তূর্যে'র মাএ জ্ঞান ফিরেছে, সবাই এক এক করে দেখতে গিয়েছে কিন্তু মেঘ যায়নি, তার লজ্জা করছে ভিষণ। কিভাবে এই মুখ নিয়ে তার সামনে দাঁড়াবে এটাই ভাবছে, মানুষটা তো তার ভালো চেয়েছে কি সে না বুঝেই এতো এতো আঘাত করেছে। বৃষ্টি বেশ কয়েকবার ডেকে গিয়েছে কিন্তু মেঘ তবুও যায়নি। হঠাৎ ভেতরের কেবিন থেকে ভেসে আসে,
“পিচ্চি তুমি কি ভেতরে আসবে নাকি অন্য ব্যবস্থা করতে হবে? ট্রাস্ট মি এখন যদি আমি অসুস্থ না থাকতাম তাহলে জিজ্ঞেস করতাম না, ডিরেক্ট কোলে নিয়ে চলে আসতাম।
তবুও মেঘে'র কোনো রেসপন্স নেই। তূর্যে'র একটু রাগ হয়, মেয়েটা সেই তেড়া আছে এখনো। সে আবারও শীতল কণ্ঠে আওরায়,
“তিন পর্যন্ত ক্রাউন্ট করবো এর মধ্যে না আসলে আমি কিন্তু চলে আসবো?
এক.... দুই....
বাকিটা বলার আগেই মেঘ গুটি গুটি পায়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকে। মাথা নিচু করে তূর্যে'র সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তার হাতের ইশারায় সবাই কেবিন থেকে বেরিয়ে আসার উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। তূর্য খুব মনোযোগ দিয়ে মেঘে'র গালের দিকে তাকায়, গালে পাঁচ আগুলের ছাপ স্পষ্ট। মূহুর্তেই তূর্য বুঝে যায় এটা কে করতে পারে? তুষার মাএ দরজায় পা ফেলেছে ঠিক তখন তূর্যে'র কথায় থেমে যায়,
“তুষার এদিকে আয় তো?
তুষার নিঃশব্দে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
“আমার দিকে আরেকটু ঝুঁকে দাঁড়া।
তুষার বাধ্য ছেলের মতো একটু ঝুঁকে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে তূর্য তার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়, শরীর ব্যাথা থাকার কারনে খুব বেশি জোরে লাগেনি তবুও সকলেই ভয় পেয়ে যায়। তবে তুষার একটুও অবাক হয় না, সে জানতো এমন কিছু হবে। আফটার অল, ভাইয়ের ক'লি'জা'য় হাত দিয়েছে কিনা।
“শালা তুই কোন সাহসে আমার পিচ্চি'র গালে থাপ্পড় দিলি? ও কি তোর বউ? তুই যখন ইচ্ছে তখন থাপ্পড় দিবি।
মূহুর্তেই তুষার এক গাল হেসে বলে,
"তুমি চাইলে বিয়ে করতেই পারি।
তূর্য রাগী ফেস করে তাকাতেই তুষার শুকনো ঢুক গিলে মিনমিন স্বরে বলল,
"আ আ আরে ভাই আমি তো এমনি এমনি বলেছি। আর সবাই চলো চলো ভাইয়া ইন্টু মিন্টু করবে।
এক এক করে সবাই বেরিয়ে যায়। তুষার যাওয়ার আগে কেবিনের দরজা একটু টেনে দিয়ে যায়, যাতে বাহির থেকে কিছু দেখা না যায়। তারপর তূর্য এক হাত দিয়ে মেঘ'কে আরো নিজের দিকে টেনে নেয়। মেঘ কাঙ্ক্ষিত স্পর্শে একটু কেঁপে ওঠে, পরক্ষনেই সামলে নেয়। তূর্য তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে আওরায়...
“মানলাম আমাকে ভালোবাসো না, তাই বলে একটু দেখতেও আসবে না?
..........?
“আমি মরে গেলে অনেক খুশি হতে পিচ্চি!
তূর্যে'র কথায় মেঘ আঁতকে উঠল। সে ছলছল নয়নে তাকিয়ে রয়, অবাধ্য চোখ থেকে অশ্রু পড়তেই আছে, থামার কোনো রেশ নেই। মেঘ চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে, মানুষ কতটা কষ্ট পেলে নিজের মৃত্যুর কথা মুখ ফুটে বলে।
“পিচ্চি!
তবুও মেঘ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
“ভালোবাসো না বলে একটু কথাও বলতে পারবে না? বুঝতে পারছি তোমার এখন আমার সাথে কথা ভালো লাগছে না। তুমি বলে ছিলে না ঢাকায় ফিরে আসার পর আমাদের সম্পর্কের ইতি টানবে, তাহলে.....
মেঘ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। বুকের ভেতর জমে থাকা অপরাধবোধ আর অনুশোচনার ভার আর সামলাতে পারল না। হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠল সে। কান্নার শব্দে রুমটা যেন আরও নিঃশব্দ হয়ে গেল। ভাঙা, অসহায় কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো তার কথা—
"সরি… আমি সত্যি সত্যি বুঝতে পারিনি আপনি আমাকে এতো এতো এতো ভালোবাসেন। আমি ভেবেছিলাম আপনি শুধু আমার রূপ-সৌন্দর্যে মোহে পড়েছিলেন। আমাকে ক্ষমা করে দিন, এমন ভুল আর কোনোদিন হবে না… প্রমিজ!
বেডে শুয়ে থাকা তূর্য ধীরে ধীরে নড়েচড়ে উঠল। বুকের ভেতর এখনো তীব্র ব্যথা, প্রতিটা নিঃশ্বাস যেন আগুনের মতো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তবুও সে ব্যথার কোনো ছাপ মেঘে'র চোখে পড়তে দিল না। একটু উঁচু হয়ে আধা শোয়া অবস্থায় বসে, গাল ফুলিয়ে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“আমি এতো এতো এতে ভালোবাসলে কী হবে? যাকে ভালোবাসি, সে তো আমাকে দেখতেই পারে না। তাই তো সে মাথা নিচু করে থাকে। আমার মতো কাইলা ইঁদুরকে দেখলে আবার যদি তার সৌন্দর্য কমে যায়
ততক্ষণে মেঘ চোখ তুলে তাকায়। তূর্য তখন অন্য দিকে তাকিয়ে আছে, আবারও অভিমানী কণ্ঠে বলে উঠল সে—
“থাক, আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। আমি তো কাইলা। কাইলা মানুষদের কপালে সুন্দর বউ জোটে না। তাই তো সে ‘ভালোবাসি’ বলেও না।
তূর্যের' ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাকানি দেখে মেঘে'র কান্নার মাঝেই হালকা হাসি ফুটে উঠল। চোখ ভিজে থাকলেও মুখে একটা মুচকি হাসি লুকোতে পারল না সে। ধীরে ধীরে একটু ঝুঁকে এসে তূর্যে'র কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
"ভালোবাসি, কাইলা ইঁদুর! আপনাকে অনেক, অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি।
তূর্য হঠাৎ তার দিকে তাকাল। মেঘ লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল, গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। তূর্য এক টানে তাকে নিজের পাশে বসিয়ে নিল।
“কী বললে? —চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করল সে।
মেঘ আবারও ফিসফিস করেই বলল,
"ভালোবাসি…
“শুনতে পেলাম না। আবার বলো? —তূর্য ঠোঁটে দুষ্টু হাসি চেপে বলল।
“ভালোবাসি আপনাকে!
“কী বলছো? এখনো তো কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। আরেকটু জোরে বলো?
"বললাম তো, ভালোবাসি!
“কিহহহহ?
এইবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না মেঘ। রাগে-লজ্জায় তূর্য'কে হালকা একটা ধাক্কা দিতেই ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল তূর্য,
“আউচ...ব্যথা পেলাম তো!
মেঘ মুহূর্তেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সব অভিমান উধাও। চোখ বড় বড় করে তাড়াতাড়ি তার দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল,
"সরি, সরি… আমি বুঝতে পারিনি। খুব ব্যথা পেয়েছেন? বেশি লাগেনি তো?
“ব্যথা দিয়ে এখন বলছো ব্যথা লাগেনি তো? আসো আমিও তোমাকে ব্যথা দিয়ে বলি ব্যথা লেগেনি তো জান!
তূর্য মুখ বাকিয়ে বলল। তা দেখে মেঘ খিলখিল করে হেঁসে দেয়। তার হাসি দেখে তূর্য মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিজের প্রেয়সী'র দিকে। চোখ ফেরাতে পারে না সে, এই মেয়েটা তার কতটা আপন, কতটা গভীরভাবে ভালোবাসে তাকে, তা হয়তো নিজেও ঠিক করে মেপে উঠতে পারে না। মেঘ বিষয়টা টের পেয়ে নিজের হাসি থামিয়ে তূর্যে'র দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
"ওভাবে তাকিয়ে কী দেখেন?
তূর্য ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে নেয়। চোখে তখন দুষ্টুমি আর গভীর মমতার অদ্ভুত মিশেল।
“ভাবছি… আমার পিচ্চি কতো বড় হয়ে গেছে। এখন তো সে আমার বেবি'র মাম্মাহ্ হওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট, তাই না?
মেঘে'র গালে লাজুক লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ে। চোখ নামিয়ে নেয় সে। তারপর ধীর, একটু অভিমান মাখানো কণ্ঠে বলে ওঠে—
"আচ্ছা আপনি আগে কেন বলেন নি যে আপনি আমাকে ছোট থেকেই ভালোবাসেন?
তূর্য চমকে তাকায়। চোখ দুটো বড় হয়ে যায়, যেন প্রশ্নটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না।
“পিচ্চি, তোমার মাথায় কোনো প্রব্লেম হয়েছে নাকি? আমি তোমাকে ছোট থেকে কীভাবে ভালোবাসবো, হুম?
মেঘ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
"হয়েছে, হয়েছে। আর ঢং করতে হবে না। তুষার আমাকে সব বলেছে।
“ওহ, তার মানে তুষার সব বলে দিয়েছে বলেই এখন আমাকে ‘ভালোবাসি’ বললে? লাগবে না তোমাকে, চলে যাও। আমি এই পিচ্চিকে চাই না।
ততক্ষণে মেঘ তার বাহু জরিয়ে ধরে।
"এহ্, বললেই হলো? আমি যাবো না। কী করবেন আপনি হ্যাঁ?
তূর্যের চোখে তখন দুষ্ট হাসি।
“চুমু দেবো!
মেঘ তৎক্ষণাৎ চোখ বড় করে তাকায়।
"আপনি কি ভালো হবেন না? আর বলুন তো, কেন আমাকে রেখে চলে গেলেন? তখন একটু আগলে রাখলে কী হতো?
এইবার তূর্য আর হাসে না। বরং মেঘকে বুকে টেনে নিয়ে নরম কণ্ঠে বলে—
“তখন যদি আমি চলে না যেতাম, তাহলে তোমার সমান আমার দু-চারটা ছাওয়াল থাকতো। ওই ছাওয়ালদের চক্করে আমি আমার বউ'টাকেই হারাতাম। আর বউ হারালে… এখন আমার কী হতো বলো তো? কে আমাকে ইন্টু-মিন্টু করতে দিতো, হুম? কে আমার বুকে ঘুমিয়ে থাকতো।
মেঘ কিছু বলার আগেই তূর্য এক হাত দিয়ে তাকে নিজের বুকের ভেতর আরও শক্ত করে টেনে নেয়। মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলে,
“জানো, তখন আমি এতটাই বেপরোয়া ছিলাম যে, ঘুমের ঘোরেও বউ হওয়ার আগেই তোমারকে চুমু-টুমু দিয়ে ফেলতাম।
মেঘে'র চোখ কপালে ওঠে।
"কিহহহহহ! বজ্জাত লোক, আপনি আগে থেকেই লুচু ছিলেন? আমি থাকবো না, চলে যাবো। সব শেষ হয়ে গেল আমার! মামনি, তোমার ছেলেকে দেখো, কেমন পাঁজি ছিল।
তূর্য মেঘে'র কপালে আলতো ঠোঁটের পরশ এঁকে দিয়ে শিশু সুলভ ভঙ্গিতে আওরায়,
“কখনো আমাকে ছেড়ে যেও না পিচ্চি! তুমিহীনা বাঁচতে পারবো না, মরে যাবো আমি। অনেক ভালোবাসি তোমায়... ভুল হলে শাস্তি দিয়ো,শাসন করো তবুও আমাকে নিঃস্ব করে যেও না!
"আমি তো এমনি এমনি বললাম?
“এমনি এমনিও তোমাকে হারাতে চাই না। একমাত্র মৃত্যু যেন আমাদের আলাদা করে!
তূর্য হঠাৎ চারপাশে তাকিয়ে একটু অবাক গলায় বলে ওঠে—
“আচ্ছা শোনো না সবাই তো আসলো। কিন্তু বড় আব্বু আসলো না কেন?
তূর্য মৃদু কণ্ঠে উত্তর দেয়,
"বড় বাবাই তো দু’দিন আগেই বিজনেসের কাজে লন্ডন গিয়েছে। আর হ্যাঁ, একটা কথা… আপনার ফোনে আয়ান নামে একজন ফোন দিয়েছিল। কিন্তু এই আয়ান আবার কে?
মেঘ কপাল কুঁচকে একটু ভাবার চেষ্টা করে। তূর্য হেসে ওঠে, আদুরে গলায় বলে,
“যাহ্ বাবা! পিচ্চি, ইদানীং তোমার ভুলে যাওয়ার রোগ হলো নাকি? আয়ান তোমার ভাসুর হয়, বড় আব্বুর ছেলে, তোমার সেই আয়ান ভাইয়া। মনে আছে? যার কাঁধে চড়ে তুমি পুরো গ্রাম ঘুরে বেড়াতে।
মেঘ লজ্জা আর বিস্ময় মিশ্রিত হাসি হেসে বলে,
"ওহ্! মনেই ছিল না। আচ্ছা, ভাইয়া দেশে আসে না কেন? আমি এ বাড়িতে আসার পর একদিনও তো তাকে দেখতে পাইনি।
তূর্যের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। চোখে একরাশ ভার জমে ওঠে।
“মনে হয় না আসবে।
মেঘ আঁতকে ওঠে।
"কেন?
তূর্য দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরের জমে থাকা কথাগুলো যেন ভারী হয়ে ওঠে।
“ভাইয়া একটা মেয়েকে ভালোবাসতো। মেয়েটা নাকি অনেক ছোট ছিল তখন। সে কাকে ভালোবাসতো, এই কথাটা শুধু বড় আব্বু আর দাদিজান জানে। আমি অনেকবার জানতে চেয়েছি, কিন্তু কেউ কিছু বলেনি। শুনেছি সেই মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইয়া তাকে নিজের মন থেকে মুছতে পারছে না বলেই অভিমান করে দূরে সরে আছে।
মেঘে'র চোখ ভিজে ওঠে।
"ভাইয়ার অনেক কষ্ট হচ্ছে, তাই না?
তূর্য মাথা নেড়ে বলে—
“হ্যাঁ। বড় আম্মু তাকে না দেখেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল… সেই শোক সে সহ্য করতে পারেনি। তার ওপর আবার সেই মেয়েটার কথা। সব মিলিয়ে নিজেকে আর সামলাতে পারছে না। আচ্ছা শোনো না… আমার কেমন যেন লাগছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। তুষার'কে ডক্টরের সাথে কথা বলতে বলো। আমাকে ডিসচার্জ দিতে বলো। বাকি সেবা আমি আমার বউয়ের তুলতুলে হাত থেকেই নিতে চাই। এখানে আর ভালো লাগছে না।
মেঘ লজ্জায় পুরো মুখ লাল টুকটুকে হয়ে উঠে! সে কিছু বলে না, শুধু মাথা নেড়ে সায় দেয়।