প্রায় দেরঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে নামকরা এক ধর্মস্থানে এসে পৌছালো উষ্ণরা সবাই।মা শান্তি কালির মন্দির এটা।এই পুজোটা হয় গভীররাতে।আর এখন বাজে প্রায় সাড়ে আটটা।লোকজন আছে অনেক।তবে ধারনা করা যায় পূজো শুরু হলেই আরো বৃদ্ধি পাবে তার পরিমান।
মায়ের প্রতিমার মুখদর্শন করতেই অভ্রার শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো।মায়ের নির্মল চোখগুলো যেন কিছু বলে অভ্রাকে।কিন্তু অভ্রা তা বুঝতে পারে না।তাকিয়েই থাকে অভ্রা,কেন রইলো জানা নেই।সামনে থাকা প্রতিমাটিকে শুধু মাত্র মাটির তৈরি বস্তু হিসেবে মেনে নিতে পারছে না সে,মনে হলো সেখানে কেউ আছে। প্রাণবন্ত কেউ,অভ্রাকে সে হাতছানি দিয়ে ডাকে।জানান দেয় অভ্রা অপবিত্র। কেন এমন হয়?কেন এমন হচ্ছে এখন?
চারিদিকে মঙ্গল ঘন্টার ঢং ঢং শব্দ,মানুষের গিজাগিজির শব্দ,এসব কিছুই যেন অভ্রার কানে যাচ্ছে না।একটু দূর থেকে উর্মি,রজনী,বেলিও তাল মিলিয়ে বিভিন্ন সম্মোধনে তাকে ডেকে যাচ্ছে,তবুও যেন সে কিছুই শুনতে পারছে না।আশপাশের লোকজন একটু বাকা নজরে তাকিয়েছে বটে।তাতেও যেন অভ্রার নড়চড় নেই।এক দৃষ্টিতে সে তাকিয়েই আছে সে সামনে থাকা শান্তিকালী মায়ের দিকে।
মন্দিরের পুরোহিত এসে কপালে থাকা টিপের উপরে একটা ছোট্ট লাল আশীর্বাদ টিকা পড়িয়ে দিলো অভ্রাকে।আলতো হেসে জিজ্ঞেস করলো...
"মায়ের রূপ দর্শনে মত্ত আছো মা?ঐ অপরূপ রূপের মায়ায় আটকালে যে আর বেরিয়ে আসা যায় না মা,,সে যে অলৌকিক, অসামান্য এক শক্তি আকৃষ্ট করে রাখে মানবকে।মায়ের মায়ায় আটকানো, সেতো খুবই ভালো কথা.."
শুনতে বোধয় পেলো অভ্রা,বুকের ভেতর কেমন যেন উতলা হয়ে উঠলো তার।দৃষ্টি তবু সরলো না মায়ের মুখশ্রী থেকে।উতলা কন্ঠেই বলে উঠলো...
"ভ্ ভয়, ভয় হচ্ছে খুব।।।ভয় হচ্ছে আমার,,ম্ মা,মাকে আমি ভয় পাচ্ছি,,খুব ভয়,,,ভয়....."
অভ্রার এমন কান্ড দেখে একটু দূর থেকে ছুটে এলো প্রভাতি আর প্রনতি।অভ্রাকে হালকা ধাক্কা দিতেই সে থেমে গেলো।প্রভাতি উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করলো....
"কি হলো,অভ্রা??এই, ঠিক আছো তুমি??ভয় পাচ্ছো কেন??দেখি,,এদিকে তাকাও..."
অভ্রা ঢোক গিললো।ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো সে।শাড়ির আচলটা টেনে নিজের গা জড়িয়ে নিলো সে। প্রভাতী উদ্ধিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো...
"কি হলো, ঠিক আছো?খারাপ লাগছে??"
অভ্রা মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো।আস্তে করে বললো...
"শীত লাগছে খুব।"
প্রভাতীরা লক্ষ্য করলো মেয়েটার সারা শরীরে কাটা দিয়ে উঠেছে।মন্দিরের সামনে থেকে সরে এসে পাশে একটা খোলা জায়গায় গেলো তারা।লোকজন বসার জন্য আগেই সেখানে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে ফ্লোরটা।অভ্রা সহ বাকিরাও সেখানে বসলো।রজনীরাও এলো সেখানটায়।উষ্ণ প্রচ্ছদ কাউকেই দেখা যাচ্ছে না,,কে জানে দুজন মিলো কোথায় গিয়ে বসে আছে।উর্মি ফোন করে সব বলতেই ছুটে এলো দুজন।
ঘামছে অভ্রা,,,এই শীত তো এই আবার গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হচ্ছে। সবাই কিছুটা চিন্তিত এটা নিয়ে।পাশে থাকা বড় খাচাওয়ালা ফ্যানটা চালিয়ে দিলো প্রচ্ছদ।উষ্ণ পানি এনে দিলো তাকে।একটু পানি খেয়েই অভ্রা বললো...
"আমি ঠিক আছি।তোমরা এতো চিন্তা করো না।এটা নতুন না।কালীমায়ের সামনে আসলেই আমার ভয় হয়।কেন হয় তা জানি না আমি,,এই জন্যই.."
নয়না হাত বুলিয়ে দিলো অভ্রার মাথায়,,,বললো...
"এসব কিছু না মা।মনের ভুল তোমার।কিচ্ছু হবে না,,এখন স্বাভাবিক হও,আমরা সবাই তো আছিই হুম??সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অভ্রা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। প্রনতি রজনীর দিকে তাকিয়ে বললো...
"আচ্ছা, তোরা সবাই এখানে বস,,আমরা আসছি।প্রীতি ওদিকে একা একা পূজোর জোগার করছে,একা এতো কিছু পারবে না ও।।আর উষ্ণ বাবা,,এখন বেশি দুরে যাস না তোরাও।বৌমার কাছেই থাকিস।"
উষ্ণ রাজি হলো।প্রচ্ছদও আর কোথাও গেলো না।প্রীথুলাকে কোথাও না দেখে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো একটু দূরেই দাড়িয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত সে।তাকে আর ডাকার প্রয়োজন বোধ করলো না সে।থাক,সময় হলে নিজেই ফিরবে।
-----
রাতের বাজে ১২:৩০।।।ইতোমধ্যে সকলেই প্রসাদভোগ গ্রহন করে নিয়েছে। মানুষের সমাগম বেড়েই চলেছে।সবাই সবার মতোই আছে।অভ্রা??ফ্লোরেই কুঁজো হয়ে শুয়ে আছে প্রনতির কোলে মাথা রেখে।চোখ বুজেঁ থাকলেও ঘুম গভীরভাবে কাবু করতে পারেনি তাকে।প্রনতিরাই জোর করে শুইয়েছে একটু ভালো লাগবে বলে।প্রনতি স্বহস্তে মাথায় হাত বুলিয়েও দিচ্ছে তার।উষ্ণ আর প্রচ্ছদ প্রথম থেকেই একসাথে আছে।এই যে এখনো তাই।একটু আগেই বেরিয়েছে দুজন মিলে।এখন মন্দিরে ঢুকে নিজেদের পরিবারের কাছে আসতে নিলেই থেমে গেলে উষ্ণ। তা দেখে প্রচ্ছদ জিজ্ঞেস করলো
"কিরে,,থামলি কেন?চল??"..
" ওয়েট."
বলেই উষ্ণ উলটো আরেক দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।তা দেখে প্রচ্ছদও সেদিকে এগোলো।উষ্ণ গিয়ে দাঁড়ালো একটা ছেলের পাশেই।ছেলেটা নিজের পাশে কাউকে লক্ষ্য করতেই তাকালো উষ্ণের দিকে। উষ্ণ আলতো হাসলো,তার বিপরীতে ছেলেটাও হাসলো।উষ্ণ দৃষ্টি সামনে রেখেই জিজ্ঞেস করলো...
"কি ভাই??মনে ধরেছে??"
ছেলেটা এবার বিস্তর হাসলো।মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোঝালো,,উষ্ণ জিজ্ঞেস করলো...
"কোনটা?"
"ঐ যে সাদাশাড়ি।ঘুমাচ্ছে যে,,ওই।"..
ইঙ্গিতটা অভ্রার দিকে বুঝতে পেরেই তেতে উঠলো প্রচ্ছদ,,এগিয়ে গিয়ে বলতে নিলো...
" এই,ওর দিকে নজ...."
থামিয়ে দিলো প্রচ্ছদে উষ্ণ। নিজেই ছেলেটিকে বললো...
"ও তো কালো?"
ছেলেটি হেসে বললো...
"কি যে বলেন না ভাই,,একে কালো বলে?শ্যাম বর্ণ বলা যায়।আর কালো হলেও কি?লক্ষ্য করুন,চেহারায় কেমন একটা মায়া আছে?এক কথায় সভ্যসুন্দর ও।".
হাসলো উষ্ণ,, একটু সিরিয়াস হয়ে বললো...
" সরি ভাই,,ও আমার হবু বউ।আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।আপনি প্লিজ আর এভাবে ওর দিকে তাকিয়ে থাকবেন না,,আমার খারাপ লাগছে বিষয়টা।".
ছেলেটি বেশ লজ্জা পেলো যেন।।উষ্ণকে বিনয়ী হয়ে "সরি,আমি জানতাম না ভাই," এসব বলে চলে গেলো।
বড় একটা শ্বাস ফেলে উষ্ণ হাটতে নিলেই দেখলো প্রচ্ছদ নড়ছে না।তাই আলতো করে প্রচ্ছদকে ধাক্কা দিয়ে বললো...
"কিরে,,চল??"
ভাবনা থেকে ছুটে এলো প্রচ্ছদ।উষ্ণের মুখে অভ্রাকে ভালোবাসার কথাটা যেন সহ্য হলো না তার।তবুও নিজেকে ধাতস্থ করলো এই ভেবে যে
"অভ্রাতো শুধু এই প্রচ্ছদকেই ভালোবাসে।"
অভ্রাদের কাছে যেতেই উষ্ণ খাঁচাফ্যানটা অভ্রার মুখ থেকে সরিয়ে গায়ের দিকে দিলো।মুখে থাকার কারনে চুলগুলো তার এলোমেলো ভাবে উড়ছিলো।
উষ্ণ লক্ষ্য করলো পাশে থাকা একটা মহিলা প্রনতি দেবীর সাথে বেশ ভাব জমিয়েছে।উষ্ণ প্রচ্ছদরাও বসলো সেখানটায়।বেশ অনেকক্ষণ পর মহিলাটি কথা বলতে বলতে প্রণতি দেবীকে প্রশ্ন করলো...
"মেয়ে কিসে পড়ে দিদি??"
মহিলাটির ইঙ্গিত লক্ষ্য করে প্রনতি দেবী অভ্রার দিকে তাকিয়ে বললো...
"ওর কথা বলছেন??,ও এইবার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে।"
মহিলাটি মাথা নাড়িয়ে হাসতে হাসতে বললো....
"আচ্ছা আচ্ছা।তো মেয়ের বিয়ের জন্য দেখছেন না?"
মহিলাটির কথার ধরণ কিছুটা মনে হয় বুঝতে পারলো প্রনতি দেবী। তাইতো ক্যাবলার মতো একবার অভ্রার দিকে তো একবার মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বললো...
"ওর বিয়ে??"
"হ্যা,,আসলে কি বলেন তো দিদি।আপনার মেয়েকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।ইশ্বর খুব নিখুঁত হাতে তৈরি করেছে আপনার মেয়েকে।ওকে আমার ছেলের বউ বানিয়ে নিতে পারলে আমারই সৌভাগ্যের ব্যপার।আ্ আপনি চিন্তা করছেন কেন দিদি?আমার ছেলে খুব ভদ্র ভাবেই মানুষ হয়েছে,কোনো খারাপ কিছু ওর মধ্যে নেই।সরকারি চাকুরী আছে ওর।ছেলে আপনাদের ঠিক পছন্দ হবে দেখবেন.."
প্রনতি দেবী তাকালো নিজের ছেলের মুখের দিকে।উষ্ণও কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে।প্রনতি দেবী স্বাভাবিক হয়ে হালকা হেসে মহিলাটিকে বললো...
"দিদি,আপনার একটু ভুল ধারনা হচ্ছে। ও আমার ছেলের হবু বউ।ওদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।"
মহিলাটি অবাক হলেও বেশ অস্বস্তিতে পড়লো যেন।বিনয়ী হয়ে প্রনতি দেবীকে বললো..
"ওহহো দিদি,,আসলে আপনি ওকে এমন ভাবে আগলে রেখেছেন, দেখে মনেই হয়না শাশুড়ি বৌমার সম্পর্ক। "
প্রনতি দেবী হাসলেন।বললেন...
"আপনি তো ওকে এক দেখাতেই নিজের ঘরের বউ বানাতে চাইছেন।আমি তো ওকে কাছ থেকে দেখেছি,মেয়ে না বানিয়ে থাকতেই পারলাম না।
পুজো শুরু হলো রাত দুটোর দিকে।চারিদিকে ঢাক,কাসর ঘন্টার আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠলো।হিমের একটু আগেই ঘুম ভেঙেছে।প্রনতিদের পাশে বসেই দেখছিলো সব।বেশ কয়েকজন ছেলে ধুনুচি হাতে ডাকের তালে তালে নাচ করছে।সেথায় প্রচ্ছদ আর উষ্ণও আছে।
উষ্ণ আর অভ্রার চোখাচোখি হতেই ইশারায় উষ্ণ ডাকলো অভ্রাকে।অভ্রার ইচ্ছে প্রবল,ধুনুচি নাচটা তার বরাবরই পছন্দের।কিন্তু এই মুহুর্তে যাওয়া হয়তো ঠিক হবে না।তাই ধীরে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করে দিলো উষ্ণকে।তা দেখে উষ্ণ ভ্রু কুঁচকে আবারও ডাকলো ইশারায়।অভ্রা কিছু বলার আগেই পাশ থেকে প্রনতি দেবী অভ্রাকে প্রফুল্ল চিত্তে বললো..
" তোমাকে নাচতে ডাকছে তো।যাও?"
অভ্রা অবাক চোখে তাকালো প্রনতির দিকে। পরক্ষণেই মুখ নামিয়ে বললো..
"না মা।ঠিক আছে। "
প্রনতির সাথে তাল মিলিয়ে প্রভাতিও বললো...
"আরে যাও তো,,এমন আনন্দ সব সময় আসে না।"
প্রনতি এবার উর্মি,বেলি এদের দিকে তাকিয়ে বললো..
"তোরাও যা?কিছু হবে না,,উষ্ণ, প্রচ্ছদ,ওরা তো আছেই।"
বলতে বলতেই অভ্রাকে ঠেলে তুলে দিলো প্রনতি নিজেই।হালকা হাসলো অভ্রা,সে যে প্রনতি কি ভাবতে,তা ভেবেই যেতে চাইছিলো না।
উর্মি আর বেলি তো অনুমতি পেয়েই দৌড়ে গিয়ে ধুনুচি হাতে নিয়ে নাচতে শুরু করলো।অভ্রাও গিয়ে একটা ধুনুচি হাতে তুলে নিলো, প্রথমে সেটিকে নাড়িয়ে নিয়ে ধোঁয়া বাড়িয়ে নিলো।আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে হালকা তাল মিলালো উর্মি আর বেলির সাথে।হাসলো উষ্ণ, প্রচ্ছদ নির্মিশেষ তাকিয়ে রইলো অভ্রার পানে।ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তারও।
ঢাকের তাল বাড়তে বাড়তেই অভ্রার নাচ তালে চলতে লাগলো।ধুনুচি নাচের সুনিপুন তালটা এতক্ষণ কারোর মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছিলো না ঠিক।ঐ নাচ্ছিলো কোনো রকম বেসামাল ভাবেই।কিন্তু এই মুহুর্তে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে অভ্রা।অভ্রার তাল দেখে প্রচ্ছদ উষ্ণ সহ আরো কয়েকজন একটু স্পেস করে দিলো অভ্রাকে।নাচের তাল, অঙ্গভঙ্গি, হাসি,সব মিলিয়ে মোলায়েম ঠেকলো সবার কাছেই।ইতোমধ্যে উপস্থিত অনেকেই অভ্রার নাচের প্রশংশায় মুখরিত।প্রশংসায় পঞ্চমুখ অনেককেই প্রনতি দেবী খুশি হয়ে বর্ননা দিয়ে বলছে..
"ওটা আমার হবু বউমা। "
বলা বাহুল্য, একটু আগেই প্রীথুলা এসেও ধুনুচি হাতে নাচ শুরু করেছে।নাচটা তার কাছে ফ্যাক্ট নয়।উদ্দেশ্য হলো অভ্রার থেকেও বেশি প্রশংসা কুড়ানো।তাইতো নাচার আগে সুন্দর মতো নিজের চুল গুলো ছেড়ে দিয়েছে । নিজের মতো গড়গতম্বিতে নাচলেও প্রচ্ছদ বিরক্ত তার কান্ডে।সে তো ঠিকই বুঝেছে প্রীথুলার ফন্দি।মেয়েটা নাচতে না পারলেও অভ্রাকে হেনস্তা করা চাই।
নাচ শেষে ধুনুচি হাতে নিয়েই উষ্ণের সাথে মায়ের মন্দিরের সামনে এগিয়ে গেলো অভ্রা।এখন আর আগের মতো ভয়টা করছে না।কিছুটা কমেছে।অভ্রা প্রনাম করে ধুনুচি দিয়েই মায়ের আরতি করতে লাগলো খেয়াল করলো উষ্ণ তার ছেড়ে দেওয়া আচলটা টেনে কিছুটা ঘোমটার মতো করে দিয়েছে।বুঝতে পেরে অভ্রাও ধরে নিলো আচলটা। আরতি শেষ করেই দুজন একসাথে প্রনাম করে মন্দিরের সিড়ি পাড় করলো। তখনই মন্দিরের পুরোহিত এসে অভ্রার কপালে একটু আশীর্বাদি সিঁদুর ফোটা দিয়ে বললো...
"সুখি হও মা,,মা তোমার মঙ্গল করুক।"..
মিহি হাসলো অভ্রা এবং উষ্ণ। পাশ দিয়ে দেখলো প্রীথুলাও ধুনুচচি রাখতে এদিকটায় এসেছে।রেখেই চলে যেতে নিলে পুরোহিত তাকে ডেকে বললো৷...
" এই যে মেয়ে শোনো?...এটা মায়ের জায়গা,,এখানে সাজসজ্জার থেকেও শালীনতা থাকাটা জরুরি।চুল গুলো বেধে নিও,মা অসন্তুষ্ট হবেন।"
পুরোহিত পাশ কাটিয়ে চলে গেলেও প্রীথুলার পড়তে থাকা তেজি নিঃশ্বাস যেন থামলো না।বাহিনীর দৃষ্টিতে পেছন ফিরে পুরোহিতের যাওয়ার পানে তাকিয়েই রইলো।পরে প্রচ্ছদের দিকে তাকাতেই দেখলো সে তাচ্ছিল্য হেসে সরে যাচ্ছে প্রীথুলার থেকে।
----
সুন্দর রাত্রির পর দিনটাও যেন মোহিত হয়ে উঠলো।পূজা শেষে সবাই বেরিয়ে এলো মন্দির থেকে।হুট করেই পরিকল্পনা করা হলো কাছেই একটা পাহাড়ি এলাকা থেকে ঘুরে আসবে সবাই।সবাই বলতে বড়রা বাদ দিয়ে।
সকলের উৎফুল্ল ভাবটা উটকো মনে হলো প্রীথুলার কাছে।তাই তো সে সবাইকে জানিয়ে দিলো সে বড়দের সাথে বাড়ি ফিরবে।কথাটার পর কেউ তাকে একটি বার জোরও করলো না আর যাওয়ার জন্য। প্রীথুলার বিষয়টা এমনই,,এই পরিবারের উপর থেকে নিচ,কেউ তাকে তেমন ধাতেই ধরে না।এর একমাত্র কারণ,প্রীথুলার ব্যবহারই।
বড় মাইক্রোবাসটা বড়দের জন্য দেওয়া হলো,বাড়ি যাবে বলে।উষ্ণের প্রাইভেট কারটায় উঠে বসলো,রজনী,রজনীর ছোট্ট মেয়ে,বেলি,বৃক্ষ আর উর্মি।আগেপিছে কষ্ট করে হলেও বসেছে তারা।তাদের পাঠিয়ে দিয়ে প্রচ্ছদ একটা সি এন জি ডেকে আনলো।বাকি পাঁচজন এটায় হয়ে যাবে অনায়াসে। সবাই সি এন জি তে উঠতে যাবে তখনই মাইক্রোবাস থেকে প্রীথুলা নেমে এসে বললো...
"আমিও যাবো তোমাদের সাথে।"
বিষয়টা খুবই বিরক্তিকর। প্রচ্ছদ তো হালকা চেচিয়ে বলেই উঠলো...
"যাবে মানে??আগে কেন না করেছিলে?জায়গা হবে না,,এখন বাড়িতে যাও।"
প্রীথুলা প্রচ্ছদের দিকে কড়া করে বললো...
"আমি যাবো বলেছি মানে যাবোই।"
প্রচ্ছদের মেজাজ চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে,,ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে এক থাপ্পর লাগিয়ে দিতে প্রীথুলার গালে।কিন্তু আশপাশ বিবেচনা করে তা আর করলো না প্রচ্ছদ।চেতেমেতে বললো...
"ঠিক আছে যাও তুমি,যেভাবে ইচ্ছে। এই সি এন জিতে যাওয়া যাবে না।যাও।"
রজনীর বর আস্তে করে প্রীথুলাকে বললো...
"বৌদি, তুমি একটু আগে বললেও তো পারতে,কেউ একজন কষ্ট করে না হয় প্রাইভেটকারে উঠে যেতাম।এখন তো সেটাও চলে গেলো।"
প্রচ্ছদ এবার বিরক্ত হয়ে হাটা ধরে বললো...
"ধুর,,যাও তোমরা সবাই।।আমি বাড়ি গেলাম।"
তাকে আঁটকে ধরলো উষ্ণ..
"আরে,দাঁড়া তুই।।ব্যবস্থা হবে ওয়েট।"
অভ্রা উষ্ণকে বললো..
"শুনুন, এক সিএনজি চলে যাক।দুজন না হয় পটে আরেকটা সিএনজি নিই?"
প্রচ্ছদ বললো..
"আরে নাহ,,তা সম্ভব নয়।জায়গাটা ভেতরদিকে,তার উপর পাহাড়ি এলাকা।কোনো গাড়িই তেমন যেতে চায় না।,এটা ম্যানেজ করতেও অনেক কষ্ট হয়েছে।"
অভ্রা আর কিছু বললো না।চুপ করে রইলো।প্রীতি না গেলেও তার ভ্রমনপ্রেমী বর পাহাড়ে যাবে।সেও রয়েছে এখানে।প্রচ্ছদ একবার ভাবলো সামনের সীটে কষ্ট করে তিনজন বসবে।কিন্তু প্রীতির বরের শারীরিক গঠন বেশ চওড়া,তাই সে বসলে আর তার পাশে কোনোভাবেই আরেকজন বসা সম্ভব নয়।একটু পর উষ্ণ বললো...
"হয়েছে,,আর কোনো কথা নয়।আমি যেভাবে বলছি উঠো।"
উষ্ণের কথা মতো রজনীর বর আর প্রীতির বর,ড্রাইভারের দুই পাশে বসলো। পেছনের সীটে একপাশে প্রীথুলা বসলো। মাঝখানে প্রচ্ছদ বসতেই তার আরেক পাশে উঠে বসলো উষ্ণ। বাইরে দাঁড়িয়ে অভ্রা হা হয়ে গেলো,সে কোথায় বসবে?বোকার মতো উষ্ণের দিকে তাকিয়ে বললো...
"আমি?"
প্রচ্ছদও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো..
"ও কোথায় বসবে?"
উষ্ণ নিজের একহাত বাড়িয়ে দিলো অভ্রার দিকে...
"আসো।"
অভ্রা অবাক হলো।জিজ্ঞেস করলো..
"মানে?"
"উতে এসো?কোলে বসবে তুমি।"
উষ্ণের কথা শুনেই সামনে থেকে ফিক করে হেসে দিলো রজনী আর প্রীতির বর।রজনীর বর তো ঠাট্টা করে বলেই ফেললো...
"বাহ,,শালাবাবু তো বেশ জায়গা বানিয়েছে অভ্রার জন্য। "
অভ্রা বললো..
"আমি কিভাবে আপনার কোলে বসবো??"
উষ্ণ দুষ্টু হেসে বললো...
"তো কি হয়েছে?তোমার যেি রোগা পটকা শরীর,আমি বেশ কোলে নিতে পারবো তোমায়।"
অভ্রা ঠোঁট উল্টে বললো..
"অপমান করছেন কেন?"
উষ্ণ হেঁসে বললো...
"ওকে বাবা সরি,আর বলবো না।তুমি বেশ মুটকি,,এবার আসো?"
"আবার??"
"সরি সরি,,তুমি ভালো,,মোটাও না চিকনও না,তুমি শুধু আমার ফুল,শ্যামা ফুল,এবার আসো তো?."
অভ্রার বেশ অস্বস্তি হচ্ছে । এভাবে সে উষ্ণের কোলে কিভাবে উঠবে?মিনমিনিয়ে বললো...
"আমি কিভাবে...."
উষ্ণের শীগল দৃষ্টি পরলো অভ্রার পানে।স্ব সিক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো....
"বিশ্বাস করো না আমায়??"
থেমে গেলো অভ্রা।কি বলবে বুঝতে পেলো না।লোকটা যে কিছু বলার মতো শূন্যস্থানই রাখেনি তার জন্য।
প্রচ্ছদের মন বারবার করে চাইছে অভ্রা যাতে উষ্ণের কোলে না বসে।তাদের এতোটা কাছাকাছি থাকাটা সহ্য হচ্ছে না প্রচ্ছদের।ভেতর থেকে কেউ একজন যেন তাকে আটকাচ্ছে বারবার,মনে হচ্ছে যেন এসব তার চোখে সইবে না।মন থেকে বারবার করে বলতে ইচ্ছে করলো..
"" না অভ্রা নাহ,,তুমি উঠোনা উষ্ণের কোলে,,দেখো আমি কষ্ট পাচ্ছি, তুমি তো আমার কষ্ট সইতে পারো না অভ্রা?প্লিজ ইগ্নোর উষ্ণ? "
প্রচ্ছদের মনের এতো আকুতি যেন শুনলো না অভ্রা।দৃষ্টি একবার প্রচ্ছদের আকুল নয়নে দিয়ে পরক্ষণেই সরিয়ে নিলো অভ্রা।নীরবে আস্তে করে উঠে বসলো উষ্ণের কোলে।উষ্ণের ঠোঁটে বিশ্বজয়ের হাসি।আর পাশে বসা প্রচ্ছদ যেন নিজেই নিজেকে হারিয়ে দিলো।ভেতর থেকে কেউ এবার যেন তাচ্ছিল্য করে বলে উঠলো..
"দেখ প্রচ্ছদ, দেখ??তোকে পাগলের মতো ভালোবাসতে থাকা মেয়েটি আজ আর তোকে বুঝলো না।শুনলো না তোর মনের কথা,ভালো টা আর বাসলো না সে তোকে।তুই যে এবার পেয়েও আর পেলি না তাকে?আর হবে না অভ্রা তো,আর হবে না।....."