ক্যাস্পিয়ানের সেই সরাসরি প্রত্যাখ্যান পেখমের ভেতরে এক প্রবল আত্মদহন তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই দহনে ঘি ঢালল পরবর্তী কয়েকদিনের দৃশ্যপট। পেখম লক্ষ্য করল, যে মানুষটা কথা বলতে গেলে পাথরের মতো নিশ্চুপ থাকে, সেই ক্যাস্পিয়ান ইদানীং বেশ সরব। কখনো হসপিটালের ক্যাফেটেরিয়ায় কোনো এক সুদর্শনার সাথে মৃদু হাসিতে কথা বলছে, কখনো বা হসপিটালের বাইরে পার্কিং লটে কোনো এক অপরিচিতার সাথে দীর্ঘ আলাপন।
পেখম দূর থেকে দেখে আর তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। বুকের ভেতরটা অভিমানে ফেটে যেতে চায়। সেদিন ক্যাস্পিয়ান যখন তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, পেখম ভেবেছিল হয়তো তার অতীতে কোনো গভীর ক্ষত আছে বলেই সে কাউকে জায়গা দিতে পারছে না। কিন্তু এখন তো দৃশ্য ভিন্ন! ক্যাস্পিয়ান তো দিব্যি অন্যদের সাথে সময় কাটাচ্ছে। তবে কি কেবল পেখমই তার অযোগ্য ছিল?
মেডিকেল কলেজের ডিউটি শেষ করে সেদিন ঘরে ফিরেই পেখম তার রুমমেট রেহনুমার কাছে মেজাজ উগরে দিল।
"আচ্ছা রেহনুমা, একটা কথা বল তো। কাউকে প্রপোজ করার পর যদি দেখো যে সে তোমার সামনেই অন্য মেয়েদের সাথে দেদারসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার মানেটা কী দাঁড়ায়?" পেখমের গলার স্বরে ছিল স্পষ্ট ক্ষোভ।
রেহনুমা তার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বসিয়ে বড় বিশেষজ্ঞের মতো জবাব দিল, "মানেটা খুবই পরিষ্কার পেখম। বুঝে নিতে হবে ওই লোকটা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় 'রেড ফ্ল্যাগ'। সে আসলে চায় তুমিও থাকবে, আবার সাইডে তার ডজনখানেক গার্লফ্রেন্ড দের ও মেনে নেবে। অর্থাৎ সে অত্যন্ত আধুনিক খোলা মনের,বিশাল দিল দরিয়া লোক। মানে সে একটা টক্সিক জালে তোকে জড়াতে চায় যাতে তুই সব মেনে নিস। এসব ব্যাটাদের শায়েস্তা করতে বদনাতে মরিচের পানি মেশানো উচিত! বুঝলি?"
পেখম গাল ফুলিয়ে একমত হলো, "ঠিক বলেছিস! একদম ঠিক। লোকটা আসলে একটা ভণ্ড।"
তাদের এই গুরুগম্ভীর আলোচনার মাঝেই ঘরে ঢুকল এশনা। তাদের কথা শুনে সে হো হো করে হেসে উঠল। "আরে ধুর! তুই কার কথা শুনছিস পেখম? এই যে আমাদের স্বঘোষিত 'রেড ফ্ল্যাগ বিশেষজ্ঞ' রেহনুমা, এ কি নিজে কখনো জীবনে প্রেম করেছে? যে কখনো প্রেমে পড়েনি তার কাছ থেকে রিলেশনশিপ অ্যাডভাইস নিচ্ছিস তুই?"
রেহনুমা লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাল বালিশের আড়ালে। এশনা হাসতে হাসতে বলল, "ওসব ছাড়ো। দেখো আমার হাতে কী!"
পেখম আর রেহনুমা একসাথ বলে উঠল, "আরে, এটা তো রিং! এনগেজমেন্ট রিং?"
এশনা লাজুক হেসে মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ, আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। এই শীতেই!"
:
:
:
পুরো শহর যখন বিয়ের সাজে বা উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা, হৃদিশাহর এপার্টমেন্টে তখন নিস্তব্ধতার রাজত্ব। আজ সে ক্লিনিকে যায়নি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। রাইন নদীর তীরের এই শীতের দিনগুলো তার কাছে বড় বেশি ভারী মনে হয়।
আজ তার বিবাহবার্ষিকী। আর অদ্ভুত সমাপতনে, আজকের এই দিনেই তার যমজ সন্তানরা পৃথিবীতে এসেছিল। অথচ তার কোল আজ শূন্য। পেট্রিকের সাথে বিচ্ছেদ হয়নি, কিন্তু যোজন যোজন দূরত্বের এক দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। পেট্রিক মানুষটা বড় অদ্ভুত। সে হৃদিশাহকে পাগলের মতো ভালোবাসে, কিন্তু তার মায়ের কঠোর আভিজাত্যের দম্ভের কাছে সে বড় অসহায় ছিল।
পেট্রিকের মা কখনোই একজন বাঙালি মেয়েকে তাদের পরিবারের বউ হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। পেট্রিক মেধাবী সার্জন হওয়া সত্ত্বেও তার মা তার ক্যারিয়ারে বারবার বাধা সৃষ্টি করেছেন, শুধু হৃদিশাহকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। এমনকি হৃদিশাহর কোল থেকে তার কলিজার টুকরো বাচ্চা দুটোকেও কেড়ে নিয়েছে ওই পরিবার। হৃদিশাহর ক্যারিয়ার ধ্বংস করার চেষ্টাও কম হয়নি।
সেই নরক থেকে বাঁচতেই হৃদিশাহ নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছে। দেশে শুরু করেছে এনজিও, যেখানে নির্যাতিত নারী আর এতিম শিশুদের জন্য আশ্রয় গড়ে তুলছে সে। অন্যের চোখের জল মুছতে মুছতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতগুলো ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছে।
হঠাৎ কলিংবেলের কর্কশ শব্দে তার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। হৃদিশাহ বিরক্ত হলো। আজ সে কারো মুখোমুখি হতে চায় না। কিন্তু বেলটা বাজছেই। দরজা খুলতেই হৃদিশাহর হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে পেট্রিক। হাতে একগুচ্ছ সাদা ফুল আর একটা ছোট কেক। তার চোখের দৃষ্টিতে সেই আগের মতোই আকুলতা, সেই একই অপরাধবোধ।
"তুমি আবার কেন এসেছ পেট্রিক?" হৃদিশাহর কন্ঠস্বর কাঁপছে।
পেট্রিক শান্ত গলায় বলল, "আজ আমাদের দিন হৃদি। আমি জানি আমি তোমার জীবনের অনেকটা সময় নষ্ট করেছি, কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে কখনো ছাড়িনি। আমি শুধু সময় নিচ্ছিলাম ওই জাল থেকে নিজেকে আর আমাদের সন্তানদের বের করে আনার জন্য।"
হৃদিশাহ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তবে কি এই শীতের শেষেই কোনো বসন্তের আভাস আসছে?
হৃদিশাহ আজ এমনিতেই ছোট মন করে আছে, তার উপর এমন কথায় দ্রুত ইমোশনাল হয়ে পড়লো। ফিরে যাও পেট্রিক,তুমি কেন নিজেকে আমার সাথে বেধে রাখো? আমি তো কবেই বলেছি চলে যাও মুক্ত করে আমাকে কিন্তু তুমি কেন... পেট্রিক তার ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল "পারব না আমি। তুমিই প্রথম তুমিই শেষ, আমার সফলতা চাইনা তোমাকে চাই।
হৃদিশাহ বলল তোমাকে ভালোবাসি না আমি। ফিরে এসো না আর, চলে যাও।
হৃদিশাহর বার বার ফিরিয়ে দেওয়া নিতে না পেরে পেট্রিক সত্যিই চলে গেল।
শহরের ব্যস্ততা আর ক্যাস্পিয়ানের ওই পাথুরে নির্লিপ্ততা থেকে বাঁচতে পেখম এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। পরদিন সকালেই সে হৃদিশাহ ম্যাডামের কেবিনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক ধরনের ক্লান্তির ছাপ, যা গত কয়েক রাতের বিনিদ্র যাপনের সাক্ষী দিচ্ছিল।
"ম্যাডাম, আমি এই শহর ছেড়ে চলে যেতে চাই। আমি মিউনিখ (Munich) বা হামবুর্গে শিফট হওয়ার কথা ভাবছি। ওখানে আমার এক পরিচিত সিনিয়র আছেন, বাকি পড়াশোনা আর প্র্যাকটিসটা ওখানেই শেষ করতে চাই।"
হৃদিশাহ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে পেখমের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে বলল, "হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন পেখম? এখানে তো তোমার সবকিছু গুছিয়ে আসছিল। নাকি জেরকণ তোমাকে খুব বেশি বিরক্ত করছে? ছেলেটা তোমাকে সত্যিই পছন্দ করে। সে কি কোনোভাবে এর কারণ?"
পেখম একটা ম্লান হাসি হাসল। জানালার কাঁচের ওপারে কুয়াশাচ্ছন্ন জার্মানির রাস্তাগুলোর দিকে তাকিয়ে সে ধীর গলায় বলল, "না ম্যাডাম। জেরকণ সাহেব অনেক বড় মানুষ। আমি তার বা তার পরিবারের ওই বিলাসিতা সহ্য করার মতো মানুষ নই। আমার স্বপ্নেও অত প্রাচুর্য নেই।"
হৃদিশাহ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, "তাতে কী আসে যায় পেখম? ভালোবাসা থাকলে তো এসব কোনো বাধাই নয়।"
"ভালোবাসা যদি সবকিছু হতো ম্যাডাম, তবে তো কথাই ছিল না।" পেখমের গলায় এক টুকরো হাহাকার ঝরে পড়ল। "আমি আসলে আমার মতো কাউকে চেয়েছিলাম। যার কোনো আভিজাত্য নেই, শুধু একবুক নীরবতা আছে। কিন্তু সম্ভবত তার মতো মানুষ আমাকে চায় না।"
"যদি আল্লাহ তোমাকে কোনো কষ্টে নিপতিত করেন, তাহলে তিনি ছাড়া তার মোচনকারী আর কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার মঙ্গল চান, তাহলে তাঁর অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করে থাকেন। আর তিনি চরম ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।সূরা-ইউনুস ১০৭)"
কথাটা শেষ করে মলিন হাসলো মেয়েটি।
আজ কিছু জরুরী কথা বলবো পেখম, তোমার হয়তো জানা উচিত...
:
:
:
হসপিটালের করিডোর দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে আসছিল জেরকণ। তার হাতে একগুচ্ছ টকটকে লাল গোলাপ, যা শীতের এই ধূসর সকালে যেন অতিরিক্ত উজ্জ্বল। ক্যাস্পিয়ান তখন ডিউটি শেষে বেরোচ্ছিল। জেরকণকে দেখে সে সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
"স্যার, হৃদিশাহ ম্যাডাম তো এখন হসপিটালে নেই। উনি বাইরে গেছেন।" ক্যাস্পিয়ান যান্ত্রিক গলায় বলল।
জেরকণ ভ্রু কুঁচকে হাসল, "তাতে কী হয়েছে? আমি কি বলেছি আমি তোমার ম্যাডামের সাথে দেখা করতে এসেছি? আমি পেখমের কাছে যাচ্ছি।"
ক্যাস্পিয়ান এক মুহূর্ত থমকাল। তারপর গোলাপ গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, "স্যার, আপনি যদি অনুমতি দেন, তবে ফুলগুলো আমি ভেতরে দিয়ে আসতে পারি।"
জেরকণ অবাক হয়ে হো হো করে হেসে উঠল। "কী আশ্চর্য! তুমি কেন যাবে? রোমান্স বোঝো না নাকি? আমি নিজ হাতে ওকে এই সারপ্রাইজটা দিতে চাই।"
"রোমান্স?" ক্যাস্পিয়ানের গলায় শব্দটা যেন খুব বেমানান শোনাল।
"হ্যাঁ মিস্টার বডিগার্ড। যাও তো এখন, আমাকে আমার কাজ করতে দাও। সারাদিন শুধু ডিউটি করলেই হয় না, জীবনটাকে উপভোগ করতে হয়।" জেরকণ শিস দিতে দিতে পেখমের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
ক্যাস্পিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে পেখম খুব ভালো একটা মেয়ে। এর আগেও সে দেখেছে অনেক রোগী সুস্থ হওয়ার পর পেখমকে তাদের ছেলে বা নাতিদের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।কখনো কখনো যুবক রোগীরাও দিয়েছে, পেখম সবসময় সেগুলো হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু আজ জেরকণকে দেখে তার মনে হলো, জেরকণই হয়তো পেখমের জন্য সবচেয়ে 'বেস্ট অপশন'। আধুনিক, প্রতিষ্ঠিত আর সুদর্শন,একজন মেয়ের আর কী চাই?তাছাড়া জেরুকণ এখন হাসতেও শিখে গেছে।
ক্যাস্পিয়ান আর ভাবতে পারল না। কেন যেন বুকের বাম দিকটায় এক অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল সে। যে ব্যথাটা গত কয়েকদিন ধরে অন্য মেয়েদের সাথে কথা বলার ভান করার সময়ও তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। সে তো চেয়েছিল পেখমকে দূরে সরিয়ে দিতে, তাকে ঘৃণা করতে বাধ্য করতে,যাতে তার মতো এক 'যাযাবর' আর 'বিপজ্জনক' মানুষের সাথে পেখমের জীবন জড়িয়ে না যায়। কিন্তু এখন এই দৃশ্য সহ্য করা কেন এত কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে!
সে শুনেছিল পেখমের ইচ্ছা, তাছাড়াও পেখম পরিবারহীন একটা মেয়ে।ক্যাস্পিয়ান নিজেই তো কেমন গোমড়া স্বভাবের। এখন ভালো লাগলেও পড়ে হয়তো পেখমের তাকে একঘেঁয়ে লাগতে পারে। জেনেশুনে সে পেখমের জীবন নষ্ট করতে চায় না।
:
:
পেখমের কথাগুলো হৃদিশাহর কানে দীর্ঘক্ষণ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ‘ভালোবাসা যদি সবকিছু হতো...’কথাটা কত বড় ধ্রুব সত্য! হৃদিশাহ জানালার শার্শিতে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের ঝরা পাতার দিকে তাকিয়ে রইল। সে নিজেও তো পেট্রিককে পাগলের মতো ভালোবেসেছিল, কিন্তু সেই ভালোবাসা তাকে পূর্ণতা দেয়নি; বরং দিয়েছিল এক দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছেদ আর সন্তানদের কাছ থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, পেট্রিককে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার চেয়ে সে যদি কেবল একটা সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকত, তবে হয়তো এই বিষাদটুকু আজ থাকত না। পেখম ঠিকই বলেছে, অসম সামাজিক অবস্থানের বিলাসিতা আর আভিজাত্যের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাটাই বলি চড়ে।
কয়েকদিন পরের কথা, জার্মানির আকাশ আজ খুব পরিষ্কার, যেন শীতের আমেজে এক চিলতে বসন্তের ছোঁয়া। হৃদিশাহ ক্যাস্পিয়ানকে ডেকে পাঠালো। ক্যাস্পিয়ান যখন রুমে ঢুকল, তার চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা।
হৃদিশাহ গম্ভীর গলায় বলল, "ক্যাস্পিয়ান, আজ সন্ধ্যায় পেখমের একটা ইনভাইটেশন আছে। একটা সেরেমনি। সে আমাকে বলেছে তোমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে। তুমি দূরে ছিলে বলে হয়তো ও তোমাকে আলাদা করে বলতে পারেনি।"
‘সেরেমনি’ শব্দটা শোনা মাত্রই ক্যাস্পিয়ানের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। তার মস্তিস্ক সেকেন্ডের মধ্যে ধরে নিল,তবে কি জেরকণের সেই বিলাসিতা আর গোলাপের গুচ্ছ পেখমের মনে জায়গা করে নিয়েছে? আজ কি তবে তাদের বাগদান? ক্যাস্পিয়ানের বুকের ভেতর যেন শত শত দামামা একসাথে বেজে উঠল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।
নিজের গাড়িতে গিয়ে বসার পর তার মনে হলো সে দিকবিদিক হারিয়ে ফেলছে। যে মানুষটা সারা জীবন পাথরের মতো শক্ত থেকেছে, আজ তার দুচোখ বেয়ে অবাধ্য জল নামছে। স্টিয়ারিং হুইলটা চেপে ধরে সে ফুঁপিয়ে কেঁপে উঠল। শেষ কবে সে কেঁদেছে, তার মনে নেই। পেখমকে হারিয়ে ফেলার ভয় তাকে একদম নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
সে মনে মনে বলল, "না পেখম, তোমাকে আমি হারাতে দেবো না।"
মানুষ জানুক বা না জানুক, ক্যাস্পিয়ান তো জানে পেখমকে সে কতটা আগলে রেখেছে। বাংলাদেশ থেকে যখন পেখম বিমানে জার্মানির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল, তখন থেকেই ক্যাস্পিয়ান ছায়ার মতো তার পিছে পিছে ছিল। পেখম হয়তো ভাবছে ক্যাস্পিয়ান কেবল হৃদিশাহর বডিগার্ড, কিন্তু সত্যটা ছিল আরও গভীর। জার্মানি আসার আগেই পেখমের ভিসার বিষয়ে এক অজ্ঞাত অভিযোগ এসেছিল,সে নাকি অবৈধ কাজের সাথে যুক্ত। হৃদিশাহ ম্যাডাম যখন সেই ঝামেলা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন ক্যাস্পিয়ানই এগিয়ে এসেছিল।
আইনি জটিলতা কাটাতে আর পেখমকে নিরাপদে জার্মানিতে থিতু করতে তারা এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল। লিগ্যাল পেপারওয়ার্কে ক্যাস্পিয়ান আর পেখম বিবাহিত। হৃদিশাহ বলেছিল, পেখমের সাথে ক্যাস্পিয়ানকে যত বেশি প্রকাশ্যে দেখা যাবে, তাদের সেই বৈবাহিক সম্পর্কের দলিল তত বেশি শক্তিশালী হবে এবং পুলিশি ঝামেলা কমবে। সেদিনের সেই কর্তব্যবোধ আজ ক্যাস্পিয়ানের জীবনের শ্রেষ্ঠতম ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে।
ক্যাস্পিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিল। তার চোখ লাল, কিন্তু সংকল্প এখন পাথরের মতো দৃঢ়। পেখম আজ মিউনিখ যাওয়ার কথা বলুক বা জেরকণকে পছন্দ করার কথা,ক্যাস্পিয়ান আজ সব পর্দা ফাঁস করে দেবে। সে আজ জানিয়ে দেবে, এই ‘রোবট’ মানুষটার আড়ালে একজন স্বামীও লুকিয়ে আছে, যে আড়াই বছর ধরে শুধু আড়ালে থেকে তাকে ভালোবেসে গেছে।