জেরকণের আলিশান ড্রয়িংরুমে এখন যুদ্ধের পরিবেশ। পেখম ঠিক করেছে, আজ সে জেরকণকে পেশাদারিত্বের চরম শিক্ষা দেবে। সে তার থেরাপি ব্যাগ থেকে সরঞ্জাম বের করে বেশ গম্ভীর মুখে বলল, "মিস্টার জেরকণ, কেবল ম্যাসাজে আপনার হাতের লিগামেন্ট ঠিক হবে না। আজ আমরা কিছু 'প্রোপ্রিওসেপ্টিভ রিহ্যাবিলিটেশন' এক্সারসাইজ করব। রেডি?"
জেরকণ সোফায় হেলান দিয়ে এক ভ্রু উচিঁয়ে তাকাল। "ব্যায়ামের আবার এতো কঠিন নাম হয় নাকি?"
পেখম কথা না বাড়িয়ে জেরকণের ইনজুরি হওয়া হাতের আঙুলে একটা 'রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড' পেঁচিয়ে দিয়ে বলল, "এই ব্যান্ডটা টেনে ধরে রাখুন আর অন্য হাত দিয়ে 'ফিংগার স্পাইডার' মুভমেন্ট করুন। খবরদার, হাত যেন না কাঁপে!" দশ মিনিট যেতে না যেতেই জেরকণের কপালে ঘাম জমে গেল। পেখম একটুও দয়া না দেখিয়ে এবার তার হাতে একটা 'ব্যালেন্স বল' ধরিয়ে দিয়ে বলল, "এবার 'রিস্ট সার্কামডাকশন' করুন। থামা যাবে না।"
জেরকণ নাজেহাল হয়ে বলল, "তুমি কি ফিজিওথেরাপিস্ট নাকি টর্চার সেলের ইনচার্জ? আমার মনে হচ্ছে হাতটা খুলে পড়ে যাবে।"
পেখম একটু বাঁকা হেসে বলল, "ব্যথা ছাড়া আরোগ্য হয় না, স্যার।"
ব্যায়াম শেষে ক্লান্ত জেরকণ যখন সোফায় মাথা এলিয়ে দিল, পেখম কৌতূহল সামলাতে না পেরে চারপাশটা একবার দেখে নিল। স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের মতো দেখতে এই ডুপ্লেক্স ঘরটা বেশ গোছালো এবং প্রাণবন্ত। সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, "একটা কথা বলব? আপনার মতো মানুষের এতো বড় প্রাসাদসমান বাড়ি থাকতে আপনি এই ছোট ঘরে পড়ে আছেন কেন?"
জেরকণ চোখ বন্ধ করেই ম্লান হাসল। "ঐ প্রিজনে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।"
পেখম ভ্রু কুঁচকাল। "অদ্ভুত! নিজের বাড়িকে কেউ প্রিজন বা কারাগার বলে?"
"ওটা আমার পূর্বপুরুষের দম্ভ, আমার নয়।" জেরকণ চোখ খুলে জানালার বাইরের আকাশটার দিকে তাকাল। "এই ঘরটা আমার নিজের উপার্জনে কেনা। ঐ রাজপ্রাসাদের চেয়ে এই ছোট ঘরটা ঢের গুণ ভালো। এখানে অন্তত আমি শ্বাস নিতে পারি।"
পেখম কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল মনে মনে ভাবলো "যার মা বাবা ভাই-বোন ঘরবাড়ি সবকিছু আছে তারও কি একা লাগে?" তারপর নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, "এই হাতের ইনজুরিটা কীভাবে হয়েছিল? কোনো অ্যাক্সিডেন্ট?"
মুহূর্তেই জেরকণের মুখটা কঠিন হয়ে গেল। সে কোনো উত্তর দিল না, কেবল দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার এই নীরবতা যেন এক গভীর ক্ষতের জানান দিল।
:
:
:
পড়ন্ত সোনালী বিকেলে জেরকণের বাসা থেকে বেরিয়ে পেখম যখন হোস্টেলের পথে পা বাড়াল, তখন দেখল ক্যাস্পিয়ানকে। ক্যাস্পিয়ান তার দিকেই আসছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই চার-পাঁচজন লোক তার ওপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই দৃশ্য দেখে পেখম ভয়ে এক কোণে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।এদিকে লোকজন ও কম, সারি সারি পাইন গাছ।তেমন জনসমাগম নেই। সে দেখল, ক্যাস্পিয়ান অত্যন্ত দক্ষভাবে পরিস্থিতি সামলে তার পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করল। কয়েকটা তীব্র আওয়াজ! সে কেবল তাদের তাড়ানোর জন্য পায়ের কাছে শ্যুট করছিল। লোকগুলো পালিয়ে গেলেও পেখম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে ক্যাস্পিয়ান এখন এক আতঙ্কের নাম।
সে পেখমের দিকে এগোতে নিলেই, মেয়েটি ভূত দেখার মতো উলটো পথে এক প্রকার দৌড়ে পালালো।
:
:
দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেল ::
বন্ধের দিন নিচে নামলো পেখম। আজ ক্যাস্পিয়ান একটু দেড়িতে এসেছে, না হয় সবসময় গার্ডের মত গেটের সামনে গাড়ি নিয়ে হাজির থাকে।আর ম্যাডামের পাঠানো কিছু না কিছু তার হাতে তুলে দেয়।
পেখম আগ বাড়িয়ে দু'চারটা কথা বলতো কিন্তু আজ কিছুই বললনা।
তার একটু কাছে যেতেই বুঝতে পারলো, কপালে ছোট ব্যান্ডেজ, ঠোঁটেও ক্ষত দেখা যাচ্ছে।নিশ্চয়ই নতুন করে কোথাও ভেজাল করেছে এই লোক।ক্ষত দেখে বুঝা যাচ্ছে সম্প্রতি কিছু হয়েছে।
কোলন শহর থেকে মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার পথ। তাদের গন্তব্য 'মন্সশাউ' (Monschau) শহরের অদূরে ই ফেল (Eifel) অঞ্চলের পাহাড়ের চূড়ায় হৃদিশাহর পরিচিত এক গোপন বাগানবাড়ি। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে যাওয়ার সময় দুপাশে ঘন বন আর ছোট ছোট ঝর্না। ক্যাস্পিয়ান ড্রাইভ করছিল একদম চুপচাপ। গাড়ির ভেতর এক ভারী নীরবতা, কিন্তু সেই নীরবতায় মিশে ছিল এক না বলা অনুভূতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে পেখম মনে মনে আওড়ালো
" তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর সে পানি যমীনের ঝর্ণাসমূহে প্রবাহিত করেছেন, এরপর তদ্দ্বারা বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তোমরা তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর আল্লাহ তাকে খড়-কুটায় পরিণত করে দেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্যে উপদেশ রয়েছে।সূরা আয্-যুমার : ২১"
চারিদিক দেখতে দেখতে পেখম পেছনের সিটে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল।
ক্যাস্পিয়ান খুব সাবধানে ড্রাইভ করছিল যাতে পেখমের কোনো কষ্ট না হয়। মাঝে মাঝে সে আড়চোখে দেখছিল পেখমের শান্ত মুখটা।
এক সময় তারা পৌঁছাল 'হিলিং হার্বস লজ'-এ। এটি মূলত একটি ভেষজ চিকিৎসালয় এবং স্পিরিচুয়াল সেন্টার, যা স্থানীয়দের কাছে 'ডাই গাইনেন হিইলার' (The Green Healer) নামে পরিচিত। কাঠের তৈরি এই লজটি পাহাড়ের এমন জায়গায় অবস্থিত যেখান থেকে পুরো উপত্যকা দেখা যায়। জার্মানদের কাছে এটি একটি পবিত্র ও আধ্যাত্মিক স্থান।
হৃদিশাহ তাদের দেখে খুশি হলো। সেখানে উপস্থিত অন্যান্যদের সাথে মেলামেশার ফাঁকেও ক্যাস্পিয়ান আর পেখমের মধ্যে এক অদ্ভুত লুকোচুরি চলতে লাগল। ক্যাস্পিয়ান প্রকাশ্যে কিছুই করল না, কিন্তু লাঞ্চের টেবিলে পেখমের পছন্দের ডিশটা তার দিকে এগিয়ে দেওয়া কিংবা বিকেলে যখন পাহাড়ের ঠান্ডা বাতাস বইছিল, তখন পেখমের অজান্তেই তার চেয়ারের পেছনে একটা পাতলা কার্ডিগান রেখে আসা, সবই ছিল তার নীরব যত্ন। পেখম অনুভব করছিল ক্যাস্পিয়ানের এই নীরব কার্যকলাপ কিন্তু পিস্তল হাতে তার রুদ্রমূর্তি সে ভুলতে পারছিল না।নিজের সহজ সরল জীবনে, এমন জটিল ধাঁচের মানুষ থাকতে পারে সে ভাবেনি।
তবে কী ক্যাস্পিয়ান ও পেখমের চোখে একজন রেড ফ্ল্যাগ হয়ে গেছে?
হৃদিশাহ এরপর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাগান বাড়ির একটা অংশে বন ফায়ারের আয়োজন করল,
নিয়ে গেল সবাইকে। পেখমের মধ্যে এক অদ্ভুত ভালো লাগা অনুভব হলো।মন চাইলো,তার যদি এমন একটা জায়গায় থেকে যাওয়ার সৌভাগ্য হতো।একটুপর হৃদিশার সাথে দূটো ৯ বছরের বাচ্চা ছেলে-মেয়ে এল।
পেখম কাছে যেতেই সে বলল, ইনি হলেন তোমাদের আন্টি।
পেখম বিদেশি বাচ্চা দুটোর দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখল, তাদের চেহরায় ম্যাডামের আদল আছে।
ম্যাডাম ওরা?
হৃদিশাহ হেসে বলল আমার টুইন বাচ্চা।
:
গ্রীল করা পোড়া মাছ- মাংসের সুঘ্রাণ ছড়াচ্ছে চারপাশে, সাথে রেখেছে হরেক রকমের ফলের রস।এই আয়োজনে অনেক ডাক্তাররা ও উপস্থিত আছেন
।এতো মানুষের ভীরে ক্যাস্পিয়ান মুখে কিছু না বললেও লক্ষ্য করছিল পেখম কেই।তার প্রতিটি কাজে ছিল গভীর যত্ন কিন্তু পেখম তাকে এড়িয়ে চলছিল।
পেখমের উপেক্ষা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো। এতো বছরে এইটুকু তো চিনে গেছে সে।
:
:
:
দুইদিন পর,বিকেলে আবহাওয়া হঠাৎ খুব খারাপ হয়ে গেছে। পেখম যখন জেরকণের বাসায় শেষবারের মতো থেরাপি দিতে গেল, তখন চারপাশ অন্ধকার। জেরকণ দরজা খুলেই রূঢ়ভাবে বলল, "আজ যাও পেখম। আমার একা থাকতে ইচ্ছে করছে।" তার চোখের বিষণ্ণতা দেখে পেখম বলল "ঠিকাছে"।
ভেবেছিল অন্তত ঝড় থামলে সে বের হবে কিন্তু জেরকণের রুক্ষতায় কিছু বলতে পারল না, মুখের উপরেই ধপাস করে দরজা বন্ধ করে দিল,একবারও এতো খারাপ আবহাওয়ায় সে কীভাবে যাবে ভাবলো না।ঝড়ের মধ্যেই ভিজে একাকার হয়ে সে হোস্টেলে ফিরল।
:
:
:
রাতে রুমে ফিরে সে মামার কাছে লোনের টাকা পাঠিয়ে জানালার ধারে বসল। তার মাথায় তখন কেবল ক্যাস্পিয়ানের চিন্তা। ক্যাস্পিয়ানের চোখের ওপর সেই পুরনো কাটা দাগটা কি এভাবেই কোনো মারপিট থেকে এসেছে? সে কি তবে কোনো অন্ধকার জগতের মানুষ? অথচ তার যত্নগুলো এতো...
বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। পেখম ভাবল, জেরকণ তার ক্ষত লুকিয়ে রাখে আড়ালে, আর ক্যাস্পিয়ান তার ক্ষত বয়ে বেড়ায় প্রকাশ্যে । তার মতো এক সাধারণ মেয়ের জীবনে এই দুই রহস্যময় পুরুষ আসলে কোন ঝড়ের সংকেত নিয়ে এসেছে?
সেদিন রাতে কোলনার ডোমের বিশাল চূড়াটা ভিজে একাকার হলো , ঠিক যেমন পেখমের মনের অজস্র অমীমাংসিত প্রশ্ন।