বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ৬

🟢

তূর্য থমথম, মেঘ হাঁসতে হাঁসতে লুটোপুটি। আর তুষার গম্ভীর মুখে নিজের ধুলো ঝাড়ছে। তূর্য ততক্ষণাক তুষার'কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আওরায়,

”এই ভাই না প্লিজ! একটু পিচ্চি'কে ফিল করতে চাচ্ছি, তাতেও এমন করছিস?

তূর্য তুষারে'র কানের কাছে ফিসফিস করে কথাটা বললো। তুষার চোখ পাকিয়ে তাকায়,

– আমি কিছু করতে পারবো না, তোমার বউ তুমি যা ইচ্ছে করো।

“যা ইচ্ছে তাই তো করতে চাই কিন্তু পিচ্চি তো রাজি হবে না!

তূর্য'র ভাবনায় তুষার এক বালতি পানি ঢেলে মুখ বাঁকায়,

– যে আশায় বসে আছো তা জীবনেও পূরণ হবে না আমি অভিশাপ দিলাম।

"এই নাতির গুষ্টি কানে কানে কি কস?

আনোয়ারা চৌধুরী'র কথায় দু'জনেই চুপ হয়ে যায়।

“না না দাদিজান, আমরা কিছু বলছি না।

সবাইকে একদম থমকে দিয়ে হঠাৎ মেঘ উঠে দাঁড়িয়ে যায়। হাই তুলতে তুলতে বলে,

"হ্যালো ইভরিওয়ান, টাইম্’স আপ!

পাশ থেকে বৃষ্টি'র প্রতিক্রিয়া,

– সেম টু, দোস্ত!

তূর্য নাক কুঁচকে অবিশ্বাসের সুরে বলে,

“কেমনে কি ভাই? এখনো আড্ডা শুরুই হলো না, আর এদের চোখে ঘুম এসে পড়েছে?

মেঘ কিছু বলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে, ওঠার সময় বেডের কোণায় থাকা বেডশিট পায়ের সাথে জড়িয়ে যায়। এক মুহূর্তেই মেঘ সামনে হুরমি খেয়ে পড়ে। তূর্য বুঝে ওঠার আগেই ধড়াম করে দু’জন একসাথে নুয়ে পড়ে যায়। মেঘ সোজা তূর্য'র বুকে গিয়ে পড়ে—এবং পরের সেকেন্ডেই নিজের অজান্তে তূর্য'র ঠোঁটে তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায়।

পুরো রুম নিস্তব্ধ!

মেঘ চোখ বড় বড় করে স্থির হয়ে যায়। হাত-পা কাঁপছে, কিন্তু নড়তে পারছে না। তূর্য বরং মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত, দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। পরের মুহূর্তেই,, তূর্য'র দু’হাত মেঘে'র কোমড়ে শক্ত করে চেপে ধরে, তাকে নিজের দিকে আরও টেনে নেয়।

তার চোখে সেই চেনা শয়তানি ঝিলিক, যেন এই ঘটনাটাই সে চেয়েছিল।

মেঘ নির্বাক।

একটাও শব্দ বেরোচ্ছে না। শুধু অনুভব করছে, তূর্য'র বুকের ধুকপুক, নিজের এলোমেলো নিঃশ্বাস।

উপস্থিত সবাই তাদের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে, কারো চোখ বড়, কারো মুখ হাঁ, কারো আবার হাসি চেপে মরার অবস্থা। এই দৃশ্যের মাঝে তুষার হঠাৎ বৃষ্টি'র চোখ দু-হাত দিয়ে জোরে চেপে ধরে। বৃষ্টি হাত ছাড়াতে চাইলে তুষার মেজাজ করে গম্ভীর স্বরে বলে,

"হুসসস! ছোট্ট মেয়েদের এসব দেখতে নেই। আগে বড় হ… তারপর এসব সীন ফিল করাবো, না মানে করবি।

বৃষ্টি লজ্জায় থতমত খেয়ে যায়!

অন্যদিকে তূর্য যেন অন্য জগতে চলে গেছে, এক প্রকার ঘোর, এক প্রকার চেতনাহীন উষ্ণতা। তার হাত ধীরে ধীরে মেঘের কোমর বেয়ে উপরে উঠতে থাকে…

মেঘ চোখ বড় করে ভাবে, এই লোকটা কি সত্যিই পাগল নাকি পুরোপুরি বেপরোয়া?

মেঘ তারাতাড়ি তূর্য'র হাত চেপে ধরে থামিয়ে দেয়।

তূর্য বেশি গুরুত্ব দেয় না।

বরং মুখটা আরও কাছে এনে মেঘে'র ঠোঁটের পাশে ফিসফিস করে—

“বউ'য়ের শরীর এতো সফট হয় বুঝি? মনে হচ্ছে এক টুকরো তুলো… আমার বুকের সাথে লেপ্টে আছে, ইসসস!

মেঘে'র সারা শরীর কেঁপে ওঠে, মুহূর্তেই সে তূর্য'র বুক থেকে ঝট করে সরে এসে কটমট চোখে তাকায়,

"কাইলা ইন্দুর…

মেঘ আর কিছু বলার আগেই তূর্য মুখ বাকিয়ে আওরায়,

“এই পিচ্চি! একদম আমার দোষ দিতে আসবে না। তুমি নিজেই আমার বুকে হুরমি খেয়ে পড়েছো হুম।

মেঘ দাঁত কিঁচিয়ে বলে,

"পড়ে গেছি তো পড়ে গেছি! তাই বলে আপনি আমাকে ছিহ্ ছিহ্ ছিহ্…

জানু চল, এই শাউ*য়্যা মার্কা বেডাদের সাথে থাকা যাবে না।

মেঘ বড় বড় পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তার পিছু পিছু বৃষ্টি ও, কিছুটা দূর এগিয়ে যেতেই তূর্য মেঘে'র হাত চেপে ধরে। এবং বৃষ্টি'কে উদ্দেশ্য করে বলে,

“আমার কিউট বনু+শালী! একটু রুমে যা, তোর দোস্তের সাথে কথা বলবো কেমন।

বৃষ্টি মুচকি হেসে এদিক ওদিক মাথা কাত করে রুমের দিকে হাঁটা দেয়। সে বরাবরই বাধ্য মেয়ে তাই আজও তার ব্যাতিক্রম হলো না।

তূর্য'র হাত থেকে মেঘ নিজেকে ছাড়াতে মরিয়া কিন্তু তূর্য ছারতে নারাজ। কেন জানি আজ মেয়েটাকে নিজের কাছে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে। মন প্রাণ ভরে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। তাকে বুকে জরিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। তবে মনের ইচ্ছে মনে রেখেই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

“এই পিচ্চি এতো ছোটাছুটি করছো কেন? একটু হাত ধরেছি তাতেও এতো প্রব্লেম।

মেঘ তূর্য'র চোখের দিকে তাকায়। তার মনের ভেতর সমস্ত আশা আকাংখা ফুটে উঠেছে। সেটা মেঘ তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেল। সে বড় বড় শ্বাস ছেড়ে বলে,

"হ্যাঁ প্রব্লেম৷ হাত ছাড়ুন আমার, ব্যাথা করছে।

তূর্য এক টানে মেঘ'কে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। মেঘে'র এলোমেলো নিঃশ্বাস তূর্য'র মুখে আঁচড়ে পড়ছে। সে নিজেকে স্বাভাবিক করে মেঘে'র দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে আওরাল,

“এই পিচ্চি, তোমার সাথে আমার কিছু পার্সোনাল কথা আছে।

মেঘ ভুরু টেনে ভদ্রতা দেখিয়ে উওর দেয়,

"আমি রাত বিরেতে পর পুরুষদের সাথে কথা বলি না।

তূর্য গরম নিঃশ্বাস ফেলে দাঁত চেপে বলে,

“হেই ইডিয়েট, আমাকে কোন এঙ্গেল দিয়ে তোমার পর পুরুষ মনে হয়?

মেঘ চোখ বড় বড় করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,

"ওহ্! আমি তো বুঝতেই পারিনি আপনি আসলে হিজ*ড়া!

মেঘ কথাটা বলেই দৌড় দেয়। কারন সে খুব ভালো করেই জানে এর পরিমাণ খুব বেশি ভালো হবে না। হঠাৎ নিজের রুমের সামনে এসে থামকে যায়। রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, আর তূর্য পেছন থেকে তার দিকে তেড়ে আসছে।

"এই জানু দরজা খোল। আরে দরজাটা খোল না পেত্নী।

ভেতর থেকে কোনো সারা শব্দ পায় না। সে আবারও চিৎকার দিয়ে উঠে,

"জানু'রে প্লিজ দরজা খোল, নয়তো তোর দোস্তকে ওই রাক্ষসটা খেয়ে ফেলবে। ধুর বা*ল দরজাটা খোল না।

বৃষ্টি তবুও দরজা খুলে না, খুলবে কিভাবে হয়তো সে অনেক আগেই ঘুমে বিভোর হয়ে গেছে। মেঘে'র বৃষ্টি'কে এখন ইচ্ছে মতো কেলানি দিতে ইচ্ছে করছে তবে এখন সেটা করা পসিবল নয় তাই আবারও দৌড় দেয়। সামনে একটা দরজা খোলা পেয়ে সেই রুমে ঢুকে পড়ে। তবে দরজা বন্ধ করার আগেই তূর্য তার সামনে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে আজ একটু বেশিই হিংস্র মনে হচ্ছে। তূর্য রুমের দরজা লক করে মেঘে'র দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে, তা দেখে মেঘে'র কপাল বেঁয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে।

সে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে তবুও নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। মনের ভেতরের ভয় সত্যি হবে না তো? সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,

"আ আ আপনি আমার দিকে এগিয়ে আসছেন কেন?

তূর্য ডেভিল স্মাইল দিয়ে আওরায়,

“আই লাভ পিচ্চি! তোমাকে একটু কষ্ট দিতে চাই। একদম নিজের স্টাইলে।

কথাটা কুম্ভকর্ণের মতো কানে এসে বাজে। সে কিছু বুঝে উঠার আগেই তূর্য তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। ততক্ষণাক মেঘ চোখ বুজে ফেলে।

মেঘ'কে অবাক করে দিয়ে তূর্য তার কানের কাছে ঠোঁট লাগিয়ে ফিসফিস করে,

“ভয় নেই পিচ্চি! তোমাকে কষ্ট দিতে চাই, তবে তোমার অনুমতি ছাড়া নয়। তুমি যেদিন নিজে সেই অধিকার দেবে,

ঠিক সেই দিনই। তার আগে নয়।

মেঘ স্থির হয়ে যায়। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে যায়। সে ধীরে ধীরে তূর্য'র চোখের দিকে তাকায়।

তার নিঃশ্বাস হালকা কাঁপছে।

এই কি সেই নিষ্ঠুর লোক,

যে একদিন তাকে “কলঙ্ক” বলে দূরে সরিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল? এই কি সেই লোক, যে তার শরীরের উপর সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন চেপে ধরেছিল এবং এক মুহূর্তের জন্যও পিছনে তাকায়নি?

এই কি সেই লোক,

যে তার শরীরের ক্ষত দেখে কেঁপে ওঠার বদলে

আরও কষ্ট দিতে দ্বিধা করেনি? মেঘের বুকে ঝড়ের মতো স্মৃতিরা আঘাত করে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে—

চিৎকার করা রাত, কাঁপতে থাকা শরীর,

উপেক্ষা, ঘৃণা,

আর সেই ভয়ানক অন্ধকার…

কিন্তু এখন,

এখন যা দেখছে, সেটা তো একদম অন্য মানুষ। তূর্য'র চোখে নেই আগের মতো আগুন। নেই রাগ, নেই ঘৃণা।

তার চোখ আজ ভরা,

এক অদ্ভুত আকুলতায়,

একটা নরম, ভাঙা ইচ্ছায় মেঘ'কে কাছে রাখতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।

তূর্য মেঘে'র চোখে চোখ রেখে নিচু, কাঁপা, দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

“পিচ্চি! আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া যায় না? শুধু একবার। শেষ বারের জন্য হলেও।

মেঘের নিঃশ্বাস থেমে যায়। তার ভিতরে যেন ঝড় ওঠে, বুকের ভেতর অদ্ভুত কাঁপুনি শুরু হয়েছে। মূহুর্তেই সে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়।

তূর্য মাথা নিচু করে আবারও বলে,

“পিচ্চি, কথা বলছো না কেন?

তার কণ্ঠে একটা অসহায়তা, যেটা মেঘ কখনো শোনেনি।

“একটা সুযোগ কি আমাকে দেওয়া যায় না? এইটুকু? আমি তোমাকে নিজের করে নিতে চাই। বিকস্,আই লাভ পিচ্চি! আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি… জানো কতটা?

ঠিক ততটাই ভয়ংকর ভাবে, যার জন্য নিজেকে এখন উম্মাদ মনে হয়।

তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবী নিস্বাদ লাগে।

মেঘে'র বুক হিম হয়ে আসে। শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। একদিন যে তূর্য তাকে সবচেয়ে ঘৃণা করতো। আজ সেই তূর্য,

তার কাছে ক্ষমা চাইছে?

ভালোবাসা স্বীকার করছে?

নিজেকে উন্মাদ বলছে?

“পিচ্চি…

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প