~তুমি কোন কাননের ফুল,
কোন গগনের তারা।।
তোমায় কোথায় দেখেছি,
যেন কোন স্বপনের পাড়া..~
গানের গলাটা বরাবরই সুন্দর প্রচ্ছদের।এই দিক দিয়ে উষ্ণের চাইতে প্রচ্ছদ এগিয়েই আছে বলতে গেলে।আর এখন,সেই সুরেলা কন্ঠেই বিষাদের অশ্রু নিয়ে গানটি আওড়ালো প্রচ্ছদ।নিশির আভাসে গানটা আরো রোমাঞ্চকর ঠেকলো তার নিজের কাছেই।আর যে কেউ নেই তার গান কিংবা অন্তরালের আহাজারি শুনবার জন্য।
গানের চারটি লাইন পেরোতেই থেমে গেলো প্রচ্ছদ।আপন মনে ভাবলো..
"সত্যিই তুমি এখন সম্পূর্ণ উষ্ণের কাননের ফুল।তোমাকে পাওয়া আর আমার কপালে নেই গো অভ্রা।কেন যে হারালাম তোমায় দুটো বছর আগে।সেই একটা ভুলের জন্য কি বিষন্ন শাস্তিটাই না দিলে তুমি আমায়।ইশশ,ভালোবাসাটা আমি বুঝে উঠার আগেই ভালোবাসাটাই হারিয়ে দিলো আমায়।আমি মানুষটা আর সুখ পাইলাম না জীবনে।"
সেই রাতটি প্রচ্ছদের পাশে তার বিয়ে করা বউ ছিলো রোজকার মতোই।কিন্তু সেই অতি সুন্দরী রমনীকে ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্খা আর জাগে না এখন।প্রীথুলা নিজেও আর প্রচ্ছদকে কাছে টানে না।
সম্পূর্ণ রাতখানাই বিনিদ্রায় কেটেছে প্রচ্ছদের।চোখ দুটো নিবদ্ধ ছিলো উপরে সিলিংয়ে ঝুলতে থাকা ফ্যানটিতে।কি করবে সে?চোখ বুজলেই যে অভ্রার গলায় উষ্ণের দেওয়া সেই ভালোবাসার চিহ্নটি ভেসে উঠছিলো চোখের পাতায়।সাথেই বারবার হুঙ্কার দিয়ে কেঁপে উঠছিলো প্রচ্ছদের শরীর। ইচ্ছে করছিলো ছুটে গিয়ে অভ্রার এলিয়ে পড়া শরীরটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতে...
"তোমায় আজীবন দুচোখ ভরে দেখার সুযোগটা অন্তত দাও অভ্রা?"
কিন্তু পারলো না প্রচ্ছদ।রাত গুলো যে এখন থেকে উষ্ণ আর অভ্রার হবে।প্রচ্ছদ কি করে যায় সেই ভালোবাসার সন্ধিক্ষণে? এখন তো আর এতটাও বিবেকহীন নয় প্রচ্ছদ।তেমনি করেই প্রচ্ছদ পারলো না তার ভালোবাসার মানুষটিকে সময় চোখে নিবদ্ধ করতে।পারলো না সে,হয়তো আর কখনো পারবেও না।
পরদিন সকালেই প্রভাতিদের পরিবার নিজ গন্তব্যে রওনা দিলো।সাথে প্রচ্ছদও। মনটা কেমন দোটানায় আবদ্ধ হচ্ছিলো তার।আর থাকতে চায়না সে এই কুমিল্লায়।এই শহর তাকে কতশত বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে।ভালোবাসা খুঁজে পেলো,নিজের চোখে মনের মানুষটির বিয়ে দেখলো,সিঁদুর পরিহিত তার প্রিয় মানুষটিকে অন্যের বউ রূপে দেখলো।দেখলো লাল টুকটুকে রাঙা শাড়িতে,রাঙা মুখের লাজুক হাসিটাও দেখে নিলো প্রচ্ছদ।অবশেষে প্রিয় মানুষটিকে দেহ মন দু দিক দিয়েই অন্যের হতে দেখলো। শহরটা যে বিষাক্ত এই প্রচ্ছদের জন্য। তাই তো যত দ্রুত সম্ভব এই শহর ছাড়তে চায় সে।তার ঐ হাটে বাজারের ভীড়ে ছোট্ট শহরটাই শ্রেয়।
কিন্তু, আবার যখন মাথায় আসছে,আজ থেকে রোজ আর অভ্রার মুখটা দেখতে পাবে না।মেয়েটার নীরব চোখে তাকানো টাও আর দেখতে পাবে না। এসব ভাবলেই আর যেতে ইচ্ছে করে না।আরো কিছুটা সময় থাকতে ইচ্ছে করে অভ্রার কাছে।ছুঁয়ে দেখার তো উপায় নেই, প্রচ্ছদ না হয় চোখের তৃষ্ণাটাই মেটালো।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সবাইকেই নিজের জিবনে ফিরতে হবে।প্রচ্ছদকেও আবার সেই গিয়ে শো রুমে কাজ করতে হবে,দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায়ও ফিরতে হবে তাকে। চলতে হবে সেই আগের মতোই।তাইতো ফিরে আসার ইচ্ছে না থাকলেও ফিরতে হলো তাকে তার ছোট্ট শহরে।
--------------
পিছুটান নিয়ে সময় থেমে থাকেনা কারোর জন্যই।তেমনি সময়,সম্পর্ক দুটোই এগিয়েছে অভ্রা আর উষ্ণের।বিয়ের প্রায় তিনবছর হয়ে এসেছে তাদের।চলমান জনমে তেমনি উন্নতি হয়েছে অভ্রার অনেক কিছুই।মেয়েটা এখন বলতে গেলে দায়িত্বশীল বউ।নিজের শাশুড়ী, ননদের সাথে সাথে মন জুগিয়ে চলছে প্রভাতি,প্রীতি সবারই।তবে সন্নিহিত কারন ছাড়াই অভ্রার প্রতি বিষাক্ত ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছে প্রীথুলার মনে।বলতে গেলে অভ্রাকে সে দু চোখের বিষ মনে করে।
বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে থাকা প্রচ্ছদের কানে এসে লাগলো প্রভাতি,প্রীতি,বেলিদের উচ্ছসিত কন্ঠ।কথার ধরন দেখেই প্রচ্ছদ বুঝে গেলো তার অভ্রার সাথে ভিডিও কলে ব্যস্ত সবাই।
তার অভ্রা,কথাটা মাথায় আসতেই হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো বিছানা থেকে।দ্রুততার সহিত ফোনের গ্যালারি সেকশন থেকে বের হলো। যেখানে এতক্ষণ ধরে অভ্রার হাস্যজ্জল কিছু ছবিতে মোহিত ছিলো প্রচ্ছদ।রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েই সোফায় জড়ো হয়ে বসা সবার প্রতি দৃষ্টি দিলো। তারপর নীরবে একটু আড়াল করে দাড়ালো,যাতে ফোনের বিপরীত প্রান্তের মায়াবী চোখ দুটিতে না আটকায় সে,তবে নিজে দাড়িয়ে ঠিক দেখবে তার অভ্রার ফুলা ফুলা মুখখানি।শুনবে মেয়েটার বলা কিছু মধুর মতো কথা।
মেয়েটাকে আগে থেকে একটু মোটা হয়েছে। তাই আজকাল তাকে একটু গুমলুগামলুই লাগে।মিষ্টি, মিষ্টি ভাব কেমন যেন।তবে শরীরের ভারে কন্ঠস্বরটা একটু ক্ষীণই শোনায়। ঐ টুকু শরীর আর কতই বা সইবে।অবশ্য এই সময়ে এরকম টুকটাক হয়েই থাকে।মা হচ্ছে যে অভ্রা।উষ্ণের সন্তানের মা।কি দারুণ অনুভূতি। অথচ বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পাড় হতে চললো প্রচ্ছদ -প্রীথুলার।তবুও প্রচ্ছদ একটিবারের জন্যও প্রীথুলাকে রাজি করাতে পারলো না সন্তান নেওয়ার কথায়।অথচ এই নিকৃষ্ট প্রচ্ছদ সেই প্রথম থেকেই ভীষণ বাচ্চা প্রেমী।
আড়ালে দাঁড়িয়ে অভ্রাকে দেখতে দেখতে ঠিক এসবই ভাবছিলো প্রচ্ছদ।প্রীথুলা বাড়ি নেই।কোথায় গেছে জানে না প্রচ্ছদ,জানতে চায়ও না আজকাল প্রীথুলা এমন হুটহাট কোথায় যায়।কেমন যেন ইচ্ছে হয় না প্রীথুলাকে নিয়ে ভাবতে।প্রীথুলা থাকলে এতোক্ষণে ঠিক তাচ্ছিল্য করতো প্রচ্ছদকে। প্রথমেই বলে উঠতো,"লজ্জা নেই তোমার?বিবাহিত মহিলার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকো?"
এমনটা এখন প্রায়ই হয়।তবুও প্রচ্ছদ থামায় না নিজের অসভ্য অভ্যাসখানা।অভ্রার মুখখানি না দেখলে যে প্রচ্ছদের রাতটা গলা কা*টা পশুর মতো ছটফট করে কাটাতে হয়।
বিষয়টা বাড়ির সকলেই জানে।প্রভাতি,প্রীতি,বেলি সকলেই।তবুও তারা প্রচ্ছদকে বারণ করে না।ছেলেটাকে দেখলে তাদেরও যে বুক পুড়ে রোজ।গত তিনটা বছরে প্রচ্ছদের মুখে আর উচ্ছাসিত হাসি দেখা যায়নি।এক অভ্রাতে মাতাল হয়ে প্রচ্ছদ আগের সব নেশা ছেড়েছে,সুঠাম দেহের যত্ন নেওয়া বাদ দিয়েছে,রাতভর ভিন্ন নারীতে মত্ত থাকা প্রচ্ছদ এখন সময় হলেই নীড়ে ফিরে আসে,এসেই প্রথম প্রশ্ন করে."অভ্রার সাথে কথা হয়েছে?ভালো আছে তো আমার অভ্রা?"
-------
ধর্মীয় মতে গর্ভাবস্থার সপ্তম মাসে স্বাধ দেওয়ার আয়োজন করা হয়েছে অভ্রার আজ।তাই তো কুমিল্লার সেই পরিচিত ফ্ল্যাটের ছয় তলায় আজ একটু বেশিই ভীড়।এসেছে প্রীতি,প্রভাতি, প্রচ্ছদ সহ বাকিরাও।বিয়ের পর এই নিয়ে পঞ্চম বারের মতো দেখা হলো প্রচ্ছদ অভ্রার।নীরব দৃষ্টিতে দেখলো অভ্রার ফুলে ফেঁপে উঠা শরীরটাকে।মুহুর্তেই কেমন যেন এক শিহরণ বয়ে গেলো প্রচ্ছদের মধ্যে।
অভ্রার অন্তঃস্থলে বেড়ে উঠছে ছোট্ট একটি প্রাণ।পাঁচ বছর আগের বেখেয়ালি,দূরন্তপনায় ঘেরা মেয়েটি আজ কত ধীরে সুস্থে হেটে আসছে,যেন নিজের মাঝে বেড়ে উঠা প্রাণটি আঘাত না পায়।সেই প্রাণটা যে উষ্ণের অংশ,আর কয়েকমাস পরেই উষ্ণ বাবা হওয়ার অনুভূতিটা পাবে।ইশশ,ভাগ্য কি নিদারুণ খেল দেখাচ্ছে প্রচ্ছদকে।অভ্রা যদি তার হতো,তাহলে আজ যে ঐ প্রাণের বাবা হওয়ার অনুভুতিটা প্রচ্ছদই পেতো।কোলে তুলে নিতো তার অভ্রার অংশকে।আহ,প্রচ্ছদের যে বাবা ডাক শুনার ভাগ্য নেই।
সফ্ট কাতান শাড়িটা দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ আবৃত করে রাখার পরও অভ্রার উঁচু পেটটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। উর্মির সাহায্যে ড্রয়িংরুমে স্বাধেয় জায়গায় এসে দাঁড়ালেই রজনী বলে উঠলো..
"ওমাহ,,সবকিছু নিচে কেন করা হয়েছে?অভ্রার এখন নিচে বসাটা ঠিক হবে না।"
প্রীতিও বললো...
"হ্যা,তাইতো।এমনিতেই সাত মাসেই কেমন নেতিয়ে গেছে মেয়েটা।তারউপর এখন নিচে বসলে যদি কিছু হয়?চেয়ার টেবিলে বসালেই তো হতো।"
তখনই বয়স্ক এক মহিলা বলে উঠলো...
"এখনকার আবার কত কিছু।বলি,আগে আমরা নয় মাসের পেট নিয়েও বাড়ির সব কাজ করতাম।এখন নাকি সামান্য একটু মাটিটে বসলেই সমস্যা হবে।"
পাড়া এলাকায় এমন কিছু হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই তো লোক মুখের কথা আটকাতে অভ্রার মা অলকা এসে মেয়েকে আগলে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো...
"কিরে মা?কিছুক্ষণ একটু নিচে বসতে পারবি না?একটু সহ্য কর?বেশি কষ্ট হবে মা?"
তখনই প্রনতি এসে বললো...
"থাক বেয়াইন।বৌমাকে এতো চাপ দিতে হবে না।না পারলে নেই।আমি সব টেবিলে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।স্বাধ তো স্বাধই।সে নিচে বসে হোক বা টেবিলে।মুখে নেওয়াটাই আসল।"
কথাটা শুনে কিছু কিছু মহিলা মুখ ভেংচি দিলো,যা অভ্রার চোখ এড়ালো না।তাই তো প্রনতিকে বাঁধা দিয়ে বললো...
"থাক না মা।আমি নিচে বসেই পারবো।কিছুক্ষণেরই তো ব্যপার।সমস্যা নেই।"
উষ্ণ কাছেই ছিলো।অভ্রার কথা শুনে সেও এগিয়ে এসে বললো..
"এই,তুমি পারবে?ব্যাথা লাগবে তো তোমার।"
অভ্রা তাকালো উষ্ণের দিকে।আবদারি সুরে বললো..
"কিছুক্ষণেরই ব্যপার।বসিই না নিচে।কিছু হবে না।"
উষ্ণ নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো অভ্রার মায়া ভরা মুখটার দিকে।থেমে বললো..
"পারবে তো?"
অভ্রা উপর নিচ মাথা ঝাকালো।উষ্ণও আলতো হেসে বললো..
"ঠিক আছে।বসো।"
এরপর প্রীতির দিকে তাকিয়ে বললো...
"দিদি,,বেশি সময় যেন না লাগে,একটু দেখিস প্লিজ।ফুলের কষ্ট হবে।"
------
স্বাধ শুরু হতেই একে একে সবাই এসে অভ্রাকে সাজানো থালা থেকে এটা ওটা তুলে একটু একটু করে খাইয়ে দিতে লাগলো।বাড়ির সকলের হলেই পাড়া প্রতিবেশিও খাইয়ে দিতে লাগলো অভ্রাকে।প্রতিবেশি এক কাকিমা এসে অভ্রার মুখে ভাত তুলে দিয়ে চোখ বুলালো অভ্রার উঁচু পেটএ।এরপর এক হাসি দিয়ে পাশে থাকা প্রনতির দিকে তাকিয়ে বললো...
"কি গো প্রনতি,তোমার তো নাতনি হবে মনে হচ্ছে। সাত মাসেই পেট এতটা ফুলেছে?ছেলে হলে পেট এতো ফুলার কথা তো নয়।বুঝলে প্রনতি,মিলিয়ে নিও আমার কথা।"
প্রনতিদেবীর বড় শখ,তার ছেলের প্রথম সন্তান যেন পুত্রই হয়।তাহলে যে বংশ টিকিয়ে রাখার কেউ থাকবে।
মহিলার কথা শুনে মুখটা একটু গোমড়া হলো ঠিকই।তবুও তিনি কিছু বললেন না।আর যাই হোক,অভ্রা তো আর নিজে হাতে পেটের সন্তানকে বানায় নি,যে চাইলেই ছেলে বানিয়ে দিবে।যা হবার হোক,দেখা যাবে।
অভ্রার চোখ এড়ায়নি প্রনতিদেবীর মন খারাপের বিষয়টি।নিজের কাছেও তো খারাপ লাগে অভ্রার,মায়ের ইচ্ছেটা যদি পূরণ না হয়?
প্রীতি দেখলো অভ্রার মন খারাপটি।আস্তে করে পাশে এসে বসলো সে অভ্রার। মুখে হালকা হাসি এনে বললো...
"কিরে মন খারাপ করছিস কেন?"
অভ্রা মুখ ছোট করে বললো...
"যদি মেয়ে হয় না যে খুব কষ্ট পাবে।"
"আর তুই?আমি তো শুনেছি,তোর নাকি মেয়ে বাবুর অনেক শখ?তোর শখের কি হবে?"
"আমার কথা থাক না দিদি।কিন্তু বাকিরা তো খুশি হবে না।"
"চিন্তা করিস না তো।কিচ্ছু হবে না পাগল মেয়ে।এতো টেনশন করে লাভ আছে?নিজের অবস্থাটা দেখ একবার।এমনিতেই তোর হাটতেও কষ্ট হচ্ছে।এই সাত মাসেই এতো উঁচু পেট নিয়ে চলছিস,তার উপর যদি আবার টেনশন করিস,তাহলে তো আরো কষ্ট হবে তোর।"
অভ্রা নিচের দিকে তাকিয়ে বললো...
"আমি যদি মায়ের মুখে হাসি ফুটাতে না পারি?"
প্রীতি একটা নিঃশ্বাস ফেললো।জিজ্ঞেস করলো..
"ডাক্তার কি বললো?ছেলে না মেয়ে?"
অভ্রা বোকার মতো দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো..
"আমি তো জানি না দিদি।"
"জানিস না মানে?ডাক্তার বলেনি?"
"বলেছে তো তোমাদের ভাইকে।ও আমাকে বলছে না।অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি।ও তো কিছুই বলেনি,আমাকেও বলে না,মাকেও বলে না।"
প্রীতি চোখ তুলে তাকালো দূরে প্রচ্ছদের পাশে বুকে দুহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা উষ্ণের দিকে।প্রীতির দৃষ্টি অনুসরণ করে অভ্রাও তাকালো।
অভ্রাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে,উষ্ণ ভ্রু কুঁচকালো। ঠোট নাড়িয়ে অভ্রাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো..
"কি হলো?খারাপ লাগছে?"
বুঝতে পেরে অভ্রা দু পাশে মাথা নাড়ালো।সম্পূর্ণ দৃশ্যটা মনোমুগ্ধকর দৃষ্টি নিয়ে দেখলো প্রচ্ছদ।ইশশ,উষ্ণ কতটা যত্ন করে তার অভ্রার।আচ্ছা,আজ যদি অভ্রা তার বউ হতো,তাহলে কি প্রচ্ছদ উষ্ণের মতো করে এতটা যত্ন নিতে পারতো তার অভ্রার? নারহ,,পারতো না প্রচ্ছদ।নিজেকে যে খুব ভালো করেই চেনে প্রচ্ছদ।অভ্রা উষ্ণের কাছে যত্নের পুতুল,তার কাছে যে এতটা যত্ন পেতো না অভ্রা।হাহ,,উপরওয়ালা হয়তো ইচ্ছে করেই অভ্রাকে উষ্ণের হাতে তুলে দিয়েছে।কথায় আছে না?ফুল গাছেই মানায়,ঠিক তেমনই।
সেই সময় একজন আত্মীয় অভ্রা না করার পরেও মাছের মাথা থেকে একটু মুখে তুলে দিয়েছিলো আহ্লাদ করে।অভ্রাও না পারতে মুখে নিলো।এখন সেই থেকে কেমন গা গুলাচ্ছে তার। অবস্থা খারাপ দেখে সে পাশ ফিরে প্রীতিকে বললো..
"দিদি,আর পারছি না।বমি আসছে আমার খুব।"
এই কথা শুনেই প্রীতিও সবাইকে মানা করলো আর খাওয়াতে।সবাইও মানলো।প্রীতি অভ্রাকে ধরে বললো...
"নে ওঠ এবার।আর এভাবে বসে থাকতে হবে না।"
অভ্রাও মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।তবে একটু নড়ে উঠতে গেলেই তলপেটে ভীষন ব্যাথা অনুভব করলো সে।সাথে সাথেই ব্যাথায় কুকড়ে নিলো মুখটি।তা দেখেই সাথে সাথে দৌড়ে এলো উষ্ণ। আগলে ধরলো তার শ্যামাফুলকে।উদ্বিগ্ন হয়ে বললো...
"কষ্ট হচ্ছে তোমার,ফুল?"
অভ্রা আস্তে আস্তে একটু স্বাভাবিক হলো।বললো..
"ঠিক আছি।"
উষ্ণ সহ বাকিরাও একটু স্বস্তি পেলো।
"আচ্ছা,, আস্তে আস্তে উঠো,আমি হেল্প করছি। "
বলেই স্বযত্নে অভ্রাকে আগলে দাড় করালো উষ্ণ। অনেকক্ষণ বসে থাকার কারনে শরীরের ভারে মেয়েটা ঠিক মতো দাঁড়াতেও পারছে।হঠাৎই হেলে পড়ে যেতে নিলেই উষ্ণ সহ পেছন থেকে উর্মিও ধরে নিলো তাকে।প্রীতিও চিন্তিত হয়ে বললো...
"ইশশ,মানা করেছিলাম নিচে বসাতে।এখন দেখছেন তো আপনারা?অভ্রা তুই ও না,,কি সবার কথায় বসে পড়লি নিচে,নিজের খেয়ালটা রাখতে হবে তো এখন নাকি?"
উষ্ণ বকলো না অভ্রাকে।আস্তে করে অভ্রার হেলে পড়া আচলটা টেনে ঠিক করে দিয়ে বললো...
"বেশি কষ্ট হচ্ছে তোমার?আমায় অন্তত বলো?"
অভ্রা কাতর কন্ঠে বললো...
"পা দুটো ট্ টলছে।হাটতে পারবো না এখন।এ্ একটু বসে,তারপর যাই?"
ঢোক গিললো উষ্ণ। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো...
"এই ভীরে এখন আর আসতে হবে না।আরো অস্বস্তি লাগবে তোমার।রুমে গিয়ে একটু রেস্ট নেবে চলো।"
বলেই উষ্ণ ধীরে সুস্থে অভ্রার ভারি শরীরটাকেই পাঁজা কোলে তুলে নিলো।একটু কষ্ট হচ্ছে তারও,তবুও সে সামলে নিলো নিজের ফুলটিকে।ধীরে ধীরে দু পা এগোতেই কানে এসে লাগলো এক মহিলার কথা...
"ওমা প্রনতি,,তোমার ছেলে তো দেখি খুব বউ পাগল হয়েছে।দেখো,তোমায় আবার যেন ছুঁড়ে না ফেলে.."
তিক্ত কথা সইতে পারে না অভ্রা।নিজের অজান্তেই শার্টের কলারখানা খামছে ধরলো উষ্ণের। উষ্ণও থেমে গেলো।কোলে থাকা ফুলটির করুণ মুখখানির দিকে একবার তাকিয়ে মহিলাটিকে কিছু বলতে যাবে,তার আগেই প্রনতি দেবীর কথা কানে এলো।তিনি মহিলাটিকে হেসে হেসেই জবাব দিলেন...
"ওমাহ, ছেলেকে বিয়ে করিয়েছি।বউ পাগল হবে না তো অন্য মেয়ের জন্য পাগল হবে নাকি?আর ছেলে তো আমায় অবহেলা করছে না গো। মাকে মায়ে মতোই ভালোবাসে,বউকে বউয়ের মতো। আর কি বললে?ছেলে আমায় ছুড়ে ফেলবে?,,ভাগ্য করে একটা বৌমা পেয়েছি বুঝলে তো দিদি,ছেলে আমায় ছুড়ে ফেলার আগে আমার বৌমা এ ছেলেকে ছুঁড়ে ফেলবে,তবুও আমায় ছাড়বে না আমার বৌমা।"
মহিলাটি আর একটি কথাও বললো না।উষ্ণ হালকা হেসে অভ্রাকে আস্তে করে বললো...
"তোমার শাশুড়ীকে দেখেছো?পিওর বৌমা কেয়ারিং।"
অভ্রাও হালকা হাসলো।উষ্ণ আবার হাটা ধরে বললো...
"বাই দা ওয়ে ফুল,,আন্টিটা এমন ভাবে কথাটা বললো,যেন আমরা ফের ফুলসজ্জা করতে যাচ্ছি। তাই না?"
অভ্রা লজ্জায় রাঙা হয়ে মুখটা গুঁজে দিলো উষ্ণের বুকে।বললো...
"নির্লজ্জ লোক কোথাকার।"
প্রশান্তময় হেসে উষ্ণও জবাব দিলো..
"আর আপনি আমার লজ্জাবতী ফুল...!""