পেখম কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটার কথা বলার ধরণটা মোটেও অনুরোধের মতো নয়, বরং আদেশের মতো শোনাল। সে আমতা আমতা করে বলল,
“খাবার বানাতে জানি, কিন্তু এই অচেনা জায়গায় কী করে বানাব? তাছাড়া আমি তো আপনাদের…”
পেখমকে কথা শেষ করতে না দিয়েই ছেলেটি হাতের ইশারায় থামিয়ে দিল। ফ্রিজে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল,
“এত কথা বলো না তো। ওমলেট করতে জানো? ফ্রিজে ব্রেড আর ডিম আছে। যা পারো দ্রুত কিছু বানিয়ে দাও। খিদেয় পেট জ্বলছে আমার।”
পেখম এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে মোবাইলটা মেঝে থেকে তুলে নিল। টর্চের আলোয় ভালো করে লক্ষ্য করতেই তার নিজের ওপর নিজেরই রাগ হলো। ছেলেটি ক্যান থেকে যা পান করছিল তা আসলে কোনো লাল রঙের কোল্ড ড্রিংক, যা অন্ধকারে সে রক্ত ভেবে ভুল করেছিল। নিজের এই ‘পুকি মেম্বার’ মার্কা সস্তা কল্পনাশক্তির কথা ভেবে সে মনে মনে নিজেকেই এক চড় লাগাল। ছেলেটা তো ভ্যাম্পায়ার নয়, তবে রক্তচোষার চেয়ে কম কিছু বলেও মনে হচ্ছে না।
পরদিন সকালটা ছিল একদম অন্যরকম। হানভাল্ডের এই ভিলা আজ যেন সৌন্দর্যের অন্য এক প্রতীক। কত মানুষ যে বাড়িটা সাজানোর কাজে ব্যস্ত, গুনে শেষ করা মুশকিল। মিসেস সামিরার বাড়িতে আজ বড় কোনো গেট টুগেদার বা পার্টি চলছে। পেখম নিজের জন্য বরাদ্দকৃত পরিপাটি রুমটাতেই বসে আছে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে এই মুহূর্তে জার্মানিতে এমন এক আভিজাত্যের মাঝে আছে।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। একজন মেইড ভেতরে এসে হাতে একটা প্যাকেট তুলে দিল। ডক্টর হৃদিশাহ তার জন্য অত্যন্ত সুন্দর একটি মার্জিত পোশাক পাঠিয়েছেন এবং খবর দিয়েছেন যেন সে দ্রুত তৈরি হয়ে বাইরের বাগানের পার্টিতে যোগ দেয়। পেখম আয়নায় নিজেকে দেখে একটু ইতস্তত বোধ করল। সে তো এমন জৌলুসপূর্ণ পরিবেশে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু ম্যামের আদেশ অমান্য করার সাধ্যও তার নেই।
পার্টিতে যাওয়ার পর হৃদিশাহ তারিফ করলেন,
“তোমাকে চমৎকার লাগছে, পেখম।”
“ধন্যবাদ।”
“এখন থেকে তুমি যেকোনো সময় এখানে আসতে পারো। কোনো মানা নেই।”
পেখম জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কতদিনের জন্য এসেছেন ম্যাম?”
“এই তো পঁচিশ দিনের মতো ছুটি নিয়েছি। তোমার কিছু লাগলে নির্দ্বিধায় বলতে পারো।”
হৃদিশাহর এমন কথায় অভয় পেয়ে পেখম বলল,
“একটা ব্যাপার ছিল।”
পেখমের মনের ভাব বুঝতে পেরে হৃদিশাহ বললেন,
“সেসব নিয়ে কিচ্ছু ভেবো না। কাগজপত্রগুলো আমার কাছে জমা আছে। তোমাকে কখনোই বিয়ের ব্যাপারে ভাবতে হবে না। কেউ এই বিষয়ে ডিস্টার্বও করবে না। সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কেবল নিজের স্বপ্ন পূরণে ফোকাস কর।”
“হ্যাঁ ম্যাম, আমি সংকল্পবদ্ধ।”
“ভেরি গুড। কিন্তু সব সময় এমন গোমড়ামুখী হয়ে থাকো কেন? নিশ্চয়ই এমবিবিএসের জন্য?”
পেখম মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না, মোটেও না। আমি আমার সাধ্যমতো স্বপ্ন দেখতে চাই। বাবা থাকলে ব্যাপারটা অন্যরকম হতো, কিন্তু আমি কারও কাছে ঋণী থাকতে চাই না। আপনি হঠাৎ করে আমার জীবনে যেন সৃষ্টিকর্তার দূত হয়ে এসেছিলেন। অলরেডি এত কিছু করেছেন, এটাও এমন একটা ঋণ যেটা শোধ করার সাধ্য হয়তো আমার এই জীবনেও হবে না।”
“ছিঃ ছিঃ, এভাবে বলো না। সাহায্য তোমাকে সৃষ্টিকর্তাই করেছেন। মাধ্যমটা আমি না হলে হয়তো অন্য কেউ হতো।”
“আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দিলে তিনি ব্যতীত তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর তিনি তোমার কল্যাণ করলে তিনিই তো সর্ববিষয়ে শক্তিমান।
তিনি আপন বান্দাদের ওপর পরাক্রমশালী, তিনি প্রজ্ঞাময়, জ্ঞাতা।(সূরা আল আনাম -১৭,১৮)”
পেখম মুগ্ধ হলো তার কথায়।
হৃদিশাহ বললেন,
“আরেকটা কথা। আমি দেশে ফিরে গেলে তুমি ক্যাস্পিয়ানের হেল্প নিতে পারো।”
“ক্যাস্পিয়ান?(caspian)”
“ওহ! পরিচয় করিয়ে দিইনি?”
পেখম না-বোধক মাথা নাড়তেই হৃদিশাহ কাউকে ইশারায় ডাকলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাজির হলো দেখতে রোবটের মতো ২৮ বছরের বডিগার্ড ক্যাস্পিয়ান আব্রাহাম। বয়সের তুলনায় এত গম্ভীর ভাব দেখায় যে, মনেই হয় না বয়স ত্রিশও পার করেনি। পেখম এখনো তার চোখ দেখতে পাচ্ছে না রোদচশমার কারণে।
হৃদিশাহ বললেন,
“তোমার যদি কখনো মনে হয় কারো সাহায্য দরকার, তাহলে ক্যাস্পিয়ানকে ডাকতে পারো। সময়ের চিন্তা করো না।”
“ঠিক আছে।” সামনে তাকাল পেখম।
ক্যাস্পিয়ান একটাও কথা বলল না।সামনে কোথায় তাকিয়ে ছিল আল্লাহ ই জানে।
পেখম রুমে চলে গেল পার্টি ছেড়ে। একসময় পেখমের তীব্র কফি খাওয়ার ইচ্ছে হলো। রাতভর ঘুম হয়নি নানান চিন্তায়। হয়তো বা নতুন পরিবেশ বলে।বাইরের হলরুমে মানুষের ভিড় আর উচ্চস্বরে কথাবার্তা চলছে। মেইডরা সবাই মেহমানদের আপ্যায়নে ব্যস্ত। পেখম কাউকে বিরক্ত না করে নিজেই কিচেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। যাওয়ার পথে একজন পরিচারিকাকে জিজ্ঞেস করে নিল কফি মেকারটা কোন দিকে।
রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার সময় সে খেয়াল করল না যে আড়াল থেকে কেউ তাকে লক্ষ্য করছে। সেই রাতের যুবকটি তখন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছিল। পেখমকে একা কিচেনের দিকে যেতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে সেই বাঁকা হাসি ফিরে এল। মেয়েটাকে জ্বালানোর এই সুযোগ, সে হাতছাড়া করতে চাইল না। পা টিপে টিপে পেখমের পিছু নিল।
পেখম যখন কিচেনে ঢুকে কফি বিন খুঁজছে, তখনই পেছন থেকে শান্ত কিন্তু ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“কালকের ওমলেটটা কিন্তু জঘন্য ছিল, মিস হোয়াটএভার।”
পেখম চমকে পেছন ফিরল,ছেলেটি দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে একই অবাধ্য চাউনি।
“ভালো না লাগলে খেয়েছিলেন কেন? আর আপনি এখানে কী করছেন?”
সে বলল,
“তুমি বলেছিলে কেবল বাংলাদেশি খাবার বানাতে জানো। ভাবছি আজ না হয়…”
সে কথা শেষ করার আগেই কিচেনের বাইরে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। কালো স্যুট পরা দীর্ঘদেহী বডিগার্ড এসে দাঁড়াল।
“গুড আফটারনুন, জেরকণ স্যার। সামিরা ম্যাম আপনাকে নিচে ডাকছেন। আর মিস পেখমকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ম্যাডাম আমাকে পাঠিয়েছেন।”
জেরকণের মুখের উদ্ধত ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। চাপা উত্তেজনা কিংবা ঘৃণা, কী যেন একটা চোখে ফুটে উঠল।
ক্যাস্পিয়ান নিস্পৃহ গলায় বলল,
“চলুন মিস। সময় হয়ে গেছে।”
পেখমের মনে হলো, এই অট্টালিকা নিজস্ব কোনো আত্মকাহিনি লুকিয়ে রেখেছে। একবার জেরকণের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সে বেরিয়ে গেল।
জেরকণের চোখের সেই তপ্ত চাউনি উপেক্ষা করে পেখম ক্যাস্পিয়ানের পিছু নিল। লোকটার হাঁটার ভঙ্গিও যান্ত্রিক, যেন প্রতিটা কদম মেপে ফেলা।
বাইরে বেরোতেই পেখম থমকে দাঁড়াল। আকাশ তামাটে রঙের। বসন্তেও বাতাসে অদ্ভুত হিমেল ছোঁয়া। গাড়িতে ওঠার মিনিট দশেক পর কাঁচের ওপর সাদা তুলোর মতো কিছু পড়তে দেখল।
“মিস্টার ক্যাস্পিয়ান, তুষারপাত শুরু হয়েছে কি?”পেখম খুব অবাক হলো।
“জার্মানিতে স্প্রিংয়ের শুরুতে একে "এপ্রিল ওয়েদার "বলে। রোদ আর তুষারের লুকোচুরি এখানে স্বাভাবিক।”
কিছুদূর যেতেই হঠাৎ ক্যাস্পিয়ান রাস্তার একপাশে গাড়ি থামিয়ে দিল। পেখমের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর গলায় বলল, "গাড়িতেই থাকুন। নামবেন না মিস।"
সে নেমে গেল সামনের একটা অন্ধকার গলির দিকে। পেখম জানালার কাঁচ মুছে দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু কুয়াশা আর তুষারে সব ঝাপসা। মিনিট পাঁচেক পর ক্যাস্পিয়ান ফিরে এল। তার কালো কোটটা একটু এলোমেলো, আর হাতের কবজির কাছে হালকা রক্তের দাগ।এই প্রথম দেখল তার চোখজোড়া কালো চশমা বিহীন।
ভ্রু থেকে চোখের নিচে অব্দি শার্প একটা পুরোনো কাটা দাগ আছে । বাদামি মণি জোড়া দিয়ে এক পলক পেখম কে দেখে নিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লো।
পেখম আঁতকে উঠে বলল, "আপনার হাতে ওটা কী? চোট লেগেছে?"
ক্যাস্পিয়ান নির্বিকারভাবে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল, "কিছু না। রাস্তার একটা বাধা সরাতে গিয়ে সামান্য ঘষা লেগেছে।"
তার কণ্ঠস্বরের শীতলতা পেখমকে আর প্রশ্ন করার সাহস দিল না। সে বুঝে নিল, এই রোবট মানবের কাছে কোনো কিছুর ব্যাখ্যা চাওয়া বৃথা।
হোস্টেলে ফেরার পর পেখম যখন নিজের রুমে ঢুকল, তখন রাত প্রায় দশটা। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে দেখল তার দুই সিনিয়র রুমমেট,এশনা আর রেহনুমা বেশ উত্তপ্ত আলোচনায় মত্ত।
এশনা কান্নাকাটি করছিল। তার হাতে ধরা ফোনে একগাদা টেক্সট মেসেজ। সে ফিসফিস করে বলল, "ও আবার শুরু করেছে রেহনুমা। আমি কার সাথে কথা বলি, কেন একটু হাসলাম সব নিয়ে ওর সন্দেহ। ও নাকি আমাকে অনেক ভালোবাসে, তাই এই অধিকার দেখায়।"
রেহনুমা বলল, "ভালোবাসা নয় রে এশনা, এটা পিওর নার্সিসিজম। তুই বুঝতে পারছিস না, দিস ইজ এ বিগ রেড ফ্ল্যাগ! সে তোকে কন্ট্রোল করতে চায়। প্রথমে শুরু হবে ভালোবাসা দিয়ে, তারপর সে তোর আইডেন্টিটি শুষে নেবে।"
পেখম তার রাতের খাবারের প্লেটটা নিয়ে এসে ওদের পাশে বসল। সে নিজেও এসব আলোচনার প্রতি ভীষণ আগ্রহী। রেহনুমা এবার পেখমের দিকে তাকিয়ে বলল, "শোন পেখম, লাইফে যাই করিস, এই রেড ফ্ল্যাগ মার্কা ছেলেদের থেকে দূরে থাকবি। যারা শুরুতে খুব বেশি কেয়ার দেখায় আর আড়ালে সন্দেহ করে, তারা আসলে মানসিকভাবে অসুস্থ।"
রেহনুমা ডায়েরি খুলে বলতে লাগল, "রেড ফ্ল্যাগের লিস্ট দেখবি? ১.অতিরিক্ত পজেসিভনেস, ২.তোকে ছোট করে কথা বলা, ৩.সব দোষ তোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া। আর সবচেয়ে বড় রেড ফ্ল্যাগ হলো, যে মানুষকে মানুষ বলে সম্মান করতে জানে না।"
পেখম ভাতের লোকমা মুখে দিয়ে ভাবল, ডক্টর হৃদিশাহ'র বাড়িতে দেখা সেই উদ্ধত ছেলেটার কথা। জেরকণ! ও তো শুধু রেড ফ্ল্যাগ নয়, ও তো আস্ত একটা লাল পাহাড়। নাম ও রেখেছে পাথরের। তার প্রতিটি কথা আর চাউনিতে এক ধরণের আধিপত্য আর অবজ্ঞা মেশানো।
সে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকেই বলল, "আমি ঠিক করেছি, জীবনে যা-ই হোক, এমন কোনো মানুষের পাল্লায় পড়ব না যারা নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করে। আই রিয়েলি হেইট দিস টাইপ অব পিপল। আই হেইট রেড ফ্ল্যাগস!"
:
:
বাইরে তখন তুষারপাত বাড়ছে। পেখম জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবল, এই নতুন দেশ আর নতুন মানুষগুলো তাকে আর কী কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে?