আপুরা একটা বড় ভুল হয়ে গেছে আমার দ্বারা, কীভাবে লিখলে বুঝবেন জানি না। হয়েছে কী, এক মগ পানি রেখেছিলাম বেলকনির কিনারায়, অসাবধানতায় হাতের ধাক্কা লেগে সোজা নিচে গিয়ে পড়েছে এক ভদ্রলোকের মাথায়। আমি কাণ্ড ঘটিয়ে যখন নিচে দেখলাম, তখনই চোখাচোখি হয়ে গেছে দুজনের।
উফ! কী যে অস্বস্তি লাগছে। নিচে গিয়েছিলাম "সরি" বলার জন্য, কিন্তু কেউ ছিল না। এরপর থেকে যেখানেই যাচ্ছি লোকটাকে দেখতে পাচ্ছি। সে কি আমায় কোনো শাস্তি দিতে চায়?
গ্রুপে পোস্টটা এপ্রুভ হওয়ার পর থেকেই একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে সদস্যরা।
একজন লিখল: "আপু মগ কি ছোট ছিল নাকি বড়?"
আমি বললাম: "বাথরুমের মগ।"
আরেকজন বলল: "মগে কি পরিষ্কার পানি ছিল নাকি ময়লা?"
লেখিকার নোটঃ এই গল্পের এন্ট্রি বুঝার জন্য আপনাকে আমার লেখা মাত্র ৩ পর্বের রেড ফ্ল্যাগস ছোটগল্পটি পড়ে আসতে হবে।
"মোটামুটি ময়লাই বলা যায়, রুমমেট এর মেকআপ ব্রাশ আর ব্লেন্ডার পরিষ্কার করছিলাম।"
এক ছেলে সাথে সাথেই কমেন্টে বলে উঠল, "আপনাকে তো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত।"
একটু অবাক হলাম, "একই নৌকার মাঝি" গ্রুপে ছেলে সদস্যরাও আছে তা জানা ছিল না। যাই হোক, তাই বলে মৃত্যুদণ্ড?
আরেকজন "পুকি" সদস্য লিখল, "আপি মানুষটা কি ইয়াং নাকি আঙ্কেল টাইপ?"
"না আঙ্কেল ছিল না, যতবার দেখেছি, তাকে বডিগার্ডের মতো লেগেছে, ফিটফাট কালো পোশাকে, কালো রোদচশমা পরা।"
তারপর থেকে এমন এমন কমেন্ট আসলো--
১. "ইশ! আমার যদি এমন একটা বফ হতো।"
২. "আপু লোকটা মনে হয় আপনার ওপর ক্রাশ খেয়েছে।"
৩. "আজকে কারো গায়ে পানি ফেলতে পারিনি বলে একা রয়ে গেলাম।"
৪. "সে নিশ্চয় আপনার স্টকার, স্টক করতে এসে মগের ঝাপটা খেয়েছে।"
৫. "আপি, আমার মনে হচ্ছে সে তোমার জন্য রোমান্টিক কোনো শাস্তি বেছে রেখেছে। এই যেমন সুযোগ পেলে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রেমের প্রস্তাব দেবে।"
৬. "যত্তসব! আপনাদের মতো মেয়েরা ইচ্ছে করেই এমন করে, ছেলে দেখলেই শরীর নিশপিশ করে।"
৭. "আমার ছেলেকেও এভাবে পটিয়েছিল এক মেয়ে, এগুলোর মা-বাবা কই থাকে আল্লাহ জানে।"
৮. "নাকি আপনি ইচ্ছে করেই উনার ওপর পানি ফেললেন?"
৯. "ইন্টারেস্টিং লাগছে, পরে কী হয় আমাদের আপডেট দিও প্লিজ আপুনি।"
১০. "তা বাইরে যেখানে দেখা হয়েছে ওখানে কথা বলেননি?"
উত্তর: "না! বলার সুযোগ পাইনি, তাছাড়া উনাকে দেখলেই কেমন ভয় ভয় লাগে। চোখ না দেখার ফলে চেহারার অভিব্যক্তি বোঝাও মুশকিল।"
১১. "আরে নাহ, উনি হয়তো সত্যিই ভদ্রলোক, ভুল ভেবে মাফ করে দিয়েছেন আপনাকে। আর হয়তো বা কাকতালীয়ভাবে আপনি উনাকে দেখতে পাচ্ছেন।"
এই একটা জাতের কমেন্ট এসেছে এতক্ষণে। খিলখিল করে হাসতে লাগল রায়ানা কমেন্টের কথাগুলো শুনে। পেখমের যেন গা গুলিয়ে এলো। রায়ানাকে একটা চাঁটি মেরে বলল, "চুপ কর তো এবার, রাস্তার মানুষজন কী ভাববে? আর আমার দুঃখ শুনে তুই এমন হাসলি কেন?"
রায়ানা বলল, "আচ্ছা দোস্ত সরি সরি, কিন্তু লোকটা কি সত্যিই প্রতিশোধ নিতে চায়?"
"ধুর! তুইও বাকিদের মতো কীসব বলছিস। কেন যে গ্রুপে পোস্ট করতে গেলাম, এখন আমি নিজেই পস্তাচ্ছি।"
"যাক এসে পড়েছি গন্তব্যে, পরশু দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।" রায়ানা রাস্তার বাম পাশে ফিরে বিদায় নিল।
এবার রাস্তায় একা হাঁটছিল পেখম ভগ্নহৃদয় নিয়ে। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে গিয়ে হোঁচটও লাগল দুই-একবার। কী দোষ ছিল তার? জীবন সবসময় তাকেই কেন এমন পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করায়?
এসব ভাবতে গিয়েই কানে এলো স্পোর্টস কারের অবাধ্য ধ্বনি। সাথে সাথেই টনক নড়ল মেয়েটির। আর বেশি দূরে নয় হোস্টেল, একপ্রকার দৌড়ে অগ্রসর হলো। গাড়িটা পাশে প্রায় চলেই এসেছে, কোনো প্রকার সুযোগ না দিয়েই পেখম দৌড়ে ঢুকে পড়ল গেটের ভেতর। দ্রুত পায়ে উঠে গেল দোতলায়। করিডোর পেরিয়ে নিজের বরাদ্দকৃত কক্ষে ঢুকে লক করে দিল।
তাকে চমকে দিয়ে রেহনুমা জিজ্ঞেস করল, "কী ব্যাপার? এত হাঁপাচ্ছ কেন? কার থেকে পালিয়ে এসেছ?"
রেহনুমা ভেজা চুল মুছে তোয়ালে শুকাতে দিতে গেল বারান্দায়। "হেই ওয়াচ ইট, কী চলছে নিচে!"
পেখম রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল। বারকয়েক ঢোক গিলে তোতলানো সুরে জিজ্ঞেস করল, "কী... কী হয়েছে?"
রেহনুমা জলদি জলদি হাত নেড়ে ডেকে বলল, "আবার যেন কোন মেয়ের বয়ফ্রেন্ড এসে ঝামেলা করছে। ওয়াচম্যানের সাথে হাতাহাতি লেগে গেছে।"
পেখমের আর বুঝতে বাকি নেই। সর্বনাশা ঝড় হয়তো তার দিকেই ধেয়ে আসবে।
"ইশ, কী সাহসী ছেলে রে বাবা!" রেহনুমা বেশ মজা পাচ্ছিল এসব দেখে, কিন্তু পেখমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। বারান্দার দরজা লাগিয়ে দিয়ে সে টেনে নিয়ে এলো রেহনুমাকে।
"বাদ দাও, চলো শুয়ে পড়ি। আমি অনেক ক্লান্ত।"
রেহনুমা বলল, "তা ঠিক, আমিও।"
একটু পরেই দরজার কড়া নড়ল। এই বুঝি ওয়ার্ডেন এলো। কিন্তু দরজা খুলে দিতেই ভেতরে এলো এশনা, বিধ্বস্ত লাগছে দেখতে। পেখম হন্তদন্ত করে তাকে বেডে বসিয়ে দিয়ে বলল, "কী হয়েছে তোমার? এমন কেন লাগছে?"
রেহনুমা এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, "বুঝেছি এখন নিচে কে এসেছিল।"
এশনা চোখজোড়া তুলে বলল, "আমি ওয়ার্ডেনকে বলেছি তাকে চিনি না। ভা... ভালো করেছি না?"
মেয়েটির দ্বিধা জড়িত কণ্ঠকে প্রশ্রয় দিয়ে রেহনুমা বলল, "অবশ্যই ভালো করেছ। তুমি চেষ্টা চালিয়ে যাও, আরো ভালো করবে।"
ঘণ্টাখানেক পেরিয়েছে, পেখমের কৌতূহল এখনো কমেনি। সে এই গার্লস হোস্টেলে এসে থাকছে প্রায় দু-মাস ধরে। এই রুমে তারা তিনজন থাকে। এশনা সিলেটের আর রেহনুমা পুরান ঢাকার মেয়ে, তারপরও দুজনের সখ্যতা খুবই ভালো।
পেখম বহুবার মনের কৌতূহল দমাতে চেয়েছে, কিন্তু এই রাতে ফিসফিস করলে এশনার সবে আসা ঘুম হয়তো ভেঙে যাবে। সেটা ভেবে রেহনুমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। যদিও মনে একটু স্বস্তি পেয়েছে সে, যা আশা করেছিল, অন্তত তেমন কিছু হয়নি।
:
:
"এতিমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও। খারাপ মালামালের সাথে ভালো মালামালের অদল-বদল করো না। আর তাদের ধন-সম্পদ নিজেদের ধন-সম্পদের সাথে সংমিশ্রিত করে তা গ্রাস করো না। নিশ্চয় এটা বড়ই মন্দ কাজ। (সূরা আন-নিসা: ২)"
ফজরের ইবাদত শেষ করে পেখম যখন কুরআন পাঠ করছিল, এই আয়াতটি পড়তেই হঠাৎ ঠোঁটের এক কোণে দুঃখের হাসি ফুটল, চোখ ভরে এলো।
"এতিম? আমিও তো এতিম।"
চাচীর করা সেই ষড়যন্ত্রগুলো মানসপটে ভেসে উঠল মুহূর্তেই।
৬ মাস আগে-
চাচাতো বোন চমকের বিয়েটাও পড়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার মাঝখানে। সে কী কষ্ট! পরীক্ষা দিয়ে এসে কোথায় একটু বিশ্রাম নেবে, উল্টো পাকঘরের দায়িত্ব সঁপে দিত চাচী। নিত্যনতুন আয়োজন চলছিল ঘরে।
ভেবেছিল ফুফুর বাড়ি চলে যাবে, কিন্তু এর মধ্যেই হঠাৎ রাদিফ আবার বায়না ধরল। চমকের বিয়ে জুড়ে সে পিছু নিয়েছে পেখমের।
"এই পেখম, আজ কি শাড়ি পরবে?"
"না," পেখম কাজ করতে করতে জবাব দিল।
রাদিফ আবার বলল, "তাহলে কী রঙের জামা পরবে?"
"মানে?" পেখমের কাঠখোট্টা জবাবকে তাচ্ছিল্য করে সে হাসল, "ইয়ে মানে, আমি ম্যাচিং করে পরব ভাবছি তোমার সাথে।"
"পরতেই যখন চাচ্ছ, চলো একসাথে পড়তে বসি, পরশুদিন এক্সাম আছে না?"
"আরে ধুর! ওসব পরীক্ষা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, পাস করতে পারলেই হলো। আমি তো ব্যবসায়ী হব। চাকরি-বাকরি করলে একটা কথা ছিল।"
রাদিফের কথায় অবাক হলো পেখম। এই ছেলের পড়া নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, অথচ একই সাথে এইচএসসি পরীক্ষার্থী তারা। পেখম রাতদিন খেটে মরছে।
রাদিফ তুড়ি বাজিয়ে তার ধ্যান ভঙ্গ করল, "তোমার এত কিসের টেনশন জানেমান? ডোন্ট ওয়ারি ডিয়ার, ইওর লাইফলাইন ইজ হিয়ার। ওতো পড়া নিয়ে টেনশন করো না তো। চলো মজা করি।"
রাদিফ যত দুষ্টই হোক, ছোটবেলা থেকেই পেখমের পক্ষ হয়ে কথা বলত সে। পেখম তাকে অন্য চোখে দেখে না, তবে ফুফাতো ভাই হিসেবে ভালো বন্ধু মনে করে। তাই আর না পেরে একটু হাসল। "যাও তো এখান থেকে, আমার অনেক কাজ।"
"মামীর সাহস তো কম না, আমার জানেমানকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে! একটু বড় হয়ে নিই, তারপর দেখো কী করি।"
"ইশ! কেউ শুনে ফেলবে, এসব বলো না তো।"
পেখমের বারণে রাদিফ চোখ টিপে বলল, "এই জন্যই তো আমি ব্যবসা করব, যাতে দ্রুত তোমায় ঘরে নিতে পারি।"
পেখম কড়া চোখে তাকিয়ে বাইরে চলে গেল নাস্তার ট্রে হাতে। বাইরে যেতেই রুবাদকে দেখল। জিন্সের সাথে পরনের সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে রেখেছে, এমন নেতা নেতা ভাব নিয়ে আছে, চোখ পড়তেই কেমন ভয় ভয় করে তার। গম্ভীরমুখো রুবাদ ভাইও যে আজকাল তাকে খেয়াল করে, সেটা জানে না পেখম।