মেঘ এখন কি বলবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু সে ঝগড়া করে হাড়তেও শেখেনি দরকার হলে তাকে মাইর দিয়ে দৌড় দেবে তবুও ঝগড়ায় হাড়া যাবে না। মেঘ হুট করেই তূর্য'র সামনে এসে তার হাতে কামড় বসিয়ে দেয়। তূর্য চিৎকার দিয়ে উঠে,
“তুষারে'র বাচ্চা এই রাক্ষসীকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দে। আমার রক্ত, মাংস খেয়ে ফেললো।
অনেক টানা হেচরা করার পর মেঘ নিজেই তূর্য'কে ছেড়ে দেয়। বেচারার হাতে কামড়ের প্রত্যেকটা দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এমন ভাবে কামড় দিয়েছে যে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। তূর্য চোখ কটমট করে তাকিয়ে আওরায়,
“বেয়াদপ মেয়ে! তোমার আব্বা আম্মা তোমাকে কিছু খেতে দেয় না, আমার রক্ত খেতে আসছো।
"না দেয় না, কাছে আসেন আরো রক্ত খাই!
তূর্য ততক্ষণাক দূরে সরে দাঁড়িয়ে যায়। এই মেয়েকে দিয়ে বিশ্বাস নেই। নিজের জয় দেখে মেঘ তৃপ্তির হাসি দেয়।
তূর্য আর দাঁড়ায় বড় বড় পা ফেলে সোজা নিজের রুমের দিকে হাঁটা দেয়। অনেক ক্লান্ত সে, আপাতত লম্বা ঘুম তার ভিষণ প্রয়োজন। তাকে যেতে দেখে মেঘ হাসতে হাসতে বলে,
"কাইলা ইন্দুর ভয় পেয়েছে। বাছাধন, আপনি যতই বিদেশ থেকে আসেন না কেন, পারমানেন্ট দেশিদের সাথে পারা মুশকিল হু। জানু রুমে চল, প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে।
বৃষ্টি এক লাফে মেঘে'র কাছে চলে আসে। দুজনেই ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে নিজেদের গন্তব্যের দিকে হেঁটে যায়।
_________________
--------------------------------------
“তুষার তোর মনে হয় ওই পিচ্চি'টা আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?
তুষার দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। ছাঁদের ঠান্ডা শীতল বাতাস তাদের শরীরকে শিউরে দিচ্ছে। ডিসেম্বরে শুরু তাই ঠান্ডা অনেকটা, তাদের গায়ে টি শার্ট ব্যাতিত কিছুই নেই। তুষার ধীরে ধীরে তূর্য'র সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখে এক প্রশান্তির হাসি, সে তূর্য'র চোখে চোখ রেখে মৃদু স্বরে বলে,
"জানো ভাই মেয়েটা বড় ভালোবাসার কাঙাল! ওকে দেখে কেও বলতেই পারবে না ওর হৃদয় কতটা ক্ষত বিক্ষত। এই দেখো ওর জীবনের সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটা হচ্ছে তুমি, অথচ তোমার সাথেই কত ভালো করে কথা বলছে। এটা ঠিক আমার ছোট বউ একটু ঝগড়া করে তবে ওর মনটা ভিষণ পবিত্র।
“সো হোয়াট বউ?
তূর্য ক্ষীপ্ত কন্ঠে বলে! তা দেখে তুষার মুচকি হাসে।
"চলো তোমাকে ডিটেইলসে বলি, আমার বড় বউ হচ্ছে দাদিজান, ছোট বউ মেঘু আর পারমানেন্ট বউ কে হবে সেটা বলবো না। আর বাকি যাদের বউ বলবো ওগুলো জাস্ট ফান। আর…
বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই তূর্য কঠোর গলায় বলে,
“তোর বড় বউ, পারমানেন্ট বউ কে? এসব জানার আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই, বাট আমার ওই পিচ্চি'র দিক থেকে দৃষ্টি নামিয়ে নে।
"কিন্তু কেন?
“ওই পিচ্চি'টা অনলি তূর্য চৌধুরী'র! সে আমায় হতে চায় বা না চায়, তাকে আমিতে আবদ্ধ করে রাখবো। যেই আমিটা ওকে আঘাতের পর আঘাত করে পালিয়ে গিয়েছিলাম আবার সেই আমিই ওকে আমার ভালোবাসা দিয়ে নিজের করে নেবো৷ ওর ক্ষত বিক্ষত হৃদয় সারিয়ে তুলবো। ভালোবাসার জন্ম দেবো ওর পাথর মনে! এটা তূর্য চৌধুরী'র প্রমিজ।
তুষার দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তূর্য'কে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে। আজকের তূর্য যেন সেই পুরোনো তূর্য নয়, আজ তার চোখে তুষার স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ভালোবাসা, ব্যথা, অপরাধবোধ। সেই দিনের মতো ঘৃণা, রাগ, নির্মমতা— কিছুই নেই।
তুষারে'র ভিতরে একটা নরম আশা জন্মায়। সে খুব করে চায়, সত্যিই চায়, তূর্য আর মেঘ এক হোক। হোক এমন একটা মিলন, যা দুজনকেই বদলে দেবে।
কিন্তু তুষারের' মন আবারও ভারী হয়ে ওঠে। কারণ, মেঘ সেই ধরনের মেয়ে নয়, যে কাউকে একবার হারালে আবার তাকে ফিরিয়ে নেয়। মেঘ হলো এমন এক মেয়ে, যে কারও দৃষ্টি নিজের দিক থেকে সরতে দেখলে নিজেও ফিরে তাকায় না।
আর তূর্য…
তূর্য তো মেঘে'র আত্মায় আঘাত করেছে। শুধু হৃদয়ে নয়,
তার অস্তিত্বে, তার সত্তায়।
তূর্য ধীরে ধীরে করিডোর ধরে হাঁটছিল। হঠাৎ মেঘে'র রুমের সামনে এসে তার পা থমকে যায়। দরজাটা বন্ধ নয়, শুধু আলগাভাবে ঠেকানো। কৌতূহলের টান সে সামলাতে পারে না; নিঃশব্দে দরজার চৌকাঠের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে। উঁকি দিতেই অবাক হয়।
সে ভেবেছিল, মেঘ হয়তো দরজা লক করতে ভুলে গেছে। কিন্তু এখন দেখছে, মেঘ চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগে কিছু লিখছে। সম্ভবত ডায়েরি...! জানালাটা পুরো খোলা, আর শীতের তীব্র বাতাস সরাসরি রুমে ঢুকে এসে ঢুকছে। বাতাস এসে হালকা ধাক্কা দিচ্ছে তার গালে। লম্বা, কালো, ঢেউ খেলানো কেশগুলো বারবার মুখের ওপর ভেসে এসে ঝাপটা দিচ্ছে। তবুও মেয়েটা নিজের জগতে ডুবে আছে,কিছুই টের পাচ্ছে না।
তূর্য একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। এমন শান্ত, এমন স্নিগ্ধ, এমন নরম লাগছে মেয়েটাকে আজ! আর তার চোখ— ঐ চোখ দুটোই তো তূর্যে'র সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। হালকা নীল আভা মেশানো চোখের মুনি, যেন ভোরের আকাশের প্রথম আলোর মতো। দেখতে যতটা সুন্দর, তার থেকেও বেশি অদ্ভুতভাবে টান ধরে। তূর্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ সামনে দিকে তাকিয়ে তূর্য'র ভ্রু যোগল কুঁচকে যায়। রেখা চৌধুরী তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তূর্য তাকে দেখে কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই রেখা চৌধুরী উল্টো পথে হাঁটা দেয়। তূর্য দৌড়ে গিয়ে নিজের মায়ের পথ আটকে ধরে। রেখা চৌধুরী আবারও পাশ কাঁটিয়ে চলে যায়। তূর্য সোজা মায়ের হাত আঁকড়ে ধরে এবং শীতল কণ্ঠে আওরায়—
“আম্মু …
রেখা চৌধুরী তূর্য'কে দূরে সরিয়ে দেয়। তার দৃষ্টি অন্য দিকে। তূর্য আবারও বলে উঠে,
“কথা বলবে না আম্মু?
.........?
“আম্মু প্লিজ কথা বলো না?
.........?
“আম্মু
তিনি এবার নিরবতা ভেঙে গম্ভীর স্বরে বলেন,
"রাত বিরেতে কুমারী মেয়েদের রুমে উঁকি ঝুঁকি দেওয়া কোনো ভদ্র ছেলের কাজ নয়। আশা করছি নেক্সট টাইম এমন ভুল হবে না।
“আম্মু তোমার ছেলে এতো বড় অপরাধ করে ফেলেছি যে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যায় না?
রেখা চৌধুরী নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনের ভেতর হাজারও প্রশ্ন কিন্তু মুখ ফুটে বলতে বার্থ। তার নিরবতা দেখে তূর্য মায়ের পা জরিয়ে বসে পড়ে। সব হঠাৎ হওয়ায় ঘাবড়ে যায় রেখা চৌধুরী। ছেলেকে নিজের পা থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে তবে তূর্য ছাড়ছে না।
তূর্য ভাঙা গলায় বলে উঠে,
“আম্মু… ক্ষমা করে দাও না তোমার অবাধ্য ছেলেকে। জানি, আমি অনেক বড় ভুল করেছি। দেখো, আজ আমি সেই ভুল বুঝতে পেরেছি, তবুও ক্ষমা করবে না আমাকে?
হঠাৎই রেখা চৌধুরী'র চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু তূর্যে'র হাতে পড়ে।
তূর্য থমকে যায়, হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
তার মায়ের চোখে এত অশ্রু… সে বহু বছর দেখেনি। চোখের কোণে জমাটবাঁধা কান্না, ঠোঁট কাঁপছে যেন কিছু বলতে চায়, তবুও বলে না। তূর্য দু’হাতে মায়ের গাল ধরে অশ্রু মুছিয়ে দেয়।
“আম্মু… কেঁদো না প্লিজ। তোমার ছেলে তো ফিরে এসেছে। তবুও কেন কাঁদছো?
রেখা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মুখ ফিরিয়ে বলেন…
"আসার তো কোনো দরকারই ছিল না।
আজ এসেছো, কয়েক মাস পরেই চলে যাবে। মাঝখানে সবাইকে মায়া বাঁধিয়ে লাভ নেই।
তূর্য কিছু বলতে গেলে তিনি বাধা দিয়ে এগিয়ে বলেন,
"আমি জানি তুমি কেন এসেছো। যেটার জন্য তোমার এত তাড়াহুড়া আর কিছুদিন অপেক্ষা করলে, আমি নিজেই সেটা তোমার কাছে পাঠিয়ে দিতাম।
তূর্য চমকে যায়—
“আম্মু… তুমি কিসের অপেক্ষার কথা বলছো?
রেখা চৌধুরী শুকনো, কষ্টমাখা হাসি হেসে বলেন,
"এখনো বুঝতে পারছো না? চলো, সোজাসাপটা বলেই দিই। তুমি নিশ্চয়ই মেঘ'কে ডিভোর্স দিতে এসেছো, তাই না?
চিন্তা করো না।
মেঘ তোমাকে কোনো দায়বদ্ধতায় বেঁধে রাখবে না। তোমাকে সারাজীবনের মতো মুক্ত করে দেবে। তুমি না এলেও… খুব শিগগিরই আমি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিতাম। আর যাই হোক, নিজের মেয়ের জীবনটা কোনো আবেগহীন, বিবেকহীন, অভদ্র ছেলের জন্য শেষ করে দিতে পারি না৷
তূর্য যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিটি শব্দ কানে ঢুকে কুম্ভকর্ণের ধাক্কার মতো বাজে। মনে হয় বুকের ভেতর কেউ ছুরি ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল। তার চোখে ভয় আর হতভম্বতা—সব একসাথে জমে যায়। এই একটা মুহূর্তে, সে যেন নিজের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে।
“আম্মু তুমি এসব কি বলছে?
রেখা চৌধুরী শান্ত কন্ঠে বলে ,
"অবাক হচ্ছো, কিন্তু আমি অবাক হওয়ার কোনো কথা বলিনি। যেটা তোমার মনের ইচ্ছে সেটা শুধু আমি পূরণ করতে চাচ্ছি। সে সম্পর্কের কোনো দাম নেই, সেটা বয়ে বেড়ানোর কোনো দরকার নেই।
তূর্য অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে। মনের ভেতর এক ঝড় বয়ে চলছে। সে দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আম্মু তুমি যে সম্পর্ক ইতি টানতে চাচ্ছো সেই সম্পর্ক আমি সারাজীবন এক বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাচ্ছি। তোমার ওই পিচ্চি মেয়েটাকে আমি আমার বউ'য়ের অধিকার দিয়ে ঘরে তুলতে চাচ্ছি। আর তুমি বলছো…
হঠাৎ রেখা চৌধুরী হাসতে থাকে। যে হাসির কারণটা তূর্য বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষন পর রেখা চৌধুরী হাসি থামিয়ে বলে,
"কি অদ্ভুত তাই না? যে মেয়ে ধর্ষিতা বলে বিয়ে করতে নাকোচ ছিলে। যাকে বা'স'র রাতে একা ফেলে চোরের মতো পালিয়ে গেলে আবার যাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য জন্মভূমিতে আসলে। আর আজ তাকে নিজের বউ'য়ের অধিকার দিতে চাও? ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর না। জানো আজ আবারও বিশ্বাস হলো ছেলে মানুষ মেয়েদের রুপেই পাগল হয় তার ব্যক্তিত্বে নয়।
তূর্য কথাই খুঁজে পায় না। সত্যিই কি কেউ প্রথম দেখাতেই কাউকে ভালোবেসে ফেলতে পারে? নাকি সে শুধু মেয়েটার সৌন্দর্যে পাগল হয়ে যাচ্ছে? এটা কি সত্যিকারের ভালোবাসা—
না কি ক্ষণিকের অনুভূতি, যেটা সময় পার হলেই মিলিয়ে যাবে ধোঁয়ার মতো?
তার বুকের ভেতর প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঘুরে ফিরে তাকে আঘাত করে। সেই মুহূর্তে রেখা চৌধুরী ঠাণ্ডা, কঠোর কণ্ঠে বললেন,
"নিজের সীমারেখায় সীমাবদ্ধ থাকো।
যা কখনো তোমার হবে না, তা পাওয়ার আশা করো না।
কথাটা বলে তিনি নিঃশব্দে চলে গেলেন। তূর্য দাঁড়িয়ে রইল চাতক পাখির মতো। মনের ভেতর ঝড় থামছে না,
সে এখনও নিজের অনুভূতির সত্যিটা খুঁজে ফিরছে… এটা কি ভালোবাসা, নাকি শুধু ভালো লাগা!