যে এমন। বেশ অনেকক্ষণ পর অভ্রা একটু ঘুমাতে পারলো।বিয়ে বাড়ির ঝামেলা,বিছানায় এটা সেটা এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে।সেগুলোকে কোনো মতে একটু সরিয়েই গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলো সে।চোখ বুজতেই চোখের পাতায় ঘুমের জোয়ার নেমে এলো।
সারারাত বরযাত্রীর গাড়িতেই মরার মতো পড়ে ছিলো প্রচ্ছদ।আজ আর সিগারেট টানতে মন চাইলো না,নিজের কষ্ট ভুলার জন্য এখন আর কোনো নারীসঙ্গেরও প্রয়োজনবোধ করলো না।এমনিই খোলা আকাশের দিকে কাটিয়ে দিলো কতগুলো প্রহর।কুমিল্লা ফিরেছে সেই কখন,এখন বাজে বেলা প্রায় একটা।এই এতোক্ষণেও প্রচ্ছদের নাম মাত্র বউ প্রীথুলা একটা কল দিলো না।সে তো নিজ আনন্দেই মত্ত। একটু আগেই প্রীতি কল দিয়ে তাকে ফ্ল্যাটে আসতে বললো।প্রীতি জানে প্রচ্ছদের মনের অবস্থা, নিজ ভালোবাসার মানুষটি নিজেরই ভাইয়ের বউ হয়েছে,সহ্য করা যায়?,
প্রীতির চোখে এখনও ভাসে গতকাল দুপুরের কথা।উষ্ণ যখন বরের বেশে তৈরি হচ্ছিলো খুশি মনে,তখন অন্যদিকে প্রচ্ছদ পাগলের মতো পায়ে পর্যন্ত পরেছিলো প্রীতির,প্রভাতির।শেষ বারের মতো মা আর বোনের কাছে অভ্রাকে ভিক্ষা চাইছিলো সে। এখনো প্রীতির কানে বাজে ভাইয়ের সেই কলিজায় লাগা কিছু কথা,
"" আমি সব খারাপ ছেড়ে দেবো দিদি,,তোর, অভ্রা,সবার গোলাম হয়ে থাকবো আজীবন,তোরা যা বলবি তাই করবো আমি।প্রয়োজনে দিন রাত কামলা খাটবো,তবুও সব কিছুর বিনিময়ে আমায় অভ্রা দে,,আমি ভিক্ষা চাইছি দিদি,,দে না আমায় অভ্রা।প্লিজ দিদি,এখনো সময় আছে,তোরা একবার অভ্রাকে বল না আমার হতে।আমি আর কখনো ওর অযত্ন করবো না,মাথায় তুলে রাখবো সারাজীবন, শুধু আমার হতে বল না ওকে।""
নিয়মতান্ত্রিক পরিস্থিতির কারনে ভাইয়ের এতো আত্ম চিৎকারের পরেও কিছুই করার ছিলো না প্রীতির।নীরবে শুধু দেখেই গেলো ভাইটার যন্ত্রণা। এরপর হুট করেই উষ্ণের ডাকে প্রচ্ছদ শান্ত হয়ে গেলো।উষ্ণের পছন্দ করে দেওয়া পাঞ্জাবীটা পড়েই বরযাত্রী গেলো সবার সাথে।একটু আগেই পাগলের মতো চিৎকার করতে থাকা প্রচ্ছদ সবার সামনে হঠাৎই চুপ হয়ে গেলো। হুট করে কেউ দেখে বুঝতেই পারলো না এই ছেলেটাই একটু আগে তার ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়ার জন্য নিজের সকল দাম্ভিকতা ছেড়ে ভিক্ষা চাইছিলো অভ্রাকে।
কেউ জানলো না সেই কথা,স্বয়ং অভ্রাও না।
নিজেকে সামলে ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে ঢুকতেই পাশ থেকে তার মামি তাকে ডেকে বললো...
"প্রচ্ছদ বাবা,এরা নতুন বউ দেখতে এসেছে।একটু নিয়ে যাবি ওদের?আমি এদিকের কাজটা সামলে উঠতে হবে।"
প্রচ্ছদ না করলো না।প্রতিবেশী ক'জন মহিলাকে নিয়েই এগিয়ে গেলো কাঙ্খিত রুমটির দিকে।পা চলছে না তার,তবুও যেতে হবে।মনের বিরুদ্ধে করা খুব সহজ কাজগুলোও যেন পাহাড় সমান কষ্টের,যা এখন মনে হচ্ছে প্রচ্ছদের।
ঘুমন্ত অভ্রার মুখপানে দৃষ্টি পড়তেই প্রচ্ছদের মনে হলো রাজ্যের সুখ এসে ধরা দিচ্ছে অন্তরে।এই যে এতোক্ষণের যন্ত্রণাটা নিমেষেই যেন উধাও হয়ে গেলো তার।মাথায় ঘোমটা দিয়েই একপাশ ফিরে হাটু ভাজ করে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। প্রচ্ছদ এক পলক তাকালো অভ্রার সিঁথির দিকে,তার সাথে কপালের মাঝখানে থাকা লাল টিপটা যেন দ্বিগুন সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলছে নববধূর।লোকে ঠিকই বলে,বিয়ের জল গায়ে পড়লে নারীর সৌন্দর্য বৃষ্টি পায়,এই যে এখন প্রচ্ছদ অনুধাবন করছে,তার অভ্রার সৌন্দর্য, কোমলত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। হুট করেই রাজ্যের সৌন্দর্য এসে ভীরেছে যেন অভ্রার মাঝে।
ক্ষনেক্ষনে অভ্রার ভ্রুজোরা কুঞ্চিত হতে দেখেই প্রচ্ছদ বুঝলো তার অভ্রার ঘুমে বিরক্ত হচ্ছে। বিছানাতেই একদল বাচ্চাকাচ্চা উচ্চশব্দে হাসাহাসি করছে।তাদের দিকে তাকিয়েই প্রচ্ছদ চাপা স্বরে বললো...
"এই,তোমরা অন্য ঘরে গিয়ে খেলো।"
বাচ্চারা ঘোর আপত্তি জানিয়ে বললো,তারা নতুন বউয়ের সাথেই থাকবে।এবার প্রচ্ছদ বললো...
"তাহলে আস্তে কথা বলো।নতুন বউ ঘুমাচ্ছে না?"
বাচ্চারা এবার সত্যিই রাজি হলো,কথার স্বরও নামিয়ে নিলো কিছুটা।এতেই শ্রান্তির নিশ্বাস ফেললো প্রচ্ছদ।
প্রতিবেশি মহিলাগুলো এটা ওটা বলছে অভ্রার বর্ননায়।সেই সবে প্রচ্ছদ কান দিলো না,এদের কথায় আর কি আসে যায়,এরা কি তার অভ্রার মনে সৌন্দর্যটা দেখেছে নাকি।
তাই প্রচ্ছদ তাদের নাস্তা জল আনার নাম করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
বিয়ের পর দিন কালরাত্রীর নিয়ম অনুযায়ী উষ্ণের সাথে দেখা হয়নি অভ্রার।তারপর দিন বৌভাত অনুষ্ঠান বেশ ভালোভাবেই কাটছে।দুপুরে ভাত কাপড়ের নিয়ম,এরপর সন্ধ্যায় রিসেপশনও কাটলো বেশ ভালো ভাবেই।একটু আগেই অভ্রার বাবার বাড়ির আত্মীয়রা ফিরেছে।এখন ইয়াং জেনারেজনের সবাই টুকটাক আনন্দ করছে এই যা।সেই কখন থেকে অভ্রাকে স্টেজে বসিয়ে রাখা হয়েছে।উষ্ণও বেশ ব্যস্ত চারদিক সামলাতে।সব কিছুর মাঝেই এর ওর ডাকে ফটো ক্লিকিং এর জন্য ছুটে আসছে আবার স্টেজে।ছবি তুলে আবার ছুটছে কাজে। রাত হয়েছে বেশ,একটার বেশি বাজে,স্টেজে রজনীর কাধে মাথা রেখে অভ্রাকে একপ্রকার ঝিমাতে দেখে উষ্ণ কাজের মাঝেই প্রীতিকে ডেকে বললো..
"দিদি,ফুলকে নিয়ে যা,ওর শরীর ভালো লাগছে না হয়তো।আর পারলে একটু কিছু খাইয়ে দিস।"
প্রীতি একবার তাকালো অভ্রার দিকে।সত্যিই মেয়েটা ক্লান্ত প্রায়।কিছু একটা ভেবে প্রীতি উষ্ণকে বললো...
"এখন খাইয়ে দেবো??না মানে তুইও খাস নি এখনো,,তোর আগে ওকে খেতে দেখলে কেউ কটু কথা বললে,,লোকে তো কথা খুঁজে বেড়ায়..."
উষ্ণ প্রীতিকে বললো...
"এসব ছাড় তো দিদি।দুপুরে পার্লারে যাওয়ার আগে কি একটু খেয়েছে,এরপর আর কিছু খায় নি ও।তুই ওকে রুমে নিয়েই খাইয়ে দে।আমি গেস্টদের সামলেই খেয়ে নেবো পরে,এসব নিয়ে ভাবিস না।।আর কেউ দেখলে বলবি,আমি নিজেই বলেছি ওকে খাওয়াতে। হুম??"
প্রীতি সম্মতি জানিয়ে এগিয়ে গেলো অভ্রার দিকে।স্টেজ থেকে নামাতে নামাতে বললো...
"আয়,আর বসে থাকতে হবে না,খেয়ে নিবি আয়।"
রজনীও একটু দুষ্টুমি করে বললো...
"হ্যা হ্যা,,তারাতারি খেয়ে নাও,আবার তো রেডি হতে হবে। তাই না?"
অভ্রা হয়তো লজ্জা পেলো,কেমন মাথা নামিয়ে ফেললো একটু।প্রীতি দেখলো অভ্রার লজ্জা রাঙা মুখটি।মেয়েটার জন্য আজকাল বেশ মায়া হয় তার,ইশশ, এই মেয়েটাকেই নিজের ভাইয়ের বউ করার জন্য চেষ্টায় ছিলো সে।কিন্তু ভাগ্য তা হতে দিলো না।প্রচ্ছদ এখন এই মায়াময়ীর জন্যই উন্মাদ হয়েছে।
মুচকি হেসে অভ্রাকে নামাতে নামাতে রজনীকে বললো...
"থাক আর লজ্জা দিস না ওকে।তুইও আয়,ওকে তো রেডি করিয়ে দিতে হবে নাকি?"
রজনী উঠে বললো...
"তুই ওকে খাইয়ে দে,আমি ওর সাজের জিনিস গুলো নিয়েই আসছি।"
কথা মতোই প্রীতি নিজ হাতে খাইয়ে দিলো মেয়েটাকে।অভ্রা যখন ক্লান্ততার মাঝেও একটু হেসে বললো...
"সত্যিই খুব খিদে পেয়েছিলো দিদি।"
তখন প্রীতির বুকটা কেমন ভরে উঠলো।ইশশ,প্রীথুলা কি কখনো তাকে এমন ভাবে আপন স্বরে ডেকেছে দিদি বলে?কই মনে পড়ে না তো।হাসলো প্রীতি,অভ্রার শরীর মৃদু কাঁপছে দেখে প্রীতি জিজ্ঞেস করলো....
"কিরে,ভয় করছে?রাতে কি হবে তা ভেবে?"
অভ্রা হেসে সাবলীল ভাবেই উত্তর দিলো...
"আরে নাহ দিদি,,এমন কিছু নাহ।আমার বেশি খিদে পেলেই এমন কাপাকাপি ছুটে।ছোট বেলা থেকেই।"
প্রীতি হেসে ভাত মাখাতে মাখাতে বললো...
"ভয় পাস না একদম।তুই যদি আজ তৈরি না থাকিস,তাহলে উষ্ণকে বলবি নির্দিধায়।আমি জানি,উষ্ণ বুঝবে তোর মনের অবস্থা, জোর করবে না তোকে কিছুর জন্য।"
অভ্রা হালকা হাসলো।তা দেখে প্রীতি আবার বললো...
"দেখ,সব পুরুষেরই বিয়ের পরের প্রথম রাত নিয়ে একটা ইচ্ছে থাকেই,তাই হয়তো তোর কাছে আবদার করেই বসবে উষ্ণ। তুই ভয় না পেয়ে ওকে বুঝিয়ে বলিস,ঠিক বুঝবে ও।ভালোবাসে তো তোকে খুব।নিজের সুখের জন্য, ও তোকে কষ্ট দেবে না নিশ্চই।"
অভ্রা শুধু ছোট্ট করে উত্তর দিলো..
"হুম।"
প্রীতি আর কিছু বললো না,খাইয়ে দিতে লাগলো অভ্রাকে।খাওয়া শেষ হলেই প্রীতি উঠতে উঠতে বললো,,
"এই রুমেই থাক কিছুক্ষণ। রজনী আসছে বলে,ও তৈরি করিয়ে দেবে তোকে।"
প্রীতির কথা মতোই কিছুক্ষণ পর রজনী দুহাত ভর্তি জিনিসপত্র এনে হাজির হলো রুমে।হাতে হাতে অভ্রার গায়ের ভারী ভারী গহনা গুলো খুলে দিয়ে হাতে একটা শাড়ি ধরিয়ে দিয়ে বললো...
"শাড়ীটা চেঞ্জ করে নাও।"
শাড়ী দেখে অভ্রা জিজ্ঞেস করলো...
"শাড়ীও চেঞ্জ করতে হবে?"
রজনী হেসে বললো...
"উষ্ণ ভাইয়ের করা নির্দেশ,এই শাড়ীটাই পড়তে হবে এখন।অবশ্য ভালোই হয়েছে,গায়ের শাড়ীটা বেশ ওজন,তোমার এমনিতেই হাসফাস লাগছে নিশ্চই?এটা পিউর কটন সিল্কের,নরম কাপড়,,এটা পড়ে ঘুমাতেও পারবে ঠিক মতো।যাও,পড়ে এসো।"
অভ্রা শাড়ী হাতে নিয়ে একটু ইতস্তত করে বললো...
"রজনী দিদি,,বলছিলাম যে, মুখটা ধুয়ে ফেলি?মেকআপ গুলোর জন্য বেশ ভাড় লাগছে আমার।"
রজনী হেসে বললো...
"হ্যা হ্যা অবশ্যই। এমনিতেও তুমি শাড়ি পাল্টে এলেই আমি মেকআপ তুলে দিতাম সব।উষ্ণভাঔ বারবার করে বলে দিয়েছে এই হেবি মেকআপ যেন না থাকে।"
অভ্রা সম্মতি পেয়ে হালকা হাসে।হাতমুখ ধুয়ে আসতেই রজনী তাকে আটপৌড়ে করে শাড়ীটা পড়িয়ে দিলো।লম্বা চুলগুলো খোঁপা করে তাতে গুজে দিলো কয়েকটি ছোট সাইজের সূর্যমুখী ফুল।সাথে আরো কি জাতের ফুল যেন আছে,নাম জানা নেই। দু হাতে পড়িয়ে দিলো কাচা ফুলের গাজরা,কানেও কাচা ফুলের দুল কোমরেও সেই ফুলের তৈরি বিছে।মুখের প্রসাধনী বলতে হালকা পাউডার দিয়ে সিথির ভাজে সিঁদুর দিলো।এরপর শাড়ির সাথে মিলিয়ে মাঝারো সাইজের একটি মেরুন কালার টিপ। সব শেষ করে রজনী হাসি মুখে পরখ করলো অভ্রাকে।
এরপর কিছু একটা ভেবেই মেরুন কালারের লিপস্টিপটা অভ্রার ঠোঁটে একে দিতে দিতে বললো...
"যদিও উষ্ণ ভাইয়ের একটু পেট খারাপ করবে,তবুও লিপস্টিকটা দিচ্ছি,এটা ছাড়া সাজটা কেমন বেমানান লাগছে।"
ঐ মুহুর্তেই হুড়মুড় করে বেখেয়ালি ভাবে রুমে ঢুকতে নিচ্ছিলো প্রচ্ছদ।রজনীর কথাটা কানে যেতেই বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো।দৃষ্টি পড়লো ড্রেসিংটেবিলের বড় আয়নাটায়। যেখানে স্পষ্ট হয়ে আছে ফুলে সজ্জিত অভ্রার মুখখানা। প্রচ্ছদের নিজের করে চাওয়া মানুষটি আজ উষ্ণের জন্য সাজিয়েছে নিজেকে।মুহুর্তের জন্য প্রচ্ছদের দৃশ্যপটে ভাসমান হলো কিছু চিত্র, আর একটু পরেই উষ্ণ কোমল হাতে ছুঁয়ে দেবে অভ্রা নামক ফুলটিকে, আর অভ্রাও লজ্জায় মিইয়ে যাবে ক্ষনে ক্ষনে।ইশশ,লজ্জাবতীটা প্রচ্ছদের হলো না।
ভাবতেই চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেললো প্রচ্ছদ।সে যে আর ভাবতে পারছে না বেশিদূর।ভাবনারা যে তাকে মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দিচ্ছে বারবার।কিন্তু প্রচ্ছদ তো মরতে চায়না,তার অভ্রার মায়া ভরা মুখটা দেখার জন্য হলেও যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতে হবে তাকে।বাচতে তাকে হবেই,না হলে যে মৃত্যুর পরেও অভ্রাকে দেখার আক্ষেপ মিটবে না তার।