বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ১৫

🟢

স্নিগ্ধ মখমলে বিকেল!

প্রায় তিন ঘন্টার পথচলার পর মেঘ অবশেষে তার প্রিয় জন্মভূমিতে পা রেখেছে। গাড়ি থামতেই সে এক রকম উত্তেজনায় ঝাঁপিয়ে বেরিয়ে আসে, যেন এই ক্ষণটাই এতো বছরের সমস্ত অপেক্ষার অবসান, তার সঙ্গে বৃষ্টিও। দূরদূরান্তে ছড়ানো সবুজ মাঠ আর মাটির ভেজা গন্ধে মাতোয়ারা।

মেঘ চোখ বোলাতে বোলাতে চারপাশের দৃশ্যটা খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে। দিগন্ত জুড়ে সরিষার হলুন ফুলে সজ্জিত, রাস্তায় হালকা ধুলো। কোথাও কোথাও পুকুরের পানিতে সূর্যের শেষ রশ্মি প্রতিফলিত হচ্ছে। মেঘ মনে মনে স্বপ্ন দেখছিল, এই মাটিতে আবার নতুন করে জীবন গড়বে। তুষার আর বৃষ্টি আজ প্রথমবার এই গ্রামে এসেছে। তাই তাদের অনুভূতি ভিন্ন, সবকিছু যেন একেবারে নতুন। তারা মেঘে'র সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আশেপাশের পাখি, বাতাস, ছোটখাট নদী, আর খাল দেখে মুগ্ধ হয়। মেঘ দেখছে, নিজেকে এই গ্রামের সাথে আবার জুড়ে নিতে তাকে আগে অতীতের সব ব্যথা ভুলে যেতে হবে।

মেঘ নাকে বারবার টেনে নিচ্ছে চেনা মাটির সেই পরিচিত গন্ধ। মনে পড়ছে সেই দিনগুলো, যে জন্মভূমিতে সে বড় হয়েছে সেই জন্মভূমিতে তাকে নির্দোষ হয়েও কলঙ্কিত করা হয়েছিল। কিন্তু আজ, সে আর অতীতের কাছে আটকে থাকতো চায় না। আজ সে এই জন্মভূমিতে নতুন জীবন শুরু করতে চায়।

গ্রামের ছোট্ট ঘরগুলোর দিকে মেঘ তাকিয়ে থাকে। খুব কম সংখ্যা ছোট্ট ঘর রয়েছে, তবে দালানের সংখ্যা যেন একটু বেড়ে গেছে। বিকেলের হালকা হাওয়া তার চুলে ছোঁয়া দেয়, আর দূরের মাঠে ছোট্ট বাচ্চাদের কন্ঠের আওয়াজ ভেসে আসছে হয়তো খেলা করছে। মেঘ অনুভব করে, প্রকৃতির এই শান্তি আর সরলতা তার মনকে অমোঘভাবে শুদ্ধ করছে।

“মেঘপরি!

কাঙ্ক্ষিত কন্ঠ স্বর পেয়ে মেঘ পেছন ফিরে, ঠিক তখনই সেই মানুষটার সঙ্গে ধাক্কা খায়। মেঘ পরে যাওয়ার আগেই তূর্য এক হাত দিয়ে টেনে নেয়, এক টানে তূর্য'র শক্ত পোক্ত বুকের সাথে বাড়ি খায় মেঘ। এবং ততক্ষণাক সে চিৎকার দিয়ে উঠে,

"উফফফ! আপনার লোহার মতো শরীর নিয়ে বারবার আমার কাছে আসেন কেন?

তূর্য চোখ পাকিয়ে তাকায়,

“তোমার কাছে যাবো না তো কার কাছে আসবো? বউ যেহেতু একটা, সেহেতু তার কাছেই আসতে হবে। সে বা'স'র করতে দেয়নি তাতে কি, হয়তো কপাল জোরে আজ দু'চারটা চুমু পেতেও পারি।

মেঘ রাগে গজগজ করতে করতে নিজের গন্তব্যের দিকে হাঁটা দেয়। বৃষ্টিও পিছু পিছু দৌড়ে যায়, কারণ মেঘ রেগে গেলে তার সব কাজের স্পিড বেড়ে যায়।

– মেঘু, থাম বইন! আমি এত তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারি না।

বৃষ্টি'র কণ্ঠস্বর কানে যেতেই মেঘ আরও দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। ওদের এই কাণ্ড দেখে তূর্য মৃদু হেসে ওঠে। তূর্য নিজের মতো হেঁটে যাচ্ছে তুষারের হাতে সমস্ত ব্যাগ দিয়ে। এতগুলো ব্যাগ হাতে কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তুষার হাঁপিয়ে উঠেছে। রাস্তাটা এতটাই সরু যে গাড়ি নিয়ে বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হয়নি। কাছাকাছি একটা গ্যারেজে গাড়ি রেখে আসতে হয়েছে। তুষারে'র হাঁটার গতি কম দেখে তূর্য বাজখাই মেজাজে বলে ওঠে,

“তুষারে'র বাচ্চা! সামান্য লেডিস ব্যাগ আনতেই এত টাইম লাগে? আমার পা মিলিয়ে মিলিয়ে চল, ব্যাটা। দেখ, বউ আমার কত দূরে চলে গেল!

তুষার বিরক্ত স্বরে জবাব দেয়,

"এ্যাহ্! আসছে সামান্য বলতে। এতই যখন সামান্য, তাহলে একটা ব্যাগ তুমি নিয়ে চলো না কেন?

“এই হাত দুটো বউ'কে কোলে নেওয়ার জন্য আর ভালোবাসার জন্য। এইসব ছোটখাটো কাজ এই হাত করে না।

তূর্যে'র কথা শুনে তুষার হেসে দেয়। সে ভীষণ খুশি, হয়তো এতটা খুশি কাউকে বলে বোঝানোর মতো নয়। সে আবারও বলে উঠে,

"শয়তান বেডি গুলা এতো এতো আটা ময়দা নিয়ে এসেছে যে আমার অবস্থা বেহাল হয়ে গেছে! বুঝি না বাপু, এতো আটা ময়দা মেখে ভূত সাজার কোনো দরকার আছে। আমার বুড়ি তো এমনিতেই অনেক কিউট আছে!

কথা শেষ হতেই তুষার নিজের মুখ চেপে ধরে। সে ভুলে কি বলতে কি বলে ফেললো।

তূর্য তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখ বাকায়,

“শালা আটা ময়দা ওরা মাখবে না তো কি তুই মাখবি? তোকে তো আটা ময়দা ছাড়াও ভূত লাগে। আর এতো লাফালাফি করিস না, বাসায় ফিরে তোর বুড়ি'কে বিয়ে দিয়ে দেবো। তোর মতো লুচ্চা বেডার হাতে আমার ছোট্ট খাট্টো বোনকে তুলে দিতে পারি না। তোর জন্য বারো ঘাটে পানি খাওয়া লেডিস্ ঠিক আছে হু!

"ভাই তুমি আমার আপন ভাই হয়ে শত্রুর মতো বিহেভ করছো? কোথায় তুমি আম্মুকে বলে আমাকে বিয়ে করিয়ে দেবে তা নয়। আমার না হওয়ার সংসার ভাঙার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো।

তুষার কাঁদু কাঁদু কন্ঠে কথা গুলো বললো। হঠাৎ দু’জন মাঝবয়সী লোক সাইকেল চালিয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তূর্য হাতের ইশারায় তাদের থামতে বলে। লোক দু’জন থেমে হাসিমুখে বলে,

- বাবা, তোমরা কেরা? এই এলাকায় নতুন মনে হয়। তোমরা কাগো বাড়ি যাইবা?

“জ্বী আংকেল, একজনের বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না আর কত দূর যেতে হবে।

একজন লোক তুষারে'র দিকে তাকিয়ে পান চিবোতে চিবোতে বলে,

- এই আব্বা দেহি ব্যাগের ভারে পইড়া যাইবা। তোমরা যে বাড়ি যাইবা, সেই বাড়ির মানুষের নাম কও। আমরা তোমাগো ওইখানে দিয়া আহি। আর এই ব্যাগগুলা আমাগো সাইকেলে রাখো, তাইলে আর কষ্ট হইবো না।

সঙ্গে সঙ্গে তুষার ব্যাগগুলো লোক দুজনের সাইকেলের ওপর তুলে দেয়। এতক্ষণে যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু তূর্যে'র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে এমনভাবে ঘাবড়ে যায় যে আবারও ব্যাগগুলো নিজের হাতেই তুলে নেয়।

"ভাই, ওইভাবে তাকিয়ো না, ভয় লাগে। একটু ব্যাগ রেখেছি, তাতেই এমন চোখে তাকায়!

তুষারে'র অবস্থা দেখে লোক দুজন হেসে ফেলে। একজন মৃদু স্বরে বলে,

- আরে বাবা, তুমি ওরে এমন করো ক্যান? তুমি ব্যাগ রাহো আব্বা, আমাগো কোনো সমস্যা হইবো না। আচ্ছা, নামডা কও তো দেহি।

তূর্য ভ্রু কুঁচকে তুষারে'র দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি—

“পিচ্চির' বাবার নাম কী? ওহ্‌, শ্বশুর আব্বা তো নেই… তাহলে চাচা শ্বশুর আব্বার নাম কী?

তুষার একটু ভেবে উত্তর দেয়,

"মেঘু'র চাচার নাম রহমত মেম্বার। উনি এক সময় আপনাদের গ্রামের মেম্বার ছিলেন। এখন আছেন কি না, ঠিক জানি না।

কথাটা শেষ হতেই লোকটার মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে আসে,

"ওই মেম্বার, যার ভাতিজিকে ধর্ষণ করছাল?

কথাটা বলেই লোকটা থমকে যায়। যেন নিজের জিহ্বায় কামড় দেয়। সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে ফেলে,

- বাবা, আমি এমন কইরা বলতে চাই নাই। মাইয়াডা তো মেলা ভালো আছিলো কিন্তু চাচার জন্য....

লোকটার কথা হঠাৎ থেমে যায়। তূ'র্যের বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। গলার স্বর হালকা হলেও ভেতরে জমে থাকা রাগ স্পষ্ট—

“কিন্তু চাচার জন্য কী, আংকেল?

লোকটা একবার তূর্যে'র দিকে, একবার তুষারে'র দিকে তাকায়। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

- বাবা তুমি আসলে কেডা? আমাগো ওই মাইডার কেউ হও?

"আংকেল ভাই হলো সেই মেয়ে মানে, মেঘে'র স্বামী আর আমি তার দেবর। আজ আমরা সবাই মেঘু'দের বাসায় বেড়াতে এসেছি।

পাশের লোকটি বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসে,

- দেখছোস হাসিম আমাগো মাইডার জামাই কতো সুন্দর। মাইডার লগে ভালো মানাইবো, আমাগো মাইয়া কোনো অংশে কম নাকি? খালি একটু....

তূর্য আবারও জিজ্ঞেস করে,

“আংকেল আপনারা কিছু একটা লোকাচ্ছেন, প্লিজ বলুন না সেই দিন কি হয়েছিল।

দুজন লোক সামনে পেছনে তাকায়। তারপর খুব ধীর কন্ঠে বলে,

- বাবা'রা এডার পিছে মেলা কিচ্ছা আছে। এডার আসল কারণ খালি একজন জানে। তুমি সময় পাইলে আমাগো বাড়ি যাইয়ো।

লোক গুলো আর দেরি না করে তূর্য'কে সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গা দেখিয়ে ব্যাগ গুলো নিয়ে চলে যায়। লোক গুলোর কথা শুনে তূর্য'র বুক উঠানামা করছে, মনের ভেতর হাজারও প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত সব প্রশ্নের উত্তর পাবে কি সে?

মেঘ নিজের বাড়ির আঙিনায় পা দিতেই কেমন যেন সারা শরীর শিউরে ওঠে। পরিচিত মাটির গন্ধ, ভাঙা উঠোন, পুরোনো আমগাছ। সবকিছুই আগের মতো আছে, অথচ সে নিজে আর আগের সেই মেঘ নেই। আট বছর পর এই বাড়ির প্রতিটা ইট, প্রতিটা দেয়াল যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা স্মৃতিগুলোকে একসঙ্গে জাগিয়ে তুলছে। এক পা এগোয়, আবার থেমে যায়। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা কানে এসে লাগে। কিছুটা দূরে, ঘরের পাশের উঠোনে জামেলা খাতুন জামাকাপড় হাতে নিয়ে ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ চোখে পড়ে যায় উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে। মুহূর্তের ভেতরেই হাত থেকে সব জামাকাপড় মাটিতে ঝরে পড়ে যায়। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি কয়েক সেকেন্ড নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যান।

- বুবু…?

গলাটা কাঁপছিল। শব্দটা ঠিকভাবে বেরোতেই চায় না। মেঘ আর নিজেকে সামলাতে পারে না। দৌড়ে গিয়ে দাদিজানে'র বুকে মুখ গুঁজে ধরে। ছোটবেলার মতোই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাওমাও করে কাঁদতে থাকে। আট বছরের জমে থাকা যন্ত্রণা, অপমান, নিঃসঙ্গতা সব অশ্রু হয়ে দাদিজানে'র বুক ভিজিয়ে

"দাদিজান! তুমি কেমন আছো?

কাঁদতে কাঁদতেই বলে ওঠে মেঘ। জামেলা খাতুনও আর ধরে রাখতে পারেন না নিজেকে। মা-বাবা হারা নাতনিটাকে এত বছর পর নিজের চোখে দেখে তার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি ফিসফিস করে বলেন,

- আল্লাহ… আমার বুবু'টা সত্যিই ফিরছে!

খুশির সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর অজানা ভয়ও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মেয়েটা অনেক বড় হয়েছে কিন্তু অতীতের সেই দগদগে ক্ষতগুলো যদি আবারও জেগে উঠে, তাহলে সহ্য করতে পারবে তো? হঠাৎ জামেলা খাতুনে'র চোখ পড়ে মেঘের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে। বয়সে তরুণ, মুখে অচেনা দৃঢ়তা। ভ্রু নাচিয়ে, একটু সন্দেহ মিশ্রিত কণ্ঠে তিনি জিজ্ঞেস করেন,

- বুবু, ওই লোকটা কেডা? আর তুই আমারে না জানাইয়া আইলি, একবার কইতে তো পারতি।

জামেলা খাতুন তুষার আর বৃষ্টি'কে দেখেই চিনে ফেলেন। কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা গড়নের শ্যাম বর্ণের লোকটাকে দেখে একটু থমকে যান। চোখ কুঁচকে ভালো করে তাকান, স্মৃতির ভেতর খুঁজে ফিরেন, কিন্তু ঠিক মিলাতে পারেন না।

তূর্য বড় বড় পা ফেলে সামনে এগিয়ে আসে। মুখে ভদ্র, সংযত এক চিলতে হাসি। গলায় যথাসম্ভব সম্মান মিশিয়ে বলে—

“আসসালামু আলাইকুম দাদিজান। কেমন আছেন আপনি?

জামেলা খাতুন প্রথমে কিছু না বলে তাকিয়ে থাকেন। তারপর তুষারে'র দিকে চোখ ঘুরিয়ে নেন। তুষার হালকা হেসে মাথা নেড়ে ইশারা করতেই যেন হঠাৎ মনে পড়ে যায়।

- নাতজামাই তুই? আমি ভালোই আছি। এতো বছর পর এই বুড়িটার কথা তগো মনে হইলো?

তারপর আর দেরি করেন না। উঠোনের দিকে মুখ করে জোরে ডাক দেন,

- ওই রহমত, বউমা! তারাতাড়ি আয় গো। আমাগো নাতনী আর নাতজামাই আইছে।

তূর্য দাদিজানে'র এই স্বাভাবিক, আপন ব্যবহার দেখে খানিকটা অবাক হয়ে যায়। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না।

এই সময় ঘরের ভেতর থেকে রহমত মেম্বার বেরিয়ে আসেন। বয়স হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু চোখে এখনো সেই পুরোনো কর্তৃত্বের ঝিলিক। তূর্য সকলের সাথে একে একে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করেন। তারপর সবাই তাদের ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়।

বাড়ির মানুষজন যেন হঠাৎ করেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কেউ পানি আনে, কেউ খাবার সাজাতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই সামনে এসে পড়ে সরবত, ফলফুড, মিষ্টি। সবার মুখে হাসি। দীর্ঘদিন পর মেঘ ঘরে ফিরেছে—এই আনন্দ সত্যি, খাঁটি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালেই কারো একজনের মুখে চাপা ভয় জমে থাকে। সে ভয়টা কারো চোখে পড়ে না, বা পড়লেও কেউ বুঝে উঠতে পারে না।

মেঘের চাচাতো বোন জারা এক এক করে সবার হাতে সরবতের গ্লাস ধরিয়ে দেয়। চোখেমুখে কৌতূহল, আনন্দ, সব মিলেমিশে একাকার। তাদের বাড়িতে ঢুকতেই এত উৎসবমুখর পরিবেশ হবে, সেটা কেউ ভাবেনি। সবচেয়ে বেশি অবাক হয় তূর্য নিজেই। সে লক্ষ্য করে, তার দিকে কারো চোখে কটু দৃষ্টি নেই, নেই অবজ্ঞা। বরং সবাই অত্যন্ত যত্ন করে কথা বলছে, হাসিমুখে আপ্যায়ন করছে। এই ভালো ব্যবহারটা তার বুকের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করে। এতো ভালো ব্যবহার কি তার প্রাপ্য?

তার মন সায় দেয় না। যে মেয়েটাকে সে একসময় একা ফেলে চলে গিয়েছিল, এই বাড়ির মানুষের তো তার ওপর ক্ষোভ থাকার কথা। অভিযোগ, প্রশ্ন, অন্তত নীরব দূরত্ব, কিছু না কিছু তো থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সে পাচ্ছে তার ঠিক উল্টোটা।

তূর্যের মুখের ভাবটা বদলে যায়। চুপচাপ হয়ে যায় সে। সেটা দেখে তুষার একটু ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করে বলে,

"ভাই, এভাবে মন মরা হয়ে থেকো না। বাড়ির কেউ জানে না তুমি মেঘু'কে একা ফেলে চলে গিয়েছিলে। সবাই জানে তুমি নিজের মেঘের চাচাতো বোন জারা এক এক করে সবার হাতে সরবতের গ্লাস ধরিয়ে দেয়। চোখেমুখে কৌতূহল, আনন্দ—সব মিলেমিশে একাকার। তাদের বাড়িতে ঢুকতেই এত উৎসবমুখর পরিবেশ হবে, সেটা কেউ ভাবেনি।

সবচেয়ে বেশি অবাক হয় তূর্য নিজেই।

সে লক্ষ্য করে—তার দিকে কারো চোখে কটু দৃষ্টি নেই, নেই অবজ্ঞা। বরং সবাই অত্যন্ত যত্ন করে কথা বলছে, হাসিমুখে আপ্যায়ন করছে। এই ভালো ব্যবহারটা তার বুকের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করে। এতো ভালো ব্যবহার কি তার প্রাপ্য?

তার মন সায় দেয় না। যে মেয়েটাকে সে একসময় একা ফেলে চলে গিয়েছিল—এই বাড়ির মানুষের তো তার ওপর ক্ষোভ থাকার কথা। অভিযোগ, প্রশ্ন, অন্তত নীরব দূরত্ব—কিছু না কিছু তো থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সে পাচ্ছে তার ঠিক উল্টোটা।

তূর্যে'র মুখের ভাবটা বদলে যায়। চুপচাপ হয়ে যায় সে। সেটা দেখে তুষার একটু ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করে বলে—

— ভাই, এভাবে মন মরা হয়ে থেকো না। বাড়ির কেউ জানে না তুমি মেঘুকে একা ফেলে চলে গিয়েছিলে। সবাই জানে তুমি নিজের কাজের জন্য বিদেশ গিয়েছিলে।

তূর্য এবার বুঝতে পারছে সবাই কেন তাকে আদর যত্ন আট এতো ভালোবাসা দিচ্ছে!

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প