পেখম তৈরি হচ্ছিল ভার্সিটির জন্য।
কোলনের (Cologne) হালকা শীতের সকাল, স্প্রিং চলছে তবুও ঠান্ডা কম নয়,তাপমাত্রা ১৮°। কাঁচের জানলার ওপাশে দেখল কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে (Lindenthal) লিনডেনথাল এলাকা। পেখম তার ডরমিটরির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্কার্ফটা ঠিক করে নিল। জার্মানিতে আজ তার তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। অথচ মনে হয় এই তো সেদিন, দেশের মাটিতে শহরের জ্যাম আর ধুলোবালি ঠেলে পাসপোর্ট অফিসে দৌড়াচ্ছিল।
এখন তার ঠিকানা “ইউনিভার্সিটি অব কোলন”। ফিজিওথেরাপি বিভাগের প্রথম সেমিস্টার চলছে। পড়াশোনার চাপ, নতুন ভাষা, আর তার চেয়েও বড় চাপ-নিজেকে টিকিয়ে রাখা। আজ সবাই তার আগে বেরিয়ে গেছে, ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সে ও যখন রুমের তালা দিচ্ছিল, তখন পাশের রুমের মারিয়া জার্মান ভাষায় ‘গুটেন মর্গেন’ (শুভ সকাল) জানাল। পেখম মৃদু হেসে জবাব দিলেও তার মনটা পড়ে রইল ছয় মাস আগের সেই কালবৈশাখী বিকেলে কারণ বাংলাদেশি নম্বর থেকে বারবার কল আসছিল, কিন্তু সে রিসিভ করেনি।
পেখমের এই বিদেশযাত্রা মোটেও রূপকথার মতো ছিল না। এইচএসসির পর যখন সমবয়সীরা আড্ডা আর ঘুরাঘুরিতে ব্যস্ত, পেখম তখন নীলক্ষেত থেকে আনা জার্মান ভাষার বইগুলো লুকিয়ে পড়ত। সঙ্গে জার্মান ভাষার কোর্স করছিল, মোটামুটি A2 লেভেলে পৌঁছে গেছে সে। ঘরের কেউ জানত না এই উচ্চাভিলাষী স্বপ্নের কথা। কিন্তু বাদ সাধল একদিন দুপুরবেলায়,দরজায় কড়া নাড়ল পুলিশ। পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন!
চাচী যেন বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলেন, “পুলিশ কেন? পেখম আবার কী অকাম করেছে?”
মেয়েটি এবার মাথা নিচু না করে বরং উঁচু করেই দাঁড়িয়ে ছিল। যখন জানাজানি হলো সে জার্মানি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। চাচী ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করলেন,
“বাপ-মা মরা মেয়ে, আমাদের ঘাড়ে বসে খাবে আর এখন ডানা গজাচ্ছে? এত টাকা কোথায় পাবে শুনি?”
চাচী সবসময় মিষ্টভাষী ছিলেন, অন্তরে যা-ই থাক সরাসরি প্রকাশ করেননি। কিন্তু পেখম বেশ অবাকই হলো,এবার তিনি প্রকাশ্যেই তার বিরোধিতা করছেন।
পেখমের চাচা ভালো মানুষ। তিনি খুব নম্রভাবে কাছে এসে মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তুই তো জানিস মা, কিছুদিন আগেই চমকের বিয়ে হলো। তোর ছোট ভাই টগরেরও পড়ালেখার খরচ আছে। এ সময়ে এত টাকা কীভাবে ম্যানেজ করব…”
চাচার কথা থামিয়ে পেখম খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল,
“আমি মামার সঙ্গে কথা বলেছি, উনি দেবেন টাকা। আপনি শুধু যাওয়ার অনুমতিটুকু দিলেই হবে।”
পেখম যেহেতু নানার বাড়ি থেকে মৃত মায়ের সম্পত্তির ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে কিছু টাকা পেত, তাই চাচা আপত্তি করতে পারলেন না।
কলেজের জয়নুল স্যার পেখমকে বলেছিলেন,যেহেতু ডক্টর হৃদিশাহ তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন অর্থাৎ তিনি পেখমের দায়িত্বও নেবেন। তবে পেখম আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়নি।
মামার সঙ্গে লিখিত চুক্তি করেছিল,বিদেশে গিয়ে যেভাবেই হোক পাই-পাই করে সব টাকা ফেরত দেবে। আর তা না হলে মায়ের সম্পত্তি থেকে মিটিয়ে দেবে। মামাও রাজি হয়েছেন এই ভেবে,ভগ্নির সম্পত্তির দায়িত্ব এখন তার হাতেই থাকবে; উনিশ-বিশ হলেই শর্ত অনুযায়ী সেটি তার হয়ে যাবে।
কিন্তু চাচী দমবার পাত্রী নন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন,
“পড়াশোনার নাম করে ফুর্তি করতে যাওয়া হচ্ছে না? এর চেয়ে দেশে ভালো ঘরে বিয়ে দিয়ে দেই। অন্তত কেউ ইজ্জতে আঙুল তুলতে পারবে না। না হলে লোকজন বলবে,মা-বাবা নেই বলে চাচা-চাচী মেয়েকে নষ্টামিতে লেলিয়ে দিয়েছে।”
পেখমের বুঝতে আর বাকি নেই,চাচীই সেই মানুষ, যিনি তার এইচএসসি পরীক্ষার ফি লুকিয়েছিলেন। কিছু বলতে পারেনি, তবে ছলছল চোখে চেয়েছিল তার মুখপানে।
কিছুদিন যেতে না যেতেই ঘরে কিছু লোক এল। রুমানা বেগমই আসতে বলেছেন পেখমকে পাত্রী হিসেবে দেখানোর জন্য। আজ বড় ফুফিও এসেছেন ঘরে। পেখমকে তারা জোরাজুড়ি করতেই সে ফুঁসে উঠল,
“আমি কোনোভাবেই বিয়েতে রাজি হব না। আপনারা যা-ই বলেন না কেন, উনাদের সম্মানের সঙ্গে চলে যেতে দিন। কারও সামনে যেতে চাই না।”
চাচী বললেন,
“তুমি তো ভালো একটা মেয়ে। কেন এমন করছ? ওইসব বিদেশ-টিদেশ নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কত নারী যে আজকাল পাচার হয়ে যায়! তুমি কী চাও এমন কিছু হোক?”ফুফি ও পেখম কে ভালোবাসে তাই চায় না মেয়েটা চোখের আড়ালে বিপদে পড়ুক।
পেখম বুঝে গেল,এরা সহজে মানবে না।
ঘরের এমন পরিবেশে ঠিক তখনই এক অদ্ভুত প্রস্তাব এল।
রুবাদ ভাই, যাকে পেখম সবসময় যমের মতো ভয় পেত, সে সরাসরি তার মাকে অর্থাৎ পেখমের ফুফিকে গিয়ে বলল,
“আমি পেখমকে বিয়ে করতে চাই।”
কথাটা শোনামাত্র হঠাৎ অন্যমনস্ক রাদিফ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। রাদিফ আর রুবাদ আপন দুই ভাই, অথচ পেখমকে নিয়ে তাদের মধ্যে শুরু হলো এক অদৃশ্য যুদ্ধ। রাদিফ অস্থির হয়ে বাড়ি মাথায় তুলল, সে সবার সামনেই জানাল,
“কিন্তু পেখম ভাইয়াকে নয়, আমাকে বিয়ে করবে!”
তার এমন বেফাঁস মন্তব্যে উপস্থিত সবাই ভড়কে গেল। ১৭ কি ১৮ বছরের চেংড়া ছেলে কিনা বিয়ের কথা বলছে! দরজা-জানালা বন্ধ থাকলেও কেউ কেউ কান পেতে ভেতরের খবর জানার চেষ্টা করছিল।
“না, ওকে আমি কোথাও যেতে দেব না।”
রাদিফের কথা শুনে রুবাদ বলল,
“পাগলামি করিস না। এটা কোনো ছেলে খেলা না। আমি প্রস্তাবটা ভেবে-চিন্তেই দিয়েছি।”
দুই ভাইয়ের মনোমালিন্য আর চেঁচামেচি পেখমের কানে আসছিল পাশের ঘর থেকে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেল সে, যখন দেখল তার একমাত্র প্রিয় কাজিন মিশা,যে তাকে বুঝত সেও আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। রুমানা বেগমও কিছুটা ঘি ঢাললেন,
“সাংঘাতিক মেয়ে! আমি তো মেয়েটাকে কত ভালো মনে করতাম। ভেতরে ভেতরে দুই ভাইকে কখন ফাঁসালো এই মেয়ে?”
মিশার কোনো প্রতিবাদ না করাতে চাচী আরও সুযোগ পেলেন। সবাই তাকেই দোষী সাব্যস্ত করল।
শেষবার মিশা বলল,
“আমাকে তো তুই প্রিয় বোন বলে ডাকতি, তবে কখনো বলিসনি কেন রাদিফ তোকে চায় আর তুই ও? সে না হয় ছোট, কিন্তু রুবাদ ভাইকে কখন…”
পেখমের চাহনি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। মিশা আর কিছু না বলে অবিশ্বাসের সঙ্গে চলে গেল।
আস্তে আস্তে বাড়িটা তার জন্য নরক হয়ে উঠেছিল।
:
:
:
অতীতের দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেখম হোস্টেল থেকে বের হলো সাইকেল নিয়ে। এখানে আসার পর দশদিনেই শিখেছিল চালানো। তার গন্তব্য এখন (Aachener Weiher) আখেনার ভাইয়ার পার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে ইউনিভার্সিটি যাওয়া। কোলন শহরটা অদ্ভুত সুন্দর আর এই সৌন্দর্যের আড়ালে পেখমের জীবনে লুকিয়ে আছে এক বিশাল রহস্য।
কিন্তু সে স্টুডেন্ট ভিসায় আসতে পারেনি। এত অদম্য পরিশ্রম, ধারালো মেধা শেষ মুহূর্তে এক বেনামি চিঠির জন্য তার স্বপ্ন ভাঙতে বসেছিল।কেউ অভিযোগ করে ভিসার কাজ প্রায় নষ্ট করে দিয়েছিল। পেখম যেন খাঁচার পাখির মতো ছটফট করতে লাগল। সে জানে দেশে থাকলে তার ইচ্ছা, আত্মা,কোনোটাই আর জীবিত রাখতে দেবে না তারা।
বৃষ্টির এক রাতে কাঁদতে কাঁদতে রবকে ডেকেছিল সে, পথ দেখাও বলতে বলতে যেন মুখে ফেনা তুলেছিল সেজদায়। এর সাক্ষী ছিল কেবল ঐ দীর্ঘ রাত।
পরে হৃদিশাহ ম্যাডামের সেই অকল্পনীয় প্রস্তাব, আর একটা কাগুজে সাক্ষর,পেখম জানে না এর বিনিময়ে সে কী পাবে আর কী হারাবে। সেই সময় কেবল একটা কথাই মাথায় এসেছিল
“যে সৎকাজ করে, সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে। আর কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে নিজেই ভোগ করবে। আর তোমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের প্রতি কোনো জুলুম করেন না।”(হা-মীম সেজদাহ–৪৬)"
পেখম জানে না তার সেই ‘স্বামী’ কে। শুধু জানে সে একজন জার্মান নাগরিক। ম্যাডাম বলেছিলেন,
“পেখম, ওখানে পৌঁছে তোমার পড়াশোনা শুরু করো। বাকিটা আমি দেখব।”
সাইকেল চালাতে চালাতে খেয়াল করল,লিনডেনথালের মোড়ে কালো রঙের স্পোর্টস কারটা দাঁড়িয়ে আছে, আর কালো চশমা পরা লোকটাও! যার মাথায় সে ভুল করে মগের পানি ফেলেছিল। লোকটা কি সত্যিই তাকে অনুসরণ করছে?
ভার্সিটির গেটে ঢুকতেই পেখমের ফোনটা কেঁপে উঠল। হৃদিশাহ ম্যাডামের মেসেজ
“পেখম, আজ বিকেলে দেখা করতে চাই।”
খুশিতে চোখ চিকচিক করে উঠল। বিদেশের মাটিতে ম্যাডামকে দেখা মানে,আপন ঘরের মানুষ খুঁজে পাওয়া।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিছু ইঙ্গিত করাই পেছনে ফিরতেই দেখতে পেল,লোকটা এবার ভার্সিটির গেটের সামনেই গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।