পুরো রুমটা যেন যুদ্ধক্ষেত্র!ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাঙা কাচের টুকরোগুলো আলোয় ঝিলমিল করছে, কিন্তু সেই আলোয় কোনো সৌন্দর্য নেই, আছে শুধু ধ্বংসের ছাপ। দেয়ালের পাশে উল্টে পড়ে থাকা চেয়ার, ভাঙা ফুলদানি, ছিঁড়ে যাওয়া পর্দা—সব মিলিয়ে রুমটা আয়ানে'র ভেতরের ঝড়েরই প্রতিচ্ছবি। আয়ানে'র হাত থেকে টুপটাপ করে রক্ত ঝরছে। কাচে কেটে গেছে হাত, ফেটে গেছে গিঁট। ব্যথা আছে, কিন্তু সে ব্যথা তার কাছে তুচ্ছ। বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলছে, তার কাছে এই রক্তক্ষরণ কিছুই না। সে দাঁত চেপে ধরে আবারও দেয়ালের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
একটার পর একটা শক্ত পাঞ্চ। দেয়াল কাঁপে, কিন্তু আয়ানে'র রাগ কমে না।
সে হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠে,
“কেন… কেন… কেন? ফুল, তুই এটা কেন করলি? ছোট্টবেলা থেকে তোকে ভালোবাসি আমি। নিজের থেকেও বেশি। আর তুই, তুই আমারই ছোট ভাইকে বিয়ে করলি? আমার কথা একবারও ভাবলি না?
কণ্ঠস্বর ভেঙে আসে তার। চিৎকারটা ধীরে ধীরে অসহায় হাহাকারে পরিণত হয়। আয়ান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। হঠাৎ করেই তার পা দুটো শক্তি হারায়। সে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে, ঠিক যেন কেউ তার ভেতরের সব শক্তি এক মুহূর্তে শুষে নিয়েছে। এই মেঝেতেই সে বসে আছে— যার জন্য গত দশটা বছর সে লন্ডনে জীবন কাটিয়েছে।
যার মুখ মনে রেখেই সে নিজের ছন্নছাড়া জীবনটাকে শাসনে এনেছে। নিজের ক্যারিয়ার গড়েছে, নিজেকে দাঁড় করিয়েছে, ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করেছে,শুধু ওই একটা মানুষের জন্য। আর আজ? আজ সে জানতে পেরেছে, ফুল তার নয়! সে আর কোনোদিনই তার হবে না।
আট বছর আগেই তার ফুলে'র বিয়ে হয়ে গেছে। আর বিয়েটা হয়েছে তারই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। এই আট'টা বছর, এই সত্যটা সবাই জানত। কিন্তু কেউ একবারও বলেনি তাকে। এই উপলব্ধিটাই সবচেয়ে বেশি ছুরির মতো বিঁধে যায় তার বুকে। ভালোবাসা হারানোর তীব্র কষ্ট,যন্ত্রনা আর বিশ্বাস ভাঙার কষ্ট, পরিবারের নীরব বিশ্বাসঘাতকতা। কেন এমনটা হলো তার সাথে? সে তো নিঃস্বার্থ ভাবে তার ফুল'কে ভালোবেসেছিল। প্রতিটি মোনাজাতে তাকে চাইতো কিন্তু সে অনেক বছর আগে থেকেই অন্য করো।
হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে আরিফ চৌধুরী’র নাম ভেসে উঠতেই আয়ানে'র চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। ফোনটা হাতে নিয়েই সে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকায় স্ক্রিনের দিকে। একবার… দু’বার… তিনবার...রিংটোন থামতেই চায় না। যেন প্রতিটা রিং তার বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষতগুলোকে আবার খুঁচিয়ে দিচ্ছে। আর সহ্য করতে না পেরে আয়ান আচমকা ফোনটা মেঝেতে ছুড়ে মারে। মুহূর্তেই ফোনটা ভেঙে গুড়িয়ে যায়, ঠিক তার হৃদয়ের মতোই।
চোখ লাল হয়ে ওঠে তার। গলা ফেটে বেরিয়ে আসে আর্তচিৎকার—
“তোমরা সবাই আমার পর! কেউ আমার আপন না, কেউ না। তুমি আমার আব্বু হয়েও নিজের ছেলের কষ্টটা একবার ভাবলে না? আজ আমি কীভাবে থাকবো বলো, আমার ফুল'কে ছাড়া। ফুল, ফিরে আয় না আমার কাছে। তোর ছোট্ট ছোট্ট আঙুল ধরে পুরো পৃথিবীটা ঘুরে দেখাবো আমি… প্লিজ ফিরে আয়।
সে হাওমাও করে কাঁদছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না ঠিকমতো। বুকটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তার বেস্ট ফ্রেন্ড আসিফ। আয়ানের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার অবস্থা করুণ, নিজেও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না। প্রিয় বন্ধুর এমন ভাঙা অবস্থা দেখে তার বুকও চেপে ধরছে কষ্টে।
ছেলেটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আয়ানে'র সামনে বসে পড়ে। কাঁপা গলায় বলে,
"দোস্ত, একটু শান্ত হ। কেন বুঝতে পারছিস না? তোর ফুল… তোর নেই আর। সে এখন অন্য কারো। তুই হাজার কাঁদলেও ওকে আর পাবি না।
এই কথাগুলো যেন আয়ানে'র বুকে ছুরি হয়ে বিঁধে যায়। হঠাৎ করেই আয়ান ছেলেটার বুক জড়িয়ে ধরে। শক্ত করে। একেবারে অসহায়ের মতো। তার কান্না আর চেপে রাখা যায় না,
“আসিফ, তুই জানিস আমি আমার ফুল'কে কতটা ভালোবাসি! ওকে ছাড়া আমি শূন্য, একদম ফাঁকা! কেন কেউ বুঝলো না আমার এই কষ্টটা৷ আমি কীভাবে বাঁচবো ওকে ছাড়া, বল? ওকে এনে দে না আমার বুকে প্লিজ…
আসিফ কথা বলতে গিয়েও থেমে যায়। তার চোখ আটকে যায় আয়ানে'র হাতে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে এখনো তীব্র বেগে রক্ত ঝরছে। রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় মেঝেতে পড়ছে, কিন্তু আয়ানে'র কোনো খেয়ালই নেই। ভয় পেয়ে যায় আসিফ।
"দোস্ত, এমন পাগলামো করিস না। দেখ, তোর হাত থেকে রক্ত ঝরছে। প্লিজ চল, ড্রেসিং করে দিই। না হলে পরে বড় প্রব্লেম হবে।
আয়ান ধীরে ধীরে হাতটা নিজের দিকে টেনে নেয়। চোখ ভরা যন্ত্রণা নিয়ে তাকায় আসিফে'র দিকে। কণ্ঠে তীব্র আর্তনাদ—
“তুই আমার হাতের রক্ত দেখতে পাচ্ছিস, কিন্তু আমার বুকের রক্তক্ষরণ তোর চোখে পড়ছে না? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমার ফুল'কে দে না আমার বুকে। আমি ওকে চাই… মানে চাই। আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না। কেন বুঝতে পারছিস না?
কথাগুলো শেষ হতেই আয়ান ভেঙে পড়ে, একজন পরাজিত প্রেমিকের মতো, যে নিজের ভালোবাসাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তার কষ্ট বুঝার মতো কেউ রইলো না, যাকে এতোটা গভীর ভাবে ভালোবেসেও সে অন্য কারো। কেন এমন হলো? নিয়তি এতো নিষ্ঠুরতম কেন? যাকে দেয়, তাকে উজার করে দেয়। আর যাকে দেয় না, তাকে সারাজীবন নিঃসঙ্গ রেখে দেয়। এতো নিষ্ঠুর কেন সে
রাত অনেকটাই গভীর!চারপাশ নিস্তব্ধ হলেও আকাশজুড়ে জোছনার নরম আলো ছড়িয়ে আছে। যেন পুরো উঠানটাকে রুপালি চাদরে মুড়ে দিয়েছে চাঁদ। সেই জোছনার আলোয় তূর্য, মেঘ, বৃষ্টি, তুষার আর বাড়ির বড় সদস্যরা উঠানে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। জামেলা খাতুন উঠানের এক পাশে চৌকিতে বসে আছেন। ঠোঁটে পান, মুখে মুচকি হাসি। পান চিবুতে চিবুতে তিনি গল্প বলছেন তাদের ফেলে আসা দিনের—পুরোনো জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কাহিনি। তার কণ্ঠে বয়সের ভার থাকলেও গল্পগুলোতে এখনো প্রাণ আছে। সবাই গভীর মনোযোগে শুনছে, কেউ কেউ মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে।
জামেলা খাতুনে'র ঠিক পাশেই চুপচাপ বসে আছে মেঘ। চোখে-মুখে একধরনের নির্লিপ্ত ভাব। সে গল্প শুনছে ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন কোথাও আটকে আছে। তূর্য ধীরে ধীরে তার দিকে সরে আসে। একটু একটু করে গা ঘেঁষে বসে পড়ে। বাড়ির মুরব্বিরা চারপাশে থাকায় মেঘ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি স্পষ্ট বিরক্ত, অস্বস্তিকর। তূর্য সেটা বুঝতে পেড়েও দাঁত কেলিয়ে হাসে। এবং আরও কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে—
“এই পিচ্চি, একটু রুমে চলো তো?
মেঘ শুনেও না শোনার ভান করে। চোখ সোজা সামনে রেখে বসে থাকে, যেন তূর্যে'র অস্তিত্বই নেই।
তূর্য আবার ডাক দেয়। এবারও একই ফল। কোনো সাড়া নেই। এইবার তূর্য ভালো করেই বুঝে যায়, মেঘ তার ডাকে সাড়া দেবে না। সে একবার চারপাশে তাকায়। সবাই গল্পে মগ্ন। কেউ তাদের দিকে খেয়াল করছে না। হুট করেই তূর্য ঝুঁকে পড়ে, মেঘে'র গালে হালকা করে ঠোঁট ছুঁইয়ে নেয়। মুহূর্তটা এতটাই ক্ষণিক যে বেশিরভাগের চোখেই পড়ে না। কিন্তু পড়ে যায় তুষারে'র চোখে।
তুষার একটু অবাক হয়, তারপর মুখের কোণে একটা চাপা হাসি ফুটে ওঠে। পরক্ষনপই সে ফিক করে হেসে ফেলে।
তুষারে'র সেই হাসি দেখে বৃষ্টি ভ্রু নাচিয়ে সে জিজ্ঞেস করে,
- তুষার ভাইয়া, তুমি হাসলে কেন?
তুষার তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নেয়।
"ওহু, কিছু না!
বৃষ্টি সন্দেহভরা চোখে তাকায়।
- কিছু না হলে হাসলে কেন?
"তুই ছোট মানুষ, তুই এসব বুঝবি না।
বৃষ্টি গাল ফুলিয়ে বসে পড়ে।
- আমি ছোট না! আমি অনেক বড় হয়েছি।
তুষার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
"চুপ করে বসে থাক। চিল্লা চিল্লি করলেই কেউ বড় হয় না।
এই কথায় বৃষ্টি'র চোখে জল টলমল করে ওঠে। সে সোজা জামেলা খাতুনে'র দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলে,
- দাদিজান, তুষার ভাইয়া আমাকে বকা দিচ্ছে।
"যাহ্ বাবা, তোকে কখন বকা দিলাম আমি?
- আমি ছোট আবার আমি মিথ্যা বলছি? তাহলে তোমরাই থাকো, আমি চলে যাচ্ছি।
এই কথা বলেই বৃষ্টি রেগে গিয়ে সেখান থেকে বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে শুরু করে। তুষার চুপ করে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু আগে যে হাসিটা ছিল, সেটা মিলিয়ে যায়। মনে মনে ভাবে—
এতটুকু কথায়ও কেউ এত অভিমান করে!
তূর্য আবারও ঠোঁট এগিয়ে নিতেই মেঘ কনুই দিয়ে তূর্য'কে ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তূর্য চিৎকার দিয়ে উঠে,
“দাদিজান! আপনার নাতনি আমাকে কু প্রস্তাব দিচ্ছে? আমাকে রুমে গিয়ে ইন্টু মিন্টু করতে বলে।
তূর্যে'র কথা শুনে সবাই স্তদ্ধ! সবাই ফ্যালফ্যাল করে দুজনের দিকে তাকায়। মেঘ তাদের তাকানো দেখে লজ্জায় মাথা নুয়ে নেয়। এতো গুলো মানুষের সামনে এসব কথা বলতে লজ্জা করছে না এসবই ভাবছে মেঘ। মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে তূর্যে'র দিকে তাকায়,
"কাইলা ইন্দুর...
“দেখছেন দাদিজান আপনার নাতনি আবারও বললো। আরে বউ, এভাবে বলার কি আছে? আমি তো তোমারই জন্য। চাচা শ্বশুর আব্বা আমরা কোথায় ইন্টু মিন্টু করবো না মানে, কোন রুমে ঘুমাবো?
রহমত মেম্বার মেয়ের জামাই'য়ের কথার প্রতি উওরে কিছু বলেন না। তিনি চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যায়। তূর্য আবারও বলে,
“শাশুড়ী আম্মা চাচা শ্বশুর আব্বা চলে গেলেন কেন?
তিনিও নিঃশব্দে হাসতে হাসতে চলে যান। তূর্য যেন আকাশ থেকে পড়ছে, সবাই তাদের রেখে চলে যাচ্ছে কেন? তূর্য ভ্রু কুঁচকে জারা'কে উদ্দেশ্য করে বলে,
“শালীকা তুমিও চলে যাবে নাকি?
- আরেহ্ না দুলাভাই, আমি চলে গেলে আপনাদের ইন্টু মিন্টু মানে ঘুমানোর রুমে কে নিয়ে যাবে।
“দেখছো বউ শালীকা আমার মতোই ভদ্র। একটু কথায় বুঝে গেল, আসো শালীকা তোমার গালে দুইটা চুম্মা খাই।
- না দুলাভাই আমার বয়ফ্রেন্ড আছে!
শেষের কথা ভাব নিয়ে বললো জারা। তা দেখে তূর্য হতবিহ্বল। এইটুকু মেয়ের বয়ফ্রেন্ড ভাবা যায়। বয়স কতই বা হবে এই তেরো কিংবা চৌদ্দ বছর।
জারা ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে বলল,
- দুলাভাই, ওভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। আমি সত্যিই বলেছি। তবে আপনি চাইলে তার সঙ্গে ব্রেকআপ করে আপনার সঙ্গে রিলেশন শুরু করতে পারি। আপনি না অনেক কিউট একদম লিচুর মতো!
জারা’র কথা শুনে মেঘ ভেতরে ভেতরে রেগে বোম। সেটা তার মুখ দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু সে কিছু বলল না, হয়তো নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে চাইছে না। তূর্য এক মুহূর্ত মেঘে'র দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল। পরক্ষণেই জারা'র দিকে তাকিয়ে বলল,
“শালীকা, এই লিচু খাওয়ার সৌভাগ্য তোমার নেই! এটা শুধু পার্সোনাল পিচ্চি'র জন্য।
হঠাৎ করেই তূর্য মেঘ'কে কোলে তুলে নেয়। মেঘ ভয়ে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। আর জারা সেটা দেখে মহা খুশি। সে এক দৌড়ে তাদের নিজের রুমের দিকে নিয়ে যায়।
তূর্য রুমে গিয়ে মেঘ'কে নামিয়ে দিতেই বুকে হালকা ব্যথা অনুভব করে। কারণ মেঘ পরপর কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দিয়েছে তার বুকে।
"বজ্জাত লোক! মেয়ে দেখলেই কোলে নিতে ইচ্ছে করে?
“ ওহু! মেয়ে দেখলে ময়, বউ দেখলে কোলে নিতেও ইচ্ছে করে, আবার ইন্টু-মিন্টু করতেও ইচ্ছে করে।
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে কথাটা বলে তূর্য। মেঘে'র কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হতে থাকে। এতটা নির্লজ্জ মানুষও যে হতে পারে, জানা ছিল না তার। ঠিক তখনই জারা খোঁচা দিয়ে বলে ওঠে,
- ওহু ওহু! বলছিলাম কি, দুলাভাই, আমি এখনো কিন্তু এই রুমেই আছি। আর শুনুন, পাশের রুমে আম্মা-আব্বা আছে। সাবধান!
কথা শেষ হতেই মেঘ ঠাস করে জারা'র পিঠে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।
"শয়তান মেয়ে! এইটুকু বয়সেই এত পেঁকে গেছিস? দাঁড়া, চাচাজান'কে বলে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি।
- আমি কিন্তু রাজি!
জারা লাজুক হাসি দিয়ে বলে। মেঘ চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে থাকে। এই মুহূর্তে কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। মাথা চেপে ধরে সে খাটে কর্নারে বসে পড়ে। জারা আবারও বলে,
- দুলাভাই, এটা আমার রুর, তাই একটু ছোট। বিছানাটাও ছোট, জামাই নেই তো তাই! আর আপনারা তো বিবাহিত মানুষ, আপনাদের এত জায়গার দরকার নেই। আপু, তুমি দুলাভাইয়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়ো। তাহলে আর জায়গার সমস্যাও হবে না।
কথাটা বলেই হাসতে হাসতে জারা কক্ষ ত্যাগ করে!
জারা বেরিয়ে যেতেই তূর্য ভেতর থেকে দরজায় খিল লাগিয়ে দেয়। দরজা আটকানোর শব্দে মেঘে'র শরীর কেঁপে ওঠে। তারপর৷ তূর্য ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। কণ্ঠটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে, চোখে অনুনয়—
“বউ!
এই একটিমাত্র ডাকেই মেঘে'র হৃদয় এলোমেলো হয়ে যায়। কণ্ঠে যেন এক ধরনের নেশা মিশে আছে। তবু সে নিজেকে শক্ত করে সামলে নেয়।
তূর্য আবারও বলে,
“দেখো বউ, শ্বশুরবাড়ি আসার তাড়াহুড়ায় আমার হাফ প্যান্টটা আনাই হয়নি। এখন বলো তো, আমি কীভাবে ঘুমাবো? আমি তো লম্বা প্যান্ট পরে ঘুমাতে পারি না।
মেঘ কোনো জবাব দেয় না। চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে তূর্যে'র মুখের দিকে একটা লুঙ্গি ছুড়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
"এটা পরে ঘুমাতে পারলে ঘুমান, না পারলে দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি মেঝেতে ঘুমাবো, আপনি খাটে ঘুমাবেন। আর রুমের লাইট একদম অফ করবেন না, নইলে আপনার নাক আমি ফাটিয়ে দেবো।
কথা শেষ না হতেই সে তড়িঘড়ি করে মেঝেতে নিজের বালিশ পেতে নেয়। শুয়ে পড়ার আগে আবার কড়া স্বরে বলে,
"রাতে যদি আমাকে টাচ করার চেষ্টাও করেন, তাহলে কিন্তু আপনার খবর আছে হু?
আর কথা না বাড়িয়ে মেঘ মাদুরে শুয়ে পড়ে। তূর্য আহাম্মকের মতো তাকিয়ে থাকে। এক নিমিষেই হাজারো কল্পনা ভেঙে চুরমার। কত আশা ছিল, পিচ্চি'র গলায় মুখ গুঁজে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে। অথচ বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। ক্লান্ত শরীর আর ভাঙা মন নিয়ে এখন আর তর্ক করার শক্তিও নেই।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে অসহায় গলায় বলে—
“কিন্তু পিচ্চি, আমি তো লুঙ্গি পরতে জানি না।
"তো আমি কি আপনাকে পরিয়ে দেবো?
মেঝে থেকেই মেঘ কর্কশ স্বরে বলে ওঠে।
“দিলে তো ভালোই হয়!
মেঘ সঙ্গে সঙ্গে ধমকে ওঠে,
"নিজে পারলে পরুন, না পারলে ওভাবেই শুয়ে পড়ুন। আর একবার যদি আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে আপনার খবর আছে!
তূর্য আর কথা বাড়ায় না। কোনোমতে কোমরে লুঙ্গি পেঁচিয়ে নেয়। বিড়বিড় করে বলে—
“শালার লুঙ্গি, বউয়ের মতো রাতে আবার খুলে অন্যদিকে থাকিস না। আমার এইটুকু ইজ্জত বউ ছাড়া আর কেউ যেন না দেখে।
এই কথাটা বলেই সে ধপাস করে খাটে শুয়ে পড়ে। চোখ দুটো বুজে নিদ্রা দেয়।
_____________
------------------------------
সকাল হতেই তূর্য আড়মোড়া দিয়ে উঠে বসে। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। মাথাটা এখনো ভার হয়ে আছে।
ঘুম না হওয়ার মূল কারণ দুটো— এক, এই বিছানা তার নিজেরটার মতো তুলতুলে নয়। দুই, যে কম্বলটা তাকে দেওয়া হয়েছিল, সেটা রাতেই মেঘ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তূর্য চারদিকে তাকায়। পুরো রুম ফাঁকা। মেঘ যে আগেই উঠে গেছে, সেটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না। হঠাৎ সে নিজের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে চিৎকার দিয়ে ওঠে—
“বউউউউউউউউউউ
তূর্যে'র চিৎকার শুনেই মেঘ এক দৌড়ে রুমে ঢুকে পড়ে। ততক্ষণে তূর্য তাড়াতাড়ি নিজের গায়ে কম্বল পেঁচিয়ে নিয়েছে।
মেঘে'র পেছনে বৃষ্টি আর জারাও ঢুকে পড়ে।
মেঘ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
"কাইলা ইঁদুর! আপনি ঠিক আছেন তো? এমন চিৎকার দিলেন কেন?
তূর্য আবার নিজের দিকে তাকিয়ে কাঁদু-কাঁদু গলায় বলে ওঠে—
“জামাই মনে না বলতে বলতে আমার ৭২ লাখ দেখে ফেললে, পিচ্চি?
দেখছো তো দেখছই, তাই বলে লুঙ্গি টুঙ্গি খুলে দেখতে হবে?
কথাটা শুনে মেঘ যেন মুহূর্তেই বরফ হয়ে যায়।
মাথার ভেতর কয়েক সেকেন্ডে হাজারটা ভাবনা একসঙ্গে ধাক্কা মারে।
মেঘ কিছু বলার আগেই জারা কৌতূহলী হয়ে চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে,
- দুলাভাই, এই ৭২ লাখ.....