বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ২০

🟢

সময় প্রবাহমান! দেখতে দেখতে চোখের পলকে প্রায় এক সপ্তাহ কেঁটে গেল। আজ সেই কাঙ্ক্ষিত শুক্রবার, তূর্য হন্নে হয়ে সত্য ঘটনা খুঁজতেছে, সঙ্গে তুষারও রয়েছে। যেহেতু গ্রাম, তার উপর আবার অচেনা, তাদের সঙ্গ দিচ্ছে সেই দু'জন লোক। যাদের সাথে গ্রামে এসে প্রথম দেখা ও কথা হয়েছে। সেই লোক দুজন তূর্য'কে সত্য ঘটনা বের করতে সাহায্য করছে, যতই হোক একজন নির্দোষ মেয়েকে তারা কলঙ্কিত করতে চায় না। তূর্য, তুষার সহ একজন লোক তাদের একটা পুরনো ভাঙা বাড়ির সামনে নিয়ে যায়। পুরো বাড়ি লতা পাতায় ঘেড়া, মনে হয় প্রায় শত বছর ধরে কেউ বসবাস করে না।

মাঝ বয়সী লোকটি পান চিবুতে চিবুতে বলেন,

- বাবারা আমি এর বিশি যাইতে পারুম না। তোমরা এইহানেই ওর খুঁজ পাইবা, আর হুনো কালু অনেক বড় শয়তান। ও কিন্তু এক লগে দশ বারোটা খুন করা পারে সাবধান, আমি ঠিক সময় বইকালে চাচারে লইয়া মেম্বার বাড়ি যামুনি। তোমরা তারাতাড়ি ওরে ধইরা আইনো, ও কিন্তু আসল সাক্ষী। মেম্বারের বিশ্বাসি লোক।

“আচ্ছা আংকেল, সাবধানে যাবেন।

লোকটি ধীরে ধীরে নিজের গন্তব্যে হাঁটা দেয়। অন্য দিকে তূর্য আর তুষার নিজেদের কাজে। দুজন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর চারপাশ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। তুষার কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠে,

"ভাই এখানে না গেলে হয় না? না মনে, আমার এখনো বিয়ে করে বা'স'র করা বাকি।

“চুপপ শালা! আমি বিয়ে করেই বা'স'র করতে পারিনি সে এই বা*ল আমার আগেই বা'স'র করার ধান্দায় আছে। আমার পিছু পিছু আয় নয়তো সারা জীবনের জন্য থার্ড পার্সন বানিয়ে দেবো।

"না ভাই আমি এমনি যাচ্ছি।

পুরোনো বাড়িটার ভেতরে পা রাখার সাথে সাথেই বাতাসটা বদলে যায়। চারপাশ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ, এমন নিস্তব্ধতা, যেন দেয়ালগুলো পর্যন্ত নিঃশ্বাস আটকে আছে। ভাঙা ছাদের ফাঁক গলে সূর্যের হালকা আলো মেঝেতে লম্বা ছায়া ফেলে রেখেছে। হঠাৎ গুলির শব্দে নিস্তব্ধতা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তুষার চোখের সামনে লোকটিকে দেখেই চিৎকার করে উঠে তূর্য'কে ধাক্কা দেয়—

"ভাই, সাবধান!

এক চুলের জন্য গুলিটা তূর্যে'র কপাল ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়। দেয়ালে লাগার সাথে সাথে ইটের টুকরো ছিটকে পড়ে। বারুদের গন্ধ মুহূর্তেই নাকে এসে লাগে। তূর্য ঘুরে দাঁড়ায়। অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে কেউ একজন। মাথা থেকে মুখ পর্যন্ত কালো ওড়নায় ঢাকা। চোখ দুটো ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না কিন্তু সেই চোখে কোনো ভয় নেই, আছে হিংস্রতা। এক মুহূর্তও দেরি না করে তূর্য দৌড় দেয়।

লোকটিও দৌড়াতে শুরু করে। তবে বয়স তার পায়ের গতিকে আটকে দিচ্ছে। ভাঙা বাড়ির করিডোর পেরিয়ে, আগাছায় ভরা উঠোনে ঢুকে পড়ে তারা। হঠাৎ লোকটি পেছন ফিরে দাঁড়ায়। পরপর দুটো গুলি ছোড়ে সে। দুটোই মিস করে গাছের গুঁড়িতে আঘাত হানে। কাঠের ছাল উড়ে এসে তূর্যে'র গায়ে লাগে। পেছন থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে তুষার বলে,

"ভাই… এই সেই লোক! গত এক সপ্তাহ ধরে যে আমাদের ফলো করছে। আমাদের ওপর যতগুলো এট্রাক হয়েছে, সবই এ করেছে। কাল রাতেও একে আমি বাড়ির পাশে দেখেছিলাম। একে ধরতেই হবে ভাই।

লোকটা আবার দৌড় দেয়। হঠাৎ তার হাত কেঁপে যায়। ঠং করে রিভেলভারটা মাটিতে পড়ে যায়। লোকটা থমকে যায় এক সেকেন্ডের জন্য, সেই এক সেকেন্ডই তার সবচেয়ে বড় ভুল। তূর্য গতি বাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে লোকটির কাঁধ। ঠিক তখনই লোকটা অদ্ভুত এক চাপা হাসি হেসে ওঠে। পরের মুহূর্তেই ছুরির ধার তূর্যে'র হাতে ঢুকে যায়। তীব্র ব্যথায় তূর্যে'র চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। সে হাত ছাড়তে বাধ্য হয়। লোকটা সুযোগ নিয়ে গাছের আড়ালে মিলিয়ে যায়, অন্ধকারে হারিয়ে যায় তার ছায়া।

চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তূর্যে'র রক্ত ফোঁটা ফোঁটা করে মাটিতে পড়ছে। তূর্য কাঁপতে থাকা হাতে তাকিয়ে দেখে, তার মুঠোয় ধরা পড়ে আছে সেই কালো ওড়না। তুষার দ্রুত এগিয়ে এসে পড়ে থাকা রিভেলভারটা তুলে নেয়। চারদিকে তাকিয়ে ভীত কণ্ঠে বলে,

"ভাই… লোকটা পালিয়ে গেল। এখন কী হবে? এখন সেই কালুটাকে কিভাবে খুঁজে বের করবো

তূর্য দাঁত চেপে ধরে। ব্যথা সত্ত্বেও সে রিভেলভারটা নিজের হাতে নেয়। ভারী লোহার ঠান্ডা ছোঁয়া তাকে অদ্ভুতভাবে শান্ত করে তোলে। সে মন দিয়ে অস্ত্রটা পরখ করে। হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে, ভয়ের নয়, শিকারের হাসি।

“তুষার, চল আসল কালপ্রিটকে পেয়ে গেছি।

গলায় অদ্ভুত দৃঢ়তা রেখে তূর্য বলে উঠে!

তুষার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। তূর্য ধীরে ধীরে বলে,

“এতদিন ভাবতাম কেউ বাইরে থেকে আমাদের সব খবর পাচ্ছে। এখন বুঝছি… শস্যের মধ্যেই ভূত ছিল।

সে কালো ওড়নাটা তুষারের দিকে ছুড়ে দেয়।

“ভালো করে দেখ। চিনতে পারছিস কি না এখন এক সেকেন্ডও নষ্ট করা যাবে না। ফাস্ট রেল স্টেশনে পৌঁছাতে হবে। নয়তো সাক্ষী পালিয়ে যাবে।

"কিন্তু ভাই তোমার হাতে রক্ত ঝরছে!

“তোর ভাবি দেখে নেবে। এখন ফাস্ট চল।

বাড়ির উঠান জুড়ে মানুষের গমগম শব্দ। ফিসফিসানি, চাপা আলোচনা, কেউ কেউ আবার প্রকাশ্যেই কথা বলছে, সব মিলিয়ে উঠানটা যেন বিচারসভা। এতো মানুষের ভিড়ে মেঘ নিজেকে অসম্ভব ছোট মনে হচ্ছে। দু’হাত জড়ো করে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, চোখ নামানো, বুকের ভেতর অজানা ভয় আর লজ্জার চাপ। মনে হচ্ছে, এই ভিড়ের প্রতিটা চোখ কেবল তাকেই খুঁজে নিচ্ছে, তার ভেতরটা উল্টেপাল্টে দেখছে। তার ঠিক পাশেই রহমত মেম্বার চেয়ারে বসে পা দুলাচ্ছে। অস্থিরতা তার পুরো শরীরে। মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট, কপালের ভাঁজগুলো গভীর হয়ে উঠেছে। প্রায় ঘন্টা খানেক কেটে গেছে, অথচ তূর্য কিংবা তুষারে'র কোনো খোঁজ নেই। হঠাৎই তিনি রাগান্বিত কণ্ঠে মেঘে'র দিকে তাকিয়ে বললেন,

- আম্মা, দেখছিস তোর জামাইয়ের কাজকাম! এতো সময় কেরা বইয়া থাকে? এতো গুলা মানুষ ওর লিগা বইয়া রইছে আর ওই পুলার কোনো খবর নাই! আমি মেম্বার মানুষ, আমার কোনো দাম নাই নাকি?

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে তিনি থামলেন না। তারপর আবারও বলেন,

- তুই আমার মাইয়া বইলা কিছু কই না? এতো বছর পর আবারও সেই কাহিনি! ক্যান এসব নিয়া আবার গুঠা দিতে হইবো? যা হওয়ার হইছে তো!

প্রতিটা কথা যেন মেঘে'র বুকে এসে আঘাত করছে। সে মুখ তুলতে পারে না, শুধু ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক তখনই হঠাৎ জামেলা খাতুন ধমকে উঠলেন। বয়সের ভারী গলার স্বরেও দৃঢ়তা স্পষ্ট।

– আ রহমত! তুই এমন করস ক্যান? পুলাডা ভালোর লিগাই তো এইসব করতাছে, আর তুই উলটা কথা শুনাস! আজ যদি তোর মাইয়ার লগে হইতো, তখন কী করতি তুই?

কথাটা শেষ হতেই উঠানে এক মুহূর্তের নীরবতা নেমে আসে। কিন্তু রহমত মেম্বারের রাগ তাতে কমে না, বরং আরও বিষ হয়ে ওঠে। তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,

- আম্মা, তোমার এই নাতনির মতো আমার মাইয়া ঢংগি না। সারাদিন মাঠে-ঘাটে দৌড়াদৌড়ি করে। ওর যা হওয়ার তাই হইছে, এহন আমার মাইয়া নিয়া টানছো ক্যান। আমার মান-ইজ্জত এমনিতেই রাহে নাই এই অ'প'য়া মাইয়া, আজ আবার আমার নাক ঢুবাইবো! ছিহ্… ছিহ্… ছিহ্…

এই কথাগুলো মেঘে'র ভেতরটা যেন একেবারে চূর্ণ করে দেয়। তার চোখ ছলছল করে ওঠে, তার বুক ফেঁটে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু পারছে না। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট আর অপমান গিলে নেয় সে। আজ চাচার ব্যবহার তাকে ভীষণ জঘন্য লাগছে। প্রতিটা কথা যেন বিষ মাখানো। মনে হচ্ছে, অনেকদিনের জমে থাকা ক্ষোভ আজ উগরে দিচ্ছে তিনি। অথচ এই মানুষটাই তো একসময় তাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসেছে। বিপদে আগলে রেখেছে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। তাহলে আজ কেন?

আজ কেন সে এতটা পর হয়ে গেল? মেঘে'র মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়— মানুষ কি পরিস্থিতি বদলালেই ভালোবাসা ভুলে যায়? নিজের স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে বাকি সবাইকে নগন্য মনে হয়।

তিনি আবারও চিৎকার করে উঠে দাঁড়ান। রাগে তার মুখ লাল, কণ্ঠস্বর কাঁপছে,

- অনেক হইছে! আর না, আমি আর ওগো রং-ঢং দেখার লিগা বইসা থাকতে পারমু না। আম্মা, তোমার নাতনি নিয়া ঘরে যাও। ওই অ’প’য়া মুখ বারবার দেখতে মন চায় না!

কথাগুলো ছুরি হয়ে মেঘে'র বুকে বিঁধে যায়। উঠানের মানুষজন হইচই করে ওঠে, কেউ কেউ মাথা নেড়ে, কেউ আবার মুখে চাপা হাসি। রহমত মেম্বার এক পা সামনে বাড়াতেই হঠাৎ কর্কশ দৃঢ় এক কণ্ঠ উঠান কাঁপিয়ে তোলে—

“ওহু চাচা শ্বশুর আব্বা! আমার বউ’কে অপমান করার রাইট আমি কাউকে দেই নাই। হোক সে চাচা বা বাবা। ওকে আঘাত করলেও আমি করবো, ভালোবাসলেও আমি বাসবো। সো নিজের লিমিট ক্রস করবেন না।

এক মুহূর্তে পুরো উঠান নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সব চোখ সেই কণ্ঠের উৎসের দিকে। ভিড়ের মাঝখানে কেউ একজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়, চেয়ার ঠেলে সরে যায়। লোকটা উঠে দাঁড়াতেই আলো-ছায়ার ভেতর থেকে তার মুখটা স্পষ্ট হয়। মুখ দেখে রহমত মেম্বারের বুক ধক করে ওঠে। চোখ বড় হয়ে যায়, ঠোঁট কাঁপতে থাকে। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে—

- কালু… তুই! তুই এহনো গ্রামে আসোস?

তূর্য প্যান্টের পকেটে এক হাত গুঁজে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে আসে। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই আত্মবিশ্বাস, চোখে ভয়ংকর শান্তি, যে শান্তির নিচে জমে আছে আগুন। সে সোজা এসে মেঘের সামনে দাঁড়ায়। মেঘ ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকায়। মেঘে'র চোখ-মুখ দেখেই বোঝা যায়,বুকের ভেতর হাজারো কষ্ট, অপমান আর রাগ সে শক্ত করে চেপে রেখেছে। তূর্য মেঘে'র কপালে হালকা ফুঁ দেয়। এবং শীতল কণ্ঠে তূর্য বলে,

“তোমায় বলেছিলাম না বউ, আমি তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবো?দেখো, আজ সেই সব দোষী তোমার সামনে হাজির।

মেঘ তার হাতের দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলে,

"আ আ আ… আপনার হাত থেকে তো রক্ত পড়ছে!

“হুসসস! আমার জন্য এখন আর চোখের অশ্রু ফেলতে হবে না বউ। সামনে বড় ঝড় আসছে, সেই ঝড় সামলানোর জন্য রেডি হও,। সত্য ঘটনা জানতে পারলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারবে তো পিচ্চি?

এই কথা বলেই তূর্য মেঘে'র সামনে থেকে সরে যায়। সোজা গিয়ে রহমত মেম্বারের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে, মুখোমুখি। তাদের মাঝখানে যেন বাতাস পর্যন্ত থমকে গেছে।

ঠিক তখনই আরও কয়েকজন ছেলে সেখানে এসে হাজির হয়। কারো কপালে কাটা দাগ, কারো হাতে শুকনো রক্ত, তাদের দিকে তাকিয়েই রহমত মেম্বারের আত্মা কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে, গলা শুকিয়ে আসে। এতক্ষণ যে মানুষটা দম্ভে কথা বলছিল, সে এখন চোখ নামিয়ে ফেলছে।

তূর্য তার এই করুন অবস্থা দেখে বাঁকা হাসে। সে খুব ধীরে ধীরে বলে,

“কী চাচা শ্বশুর আব্বা, এইটুকুতেই ঘাম ঝরছে? এখনো ট্রেলার তো বাকি হে! তো সকল সত্য আপনি বলবেন নাকি আমাকে বলতে হবে হুম?

রহমত মেম্বার কপাল ভাঁজ করে তাকিয়ে আছে। তার হাত পা কাঁপা কাঁপি করছে, তিনি পরপর কয়েকটা শুকনো ঢুক গিলে। মনের ভেতর ভয় ঢুকে গেছে, আজ তার সত্য সামনে আসবে সেটা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। তূর্য মেঘ'কে ইশারা করতেই সে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তূর্য এক হাত দিয়ে মেঘে'র কোমড় জরিয়ে ধরে নিচু স্বরে বলল....

“জানো পিচ্চি তুমি আজ কলঙ্কিত কার জন্য হয়েছো? কার জন্য এই রাক্ষস গুলো তোমার উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে? কার জন্য তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় মা-বাবাকে হারিয়েছো? কার জন্য নিজের শৈশব হারিয়েছো? কে তোমাকে সকালের সামনে কলঙ্কিনী বানিয়েছে?

মেঘ চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে। তূর্য'র মুখ থেকে সেই নিকৃষ্ট মানুষটার নাম শুনার এবং উদগ্রীব হয়ে আছে। কে জানতো সেই নামটা তার জীবনের আরেকটা খুশি কেড়ে নেবে। তূর্য মেঘ'কে শক্ত করে ধরে রহমত মেম্বারের দিকে আগুল তাক করে আওরায়—

“এই মানুষটা সবকিছুর জন্য দায়ী।

কথাটা শুনা মাএ মেঘে'র পায়ের তল থেকে যেন মাটি সরে যায়। তার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সবাই অবাক, কারো মুখে কোনো কথা নেই। মেঘ দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানুষটি ধরে রাখায় মাটিতে লুটিয়ে পরে না। মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠে,

"আপনি এসব কি বলছেন? চাচাজান আমার আরেকটা বাবা, চাচাজান এমনটা করেনি। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।

মেঘে'র কথায় তূর্য একটুও অবাক হয় না। সে জানতো মেঘ কোনদিনই বিশ্বাস করবে না, শুধু মেঘ নয় কেউ এসব বিশ্বাস করবে না। যে আগলে রেখেছে, সে কিভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।

হঠাৎ একজন লোক মেঘে'র পায়ে লুটিয়ে পড়ে। মাটিতে পড়ার শব্দে সবাই চমকে ওঠে। মেঘ আঁতকে উঠে এক পা পিছিয়ে যায়, বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। লোকটার মুখ দেখেই তার শরীর শিউরে ওঠে। এই সেই মানুষ, সেই দিন যে তাকে জোর করে পুরনো বাড়িটায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল। যে দিনের কথা আজও তার দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

"চা চা চা চাচা আপনি?

তিনি আকুতি স্বরে বলেন,

– মা আমারে মাফ কইরা দে, বিশ্বাস কর মা আমি এসব নিজে থাইকা করি নাই। তোর চাচাজান আমারে দিয়া করাইছে, আমি এসব টাকার লিগা করছি।

হুট করে রহমত মেম্বার গর্জে উঠলো,

- কালু তুই কি ভুইলা গেছোস আমি কেডা?

– মেম্বার সাহেব আমি অনেক সহ্য করছি কিন্তু আর না, আর কতো পলাইয়া থাকমু। আপনার লিগা আমি আমার ঘর, সংসার, সন্তান সব হারাইছি। আপনার কথায় কতো গুলো মানুষ মাইয়া ফালাইছি কিন্তু আর কতদিন এগিনা করুম কন?

তিনি আবারও অসহায় কন্ঠে বলেন,

– মা আমারে মাফ কইরা দে, আমি জীবনে অনেক পাপ করছি। তোর চাচার লিগা সব করছি আমি, কিন্তু এতো কিছু কইরাও আমার কপালে সুখ শান্তি জুটে নাই। এতো টাকা পয়সা দিয়া কি করমু যদি শান্তি না থাকে। তোর মনে হয় তুই আমার হাতে একজনরে খুন হইতে দেখছোস দেইখা তোরে মিথ্যা অপবাদ দিছি? কিন্তু তা সত্য কথা না। তোরে এই মেম্বারের কথায় নিয়া গেছি, আর পুলা গুলোরে টাকা দিয়া তোর উপরে মিথ্যা অপবাদ দিতে কইছি। এই মেম্বার তোর কপাল পুড়াইছে, তোরে এই বাড়ি থিকা বাইর করার লিগা এইসব করছে। তোর জায়গা জমি ইনি খাইবো তাই এমন করছে, এমনকি তোর বাপ মারে ইনিই মারছে আমার হাত দিয়া।

মেঘ ডুকরে কেঁদে উঠে। গলা শুকিয়ে আসছে তার, এতো গুলো বছর পর সত্য জানতে পেরেছে কিন্তু এই সত্য এতোটা নির্মম হবে এটা জানতো না।

– আমি তোরে কষ্ট দিতে চাই নাই মা। কিন্তু আমি যদি তোরে সেই মিথ্যা অপবাদ না দিতাম তাইলে তোর চাচা তোর লগে সেইদিন সব ঘটনা সত্য সত্য ঘটাইতো। তুই ক আমিও তো বাপ, আমি কেমনে এই নিকৃষ্ট কাজ করি। আমার বুক কাঁপছে তাও আমি কিছু করা পারি নাই, তোর শাশুড়ীরে আমিই ফোন দিয়া আনছিলাম। জানি ওই ম্যাডাম তোরে লইয়া যাইবো, তোরে যে সে খুব ভালোবাসে। তুই তো তার সই'য়ের মাইয়া আছিলি, পারলে আমাকে মাফ কইরা দিস মা। আমি নিরুপায় হইয়া তোরে কষ্ট দিছি।

লোকটি কথা বলার সময় বারবার গলা কাঁপছিল। মেঘ এক দৌড়ে নিজের চাচার কাছে যায়। আজ তার চোখ বাঁধ মানছে না, ভেতরের হাহাকার অশ্রু হয়ে ঝড়ে পড়ছে। মেঘ রহমত মেম্বারের পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

"চাচাজান ও চাচাজান আপনি কেমনে পারলেন আমায় এতো বড় কলঙ্কের কলঙ্কিত করতে! আপনি না আমায় আম্মা কন, তাহলে কেউ কেমনে নিজের আম্মারে নরক যন্ত্রনায় ফেলে দিতে পারে বলেন না। বাবা তুমি দেখে যাও, তোমার কলিজা'কে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে দিয়েছে তোমার ভাই। যাকে আমি আমার বাবা ভাবতাম, আল্লাহ্ তুমি আমারে কেন বাঁচিয়ে রাখছো। তুইলা নাও আমারে, আমি কেমনে সহ্য করুম আমার গায়ে নিজ হাতে কলঙ্ক লেপে দিছে আমার চাচা!

রহমত মেম্বার এখনো হিংস্র পশুর মতো তাকিয়ে আছে। তার মধ্যে কোনো অনুতাপ দেখা যাচ্ছে না। তিনি উল্টো মেঘ'কে থাপ্পড় দিয়ে ফেলে দেয়,

- চুপ কর অ'প'য়া! তোর মতো খা.....

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প