জার্মানিতে এখন ‘ফল’ বা শরৎ বিদায়ের সুর। রাইন নদীর তীরের গাছগুলো থেকে লাল-হলুদ পাতা ঝরে পড়ে মাটির বুক ঢেকে দিচ্ছে। পেখম নদীর পাড়ে বসে ছিল। পরন্ত বিকেলের সোনালী আলো যখন পানির ওপর ঠিকরে পড়ছে, তখন চারপাশের দৃশ্যটাকে মনে হচ্ছে কোনো ধ্রুপদী চিত্রকলা। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার পূর্বাভাস। বাতাসের আর্দ্রতা কমে এখন তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছে,আজকের থার্মোমিটার বলছে তাপমাত্রা ৩° সেলসিয়াস।
একটা জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল বলে পেখমকে উঠতে হলো। কাজ শেষ করে যখন সে ফেরার পথ ধরল, দেখল শহরের পরিবেশটা একটু থমথমে। হঠাৎ কানে এল শোরগোল আর স্লোগান। কোনো এক ইস্যুতে বড়সড় বিক্ষোভ চলছে রাজপথে। পুলিশ রাস্তা ব্লক করে দিয়েছে, সাধারণ মানুষ মেইন রোড ছেড়ে উল্টো পথ দিয়ে বাড়ি ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পেখম এখন আর ডরমিটরি বা স্টুডেন্ট হোস্টেলে থাকে না। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের আয়ে দুই রুমমেটের সঙ্গে মিলে একটা ছোট ছিমছাম বাসা ভাড়া নিয়েছে সে। কিন্তু আজকের এই পরিস্থিতিতে ঘরে ফেরাটাই যেন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঠিক তখনই পকেটে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ক্যাস্পিয়ানের নাম। সংক্ষেপে মেসেজ এসেছে ‘আপনার লোকেশন দিন।’
পেখম দ্রুত লোকেশন শেয়ার করল। এদিকে বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়ছে। পুলিশ লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া শুরু করেছে। চারদিকে হুড়োহুড়ি, চিৎকার। পেখম ভিড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তার ওপর বাইরের কনকনে ঠান্ডা যেন তীরের মতো গায়ে বিঁধছে।
হঠাৎ মানুষের সেই জনসমুদ্রের মাঝে একজনের চেনা অবয়ব নজরে এল। ক্যাস্পিয়ান! পেখমকে দেখতে পেয়ে ক্যাস্পিয়ানের পাথুরে মুখে যেন স্বস্তির একটা হালকা রেখা ফুটে উঠল। তখনই একদল লোক হুড়মুড় করে তাদের দিকে দৌড়ে এল। ধাক্কাধাক্কির চোটে পেখম যখন পড়ে যাচ্ছিল, ক্যাস্পিয়ান এক ঝটকায় তাকে নিজের কাছে আগলে ধরল। বিশালাকার ক্যাস্পিয়ান দেয়ালের মতো সামনে দাঁড়িয়ে থেকে পেখমকে ঘিরে রাখল, আর তার পেছন দিয়ে সব বিশৃঙ্খলা বয়ে গেল।
সেই উত্তেজনার মুহূর্তে পেখমের হাতটা অজান্তেই ক্যাস্পিয়ানের মুখের সেই পুরনো কাটা দাগের ওপর গিয়ে পড়ল। আলতো স্পর্শে সে যেন অনুভব করতে পারল ওই গভীর ক্ষতের ভেতরের অব্যক্ত যন্ত্রণা।তার চোখের দিকেই অপলক তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ ।
ঠান্ডায় পেখম যেন জমে বরফ হয়ে যাচ্ছিল। কোনো উপায় না দেখে ক্যাস্পিয়ান তাকে নিয়ে কাছের একটা পুরনো দিনের গেস্ট হাউজে ঢুকল। ঘরের ভেতরে পা রাখতেই হিটারের উষ্ণতা গায়ে লাগল। ক্যাস্পিয়ান দক্ষ হাতে ফায়ার প্লেসে কাঠ সাজিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিল।
আগুনের লেলিহান শিখা যখন ঘরের কোণগুলো উজ্জ্বল করে তুলল, পেখম লক্ষ্য করল ক্যাস্পিয়ান একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তার দিকে এক মগ গরম কফি এগিয়ে দিল। গেস্ট হাউজটি খুব সুন্দর, কাঠের আসবাবপত্র আর ধোঁয়া ওঠা কফির গন্ধে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
শরীরটা একটু চাঙা হতেই পেখম প্রফেশনাল ভঙ্গিতে ক্যাস্পিয়ানের সামনে এসে বসল। শান্ত গলায় বলল, "দেখি আপনার পায়ে কী হয়েছে? দিন তো।"
ক্যাস্পিয়ান কফির মগে চুমুক দিয়ে নির্লিপ্তভাবে বলল, "বাইরে ভিড়ের মধ্যে একটু মচকা লেগেছে বোধহয়। ও কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে।"
পেখম একটু বাঁকা হেসে জবাব দিল, "আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন আমি সার্টিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট। ইনজুরি নিয়ে আমার সামনে জ্ঞান দেবেন না।"
:
:
:
ক্যাস্পিয়ান বাইরে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে এল। ঝামেলা পুরোপুরি মেটেনি। সে নিচে গিয়ে গেস্ট হাউজের মালিকের কাছ থেকে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে আনল। পেখমকে আশ্বস্ত করে বলল, "পরিবেশ একটু শান্ত হলেই আমি আপনাকে বাসায় দিয়ে আসব।"
পেখম আগুনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই বলে ফেলল, "জানেন, এখানেও কিন্তু বেশ ভালো লাগছে। এক অদ্ভুত শান্তি।"
একটু থেমে সে ক্যাস্পিয়ানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রশ্ন করল, "আপনি কি সব সময় এভাবে মারামারি করেন? মানে, আপনার লাইফটা কি শুধুই এরকম গেঞ্জাম আর ফাইট?"
ক্যাস্পিয়ান এক মুহূর্ত ভাবল না। সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে অকপটে বলল, "হ্যাঁ।"
তার এই সংক্ষিপ্ত আর সত্যবাদী স্বীকারোক্তি শুনে পেখমের ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে কফির মগটা হাতে নিয়ে বলল, "আপনার মনটাও আপনার শরীরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। জানেন, আমাদের ক্লিনিকে ম্যাডামের স্টাফরা আপনাকে আড়ালে কী বলে ডাকে?"
ক্যাস্পিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
পেখম হেসে বলল, "রোবট। সবাই ভাবে আপনার ভেতরে মানুষের কোনো ইমোশন নেই।"
ক্যাস্পিয়ান জবাব দিল না, শুধু আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরের শীতের রাত আর ভেতরের এই উষ্ণ কথোপকথন,দুটো হৃদয়ের বরফ কি গলার শুরু হলো?
ফায়ারপ্লেসের আগুনের আভা ক্যাস্পিয়ানের শক্ত চোয়ালে এসে পড়ছে। পেখম কফির মগে শেষ চুমুক দিয়ে হুট করেই জিজ্ঞেস করে বসল, "একটা কথা বলব? রাগ করবেন না তো? আপনি কি নাস্তিক?"
ক্যাস্পিয়ান একটু চমকাল। তারপর দৃষ্টি নিচু করে শান্ত গলায় বলল, "না। আমার মা খুব ধার্মিক ছিলেন। নিয়মিত ইবাদত করতেন, আপনার মতো করেই হিজাব পড়তেন তিনিও। আমাকে বলতেন, 'আমি মরে গেলে আমার জন্য কে দোয়া করবে রে? তুই তো সারাদিন দুষ্টুমি আর মারামারি নিয়ে থাকিস। এখন একমাত্র ভরসা তো আমার কলিজার টুকরো ফিজা'।"
ক্যাস্পিয়ানের গলায় এক অদ্ভুত হাহাকার ঝরে পড়ল। পেখম কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইল, "কী হয়েছিল তাদের?"
ক্যাস্পিয়ান আজ আর লুকালো না। সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, মায়ের ছাই হয়ে যাওয়া আর আদরের ছোট বোন ফিজার অকালমৃত্যুর গল্পটা সে বলে গেল একে একে। পেখম স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। সে ভাবত কেবল তার জীবনটাই অসম্পূর্ণ, কিন্তু আজ বুঝল তার সামনে বসে থাকা এই তথাকথিত 'রোবট' মানুষটার ভেতরে এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ জমে আছে। পেখম মনে মনে ভাবল,ক্যাস্পিয়ানও তো আমার মতোই এতিম, আমার মতোই ঠিকানাহীন এক যাযাবর।
“তোমাদের শত্রুদের সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। আর অভিভাবক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সাহায্যকারী হিসেবেও আল্লাহই যথেষ্ট।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৪৫)"
আয়াত টা ভেবে পেখম মুচকি হাসলো।
:
:
:
শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে পেখমের জীবনেও নতুন ঝামেলার আনাগোনা শুরু হলো। জেরকণ এখন আর কেবল রোগী নয়, রীতিমতো উপদ্রব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন সে হসপিটালে হাজির হয় কোনো না কোনো অজুহাতে। একদিন তো সে সরাসরি বলেই ফেলল, "দেখো পেখম, তোমাকে নিয়ে আমি পরবর্তী ওয়ার্ল্ড ট্যুরে যেতে চাই। তোমাকে আমার কনসার্টগুলোতে থাকতেই হবে।"
পেখম যখন না বলে দেয়, জেরকণ তার স্বভাবজাত দম্ভ নিয়ে বলে, "ভেবেছ তোমাকে আমার পছন্দ? মোটেও না। তোমার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দরী মেয়েরা আমার একটা অটোগ্রাফের জন্য লাইন দেয়। তোমাকে তো স্রেফ আমার ইনজুরির জন্য দরকার।"
মুখে সে যতই রুড আচরণ করুক, তার কাজে প্রকাশ পেত অন্য কিছু। কখনও পেখমের জন্য দুষ্প্রাপ্য কোনো ওরিয়েন্টাল মিউজিক সিডি পাঠিয়ে দিচ্ছে, কখনও আবার শীতের রাতে পেখমের বাসার সামনে কোনো নামহীন ডেলিভারি বয় দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে দামি গরম চকোলেট আর একগুচ্ছ সাদা টিউলিপ। জেরকণের এই 'অদ্ভুত' উপায়ে ভালোবাসা প্রকাশের ধরন পেখমকে বিভ্রান্ত করে, কিন্তু সে জানে এই মানুষটা আগাগোড়া এক 'রেড ফ্ল্যাগ'।যে মানুষের সাথে সোজা মুখে কথাও বলতে জানেনা।সম্পর্কের মায়া কি আদৌ বুঝে সে? আজ ভালো লাগছে, কাল পেখমকে ভালো নাও লাগতে পারে।
একদিন হৃদিশাহ ম্যাডাম পেখমকে নিজের কেবিনে ডেকে পাঠালেন। অনেকক্ষণ কাজের কথা হওয়ার পর তিনি হঠাৎ পেখমের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
"পেখম, পড়াশোনা তো শেষ হতে চলল। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভেবেছ? সারাজীবন কি হসপিটাল আর পড়াশোনা নিয়েই থাকবে? পাত্র দেখব নাকি তোমার জন্য?"
পেখমের হাসিটা একটু মলিন হয়ে গেল। সে জানালার বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "জানি না ম্যাডাম। আমার মতো মানুষের কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে?"
হৃদিশাহ তাকে আশ্বস্ত করতে চাইলেন, কিন্তু পেখমের মন তখন অন্য কোথাও। অজান্তেই তার অবচেতন মন এখন ক্যাস্পিয়ানকে খুঁজতে শুরু করেছে। যখনই ক্যাস্পিয়ানকে সে হসপিটালের গেটে কিংবা রাস্তায় দেখে, পেখমের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত স্পন্দন অনুভূত হয়। ক্যাস্পিয়ানের সেই কঠোর শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটাকে সে হয়তো ভালোবেসে ফেলেছে।
কয়েকদিন পর, অন্য এক হসপিটালের একটি সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য পেখমকে যেতে হচ্ছিল। গাড়ি নিয়ে ক্যাস্পিয়ানই তাকে নিতে এল।
"আরেহ আপনি, আমি একা যেতে পারব।"
পেখমের কথা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে সে গাড়ির দরজা খুলে দিল।
পুরোটা পথ দুজনই নীরব। বাইরের প্রকৃতির মতোই সেই নীরবতা ছিল খুব ভারী। পেখম আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হঠাৎ করেই সে জিজ্ঞেস করে বসল, "ক্যাস্পিয়ান সাহেব, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? সত্যি উত্তর দেবেন?"
ক্যাস্পিয়ান স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকাল।
পেখম সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি কি আমায় পছন্দ করেন?"
গাড়িটা ঝট করে এক পাশে থেমে গেল। ক্যাস্পিয়ানের চোখমুখের ভাবান্তর বোঝা গেল না। সে কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে খুব ঠান্ডা গলায় বলল, "না। আমি আপনাকে নিয়ে তেমনটা কখনও ভাবিনি।"
প্রত্যাখ্যানটা ছিল সরাসরি এবং অত্যন্ত কঠোর। পেখমের মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সারা রাস্তা সে আর একটি কথাও বলেনি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে শুধু ভাবল,মানুষের মন চেনা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। যাকে সে তার মতো এতিম ভেবে আপন করতে চেয়েছিল, সে আসলে এক নিরেট পাথরের দেয়াল,যে দেওয়ালে পেখমের নাম নেই।
পেখমের চোখ ভিজে এল। পুরো সেমিনার জুড়ে সে নীরবে কেঁদেছে, ক্ষণে ক্ষণে মুছেছে চোখের পানি।