তুমি কোন কাননের ফুল

পর্ব - ২২

🟢

তপ্ত রোদের আলোয় থমকে থাকা অভ্রার দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনে থাকা প্রচ্ছদের দিকে।ক্লান্ততায় ঘেরা শরীর এবং মন,কোনোটাই এই মুহুর্তে প্রচ্ছদের উক্ত প্রস্তাব খানা আশা করেনি।

অভ্রার দিক থেকে কোনো প্রকার উত্তর না পেয়ে প্রচ্ছদ আবারও কাতর কন্ঠে প্রশ্ন করলো...

"বলো না অভ্রা??হবে তুমি আমার?আমরা আবার নতুন করে সব শুরু করবো।পুরোনো সব ভুলে,আবার আমরা নতুন করে সংসার সাজাবো।"

অভ্রার উত্তরের অপেক্ষায় উদিত চোখদুটি আজ আবারো অভ্রার কঠোর স্বত্বা কে নাড়িয়ে দেওয়ার তুমুল ঝড় তুলেছে মনে প্রাণে।আজ আবারো নিজের চঞ্চল কিশোরী রূপটার আগমন ঘটতে চাইছে। দুটো বছর আগের মতো আবারও প্রাণ খুলে ফিক করে হেসে দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে...

"এত্তো ইনোসেন্ট কেন আপনি দাভাই??এই জন্যই তো এত্তো এত্তো ভালোবাসি আপনাকে। "

কিন্তু সময় যে তাকে এখন অন্য এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।সে যে এখন আর শুধু নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখা চঞ্চল মনের কথা শুনতে পারবে না।তার সাথে সাথে ভাবতে হবে আরো একটি পাগল পুরুষের কথা।

আজকাল যে প্রচ্ছদকে দেখলেই হুট করে উষ্ণের কথা ভীষণ মনে পড়ে যায় অভ্রার।আজকাল প্রচ্ছদের 'অভ্রা গো 'এর চাইতে উষ্ণের কন্ঠে 'শ্যামা ফুল' ডাকটা বেশি ভালো লাগে।আবার হুট করেই উষ্ণকে হারানোর তীব্র ভয় কাজ করে মনের ভেতর। ঠিক দুবছর আগে যখন জেনেছিলো প্রচ্ছদ তার হবে না, তখন এক মুহুর্তের জন্য যেভাবে বুকটা ভারী লেগেছিলো,এখন তো প্রতি মুহুর্তেই এমন অনুভব হয় উষ্ণকে হারানোর ভয়ে।

ঠোঁটের কোনে প্রতিনিয়তের মতো সেই বিক্ষিপ্ত হাসিখানা ফুটে উঠলো অভ্রার।সেই হাসির সাথেই প্রচ্ছদকে উপহার দিলো আরো একটা পাল্টা প্রশ্ন....

"একটা সময়,,একটা মানুষকে নিয়ে আমি সারাদিন ভাবতাম।অথচ তার চিন্তাতেও আমি ছিলাম না। আজ সেই মানুষটা মুখে হঠাৎ এই কথা কেন?"

"শুধু মুখে নয়,মন থেকে বলছি আজ।জানি না আমি কিছু,কিন্তু আমি ভুল ছিলাম জানি।এতটাই ভুল ছিলাম,যে ঠিক মানুষটা আমার কাছে ধরা দিলো,কিন্তু আমি রাখতে পারিনি।"

"পুরোনো কথা না হয়,নাই বা টানলেন এখন??"

"তুমি তো আজও আমাকে ভালোবাসো,আমি জানি অভ্রা?"

অভ্রা তাচ্ছিল্য হাসলো,

"জানেন তো দাভাই,এই একটা জিনিসই না আজও পরিবর্তন করতে পারলাম না আমি।গত দুটো বছরে কত কিছুই না ছেড়ে দিয়েছি।চঞ্চলতা, উচ্ছ্বাস, বন্ধু, স্থান,,,। কিন্তু এই আপনি মানুষটাকে ভালোবাসাটা ছাড়তে পারিনি।কেন পারিনি বলুন তো? আসলে আপনার সাথে আমার অভিনয়টা ঠিক হয়ে উঠেনি।

এতো এতো ভালোবেসেও আপনাকে পাইনি।হুহ,,,আর আপনাকে না পাওয়ার কারনটাও আমার জানা,ঐ যে,পাবো না যেনেও আশায় আশায় ভালো বেসেই গেলাম।

আমার এতো ভালোবাসা,আপনার হৃদপিণ্ডের চার চারটা অলিন্দের এক কোনেও স্থান পেলো না, ইশশ, কি যে যন্ত্রণা, আপনি পারেন অনুভব করতে সেই যন্ত্রণা? "

হৃদয় পোড়া কথাগুলো অনর্থক হলেও প্রচ্ছদ যেন খুব গভীর ভাবেই অর্থ খুজে পেলো।ক্লান্ত স্বরে বললো....

"তুমি কি আমায় আর চাও না অভ্রা??আমায় আরেকটি বার সুযোগ দিতে চাও না??"

হাসলো অভ্রা,,শান্ত স্বরে বললো...

"আপনাকে না পাওয়ার তীব্র যন্ত্রনায় কাতরাবো।তবুও আর নিজের করে চাইবো না আপনাকে।"

কথা নয় যেন বি*ষ ঢালা হয়েছে প্রচ্ছদের গলায়।এতোটা জ্বলছে কেন?এতোটা?

প্রচ্ছদদের তো এতো কষ্ট হয় না কখনো।এক অভ্রা বুঝি এতটা পরিবর্তন ঘটিয়ে দিলো?এখন কি করবে প্রচ্ছদ?সে যে আজ ভালোবাসার কাঙাল,ভিক্ষা চাইবে??পায়ে ধরবে অভ্রার?তার সঙ্গ দেওয়ার জন্য?

দূর হতে উষ্ণকে এগিয়ে আসতে দেখে যন্ত্রণা লুকানোর প্রয়াশ চালালো প্রচ্ছদ।উষ্ণকে তো বুঝতে দেওয়া যাবে না,অভ্রা যে তাকি ফিরিয়ে দিয়েছে,ভালোবাসাকে আপন করেই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

প্রচ্ছদের দৃষ্টি অনুসরন করে অভ্রাও সেদিকে তাকালো। উষ্ণকে দেখেই ঠোঁটের কোনে প্রশান্‌তিময় হাসি ফুটলো তার।উষ্ণও ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে তাদের কাছে।

গতকাল রাতের পর থেকে আর কথা হয়নি উষ্ণ আর অভ্রার।উষ্ণ ভেবেছিলো এখনো সেই হাওয়া গায়ে থাকবে।কিন্তু অভ্রার হাসি তাকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।মনের সকল কাল কলঙ্ক সময় দুর করে নিজেও হাসলো একগাল।

"জানলেন কি করে, আমরা যে এখানে আছি?"

অভ্রার কথায় আরেকটু চওড়া হাসলো উষ্ণ। উত্তর দিলো...

"ফুলের সুভাষ নিতে নিতে চলে এসেছি।তা হঠাৎ আমায় দেখে ফুলের এমন হাসির কারন?"

"মারাত্মক মনে পরছিলো আপনাকে।"

মেয়েটা আজ লাগাম ছাড়িয়ে কথা বলছে খুব।যেই কথায় সামনে থাকা দুটো পুরুষ দুই রকম অনুভূতিতে সিক্ত হচ্ছে। কেউ বুক ভরা প্রশান্তি, আর কেউ বা যন্ত্রণা।উষ্ণের হাসির বিপরীতে অভ্রা আবার নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলো...

"তা এখন গন্তব্য কোথায়?আবার কুমিল্লা? "

উষ্ণ মাথা নেড়ে বললো...

"উহুম,,গন্তব্য শ্যামাফুল।"

বলতে বলতেই পকেট থেকে রুমাল বের করে অভ্রা ঘামে ভিজে থাকা ছিপছিপে তৈলাক্ত মুখখানি মুছিয়ে দিলো উষ্ণ নিজেই।আজ অভ্রা বাঁধা দিলো না উষ্ণকে।শুধু ক্লান্ত শান্ত দৃষ্টিতে উষ্ণের দিকে তাকিয়ে প্রশান্তির হাসি হাসলো।

"রোদে দাঁড়ালে যে তোমরা?এই জন্যই তো এত্তো ঘেমে যাচ্ছো।বেলি কোথায়?"

"আসছে হাতমুখ ধুয়ে।"

তিনজন মিলেই রোদ থেকে সরে একটা ছাউনির নিচে দাঁড়ালো। উষ্ণ কোমরে দু হাত গুঁজে অপেক্ষা করছে বেলি আসার।

হুট করেই অভ্রা করলো এক অদ্ভুত কাজ।উষ্ণের চোখ থেকে কালো ফ্রেমের রোদ চশমাটা খুলে নিজে পড়লো।এরপর পা উঁচিয়ে উঠে হাত দিয়ে উষ্ণের চুলগুলো হালকা এলোমেলো করে দিলো।

"সবসময় এতো হিরো সেজে থাকার কি আছে?পরে তো লোকে বলবে আমায় মানাচ্ছে না আপনার সাথে।"

অভ্রার কথায় উষ্ণ তার বিশ্ববিখ্যাত হাসি দিয়ে একটু ঝুঁকে বললো.....

"আপনার চোখে মানালেই চলবে,বুঝলেন শ্যামাফুল?"

"শুধুই আমার চোখে??আপনার চোখে মানানো লাগবে না?"

"আমার চোখে তো সেই কবেই মানিয়েছে।তাই তো বারবার বলি...

লোকে পাগল বলুক,মাতাল বলুক,আমি..

তোমার পিছু ছাড়বো না।"

প্রচ্ছদ পাশ থেকে নিরবে তাকিয়ে দেখলো কপোত-কপোতীর প্রেম।কতোটা শুদ্ধতা মিশে আছে অভ্রা উষ্ণের প্রেমে।ধরাছোঁয়ার আকাঙ্খা নেই,না আছে শারীরি কোনো অঙ্গে দৃষ্টি দেওয়ার ইচ্ছে। শুধু মিশে আছে প্রেমিকার বর্ণযুক্ত, তৈলাক্ত, ক্লান্ত মায়াবী চেহারার দিকে একযুগ অনায়াসে তাকিয়ে দেখার প্রত্যাশা আর খয়েরী রঙের ঠোঁট দুটির বিস্তীর্ণ প্রশারণে প্রাণ খোলা হাসি দেখার উচ্ছাস। যেই হাসিতে মিশে থাকে প্রশান্তি, থাকে না কোনো তাচ্ছিল্যের আভাস।

আচ্ছা, এই নব্বই দশকের মতো প্রেমিকযুগলকে কি আলাদা করতে চাওয়া নিতান্তই ঠিক হচ্ছে প্রচ্ছদের?

বেলি আসলো। শুধু হাত মুখ ধুয়ে নয়,গায়ের জামাটায় রক্ত লেগেছে বলে সেটাও কায়দা করে বদলে নিয়েছে।অভ্রা তা লক্ষ্য করে মুচকি হেসে বললো....

"ইন্টেলিজেন্স!"

বেলিও হেসে বললো....

"তোমার থেকেই একটু শিখেছি নতুন মামি।"

"এখনো তোমার মামি হইনি।না হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু খুব বেশি।"

বেলি অবাক হলো না তার কথায়।বরং একটা প্রশাতির নিঃশ্বাস ফেলে উষ্ণের দিকে তাকিয়ে বললো....

"উষ্ণ মামা যতদিন তোমায় বিশ্বাস করবে,ততদিন তুমি তারই থাকবে।কেউই ভাঙতে পারবে না তোমাদের জুটি।আর পরিবার?তা ঠিক সামলে নেবো সবাই মিলে।"

"আমি যে পরিবারের মতের উর্ধ্বে গিয়ে পারবো না বিয়েটা করতে?"

অভ্রার কথা শুনে উষ্ণ পকেটে দুহাত গুঁজে আড়চোখে তাকিয়ে বেলিকে বললো...

"থাক বেলি,,উনাকে এসব বলে লাভ নেই।ম্যাডাম তো আমায় বিশ্বাস করে না, তাই না??"

"বিশ্বাস?? করতে তো মন চায়।কিন্তু ভয় হয়,আবার যদি ঠকে যাই?"

ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দৃষ্টি জোড়া একটা কথা দিয়েই যে কত কথা বুঝিয়ে দিলো,তা বোঝার সাধ্য হয়তো সবার নেই।উষ্ণ নিজের শক্তপোক্ত হাত খানা এগিয়ে ধরে বললো....

"তুমি যতই দামী জিনিস হও না কেন,ভুল মানুষের হাতে পড়লে তুমি মূল্যহীন।

পার হয়ে এসেছোই যখন,আরেকটি বার নতুন মানুষকে বিশ্বাস করেই দেখো??"

অভ্রা শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে হুট করেই ফিক করে হেসে নিজের হাতটা উষ্ণের হাতে রাখতে রাখতে বললো...

"কাব্যিক মশাই,আমার যে খুব খিদে পেয়েছে।এরপর তো আপনার রোমাঞ্চকর কথাগুলো শুনার জন্য বেচে থাকবো না। "

উষ্ণ হেসে শক্ত করে অভ্রার হাত ধরে বললো...

"চলুন আমার রাণী, আমার রোমাঞ্চকর কথাগুলো সারাজীবন ধরে শোনানোর জন্য হলেও আপনাকে এখন খাওয়ানো দরকার।"

উষ্ণ প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে বললো....

"বাড়ি ফিরবি তো নাকি দোকানে যাবি??চল রেস্টুরেন্টে, কিছু খেয়ে দেন বের হবো।"

প্রচ্ছদের আর মন চাইলো না উষ্ণ আর অভ্রাকে একসাথে দেখতে।তাই আস্তে করে বললো.....

"উহুম।বেলিকে নিয়ে যা তোরা।আমার দোকানের জন্য লেইট হচ্ছে, এখনই চলে যাবো।"

"আরে একই পথেই তো নাকি??একটুই তো লেইট হবে।"

"না রে উষ্ণ। তোরা টাইম নে,আমি বেরোচ্ছি,না হয় লেইট হয়ে যাবে এবার।"

আর কথা বাড়ালো না উষ্ণ। অভ্রা আর বেলিকে নিয়ে কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলো।পেছন থেকে প্রচ্ছদও ধীর পায়ে হাটা ধরলো নিজ অজানার গন্তব্যে। ব্যস্ত নগরীর জনবহুল রাস্তাটাও যেন আজ শূন্য লাগছে। অনেকের মাঝেই যে একা।

কারনটা তার অজানা নয়,একটু আগেই যে অভ্রা তাকে শান্ত ভাবে প্রত্যাক্ষান করেছে।দূর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে আপন মনেই বিরবির করলো প্রচ্ছদ...

"তোমার জন্য আমার মৃ*ত্যু হোক,

তবুও আমার চোখের সামনে তুমি না হও।

অভ্রা গো,আমি যে এবার তোমায় সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি। "

তুমি কোন কাননের ফুল গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক রোমান্টিক গল্প