বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ২১

🟢

রহমত মেম্বার এখনো হিংস্র পশুর মতো তাকিয়ে আছে। তার মধ্যে কোনো অনুতাপ দেখা যাচ্ছে না। তিনি উল্টো মেঘ'কে থাপ্পড় দিয়ে ফেলে দেয়,

- চুপ কর অ'প'য়া! তোর মতো খা* ব্যা* বাচ্চার মুখ থাইকা চাচা ডাক হুনবার চাই নাই আমি।

সঙ্গে সঙ্গে তূর্য গর্জন দিয়ে তার দিকে হাত তুলে আবার নামিয়ে নেয়।

“চাচাজান....! সম্পর্কে আপনি আমার বড় না হলে আপনাকে দেখিয়ে দিতাম তূর্য চৌধুরী'র বউ'কে অপমান করার শাস্তি কতটা ভয়ংকর হয়।

রহমত মেম্বার কর্কশ কন্ঠে বলে উঠল,

- তূর্য…

তূর্য চোখ তুলে তাকাল, কণ্ঠে বরফশীতল দৃঢ়তা।

“চিৎকার করবেন না চাচাজান। চিৎকার করলেই কোনো সত্য কখনো মিথ্যা হয়ে যায় না। আপনি বলুন, পিচ্চি'কে কলঙ্কিত করার পেছনে আপনার হাত নেই? ওর বাবাকে আপনি নির্মমভাবে মেরে ফেলেননি? ওর মাকে ঘরের ভেতর আটকে রেখে আগুন জ্বালিয়ে দেননি? সেই দিন পিচ্চি'কে রাক্ষসগুলোর মুখে ছেড়ে দেননি? কথা বলছেন না কেন? কথা বলুন। চুপ করে আছেন কেন?

মেঘ হঠাৎ তূর্যে'র হাত ছাড়িয়ে আবার ছুটে গেল রহমত মেম্বারের কাছে। কাঁপা গলায় তার হাত চেপে ধরে বলল,

"চাচা… ও চাচা, আপনি বলুন ওনি সব মিথ্যা বলছে, তাই না? সব মিথ্যা! আপনি কাউকে মারেন না… আমি ভুল করছি, আমাকে মাফ করে দেন। তবুও বলেন, সবকিছু মিথ্যা, প্লিজ বলেন আমি কেনোদিন এমন পশুর মতো নিকৃষ্ট কাজ করতে পারেন না।

রহমত মেম্বার হঠাৎ করে আত্ম চিৎকার দিয়ে বলে,

- হ… হ… হ! আমিই সব করছি। সব সত্য কথা, আমি আমার ভাইকে মাইরা ফালাইছি। সব দোষ আমার, সব দোষ আমার! কালু যা কইছে সব সত্য। তোরে ওই নরকের মুখে আমিই ঠাইলা দিছি। সেইদিনের সব কিছুর লিগা আমি দায়ী, শুধু আমি।

কথাগুলো কুম্ভকর্ণের মতো মেঘে'র কানে আছড়ে পড়তে লাগল। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। হোঁচট খেয়ে সে পড়ে যেতে নিলে তূর্য ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরে ফেলল। মেঘ তূর্যের শার্ট আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল,

"আপনি কেন এই সত্যগুলো খুঁজে বের করলেন? আমি এই কষ্ট কেমনে সহ্য করুম? আমার বাবা-মার, আমার ধ্বংসের পেছনে আমার নিজের চাচার হাত! যে আমাকে আদর-যত্ন করে বড় করেছে, সেই চাচাই এতো নিষ্ঠুর কাজ করলো?

“পিচ্চি নিজেকে সামলাও, নিজের ধ্বংসের পেছনে আপন জনের হাতই বেশি থাকে। কথাটা তিক্ত হলেও এটাই সত্য, তোমার চাচা শুধু তোমার বাবা মা'কে মেরে ক্ষান্ত হয়নি, তোমাকেও মেরে ফেলতে চেয়েছিল। সেইদিনের আগুনে আল্লাহর রহমতে তুমি বেঁচে থাকলেও তোমার মা বাঁচতে পারেনি।

এরপর আবারও তোমার উপর এট্রাক করতে চেয়েছিল কিন্তু তোমার বাবা নিজের সব জায়গা জমি তোমার নামে লিখে দেয়ায় সেটা পারেনি। দলিলে একটা শর্ত ছিল, হয়তো তোমার বাবা আগেই বুঝতে পারেছিল তার মেয়ের কাছে সে খুব বেশি দিন থাকতে পারবে না। সেখানে লেখা ছিল, আঠারো বছরের আগে যদি তোমার মৃত্যু হয়, তাহলে সব জায়গা জমি মসজিদের নামে চলে যাবে। তোমাকে মারতে না পেরে, তোমার গায়ে কলঙ্ক লাগিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। এমনকি এসব সত্য ঘটনা বের করার জন্য ওনি আমাকে আর তুষার'কেও মারতে চেয়েছিল। কিন্তু বারবার বার্থ হয়েছে, আজ আমাকে শুট করেছিল তবে গুলিটা লাগেনি। কিন্তু হাতে ছুরির আঘাত দিয়েছে।

মেঘ মাথা চেপে ধরে আছে। একটা মানুষ কতটা নিকৃষ্ট হলে এমন কাজ করে। তূর্য রহমত মেম্বারের দিকে তাকিয়ে তাতছিল্ল্য হেসে বলে,

“চাচাজান! আপনি অনেক সাবধানে সব করেছেন তবে এর মাঝে দু'টো ভুল করেছেন। প্রথম ভুল, সেই আমাকে নিজের রিভেলভার দেখিয়ে। আর সেকেন্ড ভুল, আমার বউ'য়ের ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে আমাকেই মারতে গিয়েছিলেন। একটা কথা জানেন কি, পাপ যতই লুকিয়ে রাখতে যান না কেন? পাপের প্রমান কোনো কোনো ভাবে রেখে যাবেন।

তূর্য গ্রামের উদ্দেশ্য আবারও বলে,

“এবার দেখলেন তো আসল দোষী কারা? প্লিজ এর পর থেকে একটা মেয়ের সব কিছু না জেনে এমন ভুল আর করবেন না। পিচ্চি আর পিচ্চি'র মাকে আপনাদের মেম্বার মিথ্যা কলঙ্ক দিয়েছিল। শুধু মাএ আপনাদের জন্য আমার পিচ্চি এতো গুলো বছর কষ্ট পেয়েছে। তবে আপনাদের থেকেজ হাজার গুন কষ্ট আমি নিজের অজান্তেই দিয়ে ফেলেছি। আপনারা এবার আমার বউ'টাকে মিথ্যা অপবাদ থেকে রেহায় দিন।

গ্রামবাসী সবাই মাথা নিচু করে মেঘে'র কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। তাদের ভুল তারা বুঝতে পেরেছে, জামেলা খাতুন, জারা সবাই কাঁদছে। সামান্য জমির জন্য একটা মানুষ এতোটা নিচু হতে পারে কারো জানা ছিল না। জামেলা খাতুন মাথা নিচু করে নিজের ঘরে চলে যান। সবাই নিজের ভুলের অনুতপ্ত হলেও আসল দোষী অনুতপ্ত নয়। তার মুখে অনুশোচনার রেশ নেই বললেই চলে, তার মুখে এখন পৈশাচিক হাসি। রহমত মেম্বার ধীরে ধীরে তূর্যে'র সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়।

- একটা খুন করলেও যে শাস্তি, দশটা খুন করলেও সেই একই শাস্তি। সব যখন ফাঁস হয়েই গেছে, তখন তোকে বাঁচিয়ে রেখে কী করবো? এই হাত দিয়েই নিজের ভাইকে খুন করেছি, তাতেই হাত কাঁপেনি। আর তোকে খুন করা তো কোনো ব্যাপারই না।

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই চাদরের নিচে লুকানো হাতটা খুব ধীরে বেরিয়ে এলো। মুহূর্তটুকু এতটাই নীরব ছিল যে, কেউ বুঝে ওঠার সুযোগই পেল না কী হতে যাচ্ছে।

পরক্ষণেই—

ঠাস! ঠাস! ঠাস! ঠাস!

একটা নয়, পরপর চারটা বিকট শব্দে পুরো উঠান কেঁপে উঠল। তূর্যে'র বুকটা যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই হাঁটু ভেঙে পড়ল। শরীরটা মাটিতে আছড়ে পড়ল নিথরভাবে। চোখ দুটো বিস্ফারিত আর অবিশ্বাসে যন্ত্রণায়। ঠোঁট কাঁপছে, যেন কিছু বলতে চাইছে কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।

"চাচাজান আপনি এটা কি করলেন?

মেঘে'র গলা ফেটে বেরোনো সেই আর্তনাদে যেন চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সে ছুটে গিয়ে তূর্য'কে কোলে টেনে নিল। রক্তে ভিজে যাচ্ছে তার ওড়নার আঁচল, আঙুল কাঁপছে, শরীর কাঁপছে। চোখে জমে আছে অবিশ্বাস আর আতঙ্ক। সে চিৎকার করে কাঁদছে, কিন্তু সেই চিৎকার তূর্য কে আর ফিরিয়ে আনতে পারছে না।

"আপনি উঠুন না প্লিজ। তুষার, তোর ভাই কথা বলছে না কেন? চাচাজান, আপনি এটা কেন করলেন? আপনি আমার পুরো জীবন ধ্বংস করে দিয়েছেন, আর এখন এই মানুষটাকেও ছাড়লেন না?

মেঘে'র হাত-পা কাঁপছে, শ্বাস ঠিক রাখতে পারছে না। তুষার এগিয়ে আসে। তার চোখের সামনে এমন কিছু ঘটবে সে কল্পনাও করেনি।

– ভাই ও ভাই তুমি প্লিজ ঘাবড়ে যেও না। আমরা আছি তো। আমি এখনই তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো। মেঘু, তোদের এখানে হাসপাতাল কোথায়?

পাশ থেকে একজন ভাঙা গলায় বলে ওঠে,

- এই গ্রামে ওতো বড় হাসপাতাল নাই। অনেক দূরে বড় হাসপাতাল আছে। তোমরা ওরে ওখানে নিয়া যাও।

মেঘে'র আত্মাটা কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতর অপরাধবোধটা ছুরির মতো খোঁচা দেয়। নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করে, সে এখানে আসার জন্য জেদ না করলে, হয়তো আজ এই দৃশ্যটা দেখতে হতো না।

মেঘ কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠে,

"তুষার, তোর ভাইকে কথা বলছে না কেন? বৃষ্টি, তুই বল না কথা বলতে? আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না? আমারও কষ্ট হচ্ছে প্লিজ আপনি কথা বলুন না।

তূর্য অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে মেঘে'র দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকের ভেতর গুলির যন্ত্রণা এতটাই তীব্র যে, ব্যথায় সে কথা বলতে পারছে না। শুধু ঠোঁট কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভেঙে আসছে। তার চোখে জমে থাকা সেই দৃষ্টি যেন অনেক কিছু বলতে চায় কিন্তু শব্দ গুলো গলায় এসে আঁটকে থাকে।

তূর্য বড় বড় শ্বাস ছাড়ে।

প্রতিটা শ্বাস যেন বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। কাঁপতে থাকা হাতটা সে ধীরে ধীরে তুলে মেঘে'র গালে আলতো করে ছুঁইয়ে দেয়। আঙুলের স্পর্শটা খুব হালকা, তবু তাতে জমে আছে অসীম মায়া। মেঘ তখনো পাগলের মতো কাঁদছে। তার কান্না থামছে না, শ্বাস ভেঙে ভেঙে আসছে।

তূর্য বুকভরা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও মুচকি হাসার চেষ্টা করে। সেই হাসিটা ভাঙা, দুর্বল, তবু আন্তরিক। ঠোঁট কাঁপিয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে,

“পিচ্চি… কাঁদছো কেন হ্যাঁ? তুমি না বলতে আমি ভালো না… পঁচা মানুষের জন্য চোখের পানি ফেলতে নেই বউ। তুমি খুশি হওনি? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। এতোদিন পর তোমার জীবন থেকে এই স্বার্থপর লোকটা চলে যাবে বলো…

মেঘ তার দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।

"এমন করে বলছেন কেন আপনি? আমি কখনোই চাইনি আপনার এমন হোক। কখনোই না…

তূর্য আবার হাসে। হয়তো সবার সামনে নিজেকে শক্ত রাখার শেষ চেষ্টা।

“তুমিও না পিচ্চি… তুমি এমনটা চাইবে কেন? আমি কি এখনও ছোট? আমি বুঝি… তোমার ছোট্ট মনে আমি কতটা আঘাত দিয়েছি। হয়তো সেই আঘাতের শাস্তি হিসেবেই আজ আমার মৃত্যু …

সে আর কথা শেষ করতে পারে না। মেঘ তৎক্ষণাৎ তূর্যে'র মুখে হাত চেপে ধরে। ডুকরে কেঁদে ওঠে—

"তুষার! তোর ভাইকে চুপ করতে বল! না হলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।

হঠাৎ তূর্যে'র শরীরটা কেঁপে ওঠে। শ্বাস নিতে পারছে না সে। বুকের ভেতর থেকে যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ দুটো ছটফট করছে। তূর্যে'র এমন অবস্থা দেখে মেঘ আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে ওঠে—

"তুষার! তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স ডাক! ওনি কেমন জানি করছে! এই আপনি এমন করছেন কেন? আমার সাথে ঝগড়া করবেন না… আমি নাকি আর ঝগড়া করি না! আপনি উঠুন না, আজ আমি আপনার সাথে ঝগড়া করবো। বৃষ্টি, ওনাকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে বল, আমার বুক ছিঁড়ে যাচ্ছে। কথা বলুন না… আপনি না আমায় ভালোবাসেন? তাহলে কথা বলছেন না কেন?

তুষার তখন কাঁপা হাতে এম্বুলেন্সের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। বৃষ্টি বাসায় ফোন দিয়েছে। চারপাশে উপস্থিত সবাই আতঙ্কে স্তব্ধ। জামেলা খাতুন লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের ছেলের কুকর্মে তিনি ভেঙে পড়েছেন। নাতনিকে সামলাতে পারছেন না।

"দেখছো দাদিজান? তোমার ছেলে আমার জীবন থেকে সব সুখ কেঁড়ে নিলো। আমাকে ভালোভাবে বাঁচতেই দিল না।

হঠাৎ মেঘ এক দৌড়ে রহমত মেম্বারের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। চোখে পানি, কণ্ঠে মিনতি—

"চাচাজান ও চাচাজান আপনি এমনটা কেন করলেন? আপনার জায়গা-জমি চাই তো, আমি সব দিয়ে দেবো। সব! শুধু ওনাকে ভালো করে দিন না, আমি মামণিকে কী বলবো? আমার জন্য আজ ওনার ছেলের এই অবস্থা… চাচাজান দিন না ওনাকে ভালো করে দিন।

চারপাশে তখন শুধু কান্না। আর মেঝেতে পড়ে থাকা এক জীবনের নিঃশ্বাস, যেটা ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে।

“পিচ্চি একটু কাছে আসো!

তূর্যের কণ্ঠটা এতটাই ক্ষীণ যে, শব্দগুলো যেন হাওয়ার ভেতর ভেঙে ভেঙে আসে। মেঘ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। সে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে যায়, হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তার পাশে।

তূর্য দু’হাত দিয়ে মেঘে'র হাত আঁকড়ে ধরে। সেই হাতদুটো ঠান্ডা, কাঁপছে। আঙুলের চাপটুকুতে আছে ভয়,আর হারানোর শেষ চেষ্টা। মিনমিনে স্বরে সে বলতে শুরু করে—

“জানো পিচ্চি… অনেক ইচ্ছে ছিল। তোমার হাত ধরে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো। প্রতিদিন সকালে তোমার মুখ দেখেই ঘুম ভাঙবে রাতে তোমাকে বুকে জরিয়ে ঘুমাবো।

মেঘের চোখ থেকে পানি ঝরে পড়ে তূর্যে'র হাতের ওপর। সে মাথা নেড়ে শুধু বলে,

"আপনার কিছু হবে না তবুও এমন করে বইলেন না …

তূর্য হালকা হাসে। সেই হাসিটা বড় কষ্টের, বড় শান্ত।

“কিন্তু সেটা আর হলো না পিচ্চি। তুমি বলেছিলে না… আর কয়েকদিন পর আমাদের সম্পর্কের ইতি টানবে? দেখো তোমার কথাটা আজ পূরণ হতে যাচ্ছে। আজ আমি চলে গেলে তুমি মুক্ত হবে পিচ্চি। আর কখনো এই পঁচা লোকটার মুখ দেখতে হবে না।

কেউ তোমাকে বিরক্ত করবে না, কেউ তোমাকে আঘাত করবে না। আর কেউ তোমাকে কলঙ্ক বলবে না। আজ থেকে তুমি নিঃকলঙ্ক, পিচ্চি। তুমি সেই ফুল… যেটায় শুধু পবিত্রতা! তুমি আমার ফুল… না না তুমি অন্য কারো ফুল। এই ফুল বড় দামি, যেটা আমার জন্য সামান্য ব্যক্তির নয়।

কথাগুলো বলতে বলতে তূর্যে'র শ্বাস আরও ভারী হয়ে আসে। বুকটা ওঠানামা করছে অনিয়মিতভাবে। তবুও সে শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে আবার বলে—

“একটাবার ভালোবাসি বলবে বউ? শেষ বারের জন্য, আর কখনো এই নিকৃষ্ট মানুষটা নিজের ভালোবাসার অধিকার নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াবে না। এই অশান্ত হৃদয়'কে একটু শান্ত করে দাও না। একবার বলো না, মিথ্যা হলেও একবার ‘আপনাকে ভালোবাসি’ বলে বুকে জরিয়ে নাও না !

তূর্যে'র মুখ দিয়ে আর কোনো বাক্য বের হয় না।

ঠোঁট নড়ে না, চোখের দৃষ্টি আর নড়াচড়া করে না।

বুকের ওঠানামা থেমে গেছে—ঠিক যেন সময় নিজেই সেখানে এসে দাঁড়িয়ে গেছে। তার নিথর দেহখানা মেঘে'র কোলে ঢলে পড়ে থাকে। ভারী নয়, তবু অসম্ভব ভারী। সেই ভারটা শরীরের না৷ হৃদয়ের। মেঘ হঠাৎ চিৎকার দিয়ে তূর্য'কে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে,

"আপনাকে ভালোবাসি, অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি! শুনুন না, মিথ্যা নয় একটুও মিথ্যা নয়। আপনাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসি! কথা বলুন না… এই দেখুন আমি আপনাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছি, তবুও কথা বলবেন না আমার সাথে?

মেঘের কান্না উন্মাদের মতো হয়ে ওঠে। সে চারপাশের কাউকে দেখছে না, কিছু শুনছে না।

"বৃষ্টি এই বৃষ্টি ওনাকে বল না আমি ওনার সাথে সারাজীবন থাকবো! আমি পালিয়ে যাবো না, আমি কোথাও যাবো না! আপনি কথা বলুন না? আমার কষ্ট হচ্ছে কেন বুঝতে পারছেন না? ভালোবাসি বললাম, তবুও কেন আমার বুকে ফিরে আসবেন না?

তার কণ্ঠ ভেঙে যায়। শব্দগুলো এলোমেলো হয়ে যায়,

"ভা ভা ভালো…

শব্দগুলো আর বাক্য থাকে না, শুধু আর্তনাদ হয়ে বাতাসে মিশে যায়।

হঠাৎ মেঘে'র শরীরটা ঢলে পড়ে। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিল কিন্তু আর পারে না। চোখ উল্টে আসে, হাতের শক্তি ঢিলে হয়ে যায়। সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। একদিকে মেঘ নিথর, অন্যদিকে তূর্য নিথর। বৃষ্টি হাউমাউ করে কাঁদছে। তার চোখের সামনে দুইজন মানুষের করুন অবস্থা। একজন তার বেস্ট ফ্রেন্ড, আরেকজন তার ভাই। কাকে ধরে কাঁদবে, কাকে বাঁচাবে, সে বুঝে উঠতে পারছে না।

তুষার দাঁড়িয়ে আছে—নিঃশব্দে। তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, কিন্তু চোখ দিয়ে পানি নামতে দিচ্ছে না। ভাইয়ের নিথর দেহ, মেঘের অচেতন শরীর, সব একসাথে দেখেও সে নিজেকে ভেঙে পড়তে দিচ্ছে না। কাউকে তো শক্ত থাকতে হবে। এম্বুলেন্স এখনো আসেনি। সময় যেন ইচ্ছে করেই থেমে গেছে। চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু কেউ কিছু করতে পারছে না। মাথা কাজ করছে না তার, পা চলছে না। এমনটা না হলেও তো পারতো৷

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প