বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ৪

🟢

ভোরের তীর্যক রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে সরাসরি চোখে পড়তেই

মেঘ বিরক্ত মুখে কম্বল টেনে পুরো মাথা ঢেকে ফেলল। কিছুক্ষণ আগেও ঘুমটা কত শান্ত ছিল,

হঠাৎ'ই সিলিং ফ্যানের গা ছমছমে বাতাসে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।

“কোন শাউ*য়্যার নাতিরে এই সাত সকালে ফ্যান অন করল?

মেঘ বাজ খাই মেজাজে বলতে বলতে আবার কম্বল টেনে নিল। তার লাইফের সবচেয়ে ইমপোর্টেন্স ঘুম! দরকার হলে দু'দিন না খেয়ে থাকবে তবুও ঘুম মিস হবে না। তবে এই সকাল সকাল ফ্যান অন করলো কেন, সেটায় বুঝতে পারছে না।

পরক্ষণেই মাথায় খটকা লাগল, এই রুমে তো সে আর বৃষ্টি থাকে। মানে এ কাজটা বৃষ্টিই করেছে! মেঘ রাগে ফুসতে ফুসতে কম্বলের ভেতর থেকেই চিৎকার দিল—

"বৃষ্টির বাচ্চা! ফ্যান অফ কর! এই কাক ভোরে কীসের আকাম করতে আসছিস যে ফ্যান অন করতে হয়?

নীরবতা। একদম ডেড সাইলেন্স।

আর কোনো উত্তর নেই দেখে মেঘে'র মাথায় তো যেন কয়েকটা অগ্নি-গোল্লা একসাথে বিস্ফোরণ হলো। সে আবার চেঁচিয়ে উঠল

"জানু রে! তোকে আমার ভাইয়ের বউ বানামু,

তবুও ফ্যান অফ কর।

কিন্তু রুম এখনও পুরো নিস্তব্ধ। এতে মেঘের সন্দেহ আরও বাড়ল, বৃষ্টি আসলেই রুমে আছে তো? নাকি কিছু অদ্ভুত ঘটছে?

মেঘ কম্বল থেকে মাথা বের করতেই চমকে উঠে! তূর্য ঠিক তার সামনে বসে আছে, শান্ত ও ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি। মেঘ ভ্রু কুঁচকে নিজের মনে বিরবির করে,

"এতো সকালে আমার জন্মের শত্রু এই রুমে কি করছে?

পরক্ষনেই সে গম্ভীর হয়ে বলে,

"কাইলা ইন্দুর…

তূর্য এতক্ষণ যেন কল্পনার কোনো জগতে হারিয়ে ছিল। মেঘে'র সেই নামটা কানে যেতেই তার মুখাভিনয় বদলে যায়—চোখের পাতা কাঁপে, ধমকে ওঠার আগুনটুকু জ্বলে ওঠে।

“এই পিচ্চি! তোমাকে আর কিভাবে বুঝালে আমাকে ‘কাইলা ইন্দুর’ বলা বন্ধ করবে? প্লিজ, এইবার অন্তত থামো! এমন আজগুবি ডাক শুনলে নিজেকেই পেটাতে ইচ্ছে করে!

মেঘ চারদিকে তাকায়, রুমে আর কেউ নেই দেখে মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে।

"ওকে, তাহলে আজ থেকে আপনাকে কাইলা পাঠা বলবো। কিউট না নামটা? অবশ্যই কিউট! কারণ নামটা মেঘ রেখেছে কিনা।

তূর্য রাগে লাল হয়ে উঠে! সে বরাবরই সিরিয়াস কিন্তু এই মেয়ে তাকে রাগান্বিত করতে বাধ্য করে। এসেছিল ভালো করে দু'টো কথা বলতে কিন্তু সে উল্টো রাগ উঠিয়ে দিল। সে বড় বড় পা ফেলে মেঘে'র দিকে এগিয়ে আসে। মেঘ তৎক্ষণাৎ হাত তুলে চেঁচিয়ে ওঠে..

"বলবো না! সত্যি বলবো না! কাইলা ইন্দুর না, কাইলা পাঠাও না, কিছুই না! কিন্তু প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ মাইরেন না!

তূর্য তার সামনে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে যায়।

তার চোখে রাগ মিলিয়ে ধীরে ধীরে জায়গা নেয় আট বছর আগের সেই ভয়ানক স্মৃতি। সে মেঘে'র পেটে সিগারেট চেপে ধরার মুহূর্তটা, মেঘে'র সেই অসহায় চিৎকার— তার নিজের হাতের নিষ্ঠুরতা। তূর্য গিলে ফেলে শুকনো ঢোঁক। মেঘ আর কিছু বোঝার আগেই তার মুখে কেমন যেন ছায়া নেমে আসে। কিভাবে এতো জঘন্য কাজ করেছিল সে, মেয়েটা তো অবুঝ ছিল তবুও নির্মম ভাবে আঘাত করলো। সে মেয়েটার চিৎকার এখনো কানের কাছে বাজে,

"আল্লাহ্ দোহায় লাগে, আপনি আমারে মাইরেন না। আমি আপনার লগে কোনো দুষ্টুমি করমু না, তাও আমারে মাইরেন না। আমারে চাচিজান অনেক মারছে, আর মাইর খাইতে চাই না। আল্লাহ্ রস্তে ছাইরা দেন।

কতটা নিষ্ঠুর ছিল সে!

তূর্য খুব ধীরে ধীরে মেঘে'র পাশেই এসে বসে।

মেঘ বিস্ময়ে স্থির, এটা কি সত্যি? নাকি কোনো অদ্ভুত স্বপ্ন? তূর্য হঠাৎ তার মুখটা একটু সামনে বাড়ায়, এত কাছে যে মেঘে'র নিঃশ্বাস পর্যন্ত তূর্যে'র ঠোঁটে ছুঁয়ে আসে।

তার কণ্ঠ ঠাণ্ডা… কিন্তু ভীষণ গভীর—

“শোনো পিচ্চি…! তোমার কাইলা ইন্দুর এতোটাও খারাপ নয় যে, তোমার ফুলের মতো পবিত্র শরীরে আঘাত করবে। তুমি সর্বদা…

কথা শেষ হবার আগেই মেঘ ফেটে পড়ে, কিন্তু হাসিতে নয়, তাচ্ছিল্য-ভরা কঠিন এক শব্দে।

"ফুল আর পবিত্র! এই শব্দ দু'টো আমার সাথে বড্ড বেমানান। এর মধ্যে কোনোটাই আমি নয়, আমি হলাম কলঙ্ক! যা একবার যার শরীরে দাগ টেনে দেয়, হাজার চেষ্টা করলেও সেই কলঙ্কের দাগ মুছা যায় না। তাই আমাকে হাসির পাএ বানাবেন না।

তার কন্ঠ শেষ হতেই রুমটা যেন ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তূর্যে'র বুক চেপে ধরে এক অজানা ব্যথা।

মেঘে'র প্রতিটি শব্দ তার আত্মার ভেতর ঢুকে পড়ে।

সে জানে—

মেঘ কেন এমন কথা বলে। কেন নিজেকে “কলঙ্ক” বললো! কেন এত ছোট একটা মেয়ের চোখে পৃথিবী এত কঠোর হয়ে গেছে।

আচ্ছা এই “কলঙ্ক” শব্দটা কেন সবসময় মেয়েদের ওপর চাপানো হয়? কেন ভুল করলে দোষ শুধু মেয়েদের? ছেলেরা কি কখনো কলঙ্ক হয় না? নাকি সমাজের চোখ শুধু একদিকেই দেখতে পায়? তূর্যে'র চোখের কোণে রাগ নয়, একটা অন্যকিছু জ্বলে ওঠে।

ব্যথা, অপরাধবোধ আর আগুনের মতো তীব্র প্রতিজ্ঞা।

মেঘ পুরো ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এক কোণ থেকে আরেক কোণে। তবুও বৃষ্টি বা তুষারের দেখা নেই। দুইটায় দুইদিকে, একজন বই পড়তে ব্যাস্ত, আরেকজন মেয়ে পটানোর নেশায় দেশ বাঁচাচ্ছে। হঠাৎ, এক জায়গায় তার চোখ আটকে যায়। তুষার পুকুরঘাটে এক মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে এমন গল্প করছে, দেখে মনে হয় প্রেমের বাজারে সে এখন VIP কাস্টমার।

মেঘের ঠোঁট বেঁকে যায়, মাথায় দুষ্টু ভাবনা ক্লিক করে।

“আমাকে রেখে পিরিত করা! দাঁড়া বাছাধন দেখাচ্ছি মজা।

মেঘ দৌড়ে পুকুরঘাটের তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তুষার মেঘ'কে দেখেই শুকনো ঢোঁক গিলে ফেলে—

মেঘ মানেই ঝামেলা! সে এখন কি করবে কে জানে।

বিপদের সংকেত বুঝতে পেরে তুষার মেয়েটিকে হাত ধরে অন্য পাশে নিয়ে যাচ্ছে,

"নয়না, চলো, ওইদিকে যাই, কতো সুন্দর ওয়েদার।

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। হুট করে মেঘ তুষারে'র গলায় হাত পেঁচিয়ে ধরে, চোখে পানি এনে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

“জানেমান…! একটা চুমু দেয়নি বলে আমাকে ফেলে চলে আসলে? তুমি জানো, আমি তোমাকে কত মিস করেছি।

তুষারে'র মুখ হা হয়ে যায়। কি ডেঞ্জারাস মেয়েরে বাবা। এই মেয়ে কীভাবে এত বড় মিথ্যা এত সুন্দর করে গুছিয়ে বলতে পারে? সে তোতলাতে তোতলাতে বলে,

"মেঘু… অনেক কষ্টে এই মুরগি পটিয়েছি! আর তুই সাথে সাথে খাম্বা হতে চলে আসলি?

নয়না সোজা ঠাসসস করে তুষারে'র গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।

– আমি মুরগি ?

তুষার ছটফট করে,

"না জান, মানে আমি তো এমনি এমনি বলছি।

মেঘ আবার কাঁদু কাঁদু ফেস করে বলে,

“আপু দেখেন, পাঁচ বছরের রিলেশন আমাদের, আজ একটা চুমুর জন্য আমাকে ছেড়ে চলে এসেছে। আচ্ছা আপনিই বলুন আপু, আমার কাছে ভালো করে চুমু চাইলে দিতাম না ।

– কিহহহহহ???

মেঘ মাথা দুলিয়ে সিরিয়াস হয়ে বলে,

“না হলে কি! আগেও এমন করেছে। এক মেয়ে এসে বলেছিল তুষার তার সাথে রিলেশনে কিন্তু আমি বোকা বিশ্বাস করিনি। এখন বুঝি, জানেমান শুধু আমার না… আরও দশ বারোজন মেয়ের!

তুষার রাগান্বিত কন্ঠে আওরায়,

"মেঘুর বাচ্চা! এই ডাহা মিথ্যা বলিস না বোন, ঠাঠা পরবো তোর উপর ঠাঠা। নয়না বেবি, বিশ্বাস করো, আমাদের কোনো রিলেশন নাই গড প্রমিজ।

মেঘ দুষ্টু হাসি দিয়ে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে নয়না'র সামনে ধরে। স্ক্রিনে তুষার-মেঘে'র কাপল পিক৷ দুজনের মাথা মাথায় লাগানো, পিছনে হৃদয় আইকন।

“দেখেন আপু, কত ভালোবাসি আমি। অথচ আমাকে ছেড়ে এখন সে আপনার কাছে আসে!

মাত্র কয়েক ঘণ্টার রিলেশন… আর এখনই এমন অবস্থা! নয়না তুষারে'র দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ায়, এতো বড় ধোঁকা সে মেনে নিতে পারছে না।

নয়না পরপর ঠাসস! ঠাসস! ঠাসস! তুষারে'র গালে বেশ কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে গজগজ করে উঠলো,

– ছিহ্ তুষার, ছিহ্! তুমি এত বাজে? ওই মেয়ে সত্যিটা চোখের সামনে না দেখালে আমিও তো ধোঁকা খেতাম! তোমার মতো ছেলেদের জন্য এই থাপ্পড় ঠিক আছে।

ধুপধাপ পা ফেলে নয়না ঝড়ের বেগে সেখান থেকে চলে গেল। তুষার তখন পুরো রক্তিম চোখে মেঘে'র দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ? সে তো এখনো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে!

হঠাৎ তুষার জুতা খুলে লাফিয়ে উঠলো—

"শয়তানের হাড্ডি! পালাস কেন!? তোর জন্য আজ আমার পিরিত পুরাই লস হয়ে গেল! দাঁড়া, রাক্ষসী!

মেঘ দৌড়াতে থাকে, কারণ তুষারে'র হাতে একবার পড়লে আর রক্ষা নেই। তাদের দেখে পুরো ক্যাম্পাস হাসিতে ফেটে পড়ছে। বৃষ্টি দূর থেকে দুইজনকে লক্ষ্য করছিল,তার বই ছুঁড়ে ফেলে সামনে এসে দাঁড়াল।

– তুষার ভাইয়া, থামো প্লিজ! তুমি আমার মেঘুরানী'কে মারতে আসছো কেন?

তুষার গর্জে উঠলো,

"সামনে থেকে সর, বৃষ্টি।

মেঘ তাড়াতাড়ি বৃষ্টি'র পেছনে লুকিয়ে পড়ে,

এটাই তার সেফ জোন। এখানে লুকালেই কেউ তাকে ছুঁতে পারে না। বৃষ্টি বাজখাই স্বরে বলল,

– তুষার ভাইয়া, থামতে বলছি! না হলে খারাপ হয়ে যাবে!

তুষার চেঁচিয়ে ওঠে,

"তোর কথা শুনবো না? কি করবি তুই?

বৃষ্টি কোমড়ে হাত গুঁজে কর্কশ কন্ঠে আওরায়,

– খালামনি'কে বলে দেবো তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাও।”

চুপ…

পুরো পৃথিবী ২ সেকেন্ড থেমে গেল। তুষার মুহূর্তেই শান্ত, ভদ্র, নম্র, আজ্ঞাবহ হয়ে যায়। হাতে থাকা জুতা ফেলে দিয়ে কাঁপা গলায়,

"তুই কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস…?

বৃষ্টি চোখ রাঙিয়ে বলে,

– ভয় পাচ্ছো না? তাহলে এখনই কল দেই!

ভয়ানক আতঙ্কে তুষার দৌড়ে এসে বৃষ্টির হাত ধরে ফেলে,

"বোন প্লিজ! আম্মু'কে বলিস না! আম্মু জানতে পারলে আমি শেষ! তোকে ডেইরি মিল্ক খাওয়াবো, দুইটা, তিনটা, যত লাগে তত! শুধু মুখ বন্ধ রাখ!

বিপদ মাথার উপর থেকে সরে যেতেই মেঘ সাপের মতো উঁকি দেয়। না সব ঠিক আছে, তাই সে ধীরে ধীরে বৃষ্টি'র পাশে এসে দাঁড়িয়ে ঝাপটে ধরে।

“জানু জানু জানু! তুই তো আমার খালা।

বৃষ্টি ভ্রু কুঁচকে বলে,

– হোয়াট খালা? আমাকে তোর খালার মতো লাগে?

“জানু রাগ করিস না। তুই তো আমার খালা, খালু, আম্মা সব।

– ভন্ডামী রেখে এবার বল কি করেছিস? সত্যি বলবি একদম।

“তোর মনে হয়, এই ইনোসেন্ট মেয়ে মিথ্যা বলতে পারে?

তুষার ভেংচি কেটে বলে,

"ড্রামা বাদ দে রাক্ষসী। বৃষ্টি আমার দিকে তাকা, সব কথা ডিটেইলসে আমি বলছি তোকে।

তুষার প্রথম থেকে শেষ অবধি সকল ঘটনা বলে। তা শুনে বৃষ্টি স্তব, সে আগেই কিছুটা আন্দাজ করেছিল, মেঘ তাকে বিরক্ত করছে না মানে কোথাও গিয়ে আকাম করছে। সে বড় বড় চোখ তাকায়। মেঘ বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টো করে আওরায়,

“আমার দিকে তাকিয়ে আছিস কেন, আমি কিছু করিনি? এই তুষারে'র বাচ্চা আমাদের রেখে একা একা পিরিত করেছিল তাই।

"তোদের জন্য এখন আমি প্রেম পিরিতি করতে পারবো না?

মেঘ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে আওরায়,

“কবি বলেছে নিজে পিরিত করতে না পারলে, আরেক জনের পিরিতে লঙ্কা বাটা লাগিয়ে দাও!

তবুও শান্তি মতো পিরিত করতে দিও না।

তুষার রাগে গজগজ করতে করতে বলে,

"তোর কোন বা*ল পাকনা কবি বলেছে?

“কেন, তুষারন্দ্রনাথ।

তুষার মাথা চেপে ধরে মাটিতেই বসে পড়ে,

"বৃষ্টি'র তোর মাইয়াকে থামতে বল নয়তো এখানেই খুন করে ফেলবো। পুরো মেজাজের চৌদ্দটা বাজিয়ে দিছে শালী। এই মাতারী যার কপালে আছে তার কপালে শনি নাচবে।

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প