মেঘ সিঁড়ি বেয়ে ট্রলি ব্যাগ হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ায়। তাকে এই অবস্থায় দেখে উপস্থিত সবাই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। একজন আরেকজনের চোখের দিকে তাকায়, কিন্তু কারো চোখেই কোনো উত্তর নেই। নিঃশব্দ সেই মুহূর্ত মেঘ সোজা গিয়ে তাজিম চৌধুরী'র পাশে গিয়ে বসে। মেঘ'কে এতটা স্বাভাবিক দেখে পাশ থেকে আরিফ চৌধুরী অবাক কণ্ঠে বলে ওঠেন,
– আম্মা, এই ব্যাগ গুছিয়ে কোথায় যাচ্ছো তুমি?
মেঘ একটুও দ্বিধা না করে শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
"অনেক দিন ধরে দাদিজান'কে দেখি না। শুনেছি দাদিজান অসুস্থ তাই ভাবছি দাদিজানে'র কাছে কয়েক দিন থেকে আসবো।
তাজিম চৌধুরী'র কপাল ভাঁজ পড়ে। কণ্ঠে চাপা দুশ্চিন্তা,
– কিন্তু মামনি, ওখানে তোমার যাওয়া কি ঠিক হবে?
মেঘ ধীরে ধীরে তাজিম চৌধুরী'র চোখে চোখ রাখে। তার দৃষ্টিতে কোনো ভয় নেই, নেই অনিশ্চয়তা। শুধু আত্মমর্যাদা আর দৃঢ়তা। সে নরম ও দৃঢ় স্বরে বলে,
"বাবাই, আমি কোনো ভুল করিনি। ভুল করেছে ওই মানুষগুলো। আর আমি এতটা দুর্বল নই যে তাদের জন্য ভয়ে নিজের জন্মভূমিতে যাবো না।
তাজিম চৌধুরী মেঘ'কে পরম যত্নে নিজের বুকে জড়িয়ে নেন। মেয়েটার সাহস তাকে বরাবরই মুগ্ধ করে, তবুও তাকে একা পাঠানোর চিন্তায় বুকের ভেতর অজানা দুশ্চিন্তা জমে ওঠে। তিনি আবারও বলে,
– মামনি, তুমি একা যাবে? আমি বলছিলাম কি তোমার সঙ্গে যদি...
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই মেঘ মুচকি হেসে বলে ওঠে,
"না বাবাই, আমি একাই যাবো। আমি চাই না আমার জন্য বৃষ্টি বা তুষারে'র পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হোক। তাছাড়া ওরা গ্রামে গিয়ে থাকতে পারবে না, ওখানে অনেক শীত।
পাশ থেকে আরিফ চৌধুরী চিন্তিত কণ্ঠে বলে ওঠেন,
– কিন্তু আম্মা, তুমি একা একা সব সামলাতে পারবে তো?
হঠাৎ কারো শীতল কণ্ঠে ভেসে আসে,
“বড় আব্বু, আমরা আছি তো। টেনশন নিও না, গাইস কামিং!
ঠিক তখনই হাসি মুখে তুষার আর বৃষ্টি এসে দাঁড়ায় তূর্যে'র সামনে। দু’জনেই মাথা একটু ঝুঁকিয়ে খিলখিল করে হেসে বলে ওঠে,
"আমরা হাজির জাঁহাপনা!
তূর্য ও হেসে দেয়! মেঘ সবার হাতে ব্যাগ দেখে কপাল কুঁচকে তাকায়। এবং মিনমিনে স্বরে জিজ্ঞেস করে,
"তুষার, বৃষ্টি তোরা কোথায় যাচ্ছিস?
তুষার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকায়— আমরা কিছুই জানি না। সব ভাইয়াই জানে। ভাইয়া, তুমিই বলো।
তূর্য মুচকি হেসে মেঘে'র সামনে এসে দাঁড়ায়। কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে এত কাছে পেয়ে মেঘ হালকা কেঁপে ওঠে, অজান্তেই এক পা পিছিয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে তূর্য ফিসফিস করে বলে,
“আমার বউ যেখানে যাবে, আমিও তো সেখানেই যাবো নাকি?
"হোয়াটটটটটট?
মেঘের চিৎকারে তূর্য সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত দিয়ে কান চেপে ধরে। এবং ধীর, নাটকীয় কণ্ঠে বলে,
“আম্মু, তোমার বউ’মাকে বেশি বেশি দুধ আর কলা খাওয়াতে পারো না? এতো কাছে এসে কথা বলছি, তবুও কিছুই শুনতে পাচ্ছে না!
তূর্যে'র কথা শেষ হতেই সবাই হেসে ওঠে। এমনকি রেখা চৌধুরীও নিঃশব্দে হাসেন। তার সেই হাসি দেখে মেঘ তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে,
"মামনি, তুমিও হাসছো? আর আপনি! আমি আপনার বউ নয় বুঝতে পেরেছেন? আর যদি বেশি তেড়ামি করেন তাহলে আপনার কান কেটে দেবো, বলে রাখলাম!
তূর্য একটুও বিচলিত না হয়ে হেসে বলে,
“আই ডোন্ট কেয়ার! বিকস্, তখন সবাই তোমাকেই বলবে, মেঘে'র কান কাটা জামাই!
কথা শেষ করেই তূর্য শব্দ করে হাসতে থাকে! মেঘ এক পলক তাকিয়ে থাকে তার হাসির দিকে, পরক্ষনেই দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। এবং কঠোর গলায় বলল,
"স্টপ কাইলা ইন্দুর! মামনি আমি এই লোকটার সাথে যাবো না। তুমি ওনাকে যেতে বারণ করো, ওটা আমার আব্বু বাড়ি ওনি কেন যাবে।
“তুমি আমার সঙ্গে যাবে কেন, পিচ্চি? আমি যাবো তোমার সঙ্গে। আর ওটা শুধু তোমার আব্বুর বাড়ি নয়, ওটা আমার শ্বশুর আব্বার বাড়িও হু!
তূর্যে'র কথার ভঙ্গিতে এমন এক নিশ্চিন্ত দখলদারিত্ব, যে মেঘ মুহূর্তের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেলে। তারপরই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে ঘাড় ঘুরিয়ে রেখা চৌধুরীর দিকে তাকায়,
"মামনি! তুমি কিছু বলছো না কেন? আমি এই কাইলা ইন্দুরের সাথে....
কিন্তু বাকিটুকু কথা আর বলা হয় না। হঠাৎ করেই তূর্য এক ঝটকায় তাকে পাঁজা কোলে তুলে নেয়। আচমকা মাটির সঙ্গে পায়ের সংযোগ ছুটে যেতেই মেঘ চমকে ওঠে, দুই হাত অজান্তেই তূর্যে'র কাঁধে আঁকড়ে ধরে।
"এই এই কাইলা ইন্দুর...
তূর্য একটুও পাত্তা না দিয়ে ধীর পায়ে সদর দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে গলা উঁচু করে বলে ওঠে,
“আম্মু, নাতি-নাতনির জন্য কাঁথা সেলাই করা শুরু করে দাও। ফেরার সময় তোমার জন্য পিচ্চি পিচ্চি রসগোল্লা আনবো ইনশাল্লাহ্!
তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে তুষার আর বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি ছুড়ে দেয়,
“এই টুরু লাভের বংশ! তোরা দাঁড়িয়ে কী করছিস? আয়, আয়
তূর্য বেরিয়ে যেতেই তুষার আর বৃষ্টি গটগট করে তার পেছনে বেরিয়ে আসে। দু’জনের মুখেই বিশ্ব জয়ের হাসি—বিশেষ করে তুষারে'র। আজ বৃষ্টি'র পাশে বসে পুরো রাস্তা গল্প করার সুযোগ সে কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না।
এদিকে তূর্যে'র বাহুতে বন্দি মেঘ প্রাণপণে ছটফট করতে থাকে। সে কখনো তূর্যে'র বুক চাপড়ায়, কখনো রাগে পা ছোঁড়ে।!
"এই কাইলা ইন্দুর, ছাড়ুন বলছি। তুষার এই রাক্ষসকে ছাড়তে বল।
কিন্তু তূর্য একচুলও নড়ে না। বরং আরও শক্ত করে তাকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে নেয়, যেন সে কোনো অমূল্য সম্পদ!
গাড়ি চলছিল আপন গতিতে! চারপাশে শুধু ধূসর রাস্তার হালকা আলো আর ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন। তূর্য সামনের রিয়ার ভিউ মিরর ধরে বারবার মেঘ'কে আড়চোখে দেখছে। মেঘে'র পুরো মুখ ফ্যাকাশে, চোখে অজানা একটা ভাব, ঠোঁট চেপে ধরে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
যার থেকে দূরে যেতে চেয়েছিল, সেই মানুষটা আজ তার পাশে, একই গাড়িতে। এই ভেতরের চাপ, এই কাছের উপস্থিতি—মেঘে'র হৃদয়কে এক অদ্ভুত রকম ঝড়ের মধ্য দিয়ে ঠেলে দিয়েছে। তূর্য তার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের ভেতর অদ্ভুত আলো মায়া, যত্ন আর এক গভীর ভালোবাসার ঝলক। তার নিজের মনে ফিসফিস করে,
“ভালোবাসি পিচ্চি, অনেক ভালোবাসি! তোমার এই মেঘাছন্ন মুখে আমি হাসির ঝলক ফুটাবো, সেটাও খুব তাড়াতাড়ি।
মেঘ হঠাৎ চোখ বুজে নেয়, যেন নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো সামলাচ্ছে। ঠিক তখনই তুষার কনুই দিয়ে তূর্য'কে ধাক্কা দেয় এবংগলা চড়িয়ে চিৎকার করে,
"ভাই! নিজের বউ দেখতে গিয়ে আমাদের বারোটা বাজিয়ে দিও না। নিজে তো বিয়ে করেছো, আর আমি ওই রাক্ষসীর জ্বালায় বউ তো দূরের কথা, প্রেমও করতে পারি না! বউকে জড়িয়ে ধরার আগে পটল তুলতে চাই না আমি!
বৃষ্টি মুখ ঢেকে হেসে ফেলে। আর তূর্য বিরক্তি মাখা কণ্ঠে গজগজ করে বলে—
“চুপ কর শালা! তোর জন্য কি পিচ্চি'কে ভালো করে দেখতেও পারবো না?
তুষার ভেংচি কাটে,
"দেখো, দেখো! কিন্তু চোখ একটু রাস্তার দিকেও রাখো। না হলে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগেই ভূতের বাড়ি পৌঁছে যাবো। আর আমার বয়স বা কত? এই ষোলো, সতেরো, এই বয়সে ভূতের বাড়ি নো নো!
সঙ্গে সঙ্গে তুষারে'র পায়ে লাথি দিয়ে তূর্য গর্জন তুলে আওরায়—
“শালা! ভন্ডামি করিস? ঠিক সময়ে বিয়ে করিয়ে দিলে চার-পাঁচজনের বাপ হয়ে যেতি! আর এখন আসছে ষোলো-সতেরো বয়স হইতে হু!
তুষার হঠাৎ শুকনো গিলে মিনমিন স্বরে বলল,
"ওই একই তো হলো! ভাই, আম্মুকে বলে আমাকে বিয়ে করিয়ে দাও না। এই শীতে বউ ছাড়া ভালো লাগে না।
তূর্য চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“বড় ভাই বিয়ে করে বা'স'র করতে পারেনি, আর এই বা*ঙ্গির নাতি বিয়ে করার জন্য কুরকুরানি উঠছে! কুরকুরানির জায়গায় মলম মেখে রাখ, শালা!
"ভাই, আমি তোমার ছোট ভাই শালা নই! চাইলে দুলাভাই বানাতে পারো, আই ডোন্ট মাইন্ড!
শেষের কথা দুষ্টু হেসে বলল। তার মুখে একটা ছলছল হাসি।