ক্যাস্পিয়ান যখন অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাল। চারদিকে সাজসাজ রব, আলোকসজ্জা আর মৃদু মিউজিক। ভিড়ের মাঝে তার চোখ দুটো হন্য হয়ে খুঁজছিল সেই মানুষটিকে, যাকে হারানোর ভয়ে আজ সে নিঃস্ব। হঠাৎ তার নজর স্থির হলো স্টেজের এক কোণে। সাদা লং স্লিভ গাউনে, মাথায় সাদা হিজাব জড়ানো পেখম বসে আছে। হালকা মেকআপে তাকে আজ অপার্থিব সুন্দর লাগছে, যেন কোনো এক রূপকথার রাজকন্যা।
একজন মেয়ে এসে তার হাতে একগুচ্ছ ফুলের তোড়া দিয়ে গেল, আর পেখমের মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে অমলীন হাসি। ক্যাস্পিয়ানের মনে হলো তার পৃথিবীটা থমকে গেছে। "তবে কি দেরি হয়ে গেল?"এই আর্তনাদ নিয়ে সে যখন ভিড় ঠেলে এগোতে চাইল, তখনই দেখল একদল মেয়ে পেখমকে ঘিরে ধরে পাশের একটি রুমে নিয়ে যাচ্ছে। ক্যাস্পিয়ান ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। খানিক বাদে শোরগোল শুনে বুঝতে পারল, আজ পেখমের নয়, তার রুমমেট এশনার এনগেজমেন্ট সেরেমনি চলছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্বাসটা আবার ফিরে এসেছে।
:
:
ক্যাস্পিয়ান একপাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কপালে জমে থাকা ঘামটুকু মুছে নিয়ে সে পেখমের স্টেজ থেকে নামার অপেক্ষা করতে লাগল। পেখম যখন ভিড় কাটিয়ে নিচে নামল, ক্যাস্পিয়ান ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তাকে দেখে পেখমের চোখেমুখে কোনো বিস্ময় নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত শান্ত ভাব।
খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পেখম বলল, "আপনি এসেছেন তবে? ভেবেছিলাম আর দেখা হবে না।"
ক্যাস্পিয়ান শুধু দুবার পলক ফেলে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "কেন?"
পেখম বলল, "আমি কাল সকালেই কোলন ছাড়ছি। যাওয়ার আগে আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ছিল। প্রায় তিন বছর ধরে ছায়ার মতো খেয়াল রেখেছেন,বিপদে কখনো একা ছাড়েননি,এই কৃতজ্ঞতাটুকু আজ না জানিয়ে গেলে অন্যায় হতো।"
ক্যাস্পিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করল, "মিস পেখম, আপনি কেন চলে যেতে চাইছেন? আপনার ক্যারিয়ার, আপনার সবটুকু তো এখানেই গড়ে উঠেছে।"
পেখম এবার ম্লান হাসল। "সবাই বলতো আমার বাবা-মা খুব প্রাণবন্ত জুটি ছিলেন ক্যাস্পিয়ান সাহেব। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি, তাই তাদের দাম্পত্যের পূর্ণতা দেখার সুযোগ হয়নি। তবে বাবাকে দেখেছি সারা জীবন মার স্মৃতির সাথে কাটিয়ে দিতে। দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা তিনি কোনোদিন করেননি। সেখান থেকেই হয়তো আমার অবচেতন মনে একটা ইচ্ছে দানা বেঁধেছিল,আমার জীবনে যে আসবে, সে যেন আমার প্রথম এবং শেষ মানুষ হয়। আমি চাইনি আমার হৃদয়ের পাতায় একাধিক নাম জমা হোক।"
সে একটু থেমে আবার বলল, "রবের কাছে বহুবার এই প্রথম আর শেষ মানুষের প্রার্থনা করেছি। যখন আপনাকে আমার ভালো লেগে গেল, আমি নিজেকে অনেক বুঝিয়েছি। ভেবেছি এ কেবল ভালো লাগা, কিন্তু মনকে ধরে রাখতে পারিনি। আমি খুব সাধারণ মেয়ে, প্রেম-বিয়ে নিয়ে অতশত মাথা ঘামায়নি ।" ক্যাস্পিয়ান নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। সে জানে, এই মেয়েটি কতটা সহজ-সরল আর সোজাসাপ্টা।
পেখমের কণ্ঠস্বর এবার কিছুটা আবেগজড়িত হয়ে এল। "কিন্তু ক'দিন আগে জানতে পারলাম, আপনিই সেই মানুষ,যার সাথে তিন বছর আগে ওই বিপদের দিনে আমি আইনত বিবাহিত হয়েছিলাম, সেদিন আমার যে কী হয়েছিল তা বোঝাতে পারব না। আমার ঘুম, খাওয়া সব উবে গিয়েছিল। কী এক অদ্ভুত অনুভূতি! পৃথিবীতে এত মানুষ থাকতে রব আমাকে সেই মানুষটার দিকেই ঠেলে দিলেন, যাকে আমি জীবনের প্রথম 'কবুল' বলে মেনে নিয়েছিলাম স্বজ্ঞানে। মনে হয়েছিল কোনো মিরাকল ঘটেছে।"
ক্যাস্পিয়ান অবাক হয়ে শুনছিল। সে ভাবতেও পারেনি পেখম এই সত্যটা এভাবে গ্রহণ করবে। পেখম আবার বলল, "কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, আপনি তো আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আপনি আমাকে চান না। আমি হয়তো আপনার জন্য কেবলই এক 'কর্তব্য' ছিলাম। তাই ভাবছি, যেখানে ভালোবাসা নেই সেখানে দলিলে থাকা সম্পর্কের কোনো মানে হয় না। ভাগ্যে যা লিখা আছে তাই হোক, আমি নিজেকে সরিয়ে নিতেই ভালো মনে করছি।"
:
:
"গুডবাই মিস্টার ক্যাস্পিয়ান। "পেখম যখন বিদায়ের পথে এক পা বাড়াল, তখনই ক্যাস্পিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সব জড়তা, ভয় তুচ্ছ করে সে পেছন থেকে পেখমকে জড়িয়ে ধরল। ক্যাস্পিয়ানের শক্ত দুই হাতের বাঁধনে পেখম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ক্যাস্পিয়ান চোখের পাতা বুঁজে ধরা গলায় তার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, "আমার মতো একজন যাযাবর, অল্প শিক্ষিত লোক আপনার যোগ্য কী করে হতে পারে পেখম? আমি কী করে আপনার জীবনসঙ্গী হওয়ার স্বপ্ন দেখব? আমি জানি আপনি, আমার রোজকার এই মারপিট আর ক্ষতবিক্ষত জীবনকে ভয় পান। যখনই আমাকে আহত দেখেন, আপনার চোখের সেই আতঙ্ক আমি সইতে পারি না। বাট আই এম রিয়েলি ভেরি সরি... আপনাকে দূরে ঠেলে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো পথ ছিল না কিন্তু আজ আমি উপলব্ধি করলাম, আপনাকে ছাড়া আমার চলবে না।"
পেখম ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। দুজনের চোখেই তখন জল ছলছল করছে। ক্যাস্পিয়ানের কপালে আর হাতে সেই পুরনো মারপিটের কাটা দাগগুলো এখনো স্পষ্ট। পেখম কাঁপাকাঁপা হাত বাড়িয়ে ক্যাস্পিয়ানের চোখের সেই কাটা দাগটা ছুঁয়ে দিল। তার আঙুলের স্পর্শে ক্যাস্পিয়ানের দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টগুলো যেন এক নিমেষে জল হয়ে গেল।
পেখম ধরা গলায় বলল, "সরি না বলে অন্য কিছু বললে হয়তো অনেক বেশি খুশি হতাম।"
ক্যাস্পিয়ান এক মুহূর্ত দেরি করল না। সবার উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে সে পেখমের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। পকেট থেকে একটি আংটি বের করে সজল চোখে তাকিয়ে বলল, "আই লাভ ইউ, পেখম। উইল ইউ ম্যারি মি এগেইন? বি মাই ব্রাইড ফরেভার এন্ড এভার।"
পেখম বিস্ময়ে আর আবেগে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করল। তাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে ক্যাস্পিয়ান তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে গেল। এক বুক উদ্বেগ নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, "আমি কি খুব ভুল কিছু করে ফেলেছি? পেখম, প্লিজ কেঁদো না!"
পেখম হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে ক্যাস্পিয়ানের বুকে মুখ লুকাল। "আমি কখনো কিছু সহজে পাইনি ক্যাস্পিয়ান । ছোটবেলা থেকে শুধু হারিয়েছি। এই প্রথমবার এত বড় একটা মিরাকল হলো আমার সাথে। এখনো সবকিছু স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আমার খুব ভয় করছে, ঘুম ভাঙলে এই সুন্দর মুহূর্তটা আবার মিলিয়ে যাবে না তো?"
ক্যাস্পিয়ান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে পেখমকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে বনবন করে ঘুরতে শুরু করল। পেখম দুই হাত মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রাণভরে হাসল,এই প্রথম তার হাসিতে কোনো লুকানো ব্যথা নেই। সে মনে মনে বলল, 'আমি যা চেয়েছি, আমার রব আমাকে তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি দিয়েছেন।'
পবিত্র কুরআনের সেই আয়াতটি তখন তার মনের কোণে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল:
"আর শীঘ্রই তোমার পালনকর্তা তোমাকে এত দেবেন যে, তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।" (সূরা আদ-দুহা,: ৫)
ক্যাস্পিয়ান আর পেখমের সেই আনন্দঘন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হৃদিশাহর চোখের কোণেও তখন চিকচিক করছে জল। তিনি পরম মমতায় তাদের দিকে তাকালেন। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত কাউকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে লোকেশনটা নিশ্চিত করে নিলেন। আজ যেন মিরাকলের দিন, আর এই দিনের পূর্ণতা দিতে তাকে একাই লড়তে হবে।
:
:
শহরের এক কোণে নামী একটি ক্লাবে বসে একা ঝিমোচ্ছিল পেট্রিক। এক হাতের ফ্র্যাকচারটা বেশ ভোগাচ্ছে। ড্রিংকস অর্ডার করতে চেয়েও থেমে গেল। হৃদিশাহর ভালোবাসায় মজে কত বছর আগেই নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি আর অভ্যাস বদলে ফেলেছে সে। আজ জীবনের এই ক্রান্তিলগ্নে একা বসে সেই দিনগুলোর কথাই ভাবছিল। হৃদিশাহর কাছ থেকে সেই চরম প্রত্যাখ্যান পাওয়ার পর সেদিন মনের বিক্ষিপ্ততায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল সে। সেই রোড এক্সিডেন্ট শরীর ভাঙলেও মনের জেদটা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
খানিক বাদে অনুভব করল পাশে কেউ এসে বসেছে। পরিচিত সেই সুগন্ধ। পেট্রিক নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অস্ফুট স্বরে বলল, "নেশা না করেও তবে কি তাকে দেখতে পাচ্ছি আমি?"
হৃদিশাহ পরিবেশটা হালকা করতে দুটো কোল্ড ড্রিংকস অর্ডার করল। পেট্রিকের দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল, "তা কিসের নেশায় ধরেছে আপনাকে স্যার?"
পেট্রিক একদম চমকে উঠল। গলার স্বর শুনে এবার নিশ্চিত হলো এটা ভ্রম নয়। "হৃদি! তুমি কি সত্যিই আছো আমার সামনে?"
হৃদিশাহ আজ আর কাঁদল না। এতদিন নিজের ভেতর যে আভিজাত্য আর সামাজিক মর্যাদার দেয়াল তুলে রেখেছিল, আজ তা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে পেট্রিকের অক্ষত হাতটা পরম নির্ভরতায় আঁকড়ে ধরল। হাসিমুখে বলল, "চলো পেট্রিক, একসাথে কোথাও পালিয়ে যাই। আমি, তুমি আর আমাদের বাচ্চারা থাকব শুধু। যেখানে আমাদের শান্তি, সেখানেই পাড়ি দেব। এই সমাজ আর পরিবারের দম্ভের কাছে আর এক মুহূর্তও আমি নতি স্বীকার করব না।"
পেট্রিক যেন হাতে চাঁদ পেল। তার চোখে তখন অবিশ্বাস্য খুশির ঝিলিক। দৃঢ় গলায় বলল, "তুমি যেখানে বলবে হৃদি, আমি সেখানেই চলে যাব। আমাদের বাচ্চাদের জন্য, তোমার জন্য যদি আরও কিছু ছাড়তে হয়, আমি তাও ছেড়ে দেব। শুধু তুমি পাশে থেকো।"
:
:
ওদিকে ক্যাস্পিয়ান পেখমকে নামিয়ে দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিচ্ছিল। পেখম তখনো যেন ঘোরের মধ্যে। ক্যাস্পিয়ান বলল, "পেখম, কাল কি সত্যিই চলে যাবেন?"
পেখম এবার লাজুক হেসে মাথা নাড়ল। "যেখানে আমার গন্তব্য আমাকে আগলে ধরেছে, সেখান থেকে যাওয়ার আর কোনো পথ কি খোলা আছে? আমার রব আমাকে যা দিয়েছেন, তার শোকর গুজার করে শেষ করা যাবে না।"
ক্যাস্পিয়ান পকেট থেকে সেই পুরনো বিয়ের দলিলটা বের করে আনল। "এই কাগজটা একদিন কেবল আপনার সুরক্ষার জন্য ছিল। আজ থেকে এটা আমার জীবনের সবচেয়ে দামী সম্পদ।
:
:
জেরকণ একটা বিবাহিত মেয়েকে পছন্দ করেছে? ভাবতেই তার হাসি পেল কিন্তু সে সত্যিই পেখম কে পছন্দ করে।হৃদিশাহ সবটা বুঝিয়ে বলাতে সে আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি,হাসিমুখেই মেনে নিয়েছে সব।
:
:
পুরো দেড় বছর পর। সময় যেন ডানা মেলে উড়ে গেছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছুটে চলা গাড়ির জানলা দিয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় পেখম বেশ আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। ক্যাস্পিয়ানের কোলে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল সে। গত দেড় বছরে ক্যাস্পিয়ান তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেয়নি।
হঠাৎ ক্যাস্পিয়ানের মৃদু হাতের স্পর্শ আর চুলে বিলি কেটে দেওয়ার অনুভবে পেখমের তন্দ্রা ছুটল। ক্যাস্পিয়ান নিচু স্বরে ডাকল, "উঠো মাই লাভ, দেখো কোথায় এসেছি আমরা।"
পেখম আড়মোড়া দিয়ে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে জানলার বাইরে তাকাল। মুহূর্তেই তার সবটুকু ঘুম উবে গিয়ে একরাশ বিস্ময় দানা বাঁধল। সে দুচোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। এ তো সেই পাহাড়ি বাগান বাড়ি! সেই একই রকম উঁচু নিচু সবুজ পাহাড়, আর কুয়াশায় মোড়ানো শান্ত চারপাশ, যেখানে সে আগেরবার এসে মন হারিয়ে ফেলেছিল।
ক্যাস্পিয়ান তাকে হাত ধরে নিয়ে গেল সুন্দর একটা ছোট কাঠের কটেজে। ভেতরে ঢুকতেই পেখম এক আধুনিক আভিজাত্যের ছোঁয়া দেখতে পেল। ক্যাস্পিয়ান তার হাতে একটি ছোট্ট রিমোট দিয়ে ইশারা করল। পেখম কৌতূহলী হয়ে সেটা চাপতেই বেডরুমের দেওয়ালগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। স্লাইডিং স্ক্রিনের মতো একে একে ভেসে উঠতে লাগল তাদের বিয়ের সব মুহূর্ত,ক্যাস্পিয়ানের হাঁটু গেড়ে বসা, পেখমের সেই আবেগী কান্না, আর তাদের নতুন করে শুরু করা জীবনের সব রঙিন স্মৃতি।
পেখম বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ক্যাস্পিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, "এসবের মানে কী ক্যাস্পিয়ান সাহেব?"
ক্যাস্পিয়ান তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে চিবুক রাখল। ধীর গলায় বলল, "এটা আমাদের নতুন ঠিকানা পেখম। এখন থেকে এটাই তোমার ঘর।"
পেখম অবাক হতে হতেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। ঠিক এমন একটা নির্জন, শান্ত আর পাহাড়-ঘেরা কটেজেই সে থাকতে চেয়েছিল। জার্মানিতে আসার পর মন্সাউ (Monschau) ভ্রমণে গিয়ে সে মনে মনে ঠিক এমনই একটা স্বপ্নের কথা ভেবেছিল। কিন্তু ক্যাস্পিয়ান কী করে জানল? সে তো তখন কারো কাছে মুখ ফুটে কিছু বলেনি!
পেখমের মনের না বলা কথাগুলো যেন চোখের ভাষায় পড়ে নিল ক্যাস্পিয়ান। সে মৃদু হেসে বলল, "সেদিন মন্সাউ-তে দাঁড়িয়ে ঠিক এটাই ভাবছিলে না? মনের এক কোণে চেয়েছিলে, যদি এমন একটা জায়গায় থেকে যেতে পারতে?
মনে মনে বলল"তোমার ওই অপলক দৃষ্টি আর দীর্ঘশ্বাসই আমাকে সব বলে দিয়েছিল।"
পেখম ঘোর লাগা চোখে ফিরে তাকাল। "হ্যাঁ, ভেবেছিলাম ঠিকই। কিন্তু তুমি কী করে বুঝলে? তুমি তো তখন পাশেও ছিলে না!"
ক্যাস্পিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু পেখমের কপালে একটা গভীর ভালোবাসার চুমু এঁকে দিয়ে রহস্যময় হাসি হাসল। পেখম বুঝতে পারল, সে যখন নিজেকে খুব একা ভাবত, ক্যাস্পিয়ান তখন কেবল ছায়ার মতো পাশে ছিল না, সে পেখমের হৃদস্পন্দনটুকুও পড়ার চেষ্টা করত।
বাইরে তখন রাইন নদীর তীরের সেই পুরনো বিষাদ পেছনে ফেলে পাহাড়ের বুক চিরে এক নতুন ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে। পেখম বুঝতে পারল, তার রব তাকে কেবল তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকেই দেননি, বরং তার মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকেও কত নিপুণভাবে পূর্ণতা দিয়েছেন।