আই হেইট রেড ফ্ল্যাগস

পর্ব - ৬

🟢

​জেরকণের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পেখমের মুখের ওপর স্থির হয়ে আছে। ড্রেসিং রুমের আয়নায় সে বারবার পেখমকে চেনার চেষ্টা করছে। আড়াই বছর আগেকার সেই এলোমেলো মেয়েটি আর আজকের এই নিপুণ হাতের ফিজিওথেরাপিস্টের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। পেখম কোনো কথা বলছে না। সে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জেরকণের হাতের লিগামেন্টের ওপর চাপ দিচ্ছে। ব্যাগ থেকে ব্যথানাশক জেল আর আল্ট্রাসোনিক হিটিং প্যাড বের করে সে পেশীগুলোকে শিথিল করার চেষ্টা করল। জেরকণ ব্যথায় মুখ বিকৃত করলেও পরক্ষণেই পেখমের একাগ্রতা দেখে শান্ত হয়ে গেল। শো শুরু হতে আর মাত্র পনেরো মিনিট বাকি। পেখম শেষবারের মতো একটা কমপ্রেশন ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে বলল, এখন আপনি গিটার ধরতে পারবেন স্যার। তবে আঙুলের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।

​জেরকণ বিড়বিড় করে বলল, তোমাকে ঠিক কোথায় যেন দেখেছি! নামটা কী বললে?

পেখম জবাব না দিয়ে দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার হৃৎপিণ্ড ধকধক করছে। এই ছেলেটা কি তাকে চিনে ফেলল? আড়াই বছর আগের সেই স্মৃতিগুলো কোলন শহরের ধুলোর সাথে কবেই মিশে গেছে, কিন্তু অতীত যেন ছায়ার মতো পিছু ছাড়ে না।

পেখম যেতে যেতে ভাবলো

​"তিনিই আল্লাহ নভোমন্ডলে এবং ভূমন্ডলে। তিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন এবং তোমরা যা কর তাও অবগত।" - সূরা আল আনআম : ৩")

​পরের দিন হাসপাতালে এক এলাহি কাণ্ড। হাসপাতালের স্টাফরা ফিসফাস করছে, কে একজন বড় সেলিব্রিটি নাকি কাকে খুঁজতে এসেছে। রেহনুমা হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, কিরে পেখম! ব্যান্ডের সেই লিড গিটারিস্ট জেরকণ নাকি তোকে খুঁজতে এসেছে? নিচে গাড়ির লম্বা লাইন পড়ে গেছে।

পেখম ঘাবড়ে গেল, "আমাকে খুঁজছে?"

"হ্যাঁ।"

​সে চায় না আর কোনো ঝামেলার সাথে জড়াতে। সে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে হাসপাতালের ছাদে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। হৃদিশাহ ম্যাডাম তাকে ঠিকই খুঁজে বের করলেন। বাধ্য হয়ে যেতে হলো পেখমকে। ম্যাডামের সাথে তখন দাঁড়িয়ে আছে জেরকণ।

​হৃদিশাহ ম্যাডাম স্নেহের স্বরে বললেন, "পেখম, তুমি তো জানো না জেরকণ আমার আপন ভাগ্নে। ও জানালো কাল নাকি তুমি চমৎকার কাজ করেছো। ওর হাতের ইনজুরিটা বেশ পুরনো, আমি চাই তুমিই ওর রেগুলার ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করো।"

জেরকণ বাঁকা হেসে বলল, আন্টি ঠিকই বলেছে।

"কিন্তু ম্যাডাম, আমার পরিবর্তে আপনি সিনিয়র কাউকে দিলে আরো বেশি ভালো হতো মিস্টার জেরকণের জন্য।"

​হৃদিশাহ বলল, "কোনো সমস্যা হয়েছে কি? জেরকণ কী খারাপ ব্যবহার করেছে তোমার সাথে?"

জেরকণ প্রতিবাদ করে উঠল, "আই সোয়্যার আন্টি, আমি কিছু করিনি।"

পেখমও মাথা নাড়াল, না না তেমন কিছু না।

​হৃদিশাহ বলল, "আমি জানি ও একটু রূড তবে খারাপ মানুষ না।"

বিজ্ঞাপন

পেখম কিছু বলার আগে ছেলেটি বলল, "আমি তোমাকে ডাবল পেমেন্ট দেবো, যাতায়াতের জন্য গাড়ি ও দেবো। রাজি হয়ে যাও,প্লিজ।"

​পেখম আমতা আমতা করে রাজি হলো কারণ হৃদিশাহ ম্যাডামের কথা ফেলার সাধ্য তার নেই। সবাই যখন চলে গেল, জেরকণ কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, খুব তো পালিয়ে বেড়াচ্ছিলে! এখন থেকে তোমার আরেকটা কাজ আছে। রোজ থেরাপির পর আমাকে কিছু একটা খাওয়াতে হবে।

"আশ্চর্য! রাক্ষস একটা, সবসময় খাবারের কথা কীভাবে বলতে পারে মানুষ।" পেখম অন্যদিকে তাকিয়েই চোখ ঘুরালো।

সে একটা ছোট চিরকুটে তার বাসার ঠিকানাটা পেখমের হাতে গুঁজে দিয়ে চলে গেল। পেখমের পিত্তি জ্বলে গেল যেন। এই অহংকারী ছেলেটা কি তাকে বাবুর্চি ভাবছে? নিজের ওপরই রাগ হলো তার। কেন যে ওইদিন তার চিকিৎসা করতে গিয়েছিল সে!

​হোস্টেল রুমটি খুব ছোট হলেও বেশ গোছানো। জানলা দিয়ে তাকালে কোলন শহরের বিখ্যাত কোলনার ডোম বা ক্যাথিড্রালের বিশাল চূড়া দেখা যায়। রুমের দেয়ালে অ্যানাটমি চার্ট আর হাড়ের একটা ছোট মডেল ঝোলানো। এখানে বসেই সে দিনের অর্ধেকটা সময় পড়াশোনা করে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রিয় সাইকেলটা নিয়ে রাইন নদীর পাড় দিয়ে ভার্সিটিতে যায়। মাঝে মাঝে সেমিস্টার টিকিট দিয়ে ট্রামেও চলাচল করে। দুপুরে ইউনিভার্সিটির মেনসা বা ক্যান্টিন থেকে সস্তায় পাস্তা কিংবা জার্মান ব্রেড দিয়ে লাঞ্চ সেরে নেয়। তবে রাতের বেলা যখন খুব একা লাগে, তখন ছোট্ট একটা হাঁড়িতে বাংলাদেশি ডাল-ভাত রান্না করে বসে পড়ে। সেই ভাতের সুগন্ধে মনে হয় যেন এখনো তার চেনা শহরে আছে।

​জার্মান ভাষা শেখাটা পেখমের জন্য প্রথম দিকে পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু এখন সে বেশ রপ্ত করে নিয়েছে। যখন কোনো জার্মান বৃদ্ধ রোগীকে থেরাপি দেয় এবং ভাঙা ভাঙা জার্মান ভাষায় তাদের সাথে গল্প করে, তখন তাদের তৃপ্তির হাসি দেখলে পেখমের সব ক্লান্তি মুছে যায়। কোলন কার্নিভালের সময় যখন সারা শহর উৎসবে মেতে ওঠে, মানুষ বিয়ারের মগ হাতে রাস্তায় নাচে, পেখম তখন লাইব্রেরির এক কোণে বসে মানুষের পেশীর ইনজুরি নিয়ে পড়ে থাকে। তার এই কঠোর পরিশ্রমই তাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। পেখম সবসময় মানে:

"যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহান প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।" - সূরা আল মায়িদাহ : ৯)

​আজ জেরকণের বাসায় যাওয়ার প্রথম দিন। পেখম নিজের ডায়েরিতে একটা চার্ট তৈরি করেছে। প্রথমে ইনফ্রারেড রেডিয়েশন দিয়ে পেশী গরম করা, তারপর ম্যানুয়াল মোবিলাইজেশন এবং শেষে কিছু স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে একদম পেশাদার আচরণ করবে, কোনো প্রকার বাড়তি কথা বলবে না।

​অন্যদিকে, হৃদিশাহর অ্যাপার্টমেন্টে সকালের আলো এসে পড়েছে। হৃদিশাহ তৈরি হচ্ছিল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। বিছানার একপাশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পেট্রিককে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। মানুষটার মুখটা কী ভীষণ মায়াবী দেখাচ্ছে ঘুমানোর সময়! এক সময় এই মানুষটাকে সে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই পুরনো সব তিক্ত স্মৃতি আর প্রতারণার কথা মনে পড়ে যেতেই হৃদিশাহর চিবুক শক্ত হয়ে গেল। সে নিজের ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিছু ক্ষত বোধহয় সারাজীবনেও শুকায় না, কেবল সময়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।

:

:

​পেখম যখন জেরকণের আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে পৌঁছাল, তখন মৃদু হাওয়া বইছে। বেল বাজাতেই দরজা খুলল জেরকণ। গায়ে একটা ঢিলেঢালা টি-শার্ট, হাতে গিটার। সে এক কঠোর চাহনিতে বলল:

আসুন ডক্টর পেখম, আমি আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।

পেখম মনে মনে বিড়বিড় করল, ডক্টর পেখম নয় রে পাগল, তোমার ব্যথা বাড়ানোর ওষুধ এসেছে, এমন থেরাপি দেব আজ! নিজেই আমাকে বাদ দিবি। ফ্লার্টিং করিস আমার সাথে? আজ বের করব।

​জেরকণ ভেতরে যেতে যেতে পেছনে ফেলে আসা পেখমের উদ্দেশ্যে বলল, "আমাকে গালি দেওয়া বন্ধ করো।"

"হাই আল্লাহ! এই ছেলে কি সত্যিই ভ্যাম্পায়ার?"

"না"

পেখম আরো চমকে গেল।

বিজ্ঞাপন
আই হেইট রেড ফ্ল্যাগস গল্পটি সূচনা জাফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও সামাজিক গল্প