বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ৭

🟢

“পিচ্চি… সরি!

ক্ষমা করে দাও না আমায়? একটু আপন করে নাও আমাকে, একদম নিজের করে।

কথা দিচ্ছি… অভিযোগ করার মতো সুযোগ পাবে না কোনোদিন!

তূর্য'র কণ্ঠটা কেমন যেন ভেঙে ভেঙে আসে। যেন প্রতিটা শব্দের ওজন তার বুক ভেদ করে বের হচ্ছে।

মেঘ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে—

আশ্চর্যের বিষয়, কোনো রাগ নেই তার মুখে,

বরং অদ্ভুত এক শূন্যতা। তার চোখ দুটো বড়, চাতক পাখির মতো,

কিন্তু ভেতরে? ভেতরে যেন দশ বছরের জমে থাকা ঝড় এক মুহূর্তে উঠে এসে সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে।

সে কিছু বলার আগেই

পুরনো স্মৃতিগুলো ফিরে আসে, সেই ছোট্ট বয়সে অপমানের দৃষ্টিগুলো,

মাথার উপর ঝুলে থাকা “কলঙ্ক” শব্দটা!

একটা সরি?

এতে সব ঠিক হয়ে যায়? মেঘ ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়। চোখে একফোঁটা অশ্রু, আর এই দৃষ্টি তূর্য'কে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। পরক্ষনেই মেঘ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,

"সরি বললেই সব ঠিক হয়ে যায়? আরবযে কলঙ্ক বয়ে বেড়াতে হবে বলে পালিয়ে গেলেন। আজ সেই কলঙ্ককেই নিজের গায়ে জড়াতে চাচ্ছেন?

তূর্য স্তদ্ধ!

এর কথার প্রতি উওর কি দেবে বুঝতে পারছে না। সত্যি এট উওর তার নিজেরই জানা নেই। মেঘ আবারও মৃদু হেসে বলল,

"ভালোবাসলেন সে কলঙ্ক নারী'কে? তাহলে শুনুন,

আপনার মতো নিখুঁত, নিঃকলঙ্ক মানুষের পাশে

আমার মতো কলঙ্কিণী'কে মানায় না। আমার মতো কলঙ্কিণী'কে আপন করতে চাওয়া মানে আপনার জীবনের আরেকটা নতুন পাপ হবে। আপনি নিঃকলঙ্ক আমি নই, আমি চিরকাল সকলের কাছে কলঙ্ক'ই রয়ে যা কখনো মুছে যাবে না।

মেঘের কণ্ঠ ভারী,

কিন্তু ভেতরে প্রচণ্ড দৃঢ়তা! তূর্য কিছু বলতে পারে না।

তার মুখ হা হয়ে থাকে,

বুকে শব্দ জমে বাঁধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এই প্রথমবার—

সে বুঝতে পারে, কিছু সম্পর্ক ভাঙে না শব্দে,

ভাঙে নীরব ক্ষতচিহ্নে। মেঘ ধীরে পেছন ঘুরে হাঁটতে থাকে, কিন্তু প্রতিটা পদক্ষেপ যেন তূর্য'র বুকের উপর পাথর হয়ে পড়ে।

সে আবারও মেঘে'র হাত নিজের হাতের ভাঁজে বন্দি করে ফেলে। মেঘ তীব্র বিরক্তমাখা দৃষ্টিতে তাকায়,

"হাত ছাড়ুন!

তূর্য নড়েও না। বরং আরও শক্ত করে ধরে ফেলে। কণ্ঠটা অদ্ভুত স্থির, তবু গভীর কাঁপা কাঁপা—

“আমি নিজেই এই কলঙ্ক'কে আপন করতে চাই পিচ্চি! তোমার কলঙ্ক'কে নিজের গায়ে মেখে, আমিও কলঙ্কি'ত হতে চাই তোমার মতো!

মেঘ টেনে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে,

"সম্ভব নয়!

অনেক কষ্টে এই কলঙ্ক নিজের কাঁধে নিয়ে টেনে টেনে এখান পর্যন্ত উঠে এসেছি। আর নতুন করে কোন কলঙ্ক চাই না,

এবার আমি শুধু একটু শান্তি চাই।

শান্তি!

তূর্য অদ্ভুত ভাবে হাসে,

“তুমি কলঙ্ককে ভয় পাও, পিচ্চি?

এইবার মেঘ চুপ করে যায়। তার চোখের কোনায় জমে থাকা অশ্রু দুহাত দিয়ে মুছে নেয়,

কিন্তু কণ্ঠের কাঁপন চেপে রাখতে পারে না…

"নারী মানুষ কলঙ্ক'কে ভয় পায়, সে মারাত্মক ভয় পায়।

কেন জানেন…?

কারণ কলঙ্কের কালি একবার গায়ে লাগলে,

তা আর কোনোদিনও মোছে না। জীবনের পর জীবন, শ্বাসের পর শ্বাস— বয়ে বেড়াতে হয় সেই কালো দাগ। নারী'কে দোষী বানানো খুব সহজ।

কারণ নারী মুখ বুজে সব সহ্য করে…

করতেই হয়…

সমাজ তাকে সেইভাবে বানিয়ে রেখেছে। মানুষের বিচার, সেটা সবসময় পুরুষদের পক্ষে দাঁড়ায়। একটা নারী'র গায়ে কলঙ্ক ছুঁড়ে দেওয়া তাদের কাছে যেন সবচেয়ে সহজ কাজ।

নিজেকে না দেখলে, নিজের উপর না ঝড়ে পড়লে, আমি কখনো বুঝতামই না এতো সহজে একজন নারী'র জীবন কলঙ্ক দিয়ে ধ্বংস করে দিতে পারে সমাজ! পুরুষের গায়ে কখনো কলঙ্ক লাগে না। কলঙ্ক লাগে কেবল নারীর গায়ে। আর সেই কলঙ্ক নিয়েই তাকে সারাজীবন বাঁচতে হয়। বাঁচতে হয় দম বন্ধ করা ভার নিয়ে…

কলঙ্ক বড় অদ্ভুত জিনিস! নারী প্রেম করলে কলঙ্ক পায়, নারী ভালোবাসলে দাগ পায়, নারী এক পা ভুল নিলেও সমাজ চিরকাল আঙুল তোলে তার দিকে।

সে দাগ,

সেই কলঙ্ক’কেই

অলংকার বানিয়ে

একটা গোটা জীবন টেনে নিয়ে যেতে হয়! অথচ যার জন্য এই কলঙ্কের জন্ম, তার কোনো দোষ নেই! সে থাকে নিঃকলঙ্ক,

স্বচ্ছ, নির্মল, অক্ষত!

আজীবন…!

রুমজুড়ে গভীর নীরবতা।

মেঘে’র শেষ কথাগুলো বাতাসে ধোঁয়ার মতো ভেসে থাকে, যেন প্রতিটি শব্দেই লুকিয়ে আছে বহু বছরের ব্যথা, অপমান আর অব্যক্ত চিৎকার।

তূর্য স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।

তার চোখে নেই লজ্জা, নেই ভয়, শুধু আছে এক অদ্ভুত কোমল জেদ,

যা কাউকে ছাড়তে জানে না।

ধীরে ধীরে সে মেঘের হাত ছেড়ে দেয়। মেঘ বড় বড় পা ফেলে দরজার দিকে এগোয়, হয়তো পালাতে চায়, নয়তো মুক্তি খুঁজছে,

কিংবা কেবল নিজের ভাঙা হৃদয় লুকোতে চায়। দরজার হাতলে হাত রাখতেই পিছন থেকে তূর্যের ঠান্ডা কণ্ঠ ভেসে আসে—

“শোনো পিচ্চি…!

আজ তুমি নিজের ইচ্ছায় এই রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছো যাও। কিন্তু আমার জীবন থেকে বের হওয়ার কথা

কল্পনাতেও আনবে না।

মেঘ বরফের মতো জমে যায়! তার আঙুলগুলো হালকা কাঁপে। তূর্য আরেক ধাপ এগিয়ে এসে বলে,

“তূর্য চৌধুরী কখনোই নিজের প্রিয় জিনিস হারায় না।

আর তুমি… কোনো জিনিস নও। তুমি আমার প্রিয় মানুষ! সো… তুমি আমার

শুধু আমারই!

_______________________

------------------------------------------------------

সকাল সকালই মেঘ আর বৃষ্টি দু’জন তৈরি হয়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হয়।

খাবার টেবিলে আগেই বসে আছেন আরিফ চৌধুরী (তূর্য আর তুষারের বড় চাচা)

আর পাশে তাজিম চৌধুরী (তাদের বাবা) দু’জনেই সবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

মেঘ দৌড়ে গিয়ে দু’জনের মাঝখানে গিয়ে বসে পড়ে। বৃষ্টি মুচকি হেসে গিয়ে বসে আরিফ চৌধুরী'র পাশে।

আরিফ চৌধুরী দুহাত দুদিকে বাড়িয়ে দুই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নেয়।

– আমার আম্মাদের ঘুম কেমন হলো?

দু’জনেই একসাথে ছোট্ট করে বলে,

"অনেক ভালো!

আরিফ চৌধুরী ভ্রু নাচিয়ে মেঘের দিকে তাকায়,

– কিন্তু আমার এই আম্মার চোখ মুখ এমন ফোলা ফোলা লাগছে কেন? কান্না করছো নাকি আম্মা?

মেঘ মুহূর্তে থমকে যায়।

তারপর গড়গড় করে বলে ওঠে,

"ক ক ক কোথায়…? বাবাই তোমার মনে হয় মেঘ কান্না করবে! মেঘ অনেক স্ট্রং, বুঝলে?

আর মামনি কই? মামনি তারাতাড়ি খেতে দাও, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।

ওর এড়িয়ে যাওয়ার নাটক দেখে সবাই হালকা হাসে। এ সময়ে তুষার আর তূর্যও এসে টেবিলে বসে পড়ে। রেখা চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে সবার প্লেটে খাবার পরিবেশন করতে থাকে। তাজিম চৌধুরী নিজের প্লেটের দিকে ঝুঁকে এক লোকমা ভাত হাতে তুলে আদর করে মেঘে'র মুখে তুলে দেয়। কারণ মেঘ নিজের হাতে খাবার খায় না বললেই চলে৷ বাসায় থাকলে আরিফ, তাজিম চৌধুরী বা রেখা চৌধুরী খাইয়ে দেয় আর বাহিরে বৃষ্টি। হঠাৎ নিরবতা ভেঙে তাজিম চৌধুরী প্রশ্ন ছুঁড়ে,

– মামনি, তোমাদের এত স্ট্রেস নেওয়ার কী দরকার? এসব টিউশনি না করালেও তো হয়।

বাড়ির দুইটা মেয়েই কোচিং-টিউশন নিয়ে ব্যস্ত থাকে,

কিন্তু কেন?

আমাদের কি আল্লাহ্ তাআ'লা টাকা পয়সা কম দিয়েছে? যে, নিজেদের খরচ নিজেদের চালাতে হবে?

তাজিম চৌধুরীর গলায় অভিমান আর মায়ার মিশ্রণ। বৃষ্টি মুচকি হেসে তার দিকে তাকায়।

"টেনশন নিয়েন না আংকেল, আমাদের খুব বেশি প্রব্লেম হয় না।

বরং ভালোই লাগে!

কি বলিস দোস্ত?

মেঘও দ্রুত মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়। তা দেখে তাজিম চৌধুরী তূর্য আর তুষারে'র দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠেন,

– আমাদের মুখ উজ্জ্বল করলে দুই আম্মা করতে পারবে। এদের দ্বারা নয়, একজন বাপ-চাচার বিজনেস থাকতে নতুন করে বিজনেস করতে চায়, আরেকজন একই ক্লাসে চৌদ্দবার ফেল করে বসে আছে। লজ্জা করে না লজ্জা? ওদের থেকে পাঁচ বছরের বড় হয়েও টেনে-হিঁচড়ে একই ক্লাসে পড়ে আছিস!

তুষার এক মুহূর্তও কথা জমতে না দিয়ে নির্লজ্জ ভঙ্গিতে হেসে ওঠে। গলায় এক ফোঁটা অনুশোচনাও নেই।

"এই লজ্জা-টজ্জা আমার মধ্যে নাই। লজ্জা হলো নারীর ভূষণ, আমাদের নয়। তাই আমি লজ্জাকে আর লজ্জায় ফেলতে চাই না।

এই বলে সে পাশ ফিরে মেঘে'র দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসে,

"এই মেঘু, বল তো! আজকে আমাকে হ্যান্ডসাম লাগছে না? শুনছি কলেজে নাকি নতুন ম্যাম আসবে!

কথা শেষ হওয়ার আগেই বাতাস চিরে একটা উড়ন্ত জুতা এসে সজোরে তুষারে'র গায়ে আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই সবাই পেছন ফিরে তাকায়। রেখা চৌধুরী অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মনে হচ্ছে, চোখ দিয়েই গিলে খাবে। তিনি আরও দু’কদম এগিয়ে আসতেই তুষার আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,

"দেখো আম্মু! একদম মারতে আসবে না। তোমার ছেলে এখন বড় হয়েছে, তাকে বিয়ে না দিয়ে মাইর দিতে আসছো? পারলে একটা বউ এনে দাও। এই শীতে বউ ছাড়া কি ঘুম আসে?

রেখা চৌধুরী তেড়ে আসতেই তুষার এক লাফে পেছনে সরে দৌড় দেয়।

– গোলামের পুত! কাছে আয়, তোকে আজই বিয়ে করাইয়া দেই!

দৌড়াতে দৌড়াতে তুষার হঠাৎ থেমে যায়। এবং মৃদু হেসে আওরায়,

"এখন আর আমি সেই বোকা নয় আম্মু। ছোটবেলায় এভাবে কাছে টেনে নিয়ে এমন মাইর দিতে যে সাত দিন বিছানা থেকে উঠতে পারতাম না। আর এই বয়সে তোমার মাইর খেতে চাই না।”

একটু থেমে সে চোখ তুলে বৃষ্টি'র দিকে তাকায়। কণ্ঠস্বর হালকা হয়ে আসে, কিন্তু নির্লজ্জতা একচুলও কমে না।

"আমি চাই তোমার বউমার হাতে ইন্টু-মিন্টু মাইর খেতে। ওর মাইর ওর মতোই সফট হবে।

তুষারে'র কথা শেষ হতেই পুরো ড্রয়িংরুমে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। একটা মানুষ কতটা নির্লজ্জ হলে নিজের বিয়ের কথা নিজেই এভাবে ঘোষণা করতে পারে,

এই প্রশ্নটাই যেন সবার চোখেমুখে ভাসতে থাকে।

রেখা চৌধুরী ফের কিছু বলার আগেই তূর্য এগিয়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ায়। নরম হাতে তাঁর কাঁধ ছুঁয়ে শান্ত স্বরে বলে,

“আম্মু, ওর সঙ্গে রাগ করো না প্লিজ। তুষার কিন্তু একটুও ভুল বলছে না। এবার তো ওকে বিয়ে করিয়েই দাও। আমার বাচ্চা-কাচ্চা দেখতে পারবো কিনা কে জানে! এখন তুষারকে বিয়ে করিয়ে ওর বাচ্চা-কাচ্চাদের কোলে নিয়ে আদর করো। নইলে তোমাদের মনের আশা অপূর্ণই থেকে যাবে হয়তো।

এই কথাগুলো যেন হঠাৎ করেই রেখা চৌধুরীর বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়।আট বছর পর— ঠিক আজকের দিনেই, প্রথমবারের মতো ছেলের জন্য তাঁর বুকটা কেঁপে ওঠে। তূর্যে'র কণ্ঠে যে অসহায়ত্ব লুকিয়ে ছিল, তা শুধু তিনিই নয় মেঘও টের পায়। তূর্য আড়চোখে মেঘে'র দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,

“তোমায় অনেক ভালোবাসি, পিচ্চি। জানি না এই আমিটাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে কিনা। তবুও তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করবো আমি। দ্বিতীয় কোনো নারী কোনোদিনই এই হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারবে না। তুমিই প্রথম… তুমিই শেষ!

তারপর তূর্য না খেয়েই নিজের রুমে চলে যায়। হয়তো বুকের ভেতর ব্যাথা একটু তীব্র ভাবে জ্বলে উঠেছে। যেটা নেভানোর জন্য একা থাকা খুবই দরকার।

মেঘ এক পলক তাকিয়ে নিজের মনে মনে আওরায়,

"এই সামান্য কষ্ট সহ্য করতে পারেন না অথচ আপনার দেওয়া সমস্ত আঘাত আমি এতো বছর সহ্য করে কিভাবে বেঁচে আছি বলুন তো? কষ্ট হয়, ভিষন কষ্ট হয়। কিন্তু আমি কাউকে বুঝতেই পারি না আপনি আমাকে কতোটা বাজে ভাবে আঘাত করেছেন আমার নিস্পাপ হৃদয়ে!

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প