মেঘ যখন খুব ছোট ছিল, তখন প্রায় প্রতিদিনই বাবার হাত ধরে পুরো গ্রামটা ঘুরে দেখত সে। ছোট্ট হাতটা শক্ত করে বাবার আঙুল আঁকড়ে ধরে হাঁটা, এটাই ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস, তার নিরাপত্তা, তার পৃথিবী। আজ সেই মেঘ অনেকটাই বড় হয়েছে। আজও সে হাঁটছে, ঠিক সেই পুরোনো পথেই। কিন্তু বাবার হাতটা আর নেই।
মেঘে'র বয়স তখন মাত্র ছয়। বাবা মারা যান৷ যদিও মারা গেছেন বলাটা পুরো সত্য নয়। তাকে এক্সিডেন্ট করে মারা হয়েছিল। এই সত্যটা বাড়ির দু-একজন ছাড়া আর কেউ জানে না। মেঘে'র স্মৃতিতে বাবার চেহারাটা আবছা আবছা, ঝাপসা ছবির মতো—তবুও সেই অস্পষ্ট স্মৃতিই তার বুকের ভেতর গভীর শূন্যতা তৈরি করে। বিকেলের সূর্যটা ডুবে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তটা মেঘে'র ভীষণ প্রিয়। আকাশে তখন আলো আর অন্ধকারের মিশেল, যেন স্মৃতি আর বাস্তবতার মাঝামাঝি একটা সময়। সেই কারণেই আজ সে বৃষ্টি'কে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। জারা কোচিং এ থাকায় তাকে আনা হয়নি।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বৃষ্টি বলে ওঠে,
- মেঘু, তোদের গ্রামটা ভীষণ সুন্দর। জানিস, আমার তো মনে হচ্ছে সারাজীবন এখানেই থেকে যায়।
মেঘ হালকা হাসি নিয়ে বলে,
"আশা বাদ দে বইন। তুই এখানে থাকলে এখানকার কোনো ছেলেকে বিয়ে করতে হবে। আর তুষার তো তোকে এখানে বিয়ে দেওয়ার জন্য আনেনি
বৃষ্টি কপাল কুঁচকে বলে, - এখানে হঠাৎ তুষার ভাইয়ার কথা আসছে কেন?
"কাইলা ইন্দুর ঠিকই বলে! সত্যি কথা বললেই দোষ। তোমরা লুকিয়ে লুকিয়ে ইচিং-বিচিং করতে পারো, আর আমি বললেই দোষ?
- মেঘু…
"ওকে, ওকে দোস্ত! প্লিজ কাঁদিস না। তুই কাঁদছিস দেখলে বেচারা তুষার হার্ট অ্যাটাক করে ফেলবে!
এই কথা বলেই মেঘ হেসে ওঠে। তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক না বলা কথা, অনেক চাপা কষ্ট। হয়তো কাউকে এই কষ্ট বুঝতে না দেওয়ার জন্য সারাদিন হাসিতে মেতে থাকে।
দুজন হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ এগিয়ে আসে। সামনে আরও কয়েক কদম যেতেই চোখে পড়ে একটা পুরোনো বড়ই গাছ। গাছটা ভরা বড়ইয়ে৷ ডালগুলো নুয়ে পড়েছে ফলের ভারে। মেঘ আর বৃষ্টি সেদিকেই এগিয়ে যায়। কিন্তু তাদের দিকে শুধু পথটাই তাকিয়ে থাকে না—তাকিয়ে থাকে আশেপাশের মানুষজনও। কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে ঘৃণা, আবার কারো ঠোঁটে চাপা হাসি। ফিসফাস, কটূক্তি, বাজে মন্তব্য করছে অনেকেই।
মেঘ এসবের তোয়াক্কা না করে নিজের মতো হাঁটতে থাকে। মাথা উঁচু করেই।
ঠিক তখনই পাশের দিক থেকে এক মহিলা হঠাৎ জোরে বলে ওঠে,
– দেখছিস মাইয়াডার কাজ-কাম! এতো গুলা বছর পর আবার এই গ্রামে আইছে। না জানি আবার কী কাণ্ড ঘটাইতে আইছে! এদের লজ্জা শরম কিচ্ছু নাই। আমাগো সময় এমন কলঙ্ক মাইয়া ঘর থাইকা বাইর হওয়া তো দূরের কথা, ওরা বিষ খাইয়া, ফাঁসি দিয়া মইরা যাইতো। আর এই মাইয়া দেখ, কেমন নির্লজ্জের মতো হাঁটতাছে! এডা এখনো বাঁইচা আছে কেমনে? ছিহ্ ছিহ্ ঘেন্না লাগতাছে ঘেন্না।
কথাগুলো ছুরির মতো আঘাত লাগে মেঘে'র বুকে! কথা গুলো এতোটাই তীব্র যে, মেঘ নিজের মুখ থেকে একটা বাক্যও উচ্চারণ করতে পারছে না। একটা মুহূর্তের জন্য চারপাশটা যেন থমকে যায়। তবে কারো সঙ্গে তর্কে জড়ানোর ইচ্ছে নেই মেঘে'র। সে চুপ করে থাকে। নিঃশব্দ প্রতিবাদের মতো করে হাঁটতেই থাকে। অন্য দিকে অকথ্য কথাগুলো শুনে সে ভয়ে কুঁকড়ে যায়। বুকের ভেতরটা হঠাৎ হালকা কাঁপতে শুরু করে। সে আগেই আন্দাজ করেছিল, এমন কিছু হবে। তাই মানা করেছিল কিন্তু মেঘ নিজের জেদে অটল, অনিচ্ছা সত্যেও বৃষ্টি তার সঙ্গ দেয়। সে মেঘে'র দিকে তাকিয়ে অবাক হয়, মেঘ চোখ মুখ শক্ত করে রেখেছে বটে। কিন্তু তার বুকের ভেতরে যে যন্ত্রনা হচ্ছে এটা বৃষ্টি ভালো করেই বুঝতে পারছে।
তারা আরো দু’কদম এগিয়ে যেতেই হঠাৎ একজন মহিলা চেঁচিয়ে উঠে,
– এই মাইয়ারা, এইদিকে আয়! তগো লগে কথা কমু।
মেঘ আর বৃষ্টি দু’জনেই থমকে যায়। একসাথে তাকায় সেই দিকটায়। মহিলাদের চোখেমুখে যে দৃষ্টি, তাতে বোঝার বাকি থাকে না,ডাকার উদ্দেশ্য অপমান ছাড়া আর কিছু নয়। তাদের আশপাশে কয়েকজন পুরুষও আছে, বয়সে বেশ বৃদ্ধ; কিন্তু চোখের দৃষ্টি আর কথার ভঙ্গি দেখে বয়সের সঙ্গে বুদ্ধি বা মানবিকতার কোনো সম্পর্ক নেই বলেই মনে হয়। মন সায় না দিলেও পরিস্থিতির চাপে দু’জন সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
মহিলাদের মাঝখান থেকে একজন বৃষ্টি’র দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে কটূ হাসি হেসে বলে উঠে,
– এই মাইয়া, তোর চেহারা তো মাশাআল্লাহ্ অনেক ভালো। তোরে তো ভাল ঘরের মাইয়া মনে হয়। তাইলে তুই এই চরিত্রহীণ মাইয়ার লগে কি করিস? এই মাইয়া তো কলঙ্কিত, এডার লগে কথা বললেও পাপ হইবো। আর তুই এডার লগে হাঁটিস?
কথাগুলো যেন বিষ হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বৃষ্টি আর চুপ থাকতে পারে না। তার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে, কণ্ঠ গর্জে উঠে,
- মুখ সামলে কথা বলুন, আন্টি! ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, আমার বোন। ওর নামে আর একটা বাজে কথা বলবেন না। আপনাদের কে বলেছে ও কলঙ্ক? ও নিষ্পাপ, একদম ফুলের মতো নিষ্পাপ!
বৃষ্টি’র প্রতিবাদ শুনে আশপাশের কয়েকজন মানুষ হো হো করে হেসে ওঠে। কেউ কেউ হাসতে হাসতে এমনভাবে ঝুঁকে পড়ে, যেন কোনো সস্তা জোক শোনা গেছে। সেই হাসির শব্দ মেঘে'র বুকের ভেতর পাথরের মতো আঘাত করে। মেঘ চুপচাপ সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁট কাঁপে, বুকের ভেতর ঝড় ওঠে। প্রতিবাদ করতে চায়, চিৎকার করে বলতে চায়— আমি কলঙ্কিত নই। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। সে নিজের লড়াই নিজেই করতে চায়, কিন্তু আজ কেন জানি বারবারই ব্যর্থ হয়। যেন তার কণ্ঠ কেউ ছিনিয়ে নিয়েছে। এমন সময় একজন বৃদ্ধ পুরুষ গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,
– হোন মাইয়া, এডা কেমন মাইয়া আমরা সব জানি। তুই কেমনে ওরে ফুলের মতো নিষ্পাপ কস? তুই জানোস না এই মাইয়া চার-পাঁচজন বেডারে নিজের ইজ্জত বিলাইয়া দিছে। ওই বয়সেই পাঁকা আছিলো, এহন তো মনে হয় ঘর থিকা বেডা মানুষ যাই না।
- আংকেল, থামুন প্লিজ! একটা নির্দোষ মেয়েকে এমন কলঙ্ক দিয়েন না। আল্লাহ্ আপনাদের কাউকে ক্ষমা করবে না। আমার বোনের মতো পবিত্র মানুষ আর দুটো নেই, আর আপনি তাকে এভাবে অপমান করছেন?
বৃষ্টি কঠোর গলায় প্রতিধ্বনিত করে।
তার কথা পাত্তা না দিয়ে একজন মহিলা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
– হ হ, কেমন ভালা তা আমরা জানি। এই মাইয়া, তুই আবার আমাগো গ্রামে আইছোত ক্যান? এহন কি তোর জন্য আমাগো গ্রামডা শেষ কইরা দিমু? আর তোর জামাই কই? পুলাডা তো নিশ্চয়ই চইলা গেছে। যাইবোই তো, তোর মতো কলঙ্কিনী নিয়া কে সংসার করবো? ধর্ষিতা মাইয়া কারো বউ হইতে পারে না। তারা কলঙ্ক,কলঙ্কই থাকবো।
এই কথাগুলো আর শব্দ থাকে না, ছুরি হয়ে মেঘে'র শরীরে গেঁথে যায়। মেঘ মাথা নিচু করে সব শুনতে থাকে। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসে চারপাশ। কথাগুলো এতটাই তীব্র, এতটাই নির্মম যে তার ভেতরের আত্মা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতর দম আটকে আসে, হাত-পা ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যায়। মনে হয়, এখনই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। মানুষ কিভাবে পারে একটা অসহায় মেয়েকে এতোটা অপমান করতে? সে তো কলঙ্কিত নয় তবুও কেন সেই উপাধি তাকে বারবার দেওয়া হয়!
হঠাৎ মেঘ চিৎকার দিয়ে উঠে,
"থামুন আপনারা, কি পেয়েছেন কি হ্যাঁ? যা বলবেন তাই মেনে নেবো। অনেক হয়েছে আর নয়, আমি কলঙ্কিনী নয়। আপনারা নিজেরাই আমার গায়ে কলঙ্ক লেপে দিয়েছেন। শুধু মাএ আপনাদের....
মেঘ'কে বলতে না দিয়ে আরেকজন বলে উঠে,
– দেখছো নি মাইয়াডার কাজ কাম। ওই মাইয়া তুই কোন মুখ নিয়া নিজেরে শুদ্ধ প্রমান করস, কইলেই হইবো তুই কলঙ্কিনী না। আমরা নিজের চোখে দিখছি তুই কেমন, এতো দেগাম কই থাকে তোর। এতো আকাম করার পরেও গলা উঁচা কইরা কথা কস।
"চাচিজান আর কতো আঘাত দেবেন আমায়, প্লিজ থামুন এবার। সত্যি আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি আর কিভাবে বললে বুঝতে পারবেন সেইদিনের ঘটনা সাজানো ছিল, আমি কিছু করিনি। তারা ইচ্ছে করে আমাকে ধর্ষিতা বানিয়েছে। সবার মতো আমিও পবিত্র, আমার গায়ে কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। আচ্ছা আপনিই বলেন সেই দিন আমার জায়গায় যদি আপনার মেয়ে থাক....
আচমকা মহিলাটি মেঘে'র গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। মেঘে'র চোখে ছলছল করে উঠে, এতো অপমান করেও এদের সাধ মিটেনি এখন থাপ্পড় ও দিতে হলো? এই সমাজ এমন কেন? সত্য যাচাই না করেই তাদের এতো সুন্দর উপাধি দিয়ে দেয়, যেটা সে কল্পনাতেও ভাবতে ভয় পায়। মহিলাটি রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,
– চুপ কর ছি*নাল। তোর জায়গায় আমার মাইয়া থাকবো ক্যান? তোর মতো নষ্টা না আমার মাইয়া। তোরে কি কমু, গাছ যেমুন ফল তো তাই হইবো৷ মা আছার একটা ব্যা*শা মাইয়াডাও তাই হইছে।
মেঘ আবারও চিৎকার দিয়ে উঠে। কারণ এবার তার জন্মদাএী মাকে নিয়ে কথা উঠেছে, যে মাকে তাকে দশ মাস দশদিন গর্ভে লালন পালন করেছে৷ তাকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য হাজারটা কষ্ট, যন্ত্রনা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছে! সে আগুল তুলে উঁচু গলায় গর্জে উঠে,
"চাচিজান আমার মায়ের নামে একটাও বাজে কথা বলবেন না। নয়তো খারাপ হয়ে যাবে, আমাকে যা ইচ্ছে বলুন কিন্তু আমার মাকে নিয়ে নয়। সে আমার প্রিয়'র চেয়ে প্রিয় মা, তার নামে একটাও মিথ্যা অপবাদ আমি সহ্য করবো না।
– চুপ কর তুই। তোর মা কেমন ব্যা*শা তা আমাগো নতুন কইরা বুঝাইতে হইবো না। জামাইডা মরতে না মরতে আরেক বেডার লগে শুইয়া থাকে, তোর মা তোর মতোই নষ্টা আছাল।
মেঘ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না, তার মাথা ঘুরতেছে। সে হুট করে পড়ে যেতে নিলেই তূর্য দু'হাতে আগলে নেয় নিজের বুকের মধ্যে খানে৷ তার পুরো মুখ লাল হয়ে আছে, মেঘ'কে কি কি বলে অপমান করা হয়েছে সব কথায় শুনেছে সে। বৃষ্টি বিপদের আশংকা পেয়ে তূর্য'কে ফোন দিয়েছিল, আর সেসব শুনেই তূর্য এতোটা রাগান্বিত। সে একটা কাজে গিয়েছিল সেইজন্য তার মেঘপরি'কে এতো আঘাত সহ্য করতে হলো।
মহিলা গুলো এইটুকুতেই ক্ষান্ত হয় না, সে আবারও বলে উঠে,
– তোগো কইলাম না ও একটা নষ্টা মাইয়া। দেখ আরেক বেডারে লগে নিয়া...
“প্লিজ স্টপ অল অব ইউ, দ্যাটস মাই ওয়াইফ! আপনাদের সাহস হয় কিভাবে আমার বউ'কে নষ্টা মেয়ে বলার৷
হঠাৎ তূর্যে'র বজ্রকন্ঠ পুরো জায়গা কাঁপিয়ে তুলে।
– চিৎকার করলেই সত্য কথা মিথ্যা হইবো না। ও একটা নষ্টা ওর মা একটা নষ্টা। নষ্টার ঘরে নষ্টায় হয়।
মেঘ তূর্যে'র বাহু জরিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
"ওনাকে থামতে বলুন না প্লিজ? তারা সবাই আমার মা'কে কেন খারাপ বলছে, আমার গায়ে যত কলঙ্ক ইচ্ছে দিক কিন্তু আমার মা'কে এই কলঙ্ক দিতে মানা করুন। আমি সহ্য করতে পারছি না, বুক ছিঁড়ে আসছে আমার। ওনাদের চুপ করতে বলুন না।
– তোর মতো ধর্ষিতারে কলঙ্ক দেওয়া কি আছে, তুই তো আসলেই কলঙ্কিত! নষ্ট মাইয়া মানুষ, তোর মতো মাইয়া যেন কোনো বাপের ঘরে না হয়।
ততক্ষণে তূর্য উঁচু গলায় গর্জন তুলে আওরায়,
“সে ধর্ষিতা হোন বা কলঙ্কিত তবুও সে আমার বউ, তার দিকে আগুল তুলার সাহস আপনাদের কারো নেই। যে আমার বউ'য়ের দিকে চোখ তুলে আর একটা বাজে কথা বলবে ‘খোদার কসম’ তাকে আমি এই মূহুর্তেই জ্যান্ত কবর দেবো মাইন্ড ইড!
তূর্যে'র এই এক কথায় সবাই চুপ হয়ে যায়। কারো মুখে কথা নেই, অনেকেই ভয়ে সিটিয়ে যায়। তূর্য আবারও চিৎকার দিয়ে উঠে,
“আপনাদের কোনো রাইট নেই আমার বউ'য়ের সাথে উঁচু গলায় কথা বলার। ও আমার অধিকার শুধু আমার। আমার বউ কি আপনার মেয়ের মতো পর পুরুষের সাথে রাত কাঁটিয়েছে? আর আপনার মেয়ের মতো কি বিয়ের আগেই পেট বাঁধিয়েছে? নাকি আপনার ছেলের বউ'য়ের মতো পর পুরুষের হাত ধরে পালিয়ে গেছে? নাকি আপনার বউ'য়ের মতো পতিতালয়ে গিয়ে ঢলাঢলি করে, কোনটা হ্যাঁ কোনটা?
তূর্য আগুল দিয়ে নাচিয়ে নাচিয়ে বলা প্রত্যেক কথায় সবাই স্তদ্ধ। যারা এতো সময় চোখে চোখ রেখে বাজে বাজে কথা বলেছে সবাই এখন নিশ্চুপ। কেউ কেউ মাথা নিচু করে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ায়। তূর্য মেঘ'কে বুকের সাথে লেপ্টে ধরে কর্কশ কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে....
“আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আমি প্রমান করে দেবো আমার বউ ফুলের মতো পবিত্র! তাকে আপনারা জোর করে কলঙ্ক লেপে দিয়েছেন। আমি এমনি এমনি এখানে আসিনি, আপনাদের চোখে আগুল দিয়ে দেখিয়ে দেবো আসল অপরাধী কে? প্রত্যেকটা আপরাধিকে সামনে আনবো, সে যতই আপন হোক না কেন? তাদের সবাইকে আমার বউ'য়ের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হবে। এটা তূর্য চৌধুরী'র ওয়াদা!
ততক্ষণে তূর্য মেঘ'কে সকলের সামনে কোলে নিয়ে হাঁটতে থাকে। বৃষ্টিও পিছু পিছু যায়, তূর্য হাঁটতে হাঁটতে আবারও পেছন ফিরে ঘাড় কাত করে আওড়াল—
“আজকের পর থেকে আমার বউ'কে নিয়ে আর একটা বাজে কথা যে বলবে তার চোখ আমি তুলে ফেলবো। মনে রাখবেন ও শুধু কারো মেয়ে নয় ও আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার কলিজা! আর আমার শ্বশুর আব্বাকে যে বা যারা মার্ডার করেছে, কেন শাশুড়ী আম্মা সুইসাইড করলো সব কিছু খুঁজে বের করবো আমি। আগামী শুক্রবার সবাই মেম্বার বাড়ি হাজির হবেন, সেটা পুরো গ্রামের লোকদের জানিয়ে দিন। শিশু থেকে বৃদ্ধ লোক, একজনও বাদ যাবে না, দরকার হলে তাদের গাড়িতে করে আনবেন তবুও আমি সবাইকে ওখানে দেখতে চাই। আমার কথার নরচর হলে এর পরিণাম খুব ভয়ংকর হবে মাইন্ড ইড!
তূর্য বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে থাকে। মেঘ চাতক পাখির মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে, কিছু বলতে গিয়েও পারে না। গলায় এসে সব কথা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। তবুও কেন জানি লোকটাকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে, হয়তো এইবার তার বিশ্বাস ভাঙবে না।