বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ১০

🟢

স্নিগ্ধ বিকেল—

ছাঁদের গ্রিল ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে তূর্য! চারদিকে থেকে শো শো বাতাস তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। মৃদু বাতাসে তার চুল গুলো এলোমেলো হচ্ছে। তার ঠিক সামনের বিল্ডিং এ ছোট্ট একটা মেয়ে খেলা করছে, তা দেখে তূর্য'র ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি খেলে যায়।

তার বাচ্চা বরাবরই একটু বেশি প্রিয়! কেন জানি একটু বেশিই আকৃষ্ট হয় বাচ্চাদের দেখলে। মনে হয় তারা খুব আপন তার, এতোটাই আপন যে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

হঠাৎ ফোনে টুং করে ম্যাসেজ আসলো। ফোন অন করতেই ওয়ালপেপারে মেঘে'র হাস্যজ্বল মুখ দেখা গেল। কতো কিউট তার ‘মেঘপরি’! সে কিনা এই পিচ্চি'কে রেখে এতো গুলো বছর দূরে ছিল। ভাবতেই বিরক্ত হয়, হঠাৎ ছবিটির দিকে তাকিয়ে কয়েকদিন আগে স্মৃতি মাথায় বিচরন করে।

মেঘ ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে তূর্যর রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ একটাই—তার প্রিয় পুতুলটা। তুষার সেটাকে নিয়ে গেছে তূর্য'র রুমে , অথচ এখনো ফেরত দেয়নি। আর সেই পুতুল ফিরিয়ে আনতেই এত চুপিচুপি অভিযান।

কিন্তু ভয়টা কম নয়। তূর্য আগেই কড়া গলায় বলে রেখেছে, তার অনুমতি ছাড়া কেউ তার রুমে ঢুকলে শাস্তি ভয়ংকর হবে।

তবুও সাহস সঞ্চয় করে মেঘ নিঃশব্দে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। অবাক হয়ে দেখে, রুমে কেউ নেই। অথচ মিনিট পাঁচেক আগেই সে তূর্য'কে রুমে ঢুকতে দেখেছে।

সে এসব ভেবে সময় নষ্ট করে না। দ্রুত নিজের পুতুলটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে আসতে যাবে, ঠিক তখনই একটা শক্তপোক্ত দেহের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে।

মাথা তুলে তাকাতেই মেঘের আত্মা কেঁপে ওঠে। কারণ তার সামনে তূর্য দাঁড়িয়ে আছে!

ভয়ে ভয়ে সে পেছাতে থাকে, আর তূর্য ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। একসময় পিঠ ঠেকে যায় দেয়ালে। মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে—

"কা… কা… কাইলা ইন্দুর, প্লিজ আমার কাছে আসবেন না।

তূর্যে'র ঠোঁটে ডেভিল স্মাইল! সে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে আওরাল,

“কিন্তু আমি তো অলরেডি এসে পড়েছি, পিচ্চি। ভুলে গেছো নাকি, আমার পারমিশন ছাড়া রুমে ঢুকলে পানিশমেন্ট পেতে হয়?

"পা… পানিশমেন্ট?

মেঘ চিৎকার করে ওঠে।

তার ভীতু অবস্থা দেখে তূর্য হেসে ফেলে। এতদিনে মেঘ'কে এমন ভয় পেতে সে দেখেনি। সে আবারও একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,

“অনেক দিন হলো মিষ্টি কিছু খাওয়া হয়নি। চলো আজ আমার পিচ্চি'র কিউট ঠোঁটের টেস্ট নেওয়া যাক।

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে সরে যেতে চায়। কিন্তু তূর্য আবার তাকে নিজের বাহুর মধ্যে আটকে নেয়।

“ওহু! এত সহজে পালানো যাবে না।

“ছেড়ে দিন না কাইলা ইন্দুর…

মেঘে'র কণ্ঠে অসহায় ভীতু সুর।

তূর্যের মুখে দুষ্টু হাসি আরও গাঢ় হয়।

“ছেড়ে দিতে পারি। তবে আমার একটা শর্ত আছে।

"কি শর্ত…?

মেঘ ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।

তূর্যে'র ঠোঁটে দুষ্টু হাসি খেলতে থাকে।

“তুমি নিজে আমাকে একটা কিস দেবে।

কথাটা শোনা মাত্রই মেঘ চিৎকার করে ওঠে,

"কাইলা ইন্দুর! আপনার সাহস দিন দিন খুব বেড়ে যাচ্ছে দেখছি। আপনার কি মনে হয়, আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো? একদমই না!

তূর্য দুষ্টু হেসে আওরায়,

“তাহলে আমি স্টার্ট করি?

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে দু-হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলে। রাগে গজগজ করতে করতে বলে,"“আপনার চোখ দুটো কিন্তু আমি তুলে ফেলবো! এখনই যেতে দিন, কাইলা ইন্দুর!

“ওকে, ফাইন! তোমার সামনে দুইটা অপশন। এ, আমাকে কিস করবে। দুই, এই অসহ্য ‘কাইলা ইন্দুর’ নামটা ডাকা বন্ধ করবে। ফাস্ট চুজ করো।

মেঘ মুখ বাঁকিয়ে উঠে,

"আমি আপনাকে কাইলা ইন্দুর'ই বলবো। কাইলা ইন্দুর, কাইলা ইন্দুর, কাইলা ইন্দুর!

হঠাৎ তূর্য তার ঘাড়ের কাছে ঝুঁকে পড়তেই মেঘ বিদ্যুৎগতিতে পিছিয়ে যায়।

"বলবো না! সত্যি আর কাইলা ইন্দুর বলবো না। আপনি যা বলবেন তাই হবে গড প্রমিজ!

মেঘে'র ভীত মুখটা দেখে তূর্য মুচকি হাসে। নিচু স্বরে বলে,

“তাহলে তূর্য বলো।

মেঘ চোখ বড় বড় করে তাকায়।

"আমি এতো ছোট্ট একটা মেয়ে হয়ে কাইলা ইন্দুরের নাম বলবো? এ্যা… সরি সরি, বড় মানুষ।

“ওহু! তূর্য’ই বলতে হবে। স্টার্ট করো।

"নাহহহহ!

তূর্য চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই মেঘ তাড়াতাড়ি বলে ওঠে—

"বলবো! বলবো! সত্যি বলবো!

“বলো তূর্য!

"তুলা,

মেঘে'র কথা শুনে তূর্য অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। সামান্য নাম বলতে বলছে সেটাও উচ্চারণ করতে পারে না। তবে এই মূহুর্তে বেশি রেগে গেলে চলবে না। তাই আবারও শীতল কণ্ঠে আওরায়,

“তুলা নয় তূর্য বলো তূর্য!

"না তুলা,

তূর্য নিজের রাগ কোনো রকম দমিয়ে রেখে আবারও বলে,

“তূর্য বলতে বলছি তূর্য?

"তুলা তুলা তুলা,

“ধুর কথায় বলবো না আর।

"তাতে আমার বা*ল ছিঁড়া যাইবো!

কথাটা বলেই মেঘ দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

হঠাৎ আবারও ফোনে একটা ম্যাসেজ আসতেই তূর্য কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে। সে কেন ফোনটা হাতে নিয়েছিল, সেটাই যেন ভুলে গিয়েছিল। ম্যাসেজটা খুলতেই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে তার। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ছাদ থেকে নেমে পড়ে, রওনা হয় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে।

দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে আসে!

মেঘ, বৃষ্টি, তুষার আর মাহিম চারজন মিলে আনন্দে মেতে ওঠে পুরো মেলায়। চারদিকে রঙিন আলো, কোলাহল, আর বাহারি দোকানের সারি। হঠাৎ এক জায়গায় এসে বৃষ্টি’র দৃষ্টি থেমে যায়। সে দৌড়ে গিয়ে এক মুঠো লাল রাঙা কাচের চুড়ি হাতে তুলে নেয়। কাচের চুড়ি তার ভীষণ প্রিয়। গত জন্মদিনে মেঘ তাকে কয়েক মুঠো কাচের চুড়ি উপহার দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেখান থেকে দু’টো চুড়ি ভেঙে যায়। সেদিন কাঁদতে কাঁদতে তার চোখ-মুখ ফুলে উঠেছিল। আজ আবার সেই চুড়ি দেখে মনটা অজান্তেই নরম হয়ে আসে।

আনমনে সে বলে ওঠে,

– আংকেল, চুড়িগুলোর দাম কত?

বৃদ্ধ লোকটি পান চিবোতে চিবোতে উত্তর দেয়,

"বেশি না আম্মা, মাত্র পঞ্চাশ টাকা!

বৃষ্টি এক গাল হাসে। টাকা বের করতে গিয়ে হঠাৎ থমকে যায়। পার্সটা… পার্সটা তো বাসায়ই রেখে এসেছে! মুখটা মুহূর্তেই ভারী হয়ে আসে। একটু ইতস্তত করে আবার বলে,

– আংকেল, আসলে আমার টাকার পার্স বাসায় ফেলে এসেছি। আপনি চুড়িগুলো বিক্রি করবেন না। আমি মেঘু’র কাছ থেকে টাকা এনে দিচ্ছি।

এই বলে সে মেঘের দিকে ছুটতে চাইলে হঠাৎ পেছন থেকে কেউ তার হাত ধরে ফেলে।

বৃষ্টি চমকে ওঠে। হাতের স্পর্শ কাঙ্ক্ষিত কারো বুঝতে পারে।

পেছন ফিরে তাকিয়ে তুষার'কে দেখে বৃষ্টি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে!

তুষার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

"কোনো প্রব্লেম?

বৃষ্টি মাথা নিচু করে ছোট করে বলে,

– ওহু!

'তাহলে কোথায় যাচ্ছিস?

– মেঘু’র কাছে।

"কেন?

– আ… আসলে এই চুড়িগুলো আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু টাকা আনতে ভুলে গেছি। তাই মেঘু’র কাছ থেকে টাকা আনতে যাচ্ছি।

তুষার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি টেনে বলে,

"তোকে যেতে হবে না। মামা, আপনি চুড়িগুলো প্যাক করে দিন।

– কিন্তু বাবা, আপনার কাছে তো টাকা নেই।

তুষার বুকের ওপর দু’হাত ভাঁজ করে চোখ রাঙিয়ে বলে,

"তোকে কে বলল আমার টাকা নেই?

বৃষ্টি একটু ঘাবড়ে গিয়ে জবাব দেয়,

– স… সকালে তো খালামণি'র কাছে টাকা চাইলেন, তাই মনে হলো আপনার কাছে টাকা নেই।

তুষার আর কথা বাড়ায় না।

"মামা, সব রঙের দু’মুঠো করে চুড়ি প্যাক করেন।

– কিন্তু আমার তো এতগুলো চুড়ি…

"হুসস! তোকে কথা বলতে বলিনি।

এক মুঠো চুড়ি বাদ দিয়ে বাকি সব চুড়ি প্যাক করে নেয় তুষার। তারপর সেই এক মুঠো চুড়ি আলাদা করে যত্নসহকারে বৃষ্টির হাতে পরিয়ে দেয়। অতঃপর কিছুটা ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলে,

"এখনো বউ হসনি, তার আগেই এত হিসেব করছিস? আমার এত হিসেবি বউয়ের দরকার নেই। বউ মানুষ একটু বেহিসেবি ভালো!

তুষারে'র কথায় বৃষ্টি'র গাল লাল হয়ে ওঠে। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এতটা আদুরে স্বরে কেউ কখনো তাকে “বউ” বলে ডাকেনি।

তবে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে , যদি কেউ কখনো তাকে প্রপোজ করতো দ্বিতীয় দিন আর সেই মানুষটাকে পাওয়া যেত না।

কেন এমন হতো—এই প্রশ্নের উত্তর বৃষ্টি নিজেও কখনো খুঁজে পায়নি কখনো। কিন্তু আজ, কাচের চুড়ির মতোই তার বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল,

ভাঙার ভয় নিয়েও, অদ্ভুত ভালোবাসার যত্ন!

অন্যদিকে মেঘ গুটি গুটি পায়ে পুরো মেলাটা ঘুরে দেখছে। তার সঙ্গে পা মিলিয়ে মিলিয়ে চলছে মাহিম। ছেলেটার দৃষ্টিতে অদ্ভুত একটা স্থিরতা। মেঘে'র চোখে চোখ পড়তেই সে তড়িঘড়ি চোখ নামিয়ে নেয়।

সকলের চোখের আড়ালে মাহিম এক মুঠো কাচের চুড়ি কিনে রাখে—হয়তো বিশেষ কাউকে দেওয়ার জন্য।

হঠাৎ আবার তাদের চোখাচোখি হতেই মেঘ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,

"কিরে, এভাবে তাকিয়ে কী দেখিস?

মাহিম হালকা হেসে বলে,

– ডানা কাটা পরি!

"কী বললি?

– না মানে… এমনি বললাম। আচ্ছা চল, আমরা দুজন কিছু খেয়ে নেই। ওদের আশায় বসে থাকলে আজ প্রাণটাই বেরিয়ে যাবে।

ঠিক তখনই মেলার ভেতর হঠাৎ গুলাগুলির শব্দ ফেটে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বিশৃঙ্খলা। সম্ভবত দুই শত্রু পক্ষের সংঘর্ষ। বড় বড় ছুরি ঝলসে উঠছে আলোতে। চারদিক জুড়ে আতঙ্কের চিৎকার। মানুষ প্রাণপণে ছোটাছুটি শুরু করে।

তুষার ভিড়ের মাঝেই বৃষ্টি'কে বুকে জড়িয়ে ধরে। চোখ ছুটে বেড়াচ্ছে মেঘকে খুঁজতে।

"মেঘ…!

কিন্তু কোথাও তাকে দেখা যায় না। ভিড়ের ধাক্কায় মাহিম আর মেঘ আলাদা হয়ে যায়।

চারপাশের চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, হুড়োহুড়িতে মেঘ ভয়ে গুটিয়ে যায়। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। ঠিক তখনই তার সামনে থেকে একটা ছেলে বড় একটা দা হাতে এগিয়ে আসে। মেঘের নিঃশ্বাস আটকে যায়।

পা নড়াতে পারে না সে।

ছেলেটা আরও কাছে আসে। চোখে উন্মত্ততা।

মেঘ নিঃশব্দে চোখ বুজে ফেলে। আর ঠিক তখনই ছেলেটি তার দিকে কোঁপ বসাতেই……

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প