তুমি কোন কাননের ফুল

পর্ব - ২০

🟢

স্রোতের টানে সময় কখন যে চলে যায়,তা কেউই বলতে পারে না।এই যে,পুরো একটা চৈত্র মাসের কতগুলো দিন কেটে গেলো অভ্রার এই বাড়িতে।আজ ২৩শে চৈত্র। সাতদিন পরেই চৈত্রসংক্রান্তি।অভ্রা চেয়েছিলো এইদিনটা নিজের পরিবারের সাথেই কাটাতে।তবে এই বাড়ির সবাই তা মানলো না।উল্টে বললো,অঙ্গকেও এই বাড়িতেই নিয়ে আসতে।প্রবনদের বাড়িতে বেশ জাঁকজমক ভাবেই এই দিনটি পালন করা হয়।

তাই অভ্রাকেও থেকে যেতে হলো এখানেই।বাড়িতে অনেক আত্মীয়ে ভরপুর।তোড়জোড়ও চলছে বেশ দারুন ভাবেই।

বাড়ির অন্দরমহল থেকে নারী কন্ঠের কান্নার আওয়াজ আসতেই বাগান থেকে ছুটে এলো অভ্রা।তার কোলে রজনীর ছোট্ট মেয়ে রাজভী।ঘরে গিয়ে দেখলো বেলি কাঁদছে। বুকের সব কষ্ট মিশিয়ে কাঁদছে মেয়েটা।তার কান্নাতেই ভীড় জমেছে ঘরটায়।হুট করেই এমন কান্নার কারন খুঁজে পেলো না কেউই।প্রীতি ব্যস্ত হলো মেয়েকে নিয়ে।সবাই উৎফুল্ল চোখে চেয়ে জানতে চাইলো বেলির হুট করে এমন কান্নার কারন।বেশ জোর করা হচ্ছে বেলিকে,কারনটা বলার জন্য।

উষ্ণ নেই আজ,অফিসের কাজে কুমিল্লা গিয়েছে।মাঝেমধ্যেই তাকে যাওয়া লাগছে এখন অফিসে।ভোরে গিয়ে আবার কাজ সেড়ে চলে আসে সে।লং জার্নি হলেও সে ফিরেই আসে।,,অভ্রা বিচক্ষণ দৃষ্টিতে চাইলো বেলিকে।

সবার জোরাজুরিতে বেলি যখন বলছিলো...

"আ্ আমি একটা.... "

এটুকু বলতেই অভ্রা দ্রুত এগিয়ে আসতে আসতে বেলিকে থামিয়ে বললো...

"ওমা বেলি,,একটা নেলপলিশ নিয়ে মামি দুটো কথা শুনিয়েছি বলে এভাবে আমার নামে সবার কাছে নালিশ দিচ্ছো?"

অভ্রার কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে।এমন কি বেলি নিজেও।

অভ্রা গিয়ে বসলো বেলির সামনে।সকলের দৃষ্টিগোচর করে ইশারায় বেলিকে কিছু একটা বললো।হয়তো বেলিও তা বুঝলো,তাই তো চুপ করে রইলো।প্রভাতি এগিয়ে এসে অভ্রাকে প্রশ্ন করলো...

"তুমি ওকে কথা শুনিয়েছো??"

অভ্রা মাথা নুইয়ে ফেললো, আস্তে করে বললো...

"ইয়ে,,মানে,,বেলি আমার থেকে একটা নেলপলিশ চাইছিলো। কিন্তু ওটা আমার খুব পছন্দের একটা নেলপলিশ। ত্ তাই আমি ওকে ওটা নিতে বারণ করেছি।ও বেশি বায়না করাতে আমি ওকে একটু ব্ বকেছি।এই জন্যই বেলি ক্ কাঁদছে।"

প্রচ্ছদের যেন বিশ্বাস হচ্ছে না অভ্রা একটা সামান্য নেলপলিশের জন্য এমনটা করতে পারে।আর যতটুকু জানে বেলির সাথে অভ্রার অতটাও ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব নেই যে বেলি তার কাছে নেলপলিশের বায়না ধরবে।বিষয়টা প্রীথুলার ক্ষেত্রে হলে নির্দিধায় মানা যেত।

প্রীথুলা যেন সুযোগ হাওয়ায় পেয়েছে।তেতে উঠে প্রীতির সামনে এসে বললো...

"এবার??এবার এই মেয়েকে কিছু বলবেন না??খুব তো আমায় কথা শোনান,যে আমি ভালো না,আপনাদের কাউকে দেখতে পারিনা।এখন এই মেয়ে??বিয়ে হয়ে না আসতেই তো আপনার মেয়েকে কথা শুনিয়ে দিলো।"

প্রীতি আজ আর নিজের রাগকে দমিয়ে রাখলো না।টেনে তুলে অভ্রার গালে কসিয়ে একটা থাপ্পড় মারলো।অভ্রা ছিটকে সরে গেলো দূরে।প্রীতি চেচিয়ে বললো...

"তোমার সাহস কি করে হয় আমার মেয়েকে কথা শোনানোর?.দুদিন এসে পারো নি, মাথায় উঠে বসেছো সবার??কি ভেবেছো তুমি?উষ্ণ তোমাকে মাথায় করে রাখছে বলে যা ইচ্ছে করবে??বাজে মেয়ে কোথাকার,,এই জন্যই বুঝি প্রচ্ছদের সাথে বিয়ের জন্য রাজি হওনি? প্রচ্ছদ তো তোমায় উষ্ণের মতো এমন মাথায় তুলে নাচতো না তাই না?লজ্জা লাগে না এতো কিছুর পরও আমাদের সাথে এখানে এসে থাকতে?"

অভ্রা মাথা নিচু করে শুনলো সবটা।প্রতিত্তোরে কিছুই বললো না।আর না ফেললো চোখ থেকে একফোটা পানি।আত্মীয়রা সবাই নিজেদের মধ্যে অভ্রাকে ছি ছি করতে লাগলো।কেউ কেউ তো আবার প্রনতিকে তামাশা করে জিজ্ঞেসই করে বসলো...

"এ কেমন মেয়েকে আনছো গো নিজের ছেলের বৌ করে প্রনতি? এতো বাজে মেয়ে,,ছি ছি ছিহ।একই পরিবারের এক ছেলের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে আরেক ছেলের গলায় ঝুলছে?"

প্রনতি লজ্জায় ঘৃণায় অভ্রার দিকে একবার তাকিয়ে মুখ সরিয়ে নিলো।অভ্রাকে নিয়ে চর্চা করতে করতে বেলির কান্নার কথাটা বেমালুম ভুলেই বসলো যেন সবাই।মেয়েটাও যে কান্না থামিয়ে অবাক হয়ে দেখে যাচ্ছে অভ্রাকে।হুট করে কেন সে বেলির দোষটা নিজের গায়ে নিচ্ছে,তাই তো বুঝে উঠতে পারছে না বেলি।কিন্তু,তাকে বাচাতে গিয়েই যে অতীতের ঘনঘটায় জড়িয়ে পড়ছে আবার অভ্রা।শুধু জড়িয়েই পড়ছে না,,নিকৃষ্ট ভাবে সবার চোখো খারাপ হচ্ছে নিজেই।

প্রীতি ক্ষোভে চেচিয়ে বললো...

"এখনো কেন তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো?যাও এখান থেকে।"

অভ্রা নীরবেই হাঁটা ধরলো।যেতে যেতে একবার তাকালো প্রচ্ছদের দিকে।ঠোঁটের কোনে ফুটিয়ে তুললো এক অদ্ভুত যন্ত্রণাময় হাসি।প্রচ্ছদ তীব্র দৃষ্টিতে চাইলো সেই হাসি।প্রীতি তা দেখে আবারো চেচালো...

"এই মেয়ে,তুমি কি গো হ্যা??আমার ভাইয়ের দিকে ওভাবে তাকিয়ে হাসছো কেন??এবার আবার ওকে তোমার জালে ফাঁসাতে চাইছো নাকি।ছিহ,,,একটা পুরুষ দিয়ে হয়না তোমার??"

কথাটা বুকের ভেতর যেন পাথর ছুঁড়ে মারার মতো ঠেকলো অভ্রার।ঠোঁটে হাসিটা রেখেই চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেললো।

কথাখানি যে প্রচ্ছদেরও খুব একটা ভালো লাগলো না।তার অভ্রা তো এমন নয়।তাহলে কেন শুধু শুধু ওকে এসব বলছে সবাই?,,

প্রীতির দিকে তাকিয়ে প্রচ্ছদ শুধু এটুকুই বললো...

"প্লিজ,চুপ কর দিদি।"

বলতে পারলো না মনের কথা গুলো। বলতে পারলো না,অভ্রার এই হাসি আমাকে ফাঁসাতে নয়,বরং নীরবে এটা বোঝাচ্ছে,,,

"আপনি খুশি হয়েছেন তো দাভাই?এই যে সবাই আপনার দোষে আমায় দোষী করছে?"

অভ্রা আর থামলো না।বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।ধীরে ধীরে সবাই বেরিয়ে গেলো সেই কক্ষ ছেড়ে,তবে অভ্রাকে নিয়ে চর্চাটা যেন সরলোই না তাদের মুখ থেকে।সত্যি বলতে মানুষ কারো ছোট্ট একটা খুত খুজে পেলে তাকে নিয়ে চর্চা করতে আরো মসলা জোগায়,তবে কারো ভালো শুনলে তার বিন্দু পরিমান চর্চাও হয় না।

সবাই বেরিয়ে যেতেই উর্মি আর রজনী এসে বসলো বেলির পাশে।রজনী জিজ্ঞেস করলো উর্মিকে...

"উর্মি,,তারমানে উষ্ণ ভাইয়ের বউও প্রচ্ছদভাইয়ের বউয়ের মতোই পড়বে?"

উর্মি বললো..

"জানি না,,,কিন্তু বৌমনি তো এমন নাহ,,"

বেলি এবার উত্তর দিলো...

"নাহ,,,এই মামি মিথ্যা বলেছে।আমার সাথে ওর কোনো সমস্যাই হয়নি কোনো নেলপলিশ নিয়ে।ও আমার কথা আটকানোর জন্যই মিথ্যা বলেছে। কিন্তু হুট করে এমনটা বলার কারন কি??"

উর্মি আর রজনী বেলির কথা শুনে অবাক।উর্মি বললো...

"কিহ,তারমানে সবাই বৌমনিকে শুধু শুধুই ভুল বুঝছে??আমি এক্ষুনি গিয়ে সবার সামনে সবটা বলবো।"

উর্মি উঠতে নিলেই রজনী তাকে বাঁধা দিলো..

"নাহ, এখন যাস না।অভ্রা এমনি এমনি কিছু করেনি।এখন থাক।আমরা পরে ওকে জিজ্ঞেস করবো বিষয়টি নিয়ে।"

বেলির চোখ ছলছল করে উঠলো৷..

"আমার জন্য ও মায়ের হাতে থাপ্পড় খেলো?"

রজনী করুন কন্ঠে বললো...

"থাপ্পড়ের থেকেও সবার কথাগুলো যে বিষের মতো লেগেছে মেয়েটার কাছে।"

--------

উষ্ণ এসেছে রাতে।সে আসার পরেই সবাই মিলে রাতের খাবার সেরেছে।লক্ষ্য করলো বাড়ির বড়রা কেমন অভ্রাকে এড়িয়ে চলছে।অভ্রা খাবার সার্ভ করতে চাইলে নিচ্ছে না।কিছু বললে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে,কথা বলছে না।এমনকি প্রনতি,প্রভাতিও তার সাথে একই রকম ব্যবহার করছে।খাওয়ার টেবিলে অভ্রা যখন ঘুরে ঘুরে সবাইকে তরকারি পরিবেশন করছিলো,তখন প্রীথুলার প্লেটে দিতে গেলেই সে প্লেটটা একটু সরিয়ে ফেললো,ঢং করে জোর গলায়,শুনিয়ে শুনিয়ে বললো...

"উহুম,,,আমি বে*শ্যাদের হাতে কিছু খাই না।"

সবার খাওয়া যেন নিমেষেই থেমে গেলো। লজ্জায় অভ্রার কান থেকে গরম ধোঁয়া বের হতে লাগলো।ছিহ,,প্রনব বাসু,নন্দন বাসুর সামনে হুট করে প্রীথুলা এমন একটা কথা বলে ফেলবে,তা কেউই বুঝতে পারেনি।বাড়িতে না থাকায়,তারা কেউই কিছু জানে না আজকের বিষয়ে।

উষ্ণ খাওয়া ছেড়ে উঠে দাড়ালো।অভ্রার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো...

"কি হয়েছে, আমায় বলো?"

অভ্রা ঘনঘন দুদিকে মাথা নাড়ালো।উষ্ণ অভ্রাকে সরিয়ে প্রীথুলার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো...

"ওকে এই কথা কেন বলেছো তুমি?"

প্রীথুলা মুখের উপর বললো..

"যাকে যেটা বলার দরকার, সেটাই বলেছি আমি।"

উষ্ণের রাগ চওড়া হতে লাগলো,,ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো..

"কেন বললে তুমি এটা ওকে?,কি করেছে ও,বলো কি করেছে?"

উষ্ণের হুঙ্কারে একটু যেন ভয় পেলো প্রীথুলা।তাইতো চুপ করে তাকিয়ে রইলো, কিচ্ছুটি বললো না।তবে সে কিছু না বললেও,, আত্মীয়দের মধ্যে এক মহিলা বলে উঠলো...

"কি করেছে তুই জানিস না উষ্ণ? আলাপ দিয়েছিলো প্রচ্ছদের জন্য,এই মেয়ে ওকে ফিরিয়ে দিয়ে তোর গলায় ঝুলেছে।"

উষ্ণ শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিয়ে বললো...

"হ্যা তো??কি হয়েছে এতে??ওর প্রচ্ছদকে পছন্দ নাই বা হতে পারে।আর ও আমার গলায় ঝুলেছে মানে?কি বোঝাতে চাইছেন?আমি নিজে ওকে পছন্দ করেছি আমার জন্য। আর সবটা জেনেই করেছি আমি। "

আরো কিছু বলতে নিলেই অভ্রা তাকে আটকে বললো...

"থামুন আপনি।।কেন শুধু শুধু এতো কথা বলছেন আপনি?এরা যা বলছে বলতে দিন না।।প্লিজ আপনি রেগে যাবেন না।"

হঠাৎই উষ্ণের ভাব পরিবর্তন হয়ে গেলো।অভ্রার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে কাতর কন্ঠে বললো...

"ফুল?তুমি কষ্ট পাচ্ছো তাই না খুব??কষ্ট পাচ্ছো তুমি?এদের কথায় কষ্ট পাচ্ছো তুমি?"

উষ্ণের ব্যতি ব্যস্ততা দেখে অভ্রা শক্ত কন্ঠে বললো..

"আমি কষ্ট পাচ্ছি না।।পাচ্ছি না আমি কোনো কষ্ট। কেন কষ্ট পাবো আমি??সবাই তো ঠিকই বলছে।আপনি কেন বুঝতে পারছেন না??"

প্রীথুলা আবার ঠোট বেকিয়ে বললো....

"উহ,,ওর আবার কষ্ট।,, পথে ঘাটে কত নাগড় পরে আছে তার।ঐ যে ঐদিন,,ঐ ছেলেটা,,কি যেন তার নাম,,ওহ,টুটুল।।ঐ ছেলেটাও তো এই মেয়েকে নাকি অনেক ভালোবাসে..."

আর কিছু বলার আগেই উষ্ণ প্রীথুলার দিকে তাকিয়ে আবার চেচিয়ে উঠলো...

"হ্যা,ভালোবাসে।পৃথিবীর সবকটা পুরুষও যদি আমার ফুলকে ভালোবাসে তবুও আমার কোনো সমস্যা নেই। আর যেখানে আমি এটা বুঝে খুশি আছি,সেখানে তোমাদের সবার এটা নিয়ে এতো সমস্যা কেন??"

বড়বড় করে কয়েকটা শ্বাস নিয়ে উষ্ণ আবার তাকালো অভ্রার দিকে। ভ্রু কুঁচকে শক্ত কন্ঠে বললো...

"তোমার কষ্ট হচ্ছে না তাই তো??তাহলে যাও রুমে যাও।"

অভ্রাও তেজ দেখিয়ে বললো..

"আমি আমার বাড়ি যাবো"

উষ্ণ চোখ বড়বড় করে দাঁতে দাঁত খিঁচে বললো....

"উলটোপালটা কথা বললে একদম হাত পা ভেঙে ঘরের ভেতর বসিয়ে রাখবো।সো, আর একটা কথাও না,,যাও তুমি.."

উষ্ণের রাগের উর্ধ্বে গিয়ে রজনী একটু সাহস করে বলতে নিলো..

"উষ্ণ, ও খেয়ে নিক,তারপর না হয়...."

"লাগবে না ওর খাওয়া।একবেলা না খেলে কিছু হবে না।যাও রুমে যাও।।যাও বলছি। "

হার মানলো অভ্রা।সবার সামনে দিয়ে চলে গেলো নির্ধারিত রুমে।উষ্ণও আর একটি কথা না বলে বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে নিলো। নিজের ঘরে যাওয়ার আগে ফিরে এসে একবার প্রীথুলার দিকে রক্ত চোখে তাকিয়ে বললো...

"বড়ভাইয়ের বউ হিসেবে,তোমাকে সম্মান করি, বৌদি বলে ডাকি।তবে আমার ফুলকে নিয়ে ভবিষ্যতে এমন কিছু বলার আগে নিজের দিকে তাকিয়ে নেবে একবার।আর যদি কখনো আমি আমার ফুলের সম্মন্ধে এমন কথা শুনেছি,,একদম জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো বলে দিলাম। "

বলেই হনহনিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ঠাস করে দরজা আঁটকে দিলো উষ্ণ।

সবসময় শান্ত বুদ্ধিদিপ্ত, হাসি খুশি,উৎফুল্ল থাকা পুরুষটাও যে রেগে যেতে পারে তা ধারনার বাইরে ছিলো সবার।তার উপর এমন ভয়ঙ্কর রাগ,তা তো কল্পনাতীত সবার।

----

সেদিন রাতে বৃক্ষ এসে বেলিকে বললো অভ্রা তাকে ছাঁদে ডাকছে।বেলিও সিঁড়ি বেয়ে ছাঁদে উঠলো।পুরো ছাঁদটা অন্ধকার হয়ে আছে।এদিক ওদিক তাকাতেই একটু দুর থেকে অভ্রার কন্ঠ ভেসে এলো...

"আমি এদিকটায় আছি।"

বেলি তাকাতেই ছায়া দেখে বুঝলো অভ্রা সেখানেই।

অভ্রার কন্ঠ শুনে সেদিকে তাকালো প্রচ্ছদও।অনেক আগেই সে ছাঁদে এসে এককোনায় রেলিংয়ের উপর পা ঝুলিয়ে বসেছে অশান্ত মনটাকে একটু প্রশান্তি দেওয়ার লক্ষ্যে।

অভ্রা কখন এসেছে জানা নেই তার।কন্ঠ শুনেই তাকালো সেদিকে।অভ্রাও যে তাকে এখনো দেখেনি তা জানে প্রচ্ছদ। বেশ আড়ালেই আছে সে।

বেলি গিয়ে অভ্রার পাশে ছাঁদে বসে রেলিংয়ে হেলান দিলো।ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে অভ্রা ২৫ পিসের এক সেট নেলপলিশ এগিয়ে দিয়ে বেলিকে বললো...

"এটা তোমার জন্য। "

বেলি অবাক হয়ে হাতে নিয়ে বললো..

"এটা??"

ফ্ল্যাশের আলোয় অভ্রার মুখের মিষ্টি হাসিটা দেখলো বেলি।এতো কিছুর পরেও মেয়েটা হাসছে??কিভাবে পারছে??

"তখন নেলপলিশের বাহানা দিলাম না?তাই ভাবলাম তোমার জন্য কটা নেলপলিশ নিই।।এই জন্যই আনিয়েছি।"

বেলি আর কিছু বললো না।হাতের বক্স টা পাশে রেখে দিলো।অভ্রা আকাশের পানে দৃষ্টি দিয়ে বললো...

"ঘুম পাচ্ছে তোমার??না পেলে একটা গল্প বলবো তোমায়।শুনবে??"

"কিসের গল্প?"

"এমনিই পড়েছিলাম কোথাও,মনে নেই।তবে কাহিনি মনে আছে।ইচ্ছে করছে বলতে তোমাকে।শুনবে?"

"আচ্ছা বলো?"

অভ্রা মুচকি হেসে বড় একটা নিশ্বাস নিলো।এরপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো...

"তোমার মতোই সদ্য কলেজে পা রাখা ঐশি।হুট করেই প্রেমে পরলো তার ভাইয়ের এক বন্ধুর। রোজ দেখতো,মিটিমিটি হাসতো,নির্মল তাকিয়ে থাকতো।এভাবেই চলছিলো বেশ,কল্পনার বাইরে গিয়ে একদিন সেই তার সাথে কথা বললো।প্রীতম যথেষ্ট ভালো।দেখতে,শুনতে,ইনকামের দিক দিয়েও মেনে নেওয়ার মতো।চলতে চলতে ঐশি আর প্রীতমের বন্ডিংটা এতো ভালো হয়ে গেলো,বলার বাইরে।চঞ্চল ঐশি,সারাটাক্ষন ভাবতো তার প্রীতমকে নিয়ে।বান্ধবীদের মাঝে প্রেমিক বিষয়ক কথা উঠলেই ঐশি গর্ব করে বলতো,আমার প্রীতমের মতো লয়াল ছেলে পাওয়া মুশকিল। ও আমার অনেক কেয়ার করে। বান্ধবীরা তখন হিংসায় জ্বলতো,তাদের বয়ফ্রেন্ড গুলো এমন না কেন?

প্রেমে কোনো ব্যাডটাচ ছিলো না।সত্যি বলতে প্রীতমের মধ্যে ঐ রকম কোনো অঙ্গভঙ্গিই দেখেনি ঐশি,ওর দৃষ্টি ছিলো সব সময় নির্মল।ঐশি বুঝলো,সে ভীষণ ভাবেই ভালোবেসে ফেলেছে প্রীতমকে।

একদিন প্রীতম ফোন করে বললো,তার নাকি চার বছরের একটা সম্পর্ক আছে।সে ঐ মেয়েকে ছাড়তে পারবে না।আর সে ঐশিকেও ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে।ঐশি বুঝতে পারছিলো না, কি করবে সে।প্রীতমের কান্না সহ্য হয়না ঐশির,,নিজের ভেতরের কষ্ট লুকিয়ে সে হেসে প্রীতমকে জানালো,সেও নাকি মজাই করছিলো এই কটা দিন।ঐদিনই প্রীতমকে সুন্দর করে বলেছিলো,আর যোগাযোগ রাখা ঠিক হবে না।কিন্তু তা মানলো না প্রীতম,,কান্না করে ছোট্ট কিশোরীর মন গলিয়ে ফেললো।তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি তখনও।প্রীতম কথার জালে বেশ ফাঁসাতে পারে।যার দরুন, প্রীতম অন্যকারোর জানার পরও ঐশি রোজ তাকে বলতো ভালোবাসি, ভালোবাসি।,,প্রীতমও ক্লান্ত স্বরে বারবার শুনতে চাইতো সেই শব্দখানা।

একদিন প্রীতম হুট করেই কান্না করে আবদার ছুড়লো সে একটিবার জড়িয়ে ধরতে চায় তাকে।মেয়েটা না চাইতেও বাধ্য হলো,শুধু প্রীতমের ভালোর জন্য। সে একটু শান্ত হবে এই জন্য।,,

কিন্তু সেদিন প্রীতম শুধু জড়িয়ে ধরেই শান্ত হয়নি,বরং মতের বিরুদ্ধে গিয়েই ওষ্ঠে ওষ্ঠ মেলালো ঐশির।ওটাই ছিলো তাদের প্রথম এবং শেষ ছোঁয়া। এরপর থেকেই সরে যেতে লাগলো প্রীতম।কেন জানা নেই।ঐশিকে উন্মাদ করে নিজেই একদিন বললো, তার প্রেমিকা চায় প্রীতম যাতে ঐশিকে রাখী পরিয়ে নিজের বোন বানিয়ে নেয়।ঐশি সেবারও প্রীতমের কান্নায় ভুললো। বুকের ভেতর পাহার সমান কষ্ট রেখে রাখী পড়লো তার হাত থেকে।যাকে নিয়ে একটা সময় স্বামী নামক সম্পর্কটার স্বপ্ন দেখতো,তাকেই এক নিমেষে নিজের ভাই বানাতে হলো।পৃথিবীর মধ্যে শুদ্ধ ভাইবোনের সম্পর্কটাকে কলঙ্কিত করে ছাড়লো তারা।ঐশি প্রীতমকে সুখী দেখতে চায় বলে,আর প্রীতম নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে সুখী থাকতে চায় বলে।

সেদিন সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও যেন কিচ্ছু শেষ হয়নি।প্রীতমের সেই প্রেমিকা ঐশিকে মেসেজ করলো কয়েকটা,,যাতে ছিলো কিছু নিকৃষ্ট গালি,কয়েকটা অভিশাপ।

ঐশি উত্তর দিলো না ঐ মেয়ের। শুধু সবটা দেখালো প্রীতমকে।ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই প্রীতমের ভালো থাকার রূপটা পরিবর্তন হয়ে গেলো।সে সেদিন বললো,তার জীবন নাকি শেষ হয়ে যাচ্ছে এই ঐশির কারনে।ঐশিই নাকি দায়ী তার আর তার প্রেমিকার মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য।

সেদিনের পর আর কথা হয়নি তাদের।দিনে দিনে নানা ভাবে জানতে পারলো, প্রীতম বহু নারীদেহে আসক্ত।ঠিক তখনই ঐশি বুঝলো সেও ছিলো প্রীতমের একটা টোপ মাত্র। আর সহ্য হলো না ঐশির।ডিপ্রেশন মেয়েটাকে এক জলন্ত লাভায় পরিনত করলো,,ভেবে নিলো,নিকৃষ্ট প্রীতমটাকে আর এই পৃথিবীর আলো দেখতে দেওয়া যাবে না।করলোও তাই।বেশ কাটখর পুরিয়ে একজনকে দিয়ে ওর খাবারে বি*ষ মেশালো।আর এরপরই প্রীতমের ভবলীলা সাঙ্গ।

ঐশি কি কোনো ভুল করেছিলো বেলি?? "

পুরো গল্পটা বেশ মনোযোগ দিয়ে শোনার পর বেলি উত্তর দিলো...

"নাহ,,ঐশি কোনো ভুল করেনি।কিন্তু আ্ আমি যে তা পারবো না নতুন মামি?"

তুমি কোন কাননের ফুল গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক রোমান্টিক গল্প