শীতের সকালের নরম ও কাঁপুনি ধরানো ঠান্ডা মৃদু বাতাস জানালার ফাঁক গলে এসে মুখে লাগতেই অজান্তেই কম্বলের ভেতর আরও গুটিয়ে যায় মেঘ! শীত তার কোনোদিনই পছন্দ ছিল না। এই ঋতু এলেই যেন শরীরটা ভারী হয়ে যায়, না উঠতে ইচ্ছে করে, না কিছু খেতে মন চায়। কম্বলের উষ্ণতার ভেতর নিজেকে লুকিয়ে রাখতেই তার বেশি স্বস্তি। রুমের বাইরে ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। দূরের গাছগুলো থেকে ভেসে আসছে ছোট্ট ছোট্ট পাখিদের কিচিরমিচির। অন্য দিন হলে এই শব্দে তার মনটা হালকা হয়ে যেত, কিন্তু আজ অদ্ভুতভাবে বিরক্ত লাগছে। যেন এই শান্ত সকালও আজ তাকে অস্থির করে তুলছে।
ঠিক তখনই হঠাৎ এক উষ্ণ আলিঙ্গনের ছোঁয়া পেয়ে সে আরও কাছে সরে আসে। অজান্তেই ঠান্ডা পা দুটো পাশে শুয়ে থাকা লোকটির পায়ের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়।
শরীরজুড়ে মূহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে উষ্ণতা। মুহূর্তটায় বেশ ভালোই লাগছিল তার, কিন্তু পরক্ষণেই পরিচিত এক ঘ্রাণ নাকে আসতেই সে থমকে যায়। এই ঘ্রাণ সে চেনে, ধীরে ধীরে পা সরিয়ে নেয় মেঘ। মুখ থেকে কম্বলটা নামিয়ে পিটপিট করে তাকায় পাশের দিকে। আধো আলো-আঁধারিতে যে মুখটা ধরা দেয়, সেটি এতটাই চেনা যে এক ঝলকেই বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে।
তূর্য তার দিকে হালকা ঝুঁকে আছে। চোখ দুটো একদৃষ্টিতে মেঘে র মুখের দিকে স্থির, যেন পলক ফেলতেও ভুলে গেছে। তার দৃষ্টিতে কোনো কথা নেই, তবুও মনে হচ্ছে, সে অনেক কিছুই বলছে। একটা অদ্ভুত ঘোর, নিঃশব্দ আবেশ তার চোখজুড়ে।
মেঘ কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই এক উষ্ণ হাত তার কোমর ঘিরে ধরে, অল্প টানেই তাকে নিজের বুকের গভীরে টেনে নেয় তূর্য। মুহূর্তের ভেতরেই মেঘ যেন শীতের অস্তিত্ব ভুলে যায়। তূর্যের বুকের উষ্ণতা, তার নিঃশ্বাসের ছন্দ, এই আলিঙ্গনের ভেতরেই সে নিরাপদ। তূর্যে'র মন চাইছিল তাকে আরও ভেতরে লুকিয়ে রাখতে। এমনভাবে আগলে রাখতে, যেন শীত নামের কোনো কিছুরই সাহস না হয় মেঘ'কে ছুঁতে। কিন্তু বাস্তবের সীমারেখা সে জানে। তাই সেই অসম্ভব চাওয়াটুকু গোপন করে, নিজের বুকের ভেতর যতটা সম্ভব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে। এবং কোমল কণ্ঠে তূর্য ফিসফিস করে বলে—
“পিচ্চি! তোমার ঠান্ডা পা দুটো আবার আমার পায়ের ভেতর রাখো। দেখবে, শীত আর লাগবে না।
মেঘ কোনো কথা বলে না। বাধ্য মেয়ের মতো তাই করে। তার পা বরাবরই ঠান্ডা, শীত যায়, গ্রীষ্ম আসে, তবু সেই ঠান্ডা কাঁটে না। এই নিয়েই কতবার বৃষ্টি'র বকুনি শুনেছে। অথচ আজ সেই মানুষটাই তাকে উষ্ণতার চাদরে মুড়িয়ে রাখতে চাইছে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই। এই ছোট ছোট যত্ন—নিঃশব্দ আবদার, অদৃশ্য কেয়ার, এইসবের মধ্যেই মেঘ ভালোবাসা খুঁজে পায়। তার কাছে ভালোবাসা মানে বড় কিছু নয়। বোঝার মতো একজন মানুষ থাকলেই যথেষ্ট।
তূর্য ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনে মেঘে'র গলার কাছে। কোনো তাড়া নেই, কোনো হঠকারিতা নেই, শুধু নিঃশ্বাসের উষ্ণ ছোঁয়া। মেঘ হঠাৎই ছটফটিয়ে ওঠে, বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। তা দেখে তূর্য মুচকি হাসে। আরও ধীর ও গভীর স্বরে বলল,
“এইটুকু স্পর্শেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে গভীর স্পর্শে কি হবে শুনি?
মেঘ লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। মুহূর্তেই তার সুন্দর মুখটা লাল আভায় ঢেকে যায়, ঠিক ভোরের আলোয় রাঙা রক্ত জবা ফুলের মতো। সেই দৃশ্য দেখে তূর্যে'র চোখে নরম দুষ্টুমি ঝিলমিল করে ওঠে। সে হাসতে হাসতে বলে,
“একদম পারফেক্ট, এখন সত্যি সত্যিই নতুন বউ'য়ের মতো লাগছে। মিসেস তূর্য চৌধুরী! ইসস…কী কিউট আমার কুইন। লাল টমেটোর মতো।
মেঘ আর কিছু বলতে পারে না। শুধু তার বুকের কাছে নিজেকে আরও একটু গুটিয়ে নেয়।
মেঘে'র কানের কাছে আবারও তূর্যের কণ্ঠটা দুষ্টু ভঙ্গিতে প্রতিধ্বনিত হয়—
“কি ম্যাডাম, আমাকে মার্ডার না করে ছাড়বেন না দেখছি! এমন চলতে থাকলে কিন্তু শেষমেশ আপনারই ক্ষতি হবে। আফটার অল…আমাকে নির্লজ্জ উপাধি দিয়েছেন বলে কথা।
কথাগুলো কানে যেতেই মেঘ যেন বিদ্যুৎ ছুঁয়ে যায়। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ধরফর করে উঠে বসে। বুকের ভেতরটা ধকধক করতে থাকে, মুখটা আগুনের মতো জ্বলছে। তাড়াহুড়ো করে বেড থেকে নামতে গিয়ে একবার হোঁচট খায়—তবু পেছনে ফিরে তাকানোর সাহস পায় না। লজ্জা আর অস্থিরতায় এক দৌড়ে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে পড়ে, দরজাটা বন্ধ করে দেয় ভেতর থেকে।
মনে হয়, অন্তত এখানে এসে একটু স্বস্তি পাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে গভীর শ্বাস নেয়। নিজের কান, গাল, সব লাল হয়ে আছে। নিজের এই অবস্থা দেখে সে নিজেই লজ্জা লাগছে।
অন্যদিকে, তূর্য বিছানায় বসে তার চলে যাওয়ার দৃশ্যটা নীরবে দেখছিল। ঠোঁটের কোণে আপনা আপনি একটা মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। এতটা আপন, এতটা কাছের হয়েও মেয়েটা এখনও এমনভাবে লজ্জা পায়, অবশ্য এই ব্যাপারটাই তার কাছে ভীষণ প্রিয়।
তূর্য জানে, এই লজ্জা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটা ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। প্রেয়সী'র সেই লাজুক চোখ, তড়িঘড়ি পালিয়ে যাওয়া, আর না বলা অনুভূতিগুলো, সব মিলিয়ে তার হৃদয়ের কোথাও এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।
সে হালকা গলায় নিজের মনেই বলে ওঠে,
“এই লজ্জাবতী পুরোপুরি কবে আমার হবে!
শীতের সকালটা তখন আরও উষ্ণ হয়ে ওঠে, ভালোবাসার নীরব হাসিতে, আর দরজার ওপারে লুকিয়ে থাকা এক লাজুক হৃদয়ের স্পন্দনে।
কিছু সময় পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে মেঘ। ভোরের নরম আলোয় ভেজা চুল, মুখে পানি ছিটানোর সতেজতা তাকে দেখেই রীতিমতো আঁতকে ওঠে তূর্য।
এই কাকভোরে শাওয়ার?
কেন?
প্রশ্নটা যেন তূর্যে'র মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। সারারাত ঠিকঠাকই তো কেটেছে, তার জানা মতে অন্তত। তাহলে হঠাৎ সকাল সকাল শাওয়ার নেওয়ার কারণ কী? ভাবতে ভাবতেই সে ধীরে ধীরে মেঘের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মেঘ প্রথমে বিষয়টা পাত্তা দেয় না। পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তূর্য আবার সামনে এসে দাঁড়ায়।
একবার…
দু’বার…
তিনবার…
শেষমেশ মেঘে'র ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে গলা চড়িয়ে বলে ওঠে,
"প্রব্লেম কী আপনার? এদিক ওদিক করছেন কেন?
তূর্য তখনো আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে। কী বলবে, কীভাবে বলবে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তার দৃষ্টির ভাষা মেঘে'র কাছে মোটেই স্বস্তিকর লাগে না। উল্টো মেজাজ আরো বিগড়ে যায়।
"বুঝলাম না, এভাবে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছেন কেন? আমাকে কি শেওড়া গাছের পেত্নীর মতো লাগছে নাকি?
এই বলে সে পাশের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি ভালো করে পরখ করে। চুল ঠিক আছে, চোখে মুখে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। সবই তো স্বাভাবিক। তবু তূর্যে'র এই অদ্ভুত তাকিয়ে থাকা তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে।
“আরে কথা তো বলুন!
তার গলায় এবার স্পষ্ট বিরক্তি।
কিন্তু তূর্য নড়েও না। একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মেঘ অতিষ্ঠ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য এক পা এগিয়ে দেয়। ঠিক তখনই তূর্য হঠাৎ তার হাত আঁকড়ে ধরে। মেঘ কিছু বলার আগেই তূর্য তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে,
“পিচ্চি…আমার জানা মতে কাল রাতে আমাদের মধ্যে তো কিছুই হয়নি। তাহলে সকাল সকাল শাওয়ার কেন? নাকি সত্যি সত্যি ফরজ গোসল দিতে চাচ্ছো, কিন্তু আমাকে মুখ ফুটে বলতে পারছো না?
মুহূর্তের মধ্যে মেঘ হা হয়ে তাকিয়ে থাকে। এক সেকেন্ড…দুই সেকেন্ড…তারপর দাঁত কেঁচিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে।
"নির্লজ্জ লোক! আমি সকাল সকাল এমনিতেই রোজ শাওয়ার নেই। না নিলে মাথা ব্যথা করে। আর আপনি কিনা সকাল সকাল ইন্দুের মতো আজেবাজে কথা বলছেন! বলি, সকাল সকালনেশা করেছেন নাকি?
মেঘ হাত ছাড়িয়ে নিতে যায়, কিন্তু তার আগেই তূর্য আচমকা তাকে নিজের বাহুতে আবদ্ধ করে নেয় এবং আধো আধো কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে—
“একদম ঠিক বলেছো পিচ্চি! আমি এই বউ নামক নেশায় নেশাক্ত হতে চাই, ঠিক এতোটাই নেশাক্ত যে তখন নিজেকে পাগল পাগল লাগবে। কিন্তু আমার পিচ্চি কি সেসব বুঝে? নাকি আরো ভালো করে বুঝিয়ে দিতে হবে শুনি?
"মামনি, আসছি…
মেঘ কথাটা বলেই নিজেকে তূর্যে'র হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সে দৌড়ে সরে যায়, যেন ধরা না পড়াই তার একমাত্র লক্ষ্য। তূর্য তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দ একটা হাসি ফুটে ওঠে।
নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে,
“আর কত পালাই পালাই করবে পিচ্চি? রাত নামলেই তো এই মানুষটার আলিঙ্গনেই এসে ধরা দিতে হবে!
তূর্য সিঁড়ি বেয়ে হেলেদুলে নিচে নামছিল। হঠাৎই ড্রয়িংরুমের দিকে চোখ পড়তেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। সামনের দৃশ্যটা যেন অস্বস্তির। রেখা চৌধুরীর সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তুষার। তার ভঙ্গি বলছে, বকাঝকার মাঝখানেই আটকে আছে সে। রেখা চৌধুরীর মুখভঙ্গি কড়া, চোখে স্পষ্ট আগুনের ঝিলিক। কী কারণে তিনি এমন রাগান্বিত, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
তূর্য ধীরে ধীরে মেঘে'র পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। একটু ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলে—
“পিচ্চি, আম্মু হঠাৎ তুষার'কে বকছে কেন?
মেঘ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে উত্তর দেয়,
"হুসস! চুপ করে থাকুন, আমিও জানি না। তাই তো দেখতে এসেছি।
ড্রয়িংরুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। রেখা চৌধুরী রাগ চেপে রাখতে পারছেন না। হঠাৎই গলা উঁচু করে তুষারের দিকে তাকিয়ে বলেন,
–ফাজলামো করিস আমার সঙ্গে? তোকে আগেই বলে দিয়েছি, তোর পছন্দের মেয়ের সঙ্গে আমি কোনোভাবেই বিয়ে দেবো না। তুই ডিরেক্ট গিয়ে ও মেয়েটাকে বলে দে, তুই তাকে বিয়ে করতে পারবি না।
তুষার মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকায়। কণ্ঠে কাঁপুনি থাকলেও দৃঢ়তা স্পষ্ট।
"আম্মু, আমি ওকে ভালোবাসি। নিজের থেকেও বেশি। আর তুমি বলছো ওকে বিয়ে করবো না? এটা আমি পারবো না।
–এখন তোর কথা আমাকে মানতে হবে?
তুষার এক ধাপ এগিয়ে আসে এবং রেখা চৌধুরী'র হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
"আম্মু, কেন বুঝতে পারছো না? ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। ও আমার জীবনে হুট করে আসেনি, আমি ওকে নিজের জীবনে নিয়ে এসেছি। আর এখন তুমি বলছো ওকে ভুলে যেতে! এটা কি আদৌ সম্ভব?
রেখা চৌধুরী বড় বড় করে শ্বাস নেন। নিজেকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা।
–আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। আমি তোকে আগেই বলেছি, তোর জন্য আমি মেয়ে ঠিক করে রেখেছি। ওই মেয়ের সাথেই তোর বিয়ে হবে, এটা ফাইনাল।
তুষারের চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।
"আম্মু, তুমি কি ওই বেয়াদব মেয়েটাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিতে চাও? আমি তাকে বিয়ে করবো না, মানে করবো না। আমি যাকে ভালোবাসি তাকেই বিয়ে করবো, নয়তো…
রেখা চৌধুরীর চোখ সরু হয়ে আসে।
–নয়তো…? তুই কি আমাকে থ্রেট দিচ্ছিস?
তুষার গলা নরম করে বলে,
"আম্মু, একবার শুধু আমার কথা শোনো। ওর সঙ্গে পরিচয় হও। দেখবে, তোমার ছেলেকে একমাত্র সেই-ই সত্যিকারের ভালো রাখতে পারবে। আম্মু, তোমার ছেলে এতটা খারাপ না যে তার পছন্দ জঘন্য হবে।
হঠাৎ রেখা চৌধুরী ঠোঁটে ঠাণ্ডা একটা হাসি টেনে বলেন,
–চুপ কর। তোর রুচি কেমন, সেটা আমাকে আলাদা করে বোঝাতে হবে না। আমি যা বলবো, তাই হবে।
এই মুহূর্তে তুষারে'র চোখ অনিচ্ছাসত্ত্বেও অন্যদিকে চলে যায়। কিচেন রুমের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টি। তার চোখে জমে আছে অশ্রু, চোখদুটো জলমল করছে। হয়তো রেখা চৌধুরী'র কথাগুলো তার বুকের ভেতরটা চূর্ণ করে দিয়েছে। তুষারে'র সঙ্গে চোখাচোখি হতেই বৃষ্টি দ্রুত মাথা নিচু করে নেয়।
তুষার চোখ ফিরিয়ে নেয়। কণ্ঠ নীচু, কিন্তু ভীষণ ভারী।
"তোমার ছেলের পছন্দের কোনো দাম নেই তোমার কাছে, আম্মু?
হঠাৎ তূর্য এক পা এগিয়ে আসতেই রেখা চৌধুরী বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলেন।
–তুমি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো। ছোট ভাইয়ের হয়ে সাফাই গাইতে হবে না তোমাকে। আমি যাকে ছোট ছেলের বউ করে আনতে চেয়েছি, তাকেই আনবো। আমার কথার বিন্দুমাত্র নড়চড় হবে না।
তাঁর চোখেমুখে এমন এক দৃঢ়তা, যেন সিদ্ধান্তটা বহু আগেই পাথরে খোদাই করা। তূর্য কিছু বলার আগেই সে আবারও বললেন—
–আমি মা। আমি জানি আমার ছেলের সুখ কোথায়। তোমরা আমার থেকে বেশি বড় হয়ে যাওনি কেউ!
তূর্য আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্বরে বলে উঠল—
“আম্মু, তুমি বাচ্চাদের মতো কথা বলছো কেন? যাকে তুষার ভালোবাসে না, তার সঙ্গে কিভাবে সংসার করবে ও? জোর করে চাপিয়ে দিলে কি সুখ পাওয়া যায়?
রেখা চৌধুরীর মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠল। চোখের চাহনিতে একফোঁটা নরমভাবও নেই।
–এই বিষয় নিয়ে আমি আর কোনো মতামত শুনবো না। আগামী সপ্তাহেই তোমার আর মেঘে'র বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে তুষারের বিয়েও হবে, আমার পছন্দ করা মেয়েটার সাথে। আমার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। আবেগ দিয়ে কখনো দুনিয়া চলে না, পারলে এটা নিজের ভাইকে বুঝাও।
কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। গটগট করে চলে গেলেন রেখা চৌধুরী। তাঁর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই রুমটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তূর্য ধীরে ধীরে তুষারে'র দিকে এগিয়ে গেল। বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা। কিন্তু তুষার আগেই ফেটে পড়ল,
"ভাই, প্লিজ আম্মুকে থামাও। এটা আমার কোনো জেদ না, কোনো হঠকারিতা না। আমি বুড়ি'কে সত্যিই অনেক ভালোবাসি। আম্মু যদি এমন পাগলামি করে, তাহলে আমাকে কোনোদিন খুঁজে পাবে না তোমরা।
চোখের কোণে জমে থাকা কষ্ট আর ক্ষোভ আর লুকানো নেই। তূর্য কিছু বলার আগেই তুষার বড় বড় পা ফেলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।
যাই হোক না কেন, সে জানে—
নিজের ভালোবাসাকে সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। ভাঙা বুক, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর নিষিদ্ধ ভালোবাসা নিয়েই হোক, তবুও সে তার ভালোবাসার পথ থেকে সরে আসবে না।