নিজের পায়ের দিকে চোখ যেতেই হা হয়ে গেলো অভ্রা।এসব কি??আলতা কিভাবে এলো। হুট করে ঘুম ভাঙায় গলাটাও কেমন শুকিয়ে এলো,,পাশ ফিরে প্রথমেই পানি খুজলো।পেয়ে যেতেই দ্রুত তা নিয়ে ঢকঢক করে গিলে নিলো সে।তা দেখেই উষ্ণ ব্যতিব্যস্ত হলো,,উঠে এসে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো...
"কি হলো ফুল??খারাপ লাগছে তোমার??ভয় পেয়েছিলে?''
অভ্রা শান্ত হলো,,,,বললো...
" আমি ঠিক আছি।কিন্তু আপনারা এসব কেন করেছেন?"
ব্যস,,ভয় যেন এবার বাকিরাই পাচ্ছিলো।একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে চাইলো শুধু।অভ্রার সচল মস্তিষ্ক, একটু চিন্তা করেই বুঝে ফেললো বিষয়টি।বুঝতেই উষ্ণের দিকে তাকিয়ে বললো...
"আমি প্রথমেই বলেছি শাড়ি পড়তে পারবো না।"
উর্মি উত্তর দিলো...
"প্লিজ বৌ।না করে না প্লিজ।।কত কষ্ট করে আলতাটা লাগালো বলো তো,এখন এটার সাথে তো জামা মানাবেও না,তাই না??"
"কিন্তু..."
রজনী বললো...
"পড়ই না অভ্রা,,একটা দিনই তো?"
রজনীর কথার উপর অভ্রা আর কিছুই বলতে পারলো না।চুপচাপ কিছু না বলেই উঠে চলে গেলো রুমের বাইরে।সে যেতেই উর্মি রাগে উষ্ণের বাহুতে একটা থাপ্পড় মেরে বললো...
"তোর জন্য হয়েছে সবটা,,কি দরকার ছিলো এখনই নুপুর গুলো পড়ানোর??"
উষ্ণ বিছানায় বসতে বসতে বললো..
"উফহ,,আমি কিকরে জানবো,যে এটুকুতেই ঘুম ভেঙে যাবে?"
"এখন ওসব বাদ,এটা ভাব যে ও শাড়ি পড়বে কিনা,,কিছু তো বলে গেলো না।"
রজনীর কথায় সবার মুখেই চিন্তার ছাপ দেখা দিলো।আসলেই তো,,অভ্রা কি শাড়ি পড়বে??
আলতার বোতলটার দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো প্রচ্ছদ,অভ্রা মেয়েটা বেশ ভাবাচ্ছে তাকে।মন বলছে আজ অভ্রা কিছুতেই শাড়ি পড়বে না।আচ্ছা, প্রচ্ছদ কি একবার গিয়ে বলবে,শাড়ি পড়তে?অভ্রা তো তার কোনো কথা ফেলতে পারতো না।
আলোচনার মধ্যেই বেলি এসে উষ্ণকে বললো....
"উষ্ণ মামা,,তোমার বিচার হবে,কি করেছো তুমি??দিদানরা তোমায় ডাকছে।"
"আমি কি করলাম??"
"সেটা তো তুমিই জানো।তোমার বউ গিয়ে দিদানকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।কিচ্ছু বলছে না।দিদান বুঝে গিয়েছে এতে তোমারই দোষ,।এবার যাও,"
হাহ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে উষ্ণ উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গেলো মায়ের কাছে।
-------
"আমি তো ওকে ছাড়তে পারবো না প্রচ্ছদ ভাই।"
উষ্ণের সরাসরি কথায় কিছুটা ক্ষিপ্ত হলো প্রচ্ছদ।তেতে উঠে বললো...
"ছাড়তে পারবি না মানে??আমি বুঝতে পারছি না তুই ওর মধ্যে কোন সৌন্দর্যটা খুজে পেয়েছিস?"
উষ্ণ তেজী হলো না।বরং প্রচ্ছদের কথার উল্টোপিঠে একটু হাসলো।বুকে হাত গুজে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে দুর আকাশের পানে দৃষ্টি দিয়ে বললো...
"সৌন্দর্য?,,, হুমমম।।মেয়ে মানুষের সৌন্দর্য আসলেই ফ্যাক্ট করে।
মেয়ে মানুষ সুন্দর হলে পুরুষ সেই মেয়ের মোহে আটকায়।
প্রায়োরিটি দেয়,ন্যাকামিতে সঙ্গ দেয়।
যারা বলে 'Looks doesn’t matter'আসলে এই কথাটা পুরোই ভুল।
সৌন্দর্যের অধিকারী হলে মেয়ে মানুষের অর্ধেক দোষ মাফ।তাইনা???"
বলেই প্রশ্নবিদ্ধ চাহনি নিক্ষেপ করলো প্রচ্ছদের দিকে।চোখ নামিয়ে ফেললো প্রচ্ছদ। উষ্ণের কথার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বলার মতো ভাষাগত যোগ্যতা যে তার নেই।
"জানিস তো প্রচ্ছদ ভাই।আমার অভ্রা ভাহ্যিক দিক দিয়ে একটুও সুন্দর নাহ।ওর গায়ের রং কালো,,নাকটা বোঁচা, হাসি সুন্দর নেই,চুল গুলোও স্ট্রেইট না,এলোমেলো স্বভাবের। আর সব চেয়ে মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট, পুরুষের যা প্রয়োজনীয়,লম্বা হাইট,লতানো ফিগার,ফুলেফেঁপে উঠা বক্ষস্থল, গোলাপের পাপড়ির মতো টসটসে ঠোঁট,, এসবের একটাও না আমার অভ্রার মধ্যে নেই।
কিন্তু আমি ওর সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছি জানিস?ও হাসলে মুখভঙ্গি কেমন হয় সেটা দেখে নয়,,ঐ হাসির পেছনে নির্মলতা অনুধাবন করে।ওর লম্বা উচ্চতা নেই,তবে খাটো মেয়েটা যখন আমার বরাবর দাঁড়াবে, তখন ওর মাথাটা যেন আমার বুকে এসে ঠেকে,যেটা সুন্দর। ওর সব সময়ের স্ট্রেইট চুলে নয়,বরং এলোমেলো চুলগুলোকেই বারংবার হাত দিয়ে গুছিয়ে দিতেই আমার সুন্দর লাগে। ফুলেফেঁপে ওঠা বক্ষস্থল নেই তো তার,তবে ঐ ছোট বুকের ভেতরই ও আস্ত একটা হৃদযন্ত্র পালন করছে,যেটায় আছে কাউকে এক আকাশ সমান ভালোবাসার মতো ক্ষমতা।গায়ের রং কালো?সেটা ভাবতে চাই না,তবে ও যখন কিছু একটায় অবাক হয়ে গোলগোল চোখ করে তাকায়,বিশ্বাস কর ভাই,আমার চিত্ত সুদ্ধ শীতল হয়ে যায়।ঠোঁট? সেটার কথা নাই বা বললাম,আশা করি তোর কাছে তার বর্ননা দিতে হবে না,চেনাই তো তোর।,বাকি রইলো কি,,ফিগার...আমার শ্যামাফুল একদম লক্ষ্মীর মতো,,একদমই লক্ষ্মী।"""
উষ্ণের দৃষ্টিতে প্রজ্জলন অনুধাবন করে সেদিকে তাকাতেই চোখ স্থির হয়ে প্রচ্ছদের।উষ্ণের ভাষয়মতে লক্ষ্মীটি আজ সত্যিই শাড়ি পড়েছে।সাদার উপর পাড়ে আচলে নীলছে বেগুনি, আরো কয়েক রঙের সুতোর সূক্ষ্মকাজ করা আফসানা প্রিন্টের শাড়িটা কেমন সেটে রয়েছে অভ্রার শরীরের ভাজে।কোথাও কোন ফাঁক ফুকুর নেই।আচল ছেড়ে দেওয়ায় কোমড়খানাও দেখা যাচ্ছে না।তারপরও শাড়িতে এতোটা ভালো লাগছে? কই প্রীথুলাকে তো কখনো এতোটা মনোযোগ দিয়ে শাড়িতে দেখেনি সে?
দেখেছিলো,সেই প্রথম যেদিন তারা একে অপরে মত্ত হয়েছিলো।তখনও প্রচ্ছদের জীবনে অভ্রার আগমন ঘটেনি।প্রীথুলার সঙ্গে সম্পর্কের প্রায় সপ্তম মাসেই প্রথম মিলন ঘটেছিলো তাদের।একবার বলতেই রাজি হয়ে গিয়েছিলো প্রীথুলা।এতে অবশ্য সুবিধাই ছিলো প্রচ্ছদের।
আগে থেকে বুক করে রাখা হোটেলের রুমটায় প্রবেশ করে প্রথমবারের মতো প্রীথুলাকে শাড়িতে দেখেছিলো। স্লিভলেস কালো ব্লাউজের সাথে খয়েরি রঙের পাতলা জরজেট শাড়িটা বেশ মানিয়েছিলো সেদিন প্রীথুলাকে।তবে শাড়ির দিকে নজর দেওয়ার মতো সময় প্রচ্ছদের ছিলো না তখন।তার দৃষ্টি ছিলো শাড়ির ফাক গলে বেরিয়ে থাকা ধবধবে সাদা পেটে।আকর্ষণ অনুভব করছিলো বড়গলা যুক্ত ব্লাউজটার ফাঁকে। সেদিন প্রীথুলার আবেদনময়ী ভাব পাগল করে দিচ্ছিলো প্রচ্ছদকে।কোনো সংকোচ ছিলো না প্রীথুলার আর না ছিলো কোনো প্রকার কাঁপা-কাঁপি, সমান তালে তাল মিলাতে সক্ষম হয়েছে প্রীথুলা নিজেও।আর প্রচ্ছদও প্রান ভরে উপভোগ করেছে প্রীথুলার আকর্ষণীয় সেই শরীর,,নাভী....
উহ,,ভাবতেই চোখ বন্ধ করে ফেললো প্রচ্ছদ।ইশশ,ওসব এখন কেন ভাবছে সে??চোখ খুলে অভ্রাকে দেখতেই হৃদয় শীতল হলো তার।এই মিনিট কয়েকের মধ্যেই প্রচ্ছদ অনুধাবন করলো সেদিন আর আজকের পার্থক্যটা।সেদিন প্রীথুলাকে শাড়িতে দেখে শান্ত হয়েছিলো প্রচ্ছদের শরীর।কিন্তু আজ,অভ্রাকে শাড়িতে দেখে শান্ত হলো হৃদয়। অনুভব করলো আজ কিন্তু তার শরীরেও কোনো প্রকার আকাঙ্খা নেই।
জিনিসটা সুন্দর তাই না?না ছুঁয়ে, না ধরে,শুধু মাত্র দূর থেকে চোখের দেখাতেই কেমন শরীর,মন দুটোই শীতল হয়ে গেলো।অভ্রা ম্যাজিক জানে,,সত্যিই অভ্রা ম্যাজিক জানে।ওকে হারানো সম্ভব না প্রচ্ছদের পক্ষে,সত্যিই সম্ভব না।
চোখের আড়াল করে অভ্রাকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে উষ্ণ। বিরক্ত হলো অভ্রা।জিজ্ঞেস করলো...
"কি হয়েছে?এভাবে টানলেন কেন?"
"দেখবো আমার ফুলকে।"
"আজব তো,,সবাই রেডি হয়ে গেছে।যেতে হবে তো নাকি?রাত বাড়ছে।"..
" সঙ্গে আমার অনুভূতিও।"
শান্ত হয়ে গেলো অভ্রা।উষ্ণকে তার একদমই স্বাভাবিক লাগছে না।কেমন করে তাকিয়ে আছে লোকটা।
"অপ্সরা?"
নেশালো কন্ঠের তীব্রতা যেন হুরহুর করে বেড়ে উঠলো উষ্ণের।যার তীরাঘাতে বিদ্ধ হচ্ছিলো অভ্রা।উষ্ণ আবার সেই মাতাল কন্ঠে ডেকে উঠলো...
"অপ্সরা??কি নেই বলো তো?".
ভ্রু কুঁচকালো অভ্রা।বুঝতে পারলো না উষ্ণ কিসের কথা বলছে..
" কি নেই ম্ মানে??"
হাসলো উষ্ণ। বললো না একটি শব্দও।হুট করেই মাথাটা ঝুকালো সে অভ্রার কাছে।মুখের উপর একটা ফু দুতেই কেপে উঠলো অভ্রা।শরীরের শিরায় শিরায় যেন রক্তধারার মতো আগুন বইতে লাগলো তার।চোখ দুটি যেন আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে গেলো।
কিয়াৎক্ষণ পর নিজ ললাটে কিছু একটার আভাস পেতেই চোখ খুললো অভ্রা।উষ্ণ স্বহস্তে অভ্রার ললাটের মাঝ বরাবর একখানা ছোট্ট খয়েরী টিপ পড়িয়ে দিলো।হেসে বললো...
"এবার মানানসই।"
নিঃশ্বাস যেন পুনরায় ফিরে এলো অভ্রার।কিন্তু তাও কি থাকার মতো?আজ যে উষ্ণ পুরো দমে অভ্রাকে ঘায়েল করতে নেমেছে?
আলতো ভাবে নিজের ডান হাত খানা অভ্রার হাতে ছুঁয়ে দিতেই কেমন লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেলো মেয়েটা।হাসলো উষ্ণ। আবেদনময়ী দৃষ্টিতে আস্তে করে একবার উচ্চারণ করলো...
"একটু গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিই ফুলকে?"
লজ্জায় রাঙা হয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো অভ্রা।এদিক ওদিক তাকিয়ে "দেরি হচ্ছে, যেতে হবে এবার" বলেই কোনোরকম সুযোগ পেয়ে পালালো সে।পেছন থেকে অপলক তাকিয়ে শুধু হেসেই গেলো উষ্ণ। আপন মনেই উচ্চারন করলো.
"আমার লজ্জাবতী শ্যামাফুল।"
হাসি ফুটলো আড়ালে থাকা এক আউল ছাওয়ালের ঠোঁটেও। তাচ্ছিল্য পূর্ণ হাসি। নিজের প্রতিই তার তাচ্ছিল্যবোধ হচ্ছে তার। প্রমাণ যে তার স্বচক্ষে।।। আজ অভ্রা যে তাকে বুঝিয়ে দিলো
~~ভালোবাসা মানে ভরা কনসার্টে লোকচক্ষুর সম্মুখে প্রেমিকার ঠোঁটে তাল মিলিয়ে চুমু খাওয়া নয়।,,
ভালোবাসা হলো সবার আড়ালে একটু আবেদনের ছোঁয়াতেই প্রেমিকার লজ্জায় নুইয়ে যাওয়া।~~