ব্যস্ততা যেন পেখমের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হসপিটালের সাদা করিডোর আর থেরাপি ইউনিটের যান্ত্রিক শব্দের মাঝেই তার সময় কাটে। জেরকণের সাথে সেই ঝড়ের রাতের পর আর দেখা হয়নি। মাসখানেক হলো সে দেশের বাইরে। ইউরোপ আর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে তার কনসার্ট আর প্রমোশনাল ট্যুর চলছে। মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার গিটার হাতে উন্মাতাল পারফরম্যান্সের ছবি পেখমের চোখে পড়ে, কিন্তু মানুষটার সেই বিষণ্ণ চোখ দুটোর কথা মনে পড়লেই পেখম ভাবতে থাকে"সুখের এই পৃথিবী, সুখেরই অভিনয়। আসলে কেউ সুখী নয়।
:
:
একদিন বিকেলে হৃদিশাহ ম্যাডাম তাকে নিজের কেবিনে ডেকে পাঠালেন। হাসিমুখে বললেন, "অভিনন্দন পেখম! তুমি সফলভাবে তোমার কারিগরি শিক্ষা (আউসবিল্ডুং) শেষ করেছ। এখন তুমি একজন সার্টিফাইড ফিজিওথেরাপি টেকনিশিয়ান।"
পেখমের চোখে কৃতজ্ঞতার জল চিকচিক করে উঠল। হৃদিশাহর বুদ্ধিতেই সে এই পথে এসেছিল। জার্মানিতে এই পদ্ধতিতে পড়ার সুবিধা হলো, তাকে কোনো টিউশন ফি দিতে হয়নি, বরং প্রতি মাসে সে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাতা পেয়েছে, যা দিয়ে সে নিজের খরচ চালিয়ে মামার ঋণের টাকাও পাঠাতে পেরেছে।
হৃদিশাহ তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, "এখন তোমার হাতে জব আছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে। কিন্তু আমি চাই তুমি আরও উঁচুতে যাও। ইউনিভার্সিটি অফ কোলন-এ দেড় বছরের একটা ব্যাচেলর প্রোগ্রাম আছে। সেটা শেষ করে তুমি চাইলে নিউরোলজি বা স্পাইন ইনজুরি নিয়ে স্পেশালাইজেশন করতে পারবে। একজন দক্ষ বড় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা এবার সত্যি করো পেখম।"
:
:
:
ডিপ্লোমা শেষ হওয়ার আনন্দে ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা মিলে ছোটখাটো একটা র্যাগ ডে আয়োজন করল। রাইন নদীর পাড়ে সবাই গোল হয়ে বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ আর স্বপ্নের কথা বলছিল। কেউ হতে চায় নামকরা গবেষক, কেউবা চায় বিশ্বভ্রমণ করতে।
সবাই যখন পেখমকে ধরল, সে একটু লাজুক হাসল। তারপর সুদূরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আমার স্বপ্ন খুব সাধারণ, অথচ হয়তো খুব কঠিন। ছোটবেলা থেকে নিজের বলতে কোনো ভাই-বোন পাইনি,মা-বাবা ও আর নেই। তাই আমার স্বপ্ন হলো আমার একটা সুন্দর, ভরপুর পরিবার হবে। যেখানে দিনশেষে ফেরার একটা নিশ্চিত ঠিকানা থাকবে, ডাইনিং টেবিলে অনেক মানুষের গল্প হবে। আমার যে জীবনসঙ্গী হবে, তার যেন অন্তত একটা মায়াময় পরিবার থাকে, যেখানে আমি ভাগ বসাতে পারব।"
পেখমের এই সহজ স্বীকারোক্তিতে বন্ধুরা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা হয়তো ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়ের কথা ভেবেছিল, কিন্তু এই মেয়েটি খুঁজছে কেবল হারানো শৈশবের পূর্ণতা।
সন্ধ্যায় নিজ ঘরে ফিরে, এক এক করে গায়ের কাপড় খুলল, কেবল ট্রাউজার রেখে একটি অন্ধকার জিমের কোণে ঘাম ঝরাতে লাগল ক্যাস্পিয়ান। তার জীবনের গল্পটা কোনো সিনেমার চেয়েও করুণ। বিশ বছর বয়সে সে ছিল সম্ভাবনাময় এক অ্যাথলেট, দুর্দান্ত ফাইটিং স্কিল তার কিন্তু এক নিমেষে সব বদলে যায়। ছোট বোন ছিল তার পৃথিবীর একমাত্র ধ্রুবতারা। সেই বোন যে স্কুলে পড়ত, তার মা-ও ছিলেন সেই স্কুলের শিক্ষিকা। একদিন একটি তেলের ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুলের ভেতরে ঢুকে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। সেই ভয়াবহ আগুনে ক্যাস্পিয়ানের মা আর ছোট বোন দুজনেই পুড়ে মারা যান।
সব হারিয়ে ক্যাস্পিয়ান নিজের জীবনের মায়া ছেড়ে দেয়। ঝুঁকির কাজই তার নেশা হয়ে দাঁড়ায়। বড় বড় ক্লাবে বাউন্সার হিসেবে কাজ করতে করতে সে এক দুর্ধর্ষ ফাইটার হয়ে ওঠে। এখন সে একটি নামি ক্লাবের শেয়ারিং পার্টনার, পেশাদারিত্বের খাতিরে শত্রুও তৈরি হয়েছে অগুনিত । চব্বিশ বছর বয়সে তার সাথে হৃদিশাহর পরিচয়। হৃদিশাহ তাকে অন্ধকার থেকে টেনে তুলেছিল, নিজের পরিবারের সদস্যের মতো আগলে রেখেছে আজ পর্যন্ত,সময়টা কম হলেও অনুভূতি বেশ জোড়ালো । ক্যাস্পিয়ান আজ যা কিছু, তার পেছনে এই পরিবারের অবদান অনেক। কিন্তু তার শরীরের কাটা দাগগুলো আজও সেই দাউদাউ আগুনের আর লড়াইয়ের স্মৃতি বয়ে বেড়ায়।
:
:
দুদিন পর, কাজ থেকে ফিরতেই পেখমের ফোনে একটা মেসেজ এল। জেরকণ ফিরেছে।
ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এল, "আজ বিকেলে আসতে পারবে? থেরাপিটা দরকার।"
জেরকণের আলিশান অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে পেখম অবাক হলো,জেরকণ বেশ কোমল চোখে তাকাল। সবচেয়ে বড় চমক ছিল ডাইনিং টেবিলে। ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত, ইলিশ মাছ ভাজা, আর পাতলা ডাল,পুরোদস্তুর বাঙালি খাবার সাজানো।
জেরকণ আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। আগের দিনের রুক্ষ ব্যবহারের জন্য সরাসরি ক্ষমা চাওয়া তার স্বভাববিরুদ্ধ, তাই এই আয়োজন। সে হালকা গলায় বলল, "বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল সেদিন... আমি আসলে মুডে ছিলাম না। বসো, খেয়ে নাও।"
পেখম কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। ভেতরে ঢুকলেন এক সুদর্শনা নারী। জেরকণের ব্যান্ডের প্রধান ভোকাল আর্টিস্ট এলি। সে এসেই জেরকণের কাঁধে হাত রেখে অধিকারের সুরে বলল, "জেরি! আই মিসড ইউ সো মাচ! তুমি ২ দিন পর এলে কী হতো? ও!এই মেয়েটি কে?
তবে কী এই সে মেয়ে, যার কারণে
তোমার কাজে মন লাগছে না?
কীসব বলছ এলি! ও আমার থেরাপিস্ট।
জেরকণের চোখের সেই কঠিন নীরবতা আবার ফিরে এল। পেখমের মনে হলো, এই সাজানো টেবিল আর মায়াবী মুহূর্তটা যেন কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
:
:
এলি চলে যাওয়ার পর জেরকণ গম্ভীর মুখে বলল, "এখন থেকে আমার সাথে তোমাকেও ট্যুরে যেতে হবে। সামনে অনেক কনসার্ট আছে আমার।"
পেখম শান্তভাবে ভাতের প্লেট সরিয়ে রেখে বলল, "আমি যেতে পারব না স্যার। আপনি অন্য ডক্টর ঠিক করে নিন। আমার অনেক পড়ালেখা আছে, ইউনিভার্সিটির ব্যাচেলর ডিগ্রিটা আমাকে শেষ করতে হবে।"
জেরকণ এক ভ্রু উঁচিয়ে অবাক হয়ে তাকাল। তার মতো রকস্টারের সাথে ঘোরার জন্য যেখানে হাজারো সুন্দরী মেয়ে লাইন ধরে থাকে, সেখানে এই মেয়েটি মানা করে দিচ্ছে? সে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, "তুমি জানো না মেয়েরা আমার একটা ঝলক দেখার জন্য পাগল হয়ে থাকে? আর তুমি আমার সাথে ট্যুরে যাওয়ার সুযোগ হেলায় হারাচ্ছ?"
পেখম উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিল। তারপর একটু বাঁকা হেসে বলল, "আপনার জন্য মেয়েরা পাগল হোক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি আপাতত পাগল হওয়ার চেয়ে ভালো মাথার সুস্থ মানুষ হয়ে থাকতে চাই।"
জেরকণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। এই প্রথম কেউ তার দম্ভের মুখে এমন সপাট জবাব দিল।
জেরকণ হাতের ব্যায়াম করতে করতে বলল,তুমি চাওনা, আমি তোমায় রাখি?
"না "
এমন সোজা জবাবে, খারাপ লাগার বদলে উল্টো যেন ভালো লাগলো জেরকণের "কেন? "
কারণ মিউজিক মানুষকে স্রষ্টা থেকে দূরে নিয়ে গিয়ে সৃষ্টির কথা ভাবায়। যে মনে কেবল সৃষ্টির গুনগান আর স্রষ্টার অনুপস্থিতি, অন্তত সেই মনে আমি থাকতে চাই না।
"কী অদ্ভুত চিন্তা মেয়েটার! এভাবে তো কখনো ভেবে দেখা হয়নি। মনেমনে বেশ চমকে গেল জেরকণ।
পেখম বলল "আজ আসি তাহলে বাকি গুলো আপনি ঘরে বসে ডেইলি প্র্যাকটিস করবেন।
ঘর থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে বলল"
আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বৈ আর কিছুই নয়। আর যারা সাবধানতা অবলম্বন করে তাদের জন্য পরকালের আবাসই শ্রেয়, তোমরা কি (তা) অনুধাবন কর না?আল-আনাম :৩২)"