হানভাল্ডের পাইন বন ঘেরা ধূসর রাস্তা ধরে পেখম যখন তার সাইকেলটা নিয়ে বের হয়, তখন ভোরের কুয়াশা সবে কাটতে শুরু করেছে। রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ওক আর ম্যাপেল গাছগুলো থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতা চাকার তলায় পিষ্ট হয়ে এক ধরণের মচমচে শব্দ তুলছে। পেখমের পরনে একটা হালকা জ্যাকেট, পিঠে সেই চিরচেনা ব্যাগ। এই ব্যাগটাই তার ঘরসংসার, যেখানে স্টেথোস্কোপ, কিছু সার্জিক্যাল কেঁচি আর নোটবুকের সাথে ঠাঁই পায় ক্যান্টিন থেকে নেওয়া জার্মানির সেই বিশেষ ইনস্ট্যান্ট পাস্তা আর জার্মান ব্রেড।
আজ আর "আখেনার ভাইয়ার পার্ক" অতিক্রম না করে বসে পড়ল একটি বেঞ্চে, সামনে লেকও দেখা যায়, মোবাইলটা বের করে মেসেজ চেক করল। ফুফাতো ভাই রাদিফ কয়েকবার তাকে অনুরোধ করেছে সব ভুলে দেশে আসার জন্য। আজও একই মেসেজ দেখে পেখম রিপ্লাই করল "আমি কখনই তোমাকে আলাদা চোখে দেখিনি কিন্তু সেই সত্যটা যদি মিশা আপুকে আগেই বলে দিতাম, আজ "দুই ভাইয়ের প্রেমিকা" তকমা আমার গায়ে লাগত না।
শুধু চেয়েছিলাম নিজের স্বাধীনতা কিন্তু তোমরা কেউ আমাকে এক ফোঁটাও বুঝতে চাওনি। তাই তোমাদের জানিয়ে আসা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
পেখম সেদিনের কথা ভেবে কাঁদতে শুরু করল
, সে তার চাচী রুমানা বেগমের পায়ে পর্যন্ত পড়েছিল কিন্তু তারা সবাই মিলে পেখমের বিয়ে ঠিক করে ফেলল, রুবাদের সাথে। এমনকি ঘোষণা দিল, পেখমকে আর পড়ানো হবে না, সংসার সামলাবে আর স্বামীর ভালো-মন্দ নিয়েই জীবন কাটাবে।কারণ যতই পড়াশোনা করুক না কেন, মেয়েদের জন্য দিন শেষে স্বামী সন্তান পাওয়ার সুখই বড়ো সুখ। পেখম এই কথার বিরোধিতা কখনো করেনি, করতে চায়ও না কিন্তু তাই বলে জীবনটা কী তার নয়? এতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অধিকারই কী তার নেই? তাই তো পেখম শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে ঘর থেকে পালাবে।
জয়নুল স্যারের ঘরে গিয়ে উঠল সে রাতে, তার সহপাঠী নূরাশা নিজের ঘরে নিয়ে তাকে লুকিয়ে রেখেছিল। হৃদিশাহ ম্যাডাম খবর পেয়ে গাড়ি পাঠাল। মধ্যরাতেই শহর ছাড়ল পেখম। আরও কিছুদিন পর সব প্রস্তুতি নিয়ে বিয়ে হয়ে গেল তার। পেখম স্বইচ্ছায় করেছিল, হয়তো বা বড় কিছু পেতে হলে জীবনে কিছু একটা ছেড়ে দিতেই হয়। তাছাড়া তার পূর্ণ ভরষা ছিল সৃষ্টিকর্তার উপর।
"আল্লাহ মানুষের জন্য অনুগ্রহের মধ্য থেকে যা খুলে দেন, তা ফেরাবার কেউ নেই এবং তিনি যা বারণ করেন, তা কেউ প্রেরণ করতে পারে না তিনি ব্যতিত। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। সূরা ফাতির : ২"
ভারি মনটা কান্নার স্রোতে আস্তে আস্তে যেন হালকা হতে লাগল। "কেউ নেই আমার, এতো বড়ো দুনিয়ায় একায় থাকতে হলো আমায়?" আকাশের দিকে চেয়ে এমনটা বলছিল বিড়বিড় করে।
পাশ থেকে কেউ একজন হঠাৎ রুমাল এগিয়ে দিল দেখে পেখম চমকে গেছে।
"ক্যাস্পিয়ান?" ফ্যাসফ্যাসে কান্নারত গলায় উচ্চারণ করল। ইয়ে মানে, মিস্টার ক্যাস্পিয়ান আপনি?
কোনো প্রকার ভাবপ্রকাশ না করেই কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সেও বসে পড়ল বেঞ্চে। পেখম অগত্যা রুমাল নিয়ে নিজেকে সামলে নিল। নাক মুখ লাল হয়ে গেছে কিন্তু পাশে বসা মানুষটা রোবটের মতো অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, পেখমকে কিছুটা গুছানোর সময় দিয়ে একটা ছোট প্যাকেট এগিয়ে দিল। প্যাকেট খুলে একটা র্যাপিং করা ভালো মানের স্যান্ডউইচ আর একটা চকোলেট ব্রাউনি পেল। এসব দেখে তার কেন যেন আবার কান্না পেল, সে ডুকরে কেঁদেই ফেলল। কোনো হেলদোল করল না ক্যাস্পিয়ান। একটু পর সে শান্ত হয়ে ব্রাউনি খেতে খেতে বলল "সরি মিস্টার ক্যাস্পিয়ান।"
"কেন?" পরক্ষণে আবার ভাবল হয়তো তার সামনে কেঁদেছে বলে "ইট'স ওকে মিস।"
"সেদিন ইচ্ছে করে পানিটা ফেলিনি, আমি.. আমি নিচে নেমেছিলাম কিন্তু আপনি ততক্ষণে চলে গেলেন।"
দুজনেরই সে মুহূর্তের কথা ভেবে বিব্রত বোধ হলো। পেখমের খুব হাসি পাচ্ছে কিন্তু সামনের মানুষটা এমন গোমরা মুখো হলে কি একা একা হাসা যায়? তাই সে এক পাশ ফিরে হাত চেপে মুখের হাসি দমন করল।
হয়তো রোদচশমার আড়ালে বলেই ক্যাস্পিয়ানের চোখের ভাষা বোঝা গেল না, তবে কিঞ্চিৎ ঠোঁট তো তারও বেঁকে ছিল।
:
:
একে একে শীতের কম্পন আর বসন্তের মায়া পেরিয়ে এসেছিল গ্রীষ্ম, তাও এখন যায় যায়... গাছের পাতাগুলো যেন হলদে সোনালীর মিশেলে নতুন এক কল্পপুরী আঁকতে ব্যস্ত। শরতের আগমন সোনালী করে তুলছে কোলন শহরের প্রতিটি রাস্তা।
আড়াই বছর। সময়টা খুব কম নয়, আবার খুব বেশিও নয়। পেখমের প্যাডেল চালানোর গতিতে এখন এক ধরণের পরিপক্বতা এসেছে। এখন আর সেই ভয়ার্ত কিশোরীটি নেই। সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার পথে ভার্সিটির গেটের সামনে, মাঝে মাঝে যখন ক্যাস্পিয়ানকে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তার বুকটা আর আগের মতো ধক করে ওঠে না। পেখম এখন নির্লিপ্ত। সে জানে, এই আড়াই বছরে তার চারপাশের জগত বদলে গেছে, সেও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে দ্বিগুণ। হৃদিশাহ ম্যাডাম এখন বাংলাদেশে নয়, তিনিও জার্মানির কোনো এক কাঁচঘেরা অ্যাপার্টমেন্টে বসে নিজের জীবনকে রোজ নতুন করে উপলব্ধি করেন।
পেখম যখন নদীর পাড় দিয়ে সাইকেল চালায়, তখন সে বিকেলের মায়াবী আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। ফিজিওথেরাপির কঠিন পড়ালেখা আর হাসপাতালের হাড়ভাঙা খাটুনির পর এই নদীটাই তার পরম বন্ধু। প্র্যাকটিক্যাল সেশনে সারাদিন হাড়গোড় আর ওষুধের গন্ধ মাখার পর এই খোলা হাওয়া তাকে অক্সিজেন দেয়। সপ্তাহ শেষে ক্লিনিকে পাওয়া সামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে সে যখন নদীর ধারের বেঞ্চে বসে এক কাপ কফি খায়, তখন নিজেকে তার পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়। তবে আজ দিনটা একটু অন্যরকম। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রেহনুমা তাকে এক অবিশ্বাস্য তথ্য দিল। রেহনুমা খুব চাপা স্বরে পেখমকে বলল, "জানো পেখম, নিউরোলজির বিশ্বখ্যাত সার্জন আজ আমাদের এখানে আসছেন।"
পুরো একটা টিম নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছেন সার্জন পেট্রিক স্টার্লিন। মানুষটা তার টিমের সাথে এতটাই খোলা মনে কথা বললেন, সবার টেনশন মুহূর্তেই কেটে গেল। বয়স হয়তো ৪৩-৪৫ হতে পারে। এতো উচ্চপদস্থ মানুষ, পেখম ভেবেছিল কতটাই না মুডি হবে।
পেখম ফিসফিস করে বলল "উনার দক্ষতা শুনে ভেবেছিলাম উনি খুব মুডে থাকবেন কিন্তু স্যার তো খুব জলি মাইন্ডের।"
রেহনুমা বলল "এজন্যই হয়তো ম্যাডামের পছন্দ হয়েছিল।"
"মানে?"
"কেন তুই জানিস না? সারাদিন তো ম্যাডাম ম্যাডাম করিস। তিনি হৃদিশাহ ম্যাডামের স্বামী।"
পেখম থমকে দাঁড়াল। তার চোখে একরাশ বিস্ময়। সে বরাবরই ভেবে এসেছিল ম্যাডাম সিঙ্গেল। অথচ রেহনুমা আরও জানাল, এই দম্পতি এক ছাদের নিচে থাকেন না, তাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত কথোপকথন নেই। হাসপাতালের করিডোরে যখন সেই সার্জনকে সে দেখল, তখন তার মনে হলো সম্পর্ক কি এতটাই জটিল হতে পারে?
পেখম সব সময় খেয়াল করেছে, ম্যাডাম হাসিমুখে থাকলেও তার চোখে একটা কৃত্রিম হাসি।
ঠিক এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যেই হৃদিশাহর ফোনটা আসে। হয় না মাঝেমধ্যে অন্তরের টান, যাকে আমরা মনে করি সেও আমাদের মনে করে? ফোনের ওপাশে সেই পরিচিত রাশভারী কিন্তু স্নেহমাখা কণ্ঠ। হৃদিশাহ তাকে এক নতুন প্রস্তাব দেয়। জার্মানির এক প্রখ্যাত অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের সাথে কাজ করার সুযোগ। পেখমের জন্য এটা কেবল ক্যারিয়ার নয়, বরং এক নতুন জীবনের হাতছানি। কাজে যোগ দেওয়ার প্রথম অ্যাসাইনমেন্টটাই ছিল বেশ চমকপ্রদ।
:
:
:
সেদিন প্রকৃতির মেজাজ ছিল কিছুটা রুক্ষ। ঝোড়ো বাতাস বইছিল। পেখম মেট্রোতে চড়ে যখন নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাল, তখন সে দেখল এক বিশাল জনসমাগম। সেখানে একটি জনপ্রিয় ব্যান্ডের কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু লিড গিটারিস্ট হঠাৎ ইনজুরিতে পড়ায় সব ওলটপালট হয়ে গেছে। পেখম যখন ড্রেসিং রুমে ঢুকল, সে দেখল সেখানে বসে আছে জেরকণ। সেই জেরকণ, যার আঙুলের জাদুতে হাজারো মানুষ পাগল। হাতের ব্যথায় সে কুঁকড়ে যাচ্ছে প্রায়। পেখম খুব শান্তভাবে তার সরঞ্জাম বের করল। জেরকণের হাতের চেকআপ করার সময় সে অনুভব করল, জনপ্রিয়তার এই চাকচিক্যের আড়ালেও কত গভীর ক্ষত থাকতে পারে।
আগের চাইতে স্বাস্থ্য চেহারা উন্নত হলেও, কথাবার্তা সেই আগের মতোই কর্কশ, সে পেখমকে বলল "দ্রুত কিছু একটা করো আমার হাত যেন এখনই সুস্থ হয়ে যায়।"
"একটু রিলাক্স করুন স্যার আমি দেখছি।"
"দেখছি মাই ফুট! একটু পরেই শো শুরু হয়ে যাবে। কিছু একটা করো জলদি।"
জেরকণ একপলক পেখমের ব্যস্ত মুখের দিকে লক্ষ্য করে বলল "তুমি? কোথায় যেন দেখা হয়েছিল আমাদের?"
পেখম একপ্রকার চোখ লুকাল, নিজেকে আরও ব্যস্ত দেখাল।
:
:
জার্মানির কোলন শহরের একটা অ্যাপার্টমেন্টে হৃদিশাহ বসে আছে একা। কাঁচের জানালার ওপাশে আধুনিক জার্মানির ব্যস্ত শহর আর রূপালি নদী দেখছে সে। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই হৃদিশাহর সামনে এসে দাঁড়ায় তার স্বামী পেট্রিক।
হৃদিশাহ তীব্র ঘৃণা নিয়ে বলে ওঠলো, "আবারও ড্রাঙ্ক হওয়ার ভান করছ? আগের বার বুঝতে পারিনি বলে ঠাঁই দিয়েছিলাম। কেন আসো বারবার আমার দরজায়?"
তার স্বামী কোনো উত্তর দেয় না। তাদের জীবনে অনেক কিছু হয়ে গেছে, মাতাল হওয়ার ভান করে হলেও যদি বিশাল দেওয়ালটা টপকানো যায়। তার হৃদয়ে আজও হৃদিশাহর জন্য এক গোপন আকুতি রয়ে গেছে। সে মুখ ফুটে বলতে পারে না, কিন্তু হৃদিশাহকে সে নিজের আয়ত্তে রাখতে চায়। প্রকৃতির এই শীতলতার মাঝে সম্পর্কের এই উষ্ণতা, কেউ কাউকে না দেখালেও যেন নিঃশব্দে ফুঁসছে। হৃদিশাহর হাত ধরে তার দিকে চেয়ে রইল পেট্রিক।
"ছাড়ো আমাকে!" কথায় কোনো কাজ হলো না হৃদিশাহর। পেট্রিক ইচ্ছে করেই যেন তার গায়ে ঢলে পড়ল।