রাত প্রায় বারো'টা!
মেঘ গুটিশুটি হয়ে ঘুমিয়ে আছে। আর তূর্য তার পিচ্চি'র মাথায় কাছে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কতটা স্নিগ্ধ লাগছে তার পিচ্চি'কে একদম ছোট্ট বাচ্চা। অথচ সে এই বাচ্চা মেয়েটাকে কত আঘাত করেছে, নিজের উপর প্রচন্ড ঘৃণা হচ্ছে তার। গল্পটা এমন না হলেও তো পারতো। তূর্য দীর্ঘ শ্বাস নেয়, এই মূহুর্তে তার আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। হঠাৎ মেঘ গুঙিয়ে উঠে, তূর্য তারাহুরো করে সরে বসে। তূর্য ধীরে ধীরে মেঘে'র কপালে হাত রাখে, সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে, তার সারা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, পুরো মুখ ফ্যাকাশে নীল। যদিও ডক্টর আগেই বলেছিল জ্বর হওয়ার সম্ভবনা আছে, তাকে ওষুধ খাইয়ে দিতে বলেছিল কিন্তু মেঘ ওষুধ খাইনি। আর সেই জ্বর এখন তাকে কাবু করে ফেলছে। তূর্য উঠে দাঁড়িয়ে যায়, তারপর ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
বেশ কিছু সময় পর তূর্য হাতে এক বালতি পানি, একটা ছোট রোমাল আর তোয়ালে নিয়ে আসে। সে মেঘে'র পাশে বসে তার মাথা ধুয়ে দিচ্ছে, রোমাল ভিজিয়ে কিছু সময় কপালে ধরে রাখে এবং যত্ন সহকারে তারপর হাত পা মুছে দেয়।
শরীর এখনো অনেকটা উষ্ণ, সে মেঘ'কে ঘুমের ঘোরে ওষুধ খাইয়ে ঠিক করে শুইয়ে দেয়। হয়তো এখন জ্বর কমবে, নয়তো আবার নতুন মেডিসিন দিতে হবে। তূর্য হাতের গ্লাস রাখতে গিয়ে দেখে জগে পানি নেই বললে চলে, অনেক তলানিতে অল্প একটু রয়েছে। তূর্য আবারও জগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, এই জ্বরের ঘোড়ে তার ‘মেঘপরি’র যদি আবার তৃষ্ণা পায়। সে জগ ভর্তি করে পানি নিয়ে রুমে ঢুকতে যাবে ঠিক তখন রেখা চৌধুরী তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
সে গম্ভীর স্বরে বলেন,
"তুমি এখনো মেঘে'র রুমে? তোমাকে তো চলে যেতে বলেছি, আর তুমি এখানে থাকলে বৃষ্টি কোথায়?
সে নিচু স্বরে জবাব দেয়,
“বৃষ্টি গেস্ট রুমে আছে। আর আম্মু আমি তো তোমায় বলেছি আজ পিচ্চি'র সাথে আমি থাকবো।
"তুমি কি চাও বলতো। তুমি বুঝতে পারছো না, মেঘ তোমাকে দেখলে আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর আমি চাই না তোমার জন্য আমার মেয়েটার কিছু হোক। তুমি এখন নিজের রুমে যেতে পারো, আমি আছি ওর পাশে।
তূর্য মাথা নিচু করে আওরায়,
“সরি আম্মু, কিন্তু আমি এখানেই থাকবো পিচ্চি'র সাথে। টেনশন করো না, পিচ্চি জেগে উঠার আগেই আমি চলে যাবো। ও আমাকে দেখবে না।
রেখা চৌধুরী কিছু বলার আগেই তূর্য'র ভাঙা কন্ঠ ভেসে আসে,
“আম্মু প্লিজ! এইটুকু অধিকার তো আমার আছে, জানি ওর ভয়ংকর পরিস্থিতি আমি পাশে থাকতে পারিনি। তবে 'খোদার কদম' আজকের পর থেকে ওর প্রতিটি আঘাতের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াবো আমি। ওকে কোনো কষ্ট, ব্যাথা ছুঁতে পারবে না।
রেখা চৌধুরী কেমন যেন নিজের ছেলের প্রতি বিশ্বাস পেল। সে জানে তার ছেলে নিজের কথা রাখবে, তবুও মনের ভেতরের ধুকপুকানি যাচ্ছে না। তিনি শুধু ছেলের কাঁধে হাত রেখে নরম স্বরে বলল,
"তোমাকে শেষ বারের মতো আবারও বিশ্বাস করছি! এবার নিশ্চয়ই আগে বারের মতো পালিয়ে যাবে না। মনে রেখো বিশ্বাস এমন একটা জিনিস যা একবার ভেঙে ফেললে আর জোড়া লাগানো যায় না।
তিনি আর কোনো বাক্য না বলেই চলে যান। তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তূর্য গভীর শ্বাস নেয়! সে শুধু একটা মেয়ের কোমল হৃদয় ভেঙে দেয়নি, ভেঙে দিয়েছে নিজের মমতাময়ী মায়ের বিশ্বাস। তিনি যে বিশ্বাসে মেয়েটাকে আগলে রাখার জন্য তার সাথে বিয়ে দিয়েছিল, তূর্য সে বিশ্বাস চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। কিন্তু তূর্য সেই ভুল আর দ্বিতীয় বার করবে না—নিজের সবটা দিয়ে মেয়েটিকে আগলে রাখবে। তাকে ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখবে। যে চাদর থেকে সে চাইলেও বের হতে পারবে না। তাকে সেই কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা গ্রহণ করতে হবে করতেই হবে।
তূর্য বড় বড় পা ফেলে মেঘে'র পাশে গিয়ে বসে। তার গা স্পর্শ করে দেখে, জ্বর অনেকটা কম। কিন্তু মেয়েটা এখনো ঘোড়ের মধ্যে আছে। কিসব আবুল তাবুল বলছে, কিছু কিছু বাক্য স্পষ্ট আর কিছু অস্পষ্ট।
"আপনি একটুও ভালো না, সবার মতো আপনিও আমাকে কষ্ট দিলেন! সবচেয়ে বেশি ও নির্মম ভাবে। কেন কষ্ট দিলেন আমায়, শুধু কলঙ্কিত বলে৷ কেন কলঙ্কিত মেয়েরা কি ভালো নয়, তারা কি ইচ্ছে করে নিজের গায়ে কলঙ্ক নিয়েছে। তারাও তো নিজের মানুষটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো, তাদের সাথে সুখের সংসার করতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছু কিছু কাপুরষ সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই শেষ করে দিল। তারা মেয়ে গুলোকে নিঃস্ব করে দিল। তাদের নিজের বলতে কিছুই রইলো, তাই তো সবাই তাদের অবহেলা করে। শুধু কষ্ট দেয়, কেউ ভালোবাসে না!
তূর্য একদম স্তদ্ধ! হাত পা কাঁপছে ভিষণ, হৃদপিণ্ড বিদুৎ গতিতে লাফাচ্ছে। মনে হচ্ছে বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে৷ কথার ধাড়ালো এতোটাই তীব্র যে, তার বুক ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। মনের ভেতর ঝড় তুলে দিচ্ছে, কি করলে এই ঝড় থামকে জানা নেই তার। শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে।
হঠাৎ মেঘ তূর্য'র হাত টেনে ধরে। এবং অনুনয় স্বরে প্রতিধ্বনিত করে…
"জানু একটু জরিয়ে ধরবি আমায়? একটু তোর বুকে ঘুমাতে চাই। দূরে যাচ্ছিস কেন? রোজ তো কাছেই থাকিস, তাহলে আজ কেন দূরে সরে যাচ্ছিস, আয় না কাছে৷
তূর্য আবারও সরে আসতে চায় তবে মেঘ তার হাত ছাড়তে নারাজ। শক্ত করে ধরে রেখেছে। সে কিছু বলতে চেয়েও পারে না, কারণ মেঘ জেগে গেলে আরো বিপদ হবে।
"জানু আসবি না আমার কাছে? একটু আয় না।
তূর্য আর দূরে সরে থাকতে পারে না। সে অনিচ্ছা সত্যেও মেঘে'র কম্বলের ভেতর ঢুকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘ তার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে! মেয়েটার উষ্ণ শরীর তূর্যে'র বুকের সাথে লাগতেই কেঁপে ওঠে। মেঘ আবারও অস্পষ্ট স্বরে বলল উঠলো—
"থ্যাকস্ বুড়ি!
আচমকা মেঘ তার গালে ঠোঁট ছোঁয়ায়! তূর্য হেসে দেয়। হোক না অন্য কেউ ভেবে দিয়েছে তাতে কি, তার পিচ্চি'র স্পর্শ সেটা তো ভুল নয়।
মেঘ নিজেকে তূর্যে'র বুকের সাথে লেপ্টে নেয়! হয়তো বহু বছর পর নিজের সুখের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। তূর্য অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে, আজ কেন জানি মেয়েটার দিক থেকে দৃষ্টি সরতে চাচ্ছে না। খুব আপন করে নিতে ইচ্ছে করছে কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। তাতেও সে হ্যাপি, এতো গুলো বছর পর তাকে কাছে পেয়েছে এটাই তার কাছে অনেক পাওনা!
মেঘে'র কপালে উড়ন্ত চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে সে ফিসফিস করে উঠে—
“মেঘপরি! তোমাকে একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তাই না? দেখো তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমিও ভালো নেয়। আমার ভেতরটাও জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা দহন এতো তীব্র কেন...? জানো পিচ্চি সেইদিন যদি আমি ফিরে আসতাম তাহলে হয়তো তোমাকে এতো কষ্ট সহ্য করতে হতো না। না তুমি এতো স্ট্রং হতে, আর না সাহসী। আমি চেয়েছি আমার পিচ্চি অন্যায়ের প্রতিবাদ করুক, দেখ আজ আমি সফল। হয়তো সবাই আমাকে ভুল বুঝতেছে তাতেও আমার কিছু যায় আসে না। তুমি ঠিক থাকলেই হলো। তোমার মনও আমি জয় করে নেবো, #বিহঙ্গীনির_ব্যাকুল_মন শান্ত করবো আমি। তার হৃদয়ে আর আঘাত লাগবে না। খুব ভালোবাসি পিচ্চি, যে ভালোবাসার কোনো সীমা নেই ঠিক ততটাই তোমাকে ভালোবাসি!
তূর্যে'র হাতে স্পর্শ মেঘে'র গালে লাগতেই সে নড়েচড়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে তূর্য নিজের হাত সরিয়ে নেয়। মেঘ নিজের হাত দিয়ে কিছু খুঁজতে থাকে। হঠাৎ তূর্যে'র শার্টে টেনে ধরে,
"জানু তুই কবে থেকে শার্ট পড়িস? আমি নাকি তোর বেষ্ট ফ্রেন্ড কিন্তু আমাকেই বললি না। তুইও সবার মতো পর করে দিলি।
সে কাঁদু কাঁদু কন্ঠে কথাটা বললো! পরক্ষনেই ফিসফিস করে,
"দোস্ত এই শার্ট তোকে তুষার দিয়েছে তাই না? জানিস তুষার তোকে অনেক অনেক অনেক ভালোবাসে। কিছু বেচারা বলতে পারে না, তোকে একটা কথা বলি? তুই না তুষার'কে বিয়ে কর তারপর আমরা সারাজীবন এক সঙ্গে থাকবো। কিন্তু...
তূর্য আনমনে বলে উঠে,
“কিন্তু কি?
পরক্ষনেই মুখ চেপে ধরে। সে চুপ থাকতে চেয়েছিল কিন্তু ভুলে কথা বলেই ফেললো।
"দোস্ত তোর কন্ঠ বেডা বেডা লাগছে কেন? সে যাই হোক, আমার কথা শোন। তোদের বিয়ের পরেও আমি এখানে থাকবো৷ এমনকি কাইলা ইন্দুর আরেকটা বিয়ে করলেও। যদি আমাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দিতে চায় তাহলে আমি তাদের দুজনকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখবো। আইডিয়া খারাপ না কি বলিস। আর শোন আমাকে সকাল সকাল একদম ডাকবি না, আর না তুই আগে ভাগেই উঠে পড়বি। আজ তোকে জরিয়ে ধরে ঘুমাতে অনেক শান্তি লাগছে। অনেক অনেক অনেক…
মেঘ আর কিছু বলে না। তূর্য ঘাড় কাত করে দেখে তার পিচ্চি ঘুমে বিভোর, সে খুব ভালো করেই জানে। এই মেয়েটার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ঘুম। দুনিয়া উল্টো হয়ে গেলেও তার ঘুম ভাঙবে না।
ভোরের তীর্যক রশ্মি চোখে পড়তেই মেঘ হুরমুরিয়ে উঠে বসে! বাহির থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ বেজেই চলছে। সে তারাহুরো করে বেলকনির দিকে হাঁটা দেয়। সকালের প্রকৃতি তার ভিষণ পছন্দ, কিন্তু তবুও নিজেকে অসম্পূর্ণ লাগছে। হঠাৎ বৃষ্টি তার পাশে দাঁড়াতেই এক গাল হেসে দেয়। এই মানুষটাকে সে ভিষণ মিস করছিল। সে আচমকা বৃষ্টি'কে জরিয়ে ধরে।
"জানু তুই ঠিক আছিস?
বৃষ্টি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
– আমার আবার কি হবে? আমি তো ঠিকই আছি।
"চুপ কর বেডি। কালকে মেলায় যে মাথায় এতো আঘাত পেলি সেটা ভুলে গেছিস?
বৃষ্টি ছলছল নয়নে তাকিয়ে আছে! সে এখনো তাকে নিয়ে ভাবছে। একটা মানুষ কিভাবে এতো তারাতাড়ি সব ঘটনা ভুলে হাসি মুখে কথা বলতে পারে। হয়তো মেঘ'কে না দেখলে বুঝতেই পারতো না।
– মেঘু তুই...
মেঘ বৃষ্টি'কে থামিয়ে দিয়ে মুচকি হেঁসে বলল,
"বাদ দে এসব, কাল কি হয়েছে তা আর নতুন করে মনে করতে চাই না। আচ্ছা দোস্ত কালকে যে তুই শার্ট পড়ে ঘুমিয়ে ছিলি সেই শার্ট আমাকে দেখালি না। তুষার তোকে গিফট করেছে বলে আমাকে একটু দেখতেও দিবি না?
– কিহহহ? তুষার ভাইয়া আমাকে শার্ট গিফট করেছে? কিন্তু আমি তো কোনো শার্ট....
"বুড়ি এতো তারাতাড়ি আমার দেওয়া গিফটের কথা ভুলে গেলি? তোর কালকে আমার একটা শার্ট পছন্দ হলো আর আমি তোকে সেটায় দিলাম। মনে পড়েনি,
তুষার বড় বড় পা ফেলে বৃষ্টি'র পাশে দাঁড়িয়ে তার হাতে চিমটি দেয়। সে ততক্ষণে চিৎকার দিয়ে উঠে,
– উফফফ! তুষার ভাইয়া তুমি আমাকে চিমটি দিলে কেন? দোস্ত কিছু বল না।
মেঘ সঙ্গে সঙ্গে তুষারে'র হাত থেকে কফির মগ নিয়ে তার দিকেই ছুড়ে দেয়। ভাগ্যক্রমে সেই মগ তুষারে'র মেইন পয়েন্ট বরাবর লাগে, যদিও আঘাত তেমন তীব্র নয়। তবুও তুষার চিৎকার দিয়ে উঠে,
"শাঁকচুন্নি আমার বংশের বাতি জ্বালানোর আগেই রসাতলে দিতে যাচ্ছিল! রাক্ষসী একটা, আমি তোর কোন পাঁকা ধানে মই দিয়েছি যে আমার এতো বড় সর্বনাশ করতে যাচ্ছিলি।
তুষারে'র অবস্থা দেখে মেঘ, বৃষ্টি দুজনেই হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। বৃষ্টি কোনো রকম হাসি থামিয়ে ছোট্ট ছোট্ট করে বলে,
– তুষার ভাইয়া তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো তুমি কার গায়ে আঘাত করেছো। মনে আছে, একটা বেডি আমাকে থাপ্পড় দিয়েছিল বলে তার চুল গুলো কেঁটে নিয়েছিল আমার দোস্ত।
তুষার নিজের মনে বিরবির করে,
"ঠিকই আছে! তোর সাথে বা'স'র করার পর তোর দোস্ত আমাকে হয়তো বোম মেরে উড়িয়ে দেবে। দেখে দেখে রাক্ষসীর বান্ধবীকে পছন্দ হলো হু।