ইউনিভার্সিটি অব কোলনের অ্যানাটমি ল্যাবে তখন হাড়ের ক্যাডাভেরিক মডেল গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ আলো পড়েছে। পেখম মন দিয়ে ফিমার হাড়ের "জয়েন্ট রিঅ্যাকশন ফোর্স" নিয়ে নোট নিচ্ছিল।
চারপাশে চলছে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের ব্যস্ততা। বরাবরই এসব তার কাছে কেবল নতুন নয়, প্রতিবার বিস্ময়করও লাগে। কী সুন্দর তাঁর সৃষ্টি!সৃষ্টিকর্তার প্রশংসাই বলল
"আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন সব বিষয়ে যাতে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের একের উপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ। আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত। (সূরা-আন নিসা : ৩২)"
আজ পেখমের অবচেতন মন বার বার ভার্সিটির গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো স্পোর্টস কারটার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। সে জানে, এই শহরে তার আপন কেউ নেই, কিন্তু কেউ একজন ছায়ার মতো তার পিছু নিচ্ছে। ক্লাস শেষে অজানা এক ভয়ে ভয়ে গেটে দেখল কেউ নেই। যাক! স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেলে ভাবল, প্রথমবার হৃদিশাহ ম্যামের সাথে দেশের বাইরে দেখা হবে। এই অচেনা রাজ্য যেন আজ তার কাছে একটু একটু আপন লাগছে।
সাইকেলটা স্ট্যান্ডে রাখতে গিয়েই সে মোবাইল চেক করল। "সে কী! লোকেশন তো সেন্ড করেনি ম্যাম। একটা কল করে দেখি।" হঠাৎ কী মনে করে চোখ তুলতেই দেখতে পেল, কালো চশমা পরা পুরুষটি তার সামনে এগিয়ে আসছে।
বার কয়েক ঢোক গিলল সে। এর আগে কখনো বিদেশি পুরুষ দেখেনি তা নয়! ইদানীং তো প্রায়ই দেখা হয়, কিন্তু এই দীর্ঘদেহী, শক্ত চেহারার পুরুষটি যেন একটা রোবট। পরনের কালো ওভারকোটটা খুলে হাতের এক পাশে রেখে সরাসরি পেখমের দিকে এগিয়ে এল সে। লোকটা গম্ভীর গলায় ইংরেজিতে বলল,
"চলুন।"
"জি?"
"আমার সাথে চলুন।"
পেখম পাশ কাটিয়ে এক প্রকার উপেক্ষা করে চলে গেল। "আশ্চর্য! ভেবেছে কী আমাকে?"
সে আবার পেছন থেকে ডাকল, "এক্সকিউজ মি! আপনাকে বলছি গাড়িতে উঠুন।"
পেখম ভয় পেলেও প্রকাশ না করে উত্তর দিল "দেখুন আপনাদের দেশে ওসব থাকতে পারে কিন্তু আমি সেই টাইপের নই।"
"টাইপ?" সে যেন ভ্রু উঁচু করল।
তৎক্ষণাৎ হয়তো কল এসেছে, পকেট হাতড়ে মোবাইল কানে দিল সে। পেখম কিছু শুনতে পায়নি, এত আস্তে কথা বলেছে।
কয়েক সেকেন্ড পর বলল, "মিস পেখম, ডক্টর হৃদিশাহ আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।"
সমস্ত জল্পনা কল্পনা যেন বেলুনের মতো ফেটে গেল। পেখম কিছুটা দ্বিধায় পড়ল। লোকটা কি তবে ম্যাডামের বডিগার্ড? সে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, "আমি তো সাইকেলে..."
"সাইকেলটা এখানে সুরক্ষিত থাকবে। প্লিজ, গাড়িতে উঠুন।" লোকটার কথায় এক ধরণের পেশাদার দৃঢ়তা আছে।
পেখম যখন কালো স্পোর্টস কারের পেছনের সিটে বসল, তখন তার মনে হলো সে কোনো সিনেমার দৃশ্যে ঢুকে পড়েছে। মনে মনে খুব লজ্জা পেল, ঠোঁট কামড়ে ভর্ৎসনা দিলো ঐ গ্রুপের পুকি মেম্বারকে, যে কিনা বলেছিল "লোকটা যদি তোমাকে নিজের সাথে নিয়ে গিয়ে রোমান্টিক শাস্তি দেয়।"
ছিঃ ছিঃ! এতো ফালতু চিন্তা আগে কখনো আসেনি, তাই তো পেখম এমন আচরণ করেছে। এই জন্যেই হয়তো বলে, সঙ্গদোষে লোহা ভাসে।
গাড়িটা লিনডেনথালের পরিচিত ঘিঞ্জি রাস্তা পেরিয়ে দ্রুত গতিতে এগোতে লাগল দক্ষিণের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশের দৃশ্যপট বদলে গেল। লিনডেনথালের ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্টের বদলে দুপাশে দেখা দিল বিশাল সব পাইন গাছ আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজের সমারোহ। এটিই হানভাল্ড (Hahnwald), কোলনের সবচেয়ে দামী আর অভিজাত এলাকা।
গাড়ির কাঁচের ওপাশে পেখম দেখল আধুনিক স্থাপত্যের সব ভিলা। প্রতিটি বাড়ির দূরত্ব একেকটি ছোটখাটো মাঠের সমান। শান্ত, নিস্তব্ধ এই এলাকায় বাতাসের গন্ধটাও যেন আলাদা। গাড়িটা এক বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল। সামনে একটি ধবধবে সাদা রঙের ক্যাসেল-সদৃশ বাড়ি, যার চারপাশ ঘিরে রেখেছে বিশাল বাগান। এই সমস্ত চোখ ধাঁধানো রূপ দেখে পেখম মনে মনে জপল,
"বলুন ইয়া আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। (সূরা আল ইমরান : ২৬)"
গাড়ি থেকে নামতেই পেখম দেখল পোর্টিকোতে দাঁড়িয়ে আছে ৩৫ বছরের উন্নত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক নারী, যার মন হাজারও রূপবতীর চাইতে বেশি সুন্দর, বেশি দামী। অন্তত পেখমের চোখে তার চেয়ে সুন্দর নারী কেউ নেই। তবে তিনি একা নন, ডক্টর হৃদিশাহ এর সাথে রয়েছেন আরও এক সম্ভ্রান্ত নারী আর এক তরুণী। তারা হলেন ম্যাডামের বোন সামিরা এবং তার মেয়ে, যারা এই হানভাল্ডের অট্টালিকার মালিক। হৃদিশাহ এগিয়ে এসে পেখমকে জড়িয়ে ধরলেন। মিসেস সামিরা বললেন, "তুমিই তবে সেই মেয়ে যার কথা হৃদি ভুলেনা কখনো! এসো মা, ভেতরে এসো।"
এমন আদর করে কখন কেউ কথা বলেছে, পেখমের মনে পড়ছে না। পেখমের মুখে হাসি কিন্তু নমনীয় চোখ। হৃদিশাহ এর হাত দুটো ধরে বলল, "খুব খুব ভালো লাগছে আপনাকে দেখে ম্যাম।"
ম্যাডাম তার চোখের ভাষা বুঝলেন। তিনি হাসিমুখে বললেন, "আজকের রাতটা তুমি এখানেই থাকবে পেখম। তোমার সাথে অনেক জরুরি কথা আছে।"
পেখমের মাথায় এল কিছু প্রশ্ন। তার সেই 'কাগুজে স্বামী' কে? কেন তাকে এই রাজপ্রাসাদে আনা হলো? কিন্তু ম্যাডাম যেন কৌশলে সব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলেন। ডিনার টেবিলে মিসেস সামিরার পরিবারের হাসিঠাট্টা আর আভিজাত্যের আড়ালে পেখম নিজেকে খুব বেমানান অনুভব করছে। তার মনে পড়ে গেছে দেশের সেই জরাজীর্ণ পরিবার, যেখানে শখ করে এক টুকরো মাছ- মাংসও খেতে পারেনি সে। আর হোস্টেলের শর্টকাট খাবারের কথা। জীবন তাকে এতো সুন্দর কিছু দেখাবে সেটা কেবল কল্পনা বৈকি।
:
:
রাত যখন গভীর হলো, পেখমের তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে গেল। ডাইনিং রুমের আলিশান ঝাড়বাতিগুলো ততক্ষণে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে পা টিপে টিপে কিচেনের দিকে এগোল। পুরো বাড়িটা যেন ঘুমিয়ে গেছে । কিচেনের বিশাল আইল্যান্ড টেবিলের পাশে অন্ধকারের মধ্যে কেউ একজন দাঁড়িয়ে ফ্রিজ থেকে বোতল বের করছিল।
পেখম ফোনের টর্চটা জ্বালাতেই আঁতকে উঠল। ওপাশে দাঁড়ানো কালো হুডি পরা এক লম্বা যুবক, যার কানে গোঁজা হেডফোন আর চোখে এক ধরণের অবাধ্য চাউনি। যুবকটিও পেখমকে এভাবে দেখে চমকে উঠল যদিও চোখে সে ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় কিছু দেখতে পাচ্ছে না। মুখ থেকে লাল তরল ছলকে পড়ল। সেটা দেখে পেখম এক পর্যায়ে বলে ফেলল, "মাগো! ভ্যাম্পায়ার না কি?"
মোবাইলটা ও হাত ফসকে ফ্লোরে পড়ে গেল।
"হু আর ইউ?" ছেলেটা কর্কশ স্বরে কিন্তু চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
তার মুখে কথা শুনতে না পেলে মনে হয় পেখম জ্ঞান হারাতো। সে ভয়ে তোতলাতে লাগল, "আ...আমি পেখম। ম্যাডামের মেহমান।"
ছেলেটার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি দেখা দিল। ডার্ক মেহগনি রঙের চুল আর ডান হাতের কব্জিতে একটা লাল রঙের উল্কি, যা ফ্ল্যাশলাইটের ঝাপ্সা আলোয়ও যেন দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা এক পা এগিয়ে এসে বলল, "ওহ! গুড।
ওয়েলকাম টু আওয়ার পার্সোনাল প্রিজন।"
"প্রিজন?"
পেখমের প্রশ্ন তোয়াক্কা না করে ছেলেটি বলল, "খাবার বানাতে জানো?"
"কী?"
"যাও কিচেনে গিয়ে কিছু বানিয়ে আনো।"
পেখম কেবল হা হয়ে রইলো, সে কী ভুল কিছু শুনছে?