তুমি কোন কাননের ফুল

পর্ব - ২৯

🟢

"আপনি প্রথম থেকেই আমার বিষয়ে সবটা জানতেন।সবটা জেনেই আপনি আমাকে বিয়ে করেছেন।তাহলে এখন কেন আপনি আমাকে এভাবে এড়িয়ে চলছেন?"

অভ্রার কন্ঠ কাঁপছে অনবরত।তবুও যেন সে চাইছে না উষ্ণের সামনে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে।বিষয়টা বেশ বুঝতে পারলো উষ্ণ। তবে কথার উত্তরে কিচ্ছু না বলে অভ্রাকে পেছন থেকে আরো একটু জড়িয়ে ধরলো সে।

স্পন্দিত তরঙ্গের মতো এক কম্পন যেন অভ্রার শরীরেও বয়ে গেলো হঠাৎ করে।উষ্ণায়নের উষ্ণ কোমল ছোঁয়া গুলো নারী সত্তাকে যেন হুট করেই জাগিয়ে তুলছে।তবু নিজের অনুভূতির সাথে যুদ্ধ করে লজ্জাকে আশকারা না দিয়ে কন্ঠে প্রখরতা এনে বললো....

"আপনি উত্তর দিচ্ছেন না কেন উষ্ণায়ন?,,শুনুন,,আপনি কি উত্তর দিবেন আমি জানি না।তবে এই এখন একটা কথা স্পষ্ট জানিয়ে রাখতে চাই আপনাকে।বিয়েটা যখন করেই ফেলেছেন আমাকে এভাবে ইগ্নোর করা যাবে না।ভ্ ভেতরগত দিক থেকে আমাদের সম্পর্ক যাই থাকুক,কিন্তু বাড়ির সবার সামনে আপনি যদি আমার সাথে অন্য সব হাসবেন্ড ওয়াইফের মতো বিহেভ না করতে পারেন,তাহলে নিজ মুখে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দিবেন,আমাকে নিয়ে আপনার সমস্যাটা।এরপর আমাকে ছেড়ে দিলেও আমার কোনো আপত্তি নেই।"

এতোক্ষণ কোনো হেলদোল না হলেও শেষের কথাটা শুনে অভ্রার পিঠ থেকে মুখ তুলে তাকালো উষ্ণ। চোখ জোড়া কুঁচকে বললো....

"মাইর চেনো তুমি? ভয় করছে না এসব বলছো যে আজ?"

অভ্রাও এবার নড়েচড়ে তাকালো উষ্ণের চোখের পানে।অভ্রা বেশ করে চাইলো নিজেকে শক্ত রাখতে।কন্ঠে তেজ নিয়ে আগের মতোই বললো...

"না করছে না ভয় আমার।কেন আমি ভয় পাবো?আপনি কি আদেও বুঝতে পারছেন আমি কত কি ফেইস করছি?আপনার মনে হতেই পারে,আমি স্ট্রং,আমি এসব কিছু খুব সহজেই সামলে নিতে পারবো।মানলাম, মানলাম আমি গায়ে মাখছি না প্রীথুলার রোজ রোজ ফিনকি দিয়ে বলা কথাগুলো।আত্মীয়দের আড় চোখে আমাকে দেখা,কেউ কেউ তো জিজ্ঞেস করেই বসছে,আমি না কি আ্ আপনাকে স্ সুখ দিতে পারিনি,তাই আপনি আমার সাথে এমন করছেন।এটাও সহ্য করে নিলাম আমি।কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন,এতো কিছুর পরে এসে এই বদ্ধ ঘরের মধ্যেও আপনার এই নাজুক আচরন আমার সহ্য হয় না।কেন করছেন আমার সাথে এমনটা?আমি আপনার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি?যে আপনিও প্রচ্ছদ দাভাইয়ের মতো করেই আমাকে আবার ভেঙে দিচ্ছেন? আমার আর সহ্য হয় না এসব,মরে যেতে ইচ্ছে করছে আমার,,আমি তো আপনার পেছনে লাগিনি,আপনিই নিজে এসে আমার ভালোবাসার জায়গা দখল করে নিয়েছেন।এখন যখন আমি আপনাকে নিজের করে নিতে লাগলাম,তখনই আপনি এমন করে হারিয়ে দিচ্ছেন আমায়।বুঝেন না কেন,আমিও আপনার মতো করেই আপনাকে চাই?"

নিজেকে অনেক চেষ্টা করেও আটকে রাখতে পারলো না অভ্রা। কথার মাঝেই ঠোঁট ভেঙে কান্না করে দিল সে।তরল পানি গড়িয়ে পড়লো চোখের কার্নিশ বেয়ে।বক্ষস্থলের ক্রমাগত উঠা নামা কিছুতেই যেন সামলাতে পারছে না।

"ভালোবাসো আমায়?"

উষ্ণের শীতল প্রশ্নখানার উত্তর দিতে আজ একটুও ভাবলো না অভ্রা।বললো...

"বুঝতে পারেন না,আপনি?"

"তবুও তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।"

"সহস্রবার ভালোবাসি বলেও তো আগলে রাখতে পারলাম না।এবার না হয় মুখে না বলেই ভালোবাসবো।"

কিঞ্চিৎ হাসলো উষ্ণ। মুখটা একটু নামিয়ে অভ্রার অশ্রুশিক্ত দু চোখের পাতায় ওষ্ঠ ছোয়ালো নিজের।কত আবেশ মিশে আছে সেই ছোঁয়ায়। একটি বারের জন্যও অভ্রার মনে হয় নি লোকটি তার মাঝে রাত্রীসুখ চাইছে,শুধু মনে হলো বারবার,লোকটি তাকে খুব যত্ন করে ভালোবাসছে।

"তোমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম এই কথাটা।জানতে চেয়েছিলাম,তুমি আমার জন্য কতটা কি করতে পারো।আমার প্রতি তোমার অনুভূতিটা প্রচ্ছদের থেকে কম, নাকি বেশি,তা দেখবো বলেই বিয়ের পর এতগুলো দিন আমি আমার বউকে দুরে দুরে রেখেছি।আমার ফুলের প্রতি আমার কোনো ভুল ধারনা নেই।আর বিয়ে করেছি আমি তোমায়।জীবনের শেষ অধ্যায়ের সাথে বেঁধে নিয়েছি ছেড়ে দেবো বলে নয়।আমাদের বৈবাহিক জীবন থেকে ছাড়াছাড়ি শব্দটা মুছে যাক ফুল। ঝগড়া হবে,অভিমান হবে,দু না হয় কথা হবে না দুজনার,তবুও প্লিজ তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা চিন্তাতেও আনবে না।তুমি জানো না, তুমি আমার ঠিক কি,আমার হঠাৎ একদিনের দেখা ফুলটি আমার জীবনের প্রাণভোমরা। মনে রেখো,ছেড়ে গেলে তুমি বিধবা হবে তৎক্ষনাৎ। "

"আমাকে আর এভাবে ইগ্নোর করবেন না তো?"

বাচ্চামো সুরটা বেশ মনে লাগলো উষ্ণের।প্রফুল্ল হেঁসে জিজ্ঞেস করলো...

"আমি থাকতে আর পুতুলকে জড়িয়ে ধরতে চাইবে?"

অভ্রা ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো।তা দেখে উষ্ণ হাসি চওড়া করে তুললো।অভ্রার বুকের উপর মাথা রেখে নিজের ভর ছেড়ে দিলো পুরো।চোখ বন্ধ করতে করতে বললো...

"আজ শুধু জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ো ফুল।তুমি অসুস্থ। আমরা অন্যরাতে খেলবো।"

--------

পরদিন সকালটা অভ্রাকে বেশ হাসিখুশিই লাগলো সবার কাছে।প্রীথুলার মনেও খটকা লাগলো,সব কি ঠিক হয়ে গেলো?তার সন্দেহটা সত্যি হলো যখন উষ্ণ ডায়নিং টেবিলে এসে বসলো।বসতে বসতেই সে অভ্রার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো যে।এরপর?কত কিছু,,এই ফুল, হাতে ব্যথা লাগবে, কিছু ধরতে যেও না।ফুল,আগুনের কাছে কম যাও,ফুল,পাশে এসে বসো তো একটু।আরো কত কি।

উষ্ণের কথার ধরনে সবাই বুঝলো তাদের দম্পতি জীবন স্বাভাবিক হলো।এতে সবার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটলেও অন্তর পুড়ে ছাই হলো এক অভাগা প্রেমিক পুরুষের।পাশে বসে দিব্বি খাচ্ছে প্রীথুলা।কই,সে তো একবারও অভ্রার মতো নিজের স্বামীকে জিজ্ঞেস করলো না কিছু লাগবে কিনা।একবারও চোখে চোখ রেখে মুচকি হাসলো না।কি যে হারিয়ে ফেললো সে,এখন টের পাচ্ছে।উষ্ণের শ্যামা ফুলটা তো একটা সময় তার বউ হতে চাইতো।কেন মেয়েটাকে প্রীথুলার জায়গাটা দিতে পারলো না প্রচ্ছদ?

-----

সম্পর্কের সৌন্দর্য বাড়তে লাগলো উষ্ণ আর অভ্রার। সুখের দেখা কারে কয়,তা অনুভুত হলো যেন।দিন যে পেরোচ্ছে খুব দ্রুতই।এই যে,,দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন পাড় হয়ে গেলো।তেমনি ঘনিয়ে এলো প্রচ্ছদদের নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার সময়।আজ উর্মির জন্মদিন।কাল অথবা পরশুই চলে যাবে প্রচ্ছদরা।

উর্মির বিয়ের পর প্রথম জন্মদিন।তার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে তার স্বামী এই বাড়িতেই তার জন্মদিনের আয়োজন করলো।তেমনি উষ্ণও বোনের জন্য কিছু কমতি রাখে নি।

উর্মির নিজেকে আজ পরিপূর্ণ মনে হয়,উষ্ণের মতো একটা বড় ভাই নামক বটগাছের ছায়া পেয়ে,আর এখন?একজন পার্ফেক্ট জীবনসঙ্গী পেয়ে। বাবার অনুপস্থিতি কখনো টের পেতে দেয় নি উষ্ণ তাকে।কেমন যেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে মা,বোন সবটা সামলেছে ছেলেটা।তেমনি যত্ন নিয়েছে নিজেরও।নিজেকেও গড়ে তুলেছে একজন হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মানুষ হিসেবে।হুট করে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না,এই ছেলের বাবা নেই,এই ছেলেটাই সামলে আসছে একটা সংসার।আর এখন?দায়িত্ব নিয়েছে আরো একজনেরও।উর্মির মনে শান্তি লাগে,অভ্রাকে দেখে।দাভাই একজন মনের মতো বউ পেয়েছে।মেয়েটা বুঝদার,সংসারও সামলাতে জানবে,উষ্ণের সাধ্যের মধ্যে আবদারও করতে পারবে,সাথে হয়ে উঠবে উষ্ণের ক্লান্তময় সন্ধ্যার এক চিলটে হাসির কারন।উপরওয়ালা কত নিখুঁত ভাবেই না উষ্ণের জন্য তৈরি করেছে তার শ্যামা ফুলকে।

সন্ধ্যা হতেই একটা এ্যাশ গ্রে কালারের শাড়ি নিয়ে উর্মির রুমে হাজির হলো অভ্রা।ঠোঁটের কোনে মিষ্টি হাসি।রুমে উর্মির স্বামীকে দেখলো না,তাই হেসে জিজ্ঞেস করলো...

"তোমার বর কই ননদিনী?"

উর্মি বললো...

"ও তো মনে হয় দাভাইয়ের সাথে বাইরে টা দেখছে।"

"আচ্ছা, তাহলে এবার চটপট রেডি হয়ে নাও তো দেখি।একটু পরেই ডাকবে হয়তো।"

উর্মি দেখলো শাড়িটা।সুন্দর বলা যায় এক কথায়।অভ্রা চলে যেতে নিলেই উর্মি পেছন থেকে ডেকে বললো...

"দাঁড়াও না অভ্রা।"

অভ্রা দাঁড়ালো। উর্মি গিয়ে আলমিরা থেকে আরো একটা শাড়ি এনে অভ্রার হাতে দিয়ে বললো...

"দাভাই বলেছে,আজ যেন তুমি এটাই পড়ো।"

অভ্রা চোখ বুলালো শাড়িটায়।কালো রঙের জাপানিজ সিল্কের শাড়ি।হাসলো অভ্রা,না করলো না।আচ্ছা বলে শাড়িটা নিয়েই নিজের রুমে এলো।

-----

জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কাজ শেষ করে রুমে আসলো অভ্রা।হালকা ক্লান্ততা ভর করেছে,তবে তেমন কিছুই না।গন একটা নিঃশ্বাস ফেলে আয়নার সামনে দাড়িয়ে কাঁধের দিকের পিনটা খোলার চেষ্টা করলো।উফহ,প্রীতি যে কিভাবে লাগিয়ে দিয়েছিলো পিনটা।অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও পারছিলো না অভ্রা।হঠাৎ কাঁধে একটা শীতল হাতের ছোয়া পেতেই কম্পমান হলো তার তীর্যক শরীর।আয়নায় তাকিয়ে দেখলো,উষ্ণ মুখে এক বিস্তীর্ণ হাসি নিয়ে পিনটা খুলছে।সক্ষম হতেই সেটি ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে নিজের দুহাতে পেছন থেকে অভ্রার কোমর জড়িয়ে ধরলো। মাথাটা নামিয়ে থুতনি ঠেকলো অভ্রার কাঁধে। দৃষ্টিতে তার আয়নায় অভ্রার প্রতিবিম্বতে।

"বউফুল?"

অভ্রা উত্তর দিলো না,শুধু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো উষ্ণের পানে।

"কালো শাড়িতে,তোমায় আবেদময়ী লাগছে।"

হৃদয়ে সুপ্ত এক লজ্জা কনার বাসা বাধলো যেন অভ্রার।কাঁপা কন্ঠে শুধু উচ্চারণ করলো...

"হুম??"

উষ্ণ উত্তর দিলো না।মোহতায় আচ্ছন্ন হয়ে মুখ ডুবালো অভ্রার মশ্রিণ গলায়,ঘাড়ে।এলোমেলো ওষ্ঠ ছোঁয়ায় ভরিয়ে দিতে লাগলো উত্তপ্ত ফুলকে।সে মিইয়ে যাচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে।শরীরের কম্পন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার অবিরত।ইহাতে উষ্ণ বাঁধা প্রাপ্ত হচ্ছে না।বরং উষ্ণের উদ্দীপ্ত মন, মস্তিষ্ক, আকাঙ্খারা আরো কাছে টেনে নিতে চাইছে ফুলটিকে।

ইশশ,কাঁপা-কাঁপি করেও কেউ পৌরুষ সত্তাকে আকর্ষণ করতে পারে?

কম্পমান ওষ্ঠজোড়ার দিকে নজর আটকাতেই উত্তাল ঢেউয়ে ভাসতে লাগলো যেন উষ্ণ। শিহরিত অনুভুতির দরুন অভ্রার নাকের নিচ আর ঠোঁটের উপর সংলগ্ন অঞ্চলে বিন্দু বিন্দু ঘাম পরিলক্ষিত হলো উষ্ণের।কি জ্বালা,শরীরের এই শ্বেদজল টুকুও তাকে টানছে আজ।ধীরে ধীরে নিজের দুই ঠোঁটের মধ্যাঞ্চল দিয়ে চুষে নিলো সেই স্বেদজল টুকু।অভ্রার নাকে নাক ঠেকিয়ে,দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে ওয়াইনি ভয়েজে বললো....

"ফুল? আই ওয়ান টু প্লে উইথ ইউ। ইটস আ ক্রেজি গেইম ফর মি। আই হার্ডলি নিড ইউ রাইট নাও। উইল ইউ?"

বক্ষস্থলের দ্রুত ওঠানামা চলছে অভ্রার। এ কেমন অনুভূতি, কাঁপতে কাপতেই সাহস সঞ্চয় করে বললো....

"উ্ উষ্ণায়ন,আ্ আমার ভয় করছে।"

উষ্ণ দ্রুত হাতে অভ্রার লতানো কোমর টেনে আরেকটু মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে।সাথে কথার প্যাচ তো আছেই..

"কাম অন ওয়াইফি,,ইট'স মি,ইউর হাসবেন্ড। ওভারোলি, ইউ আর মাই ফ্লাওয়ার।আই নেভার হার্ট ইউ।ডোন্ট এফ্রেইড সোনা। প্লিজ?"

অভ্রার কি হলো বুঝতে পারছে না।মুখ দিয়ে আর একটা কথাও বের হচ্ছে না তার।শক্ত হাতে খামচে ধরলো উষ্ণের পরনের সফেদ রঙা শার্টটি।এতেই যেন সম্মতি পেলো উষ্ণ। কিচ্ছু টি চিন্তা না করে দ্রুত নিজের ওষ্ঠ দ্বারা চেপে ধরলো অভ্রার টসটসা ওষ্ঠদ্বয়।মিষ্টত্ব গ্রহনে রঞ্জিত হলো দুটো মন,দুটো দেহ।ধীরে ধীরে গভীর থেকেও গভীরে যেতে লাগলো বদ্ধ ঘরের উদ্দীপনা।ছোট ছোট লাভবাইটের সাড়া হিসেবে অভ্রার আনাড়িপনায় ঘেরা শিতকারের সাক্ষী হলো উষ্ণ।

কিছু উষ্ণতা,কিছু শীতল অনুভুতি,কিছু সুখের যন্ত্রণার মাধ্যমে অভ্রায়ীনি আর উষ্ণায়ন, মিলিত হলো এক নামে,এক বাঁধনে, পূর্নতার খাতায় আটকা পরলো "উষ্ণায়ীনি"নামের একটি ভালোবাসার পঙক্তি।

অথচ একই ছাঁদের নিচে,একটু দূরত্বে, ঘুমে নিস্প্রভ থাকা প্রচ্ছদ জানতেও পারলো না,তার বিতর্কিত ভালোবাসার মানুষটি আজ, এই রাতে তারই উষ্ণ ভাইয়ের বিছানায় উষ্ণতা ছড়াচ্ছে।

--------------

রোজ নিয়মের মতো আজ আর সকাল সকাল অভ্রাকে দেখা গেলো না।ব্রেকফাস্ট টেবিলে মাত্রই এসে বসলো প্রচ্ছদ।চোখ বুলিয়ে অভ্রাকে না দেখে প্রভাতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেই বসলো..

" অভ্রা কোথায়?"

প্রভাতি হাতের কাজটা একটু থামিয়ে তাকালো প্রচ্ছদের দিকে।ছেলেটা তার নাড়ি কাটা রত্ন।তাই তো বিপথে গেলেও এখনও ছেলের জন্য বুকটা ছিড়ে যায় প্রভাতির।প্রচ্ছদ যে আর আগের মতো নেই,তা মা হয়ে বেশ বুঝতে পারে প্রভাতি।আজকাল ছেলেটা সময় পেলেই অভ্রাকে দেখে।শুধুই দেখে,কিছু বলে না।নিজের বউ ছেড়ে অভ্রার কথা বলে,হুট করেই হেসে বলে,দেখো তো মা,অভ্রাকে আজকাল কেমন বউ বউ লাগে,দিদি,অভ্রার হাত পুড়েছে,কাজ করতে দিবি না একদম কিন্তু ওকে।এইতো কাল দুপুরে হুট করেই একটা শাড়ি এনে প্রভাতির হাতে দিয়ে বললো..

"মা,আজকে অভ্রাকে এটা পড়তে বলো।"

প্রভাতি না চাইতেও নিলো সেই শাড়িটি।সরাসরি বললে অভ্রা তো নিতো না শাড়িটা,তাই তো কায়গা করে উর্মির হাতে দিয়েছে,তাও উষ্ণের নাম করে।সন্ধ্যায় পুরো অনুষ্ঠানে প্রচ্ছদ যে তার পছন্দ করা শাড়িতে অভ্রাকেই দেখে গেলো,তাও খেয়াল করলো প্রভাতি,প্রীতিরা।এ কেমন পাগল করে দিচ্ছে ছেলেটাকে। ভালোবাসে মানলাম।তাই বলপ এই একপাক্ষিক পাগলামি কি করা সাজে?অভ্রার দোষ তো দেওয়া যায় না,মেয়েটাও তো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এই প্রচ্ছদের পাগলামি তে।

"কি হলো মা,অভ্রাকে দেখছি না যে?"

ঘোর ফিরলো প্রভাতির।আবারো কাজে মন দিয়ে আস্তে করে বললো...

"জানিনা,আজ এখনো আসেনি নিচে।"

একটু পরেই উষ্ণ এসে বসলো চেয়ার টেনে।প্রনতিই এবার জিজ্ঞেস করলো...

"কিরে,বৌমা কোথায়।এখনো আসে নি যে?"

উষ্ণ খাবার বাড়তে বাড়তে বললো...

"ফুলপর শরীরটা ভালো নেই মা,,রুমেই আছে।"

প্রভাতি এবার একটু চিন্তিত হয়ে বললো..

"ওমা,সে কি কথা।তো নাস্তা টা করে নিতো.."

"মাসিমনি,চিন্তা করো না।আমি নাস্তা নিয়ে যাবো না হয় রুমে ওর জন্য। সমস্যা নেই।"

উর্মি এবার হাত বাড়িয়ে নাস্তা বাড়তে বাড়তে বললো...

"ঠিক আছে তোমরা খাও,আমি অভ্রাকে নাস্তা দিয়ে আসছি।"

কথাটা শুনেই উষ্ণ তাড়া দিয়ে বললো...

"এই এই নাহ,,তুই যাস না।ত্ তুই বস,,ও তো ঘুমাচ্ছে এখনো।আমিই নাহয় নিয়ে যাবো।বস তুই।"

প্রীতি বুদ্ধিমতি বেশ।কিছু একটা আন্দাজ করেই উর্মিকে চোখের ইশারায় মানা করলো যেতে।কথাটা ওখানেই থামলো।

কিন্তু নিপরীতে বসে থাকা প্রচ্ছদের মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা।বুক কাঁপছে তার।তার জন্য অভ্রার কোনো ক্ষতি...না নাহ,এটা হতে দেওয়া যায় না।এলোমেলো দৃষ্টিতে পুরো সময়টা একবার উষ্ণের দিকে,তো আরেকবার উষ্ণ অভ্রার রুমের বদ্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে কাটালো।

উষ্ণ খাওয়া শেষ করে অভ্রার খাবারটা নিয়ে রুমের দিকে যেতে নিলেই জায়গা খালি পেয়ে প্রচ্ছদ গিয়ে দাঁড়ালো উষ্ণের সামনা সামনি।বুক কাঁপছে তার।তবুও কন্ঠে জোড় এনে প্রশ্ন করলো উষ্ণকে...

"অভ্রার কি হয়েছে,আমাকে বল।"

উষ্ণ চুপ রইলো।তা দেখে প্রচ্ছদ আবারও সন্দিহান কন্ঠে বললো...

"ক্ কালকে অভ্রা আমার দেওয়া শাড়িটা পড়েছে বলে,তুই ওকে ম্ মকরেছিস তাই না?কিরে বল?"

উষ্ণ চেয়ে দেখলো প্রচ্ছদের ভয়,উদ্বিগ্নতা।আবারো বললো...

"চুপ করে থাকিস না উষ্ণ, বল আমায়,,তুই মেরেছিস ওকে?,,দেখ,এতে ওর কোনো দোষ নেই,ও্ ও জানে না যে শাড়িটা....ত্ তুই ওকে কষ্ট দিতে পারিস না।আ্ আমার অভ্রা কষ্ট পেলে আমি তোকেও ছাড়বো না উষ্ণ। "

উষ্ণ ঘন এক নিঃশ্বাস ফেললো। নিজের টিশার্টের লম্বা হাতা দিয়ে প্রচ্ছদের কপাল,গলা মুছে দিতে দিতেই হালকা হেঁসে বললো...

"রিলাক্স প্রচ্ছদ ভাই। ঘামছিস তুই,,এতো টেনশন করিস না,এমন কিছুই হয়নি।,,তুই আমাকে চিনিস প্রচ্ছদ ভাই,আমি এই সামান্য কারনে কখনোই আমার ফুলকে কষ্ট দিতে পারবো না। চিন্তা করিস না তুই।ও ঠিক আছে। "

প্রচ্ছদের হঠাৎ কি হলো জানা নেই।দু হাতে উষ্ণের একটি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বলতে লাগলো..

"প্লিজ উষ্ণ,, আ্ আমার অভ্রা,তোকে খুব বিশ্বাস করে। আমার পরে দ্বিতীয়বারের মতো তোকে চাইছে সে।আ্ আমার মতো তুই ওকে ঠকাস না।আ্ আমার অভ্রাকে আগলে রাখ তুই।কখনো ওকে কষ্ট দিস না। ওর মতো কাউকে পাবি না তুই।কখনোই পাবি না।আমি হারিয়েছি তো,তাই বুঝছি, তুই অন্তত ওর হৃদয় ভেঙে দিস না।"

উষ্ণ হাসলো আলতো করে।হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে প্রচ্ছদের কাঁধে হালকা চাপড় দিয়ে বললো...

"ডোন্ট ওয়ারি।ও আমার ফুল তো,আমি ফুলের মতোই যত্ন নেবো ওর।তুই শান্ত থাক।হুম?"

প্রচ্ছদ কিছুটা শান্ত হতেই উষ্ণ এগিয়ে যেতে নিলো রুমের দিকে।আপন মনেই বিরবির করলো...

"তোমার দু দুটো প্রেমিকপুরুষ আমায় গুরুদায়িত্ব দিয়েছে ফুল।তোমায় আগলে রাখার দায়িত্ব। আমি নিজের চিন্তায় না হলেও,অন্তত টুটুল আর প্রচ্ছদ ভাইয়ের দেওয়া দায়িত্বটা পালন করতেই সারাজীবন আগলে রাখবো তোমায়।এই উষ্ণায়ন কথা দিলো,টুটুল,প্রচ্ছদ ভাই,আর তোমাকেও।"

------

সাড়ে বারোটার দিকে ড্রয়িংরুমে বসে দোকানের হিসেব মিলাচ্ছিলো প্রচ্ছদ,কাল থেকে আবার ফিরবে তাই।মাথাটা হালকা ধরেছে বলে এক কাপ চা চাইলো রান্নাঘরে হাপ পেড়ে।একটু পরেই টেবিলপর উপর ছোট্ট একটা ট্রে এসে থামলো।সেখান থেকেই চায়ের কাপ আর বিস্কিটের প্লেটটা নামিয়ে রাখছিলো দুটো শাখা-পলা পরিধান করা হাত।সেই হাতের মালিককে দেখার জন্যই চোখ দুটি হালকা উপরে তুলতেই দৃষ্টি গিয়ে আটকালো তার গলার কাছটায়।শ্যাম বর্ণীয় শরীরে স্পষ্ট হয়ে আছে লালছে দাগটি।তুখর মস্তিষ্ক প্রচ্ছদের,মুহুর্তেই বুঝে গেলো দাগটি কিসের হতে পারে।বুঝতে পেরেই দৃষ্টি আরেকটু উপরে তুলতেই ঘোমটায় আবরিত অভ্রার ছোট্ট মায়া মুখটু ভেষে উঠলো।সাথে সাথেই যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো প্রচ্ছদের।চিন্তা ভাবনারা কিয়াৎক্ষনের জন্য যেন হাওয়া হয়ে গেলো মাথা থেকে। কি দেখছে সে?

আহ যন্ত্রণা, সকাল থেকে ভাবছে, উষ্ণ তার অভ্রাকে মেরেছে কিনা,কিন্তু বাস্তবতা যে পুরোটাই ভিন্ন।সবটা গুছিয়ে ভাবতেই প্রচ্ছদ বুঝলো,,তার অভ্রাকে উষ্ণ মারেনি,কষ্ট দেয়নি।বরং মুড়িয়ে রেখেছে ভালোবাসার চাদরে,সারাটা রাত ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছে তার অভ্রার ছোট চিত্রাঙ্কনের মতো লতানো দেহটিকে।

ইশশ,প্রচ্ছদ কাকে বোঝাবে,এই মুহুর্তে তার হৃদয়ে চলতে থাকা দামামা বাজানো, কম্পিত ধ্বনিহীন যন্ত্রণাটুকুর অনুভূতি?

তুমি কোন কাননের ফুল গল্পটি অভ্রায়ীনি ঐশি-এর লেখা একটি জনপ্রিয় সাংসারিক রোমান্টিক গল্প