মেঘ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দরজা লক করে মনমরা হয়ে রুমের ভেতর বসে আছে। কারও সঙ্গে কথা বলছে না, এমনকি দরজাও খুলছে না। তূর্য নিজে এসে একাধিকবার ডেকেছে কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। জামেলা খাতুন মুখ ভার করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কণ্ঠে জমে থাকা কষ্ট চেপে রেখে বললেন,
- নাতজামাই, আমার নাতিনডারে ভালো কইরা দে। ওর কষ্ট আর সহ্য হয় না আমার। কেমন কইরা কান্দে! মা-বাপ মরা মাইয়াডার কষ্ট কেউ বুঝে না ক্যান?
তূর্য এগিয়ে এসে জামেলা খাতুনের সামনে দাঁড়িয়ে নরম গলায় আশ্বাস দিল,
“দাদিজান! এই বয়সে এত টেনশন কইরেন না, আমি আছি তো। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি থাকতে পিচ্চি আর কষ্ট পাবে না। আচ্ছা, আপনার কাছে আমার একটা কথা জানার আছিল।
- কী জানতে চাস দাদাভাই?
“আমার শ্বশুর আব্বা আর শাশুড়ি আম্মার ব্যাপারে। তবে এখন না, সময়মতো আপনার কাছে আসবো।
- আচ্ছা, আসিস। আর শোন এই শীতে বাইরে খাড়াইয়া থাকবি নাকি? ঘরে যা, দেখ মাইয়া দরজা খুলে নাকি।
তূর্য হালকা হেসে উত্তর দিল,
“হুম! আপনিও গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়প পড়েন, ম্যাডাম। আপনার নাতনিকে সামলানোর জন্য আমি আছি, হোক সোজা আঙুলে কিংবা বাঁকা আঙুলে।
জামেলা খাতুন মুচকি হেসে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। তিনি চলে যেতেই তূর্য ইশারায় জারা'কে কাছে ডাকল। জারা কাছে আসতেই সে ফিসফিস করে বলল,
“শালীকা, যা বললাম তাই-ই করবে। মনে থাকবে তো?
- সব মনে আছে। কিন্তু আমার চকলেট?
“আবার চকলেট?
- চকলেটের জন্যই তো করছি! ওইভাবে তাকানোর কী আছে বাপু? আপনার চাহুনি ভালো না। আপুকে সাবধান করতে হবে।
তূর্য ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে বলল,
“সাবধান করেও লাভ নাই। খুব তাড়াতাড়ি সু-খবর পাবে হুম!
- ঢং বাদ দেন। এখন পর্যন্ত আপু ঠোঁটেই চুম্মা দিতে পারে নাই, আর সু-খবর!
জারা ভেংচি কেঁটে বলে এবং তারপর সে নিজের কাজে মন দিল।
তূর্য ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে শীতের হিমেল বাতাস, ভেতরে নিস্তব্ধতা। সে কণ্ঠ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে ডাকে,
“পিচ্চি! দরজাটা খুলো, বাইরে খুব শীত। এই পিচ্চি…
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। দরজার ওপাশে যেন নিঃশ্বাসও থমকে আছে। তূর্য আরও কয়েকবার ডাক দেয়, কখনো নরম, কখনো একটু জোরে, তবু মেঘে'র কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একসময় সে ঠান্ডা, নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“রুমে ঢুকতে দেবে না তো পিচ্চি? ওকে ফাইন। আজ না হয় সারারাত বাইরে দাঁড়িয়েই থাকবো আমি আর শালীকা…
বাকিটুকু শেষ করার আগেই হঠাৎ দরজাটা খুলে যায়। এক মুহূর্তের মধ্যেই তূর্য কোনো দ্বিধা না করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরক্ষণেই মেঘ তার বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সমস্ত অভিমান, কষ্ট আর জমে থাকা কান্না যেন একসাথে ভেঙে পড়ে। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
“পিচ্চি…!
তূর্য অবাক হলেও তাকে শক্ত করে ধরে রাখে।
মেঘ ভাঙা কণ্ঠে বলে ওঠে,
"সবাই এমন কেন বলুন তো? সবাই আমাকে খারাপ বলছে, তাতে আমার কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু আমার মা’কে কেন বাজে বাজে কথা বলছে? আমার মা খুব ভালো ছিল। আচ্ছা আপনিও কি বিশ্বাস করেন আমার মা খারাপ ছিল?
তার চোখে জল জমে থাকে, দৃষ্টি কাঁপে। তূর্য ধীরে নিচু হয়ে মেঘে'র থুতনি ধরে, চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,
“এসব কী ভাবছো পিচ্চি? মা কখনো খারাপ হয় না। হোক সে তোমার মা কিংবা আমার মা। মাথায় এসব চিন্তা কখনোই আনবে না। আর এত কান্না করছো কেন হুম? আমার পিচ্চি তো স্ট্রং।
এই কথাগুলো শুনে মেঘে'র কান্না ধীরে ধীরে থেমে যায়। সে কোনো কথা না বলে তূর্যে'র বুকে লেপ্টে থাকে। এই জায়গাটায় এসে তার বুকের ভারটা হালকা হয়ে যায়। আশ্চর্য শান্তি লাগে, একটুও কষ্ট নেই। হয়তো এই শান্তিটাই পবিত্র। হঠাৎ তূর্য হালকা হাসফাস করে ফিসফিসিয়ে বলে,
“ওহু ওহু… পিচ্চি, দরজাটা কিন্তু খোলা।
মুহূর্তেই মেঘ সরে দাঁড়ায়। যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসে। সে এক সেকেন্ডের জন্য ভুলেই গিয়েছিল, সে কার বুকে ছিল। তূর্য আবার বলে,
“পিচ্চি, পিপাসা লাগছে। পানি খাবো?
মেঘ নিচু স্বরে জবাব দেয়,
"আপনি বসেন, আমি আনছি।
সে দরজার দিকে পা বাড়াতেই তূর্য তার হাত টেনে ধরে।
“অনেক রাত হয়েছে। এখন কাউকে ডাকার দরকার নেই। চলো, দু’জন টিউবওয়েলের কাছে যাই।
মেঘ একটু ভেবে তার কথায় সায় দেয়। দু’জনে একসাথে বেরিয়ে যেতেই, এই সুযোগেই জারা চুপিচুপি রুমে ঢোকে। তার যা নেওয়ার কথা ছিল, সব গুছিয়ে নেয়। আর তারপর, এক দৌড়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়।
মেঘ রুমে ঢুকেই থমকে যায়। অবাক হওয়ার মতোই দৃশ্য, ঘরের অনেক জিনিসই নেই। মেঝেতে পাতা মাদুর উধাও, বালিশও নেই। পুরো বিছানা জুড়ে পড়ে আছে মাত্র একটি বালিশ। মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তূর্যে'র দিকে তাকায়। তূর্য কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে দরজা বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই এক টানে মেঘ'কে নিজের বাহুতে টেনে নেয়।
মেঘ নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। রাগে গলা কর্কশ হয়ে যায়।
"এই আপনি কী খান, বলুন তো?
তূর্য ফোঁস করে হেসে বলে,
“কেন? তুমিও খাবে নাকি?
"আমি কি বলেছি আমি খাবো? আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছি, আপনার শরীরে এত শক্তি আসে কোথা থেকে? আপনি এক হাত দিয়ে আমাকে ধরে রেখেছেন, অথচ আমি দু’হাত দিয়েও নিজেকে ছাড়াতে পারছি না!
তূর্য মেঘে'র কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
“আপনার শরীরে ভিটামিনের বড় অভাব, ম্যাডাম! স্পেশাল ভিটামিন শরীরে না পরলে এমন শক্তি আসবে না।
মেঘ রাগে ফুঁসে ওঠে।
" ভণ্ডামি করছেন আমার সঙ্গে? আমি ভিটামিন-এ থেকে জেড পর্যন্ত সব খাই। আর আপনি বলছেন ভিটামিনের অভাব?
তূর্যের ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে,
“শোনো পিচ্চি, সব ভিটামিন টেস্ট করলেও আমি নামক স্পেশাল ভিটামিনটা এখনো টেস্ট করোনি। তাই তোমার শরীরেও শক্তি নেই।
"আপনাকে তো....
তূর্য মাথা কাত করে আওরায়,
“চুমু দেবে দাও! অনেক দিন হলো মিষ্টি কিছু খাই না, বউ চুমু দিলে সেটা তো আরো স্পেশাল হয়ে যাবে।
"মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে কিন্তু?
“তাহলে একটু জরিয়ে ধরি! ট্রাস্ট মি এক মিনিটেই মাথা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
"আপনি কি মুখ বন্ধ রাখতে পারেন না?
“পারি, তবে বউ চুমু না দিলে পারি না। একটা দিলে আগামী এক ঘন্টা টু শব্দও করবো না গড প্রমিজ!
বলেই তূর্য নিজের ঠোঁট জোরা মেঘে'র দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। মেঘ ততক্ষণে তূর্য ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। সে রাগে গজগজ করতে করতে বলে উঠে,
"নির্লজ্জ লোক! বেশি বাড়াবাড়ি করলে কেঁচি দিয়ে কেঁটে দেবো, তাতে যদি একটু লজ্জা হয়।
তূর্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“একবার কাঁটছি তাতেই লজ্জা হলো না, দ্বিতীয়বার আর কতো লজ্জা হবে! তুমি চাইলে তোমার লজ্জাও ভেঙে দিতে পারি ট্রাই করবো?
মেঘ কপাল ভাঁজ করে উঠে,
"ভাই আমি নাকের কথা বলছি?
তূর্য তাজ্জব বনে যায়। সে কি বলবে ভেবে পায় না। কিন্তু মেঘে'র সঙ্গে কথায় হারলেও চলবে না, কিছু সময় নিরবতা থেকে আবারও বলে ...
“আমিও তাই বলছি। আচ্ছা শুনো না একটা কথা বলার ছিল,
"পজিটিভ হলে বলেন আর এতো ঘেঁষা ঘেঁষি আমার পছন্দ নয় দূরে থাকেন।
তূর্য ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে আওরাল,
“আমার না ইদানীং পাপ্পা ডাক শুনতে খুব ইচ্ছে করছে। তাই আমি....
"ওখানেই থামুন। আপনার সাথে এক ঘরে থাকছি, খাইয়ে দিচ্ছি, ফ্রী হয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছি মানে এই নয় আমি সব ভুলে গেছি। আপনি যেটা চান সেটা কোনো দিনই সম্ভব নয়, আপনাকে আমি কোনোদিন ভালোবাসবো না। নেহাত সবাই কষ্ট পাবে বলে কাউকে সত্যি জানায়নি তবে ঢাকা ফিরে আমাদের সম্পর্ক ইতি টানবে মনে রাখবেন।
মূহুর্তেই তূর্য'র বুকটা হা হা করে উঠলো। সে অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো, মেঘ সেদিকে না তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে রয়।
"আচ্ছা আপনি এ বালিশে ঘুমিয়ে পড়ুন আমি মেঝেতে কোনো রকম শুয়ে পড়ছি।
তূর্য মেঘে'র হাত আচমকা টেনে ধরে এবং খুব ধীর কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
“আমাদের সম্পর্ক যেহেতু আর কয়েক দিনের তাহলে শেষ কয়েকদিনের জন্য আমার হয়ে থাকবে? তেমন কিছু করবো না, জাস্ট তোমাকে জরিয়ে ধরে শেষ মূহুর্ত গুলো কাটাতে চাই প্লিজ পিচ্চি প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ!
মেঘ মানা করতে চেয়েও পারলো না। মানুষটা তাকে অবহেলা করে চলে গেলেও, সেই অসহায় কণ্ঠস্বরের কাছে সে হেরে যায়। আর ক’টা দিনই তো, চাইলে চোখের পলকেই কেটে যাবে। এই ভেবে নিজেকেই সান্ত্বনা দেয় মেঘ। মেঘ শুয়ে পড়তেই তূর্য ধীরে তার গলায় মুখ গুঁজে দেয়। হঠাৎ করে মেঘে'র নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। হাত দুটো অজান্তেই কেঁপে ওঠে ভীষণভাবে। ভয়, দ্বন্দ্ব একসাথে বুকের ভেতর গুলিয়ে যায়। তবু আশ্চর্যভাবে মনের কোথাও একটা শান্তি নেমে আসে। অনেক দিন পর যেন সে নিজেকে একটু নিরাপদ অনুভব করে। কিছু সময় পর মেঘ ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়।
কিন্তু তূর্যে'র চোখে ঘুম নেই। সে নিঃশব্দে মেঘে'র নিঃশ্বাসের ওঠানামা দেখে। বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো কথা আর চাপা দীর্ঘশ্বাস একসময় ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে,
“পিচ্চি সত্যি তুমি কি আমাকে ভালোবাসবে না? আমার ভুল গুলো ক্ষমা করবে না? এই নিকৃষ্ট মানুষটাকে একবার আপন করে নেবে না? আমি চেষ্টা করবো, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে চাইবো৷ ইনশাল্লাহ্ আমার ভালোবাসা সত্য হলে তোমাকে আমি নিজের করে পেয়ে যাবো!
উঠানের জোসনা রাতে, তুষার অপেক্ষা করছে সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটার জন্য। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, চারপাশে নীরবতা, শুধু দূরে দূরে গাছের পাতা হালকা ফিসফিস করছে। কিছু সময় পর বৃষ্টি এদিক ওদিক করতে করতে বেরিয়ে আসে। তার চোখে কৌতূহল আর কিছুটা উদ্বেগ। সে তুষারে'র সামনে দাঁড়াতেই তুষার ধীরে, একটানা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি'কে নিজের পাশে বসিয়ে নেয়।
বৃষ্টি একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করে,
- তুষার ভাইয়া, এতো রাতে এখানে আসতে বললে কেন? কোনো দরকার ছিল? তুমি ঠিক আছো তো? জ্বর বা অসুস্থতা তো হয়নি?
বৃষ্টি’র এতো প্রশ্নে তুষার মুচকি হেসে ওঠে। তার চোখে যেন অজানা আলো ঝলসে ওঠে। ধীরে ধীরে সে বৃষ্টি’র হাত নিজের হাতের ভাঁজে ঢুকিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। জোসনার নরম আলোতে তাদের ছায়া মিশে একাকার হয়। নীরবতা চারপাশে ভেসে থাকে, কিন্তু তার মধ্যে আছে এক অদ্ভুত শান্তি। কথা না বললেও অনুভূতির ভারে বাতাস যেন ভারাক্রান্ত। বৃষ্টি একটু অবাক, একটু লাজুক, আর তুষার এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেছে। শুধু তারা দু’জন, শুধু জোসনার আলো, এবং গভীর রাতের নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ তুষার বৃষ্টি'র দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
"বুড়ি তোকে কিছু কথা বলতে ডেকেছি।
- হুম বলো।
সে দু'হাত দিয়ে বৃষ্টি'র গাল ছুঁয়ে বলল,
"তুই তো জানিস বুড়ি আমি হেয়ালি কথা একদম পছন্দ করি না। আমি যা বলবো ডিরেক্ট বলবো, তোকে অনেক দিন হলো একটা কথা বলতে চাচ্ছি কিন্তু বলার সাহস হয়ে উঠেনি। তবে এখন আমার মনে হচ্ছে সময়ের কাজ সময়ে করতে হয় নয়তো ভাইয়ের মতো আমাকেও আফসোস করতে হবে।
বৃষ্টি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না তুষার আসলে কি বলতে ডেকেছে। তুষার বড় বড় শ্বাস ছেড়ে আকুতি স্বরে আওরায়,
"ভালোবাসি বুড়ি, তোকে অনেক ভালোবাসি! বিশ্বাস কর আমার এই অনুভূতি এক দিনের নয়, তোকে ছোট থেকেই আমার পছন্দ কিন্তু কখনো তোকে বলিনি। তুই যখন খুব ছোট ছিলি তখন থেকেই তোকে আমার ভালো লাগে, তোর সাথে কাটানো প্রতিটি মূহুর্ত আমার কাছে স্পেশাল। তুই এখন বলতেই পারিস আমার মতো বেকার , ফেইল করা ছেলে তোর পছন্দ নয়।
ট্রস্ট মি, তোকে আমার করে পেলে আমি চাকরি করবো। এসব বাজে আড্ডায় আর যাবো না, হ্যাঁ আমি পড়াশোনায় একটু দুর্বল কিন্তু এটা তুই মানিয়ে নিতে পারবি না? তুই চাইলেই পারবি, আর হলো মেয়েদের সাথে কথা বলা। আমি সত্যি ফোনে কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলি না, শুধু তোকে দেখানোর জন্য সামনাসামনি একটু কথা বলি। তাতেও যদি তোর বিশ্বাস না হয় তাহলে, এই নে আমার ফোন আমি আর ফোন'ই চালাবো না। তবুও তুই আমার হয়ে যা বুড়ি। তোকে অনেক ভালোবাসবো, আগলে রাখবো, একটুও আঘাত পেতে দেবো না। আমি খালুজানে'র মতো একটুও হবো না, আমাদের যখন ঝগড়া হবে তারপর আমরা আবার সব মিটমাট করে নেবো তবুও তুই আমার হয়ে যা প্লিজ!
তুষারে'র কথা শুনে বৃষ্টি একদম বরফ হয়ে যায়। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার কথা শুনছে,
"অনেক ভালোবাসি তোকে বুড়ি! আমি তোকে কোনো কিছুর বিনিময়ে হারাতে চাই না। তুই আম্মু'কে নিয়ে টেনশন করিস না, আমি আম্মুর পায়ে ধরে হলেও রাজি করবো। তুই শুধু এখন বল তুই আমার, আমি ব্যতিত অন্য কারো হবি না। আর তোর যত ইচ্ছে পাড়তে পারিস আমি মানা করবো না। বল না তুই আমারই থাকবি।
হুট করে বৃষ্টি উঠে দাঁড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে তুষার ও। বৃষ্টি মাথা নিচু করে নরম স্বরে বলল,
- তুষার ভাইয়া আমি তোমার প্রস্তাবে রাজি নয়। তুমি জানো আমি প্রেম টেম পছন্দ করি না তবুও? ইভেন আমি কখনো এসব কাজ করবোও না।
মূহুর্তেই তুষারে'র বুক ছাঁৎ করে উঠে। সে এমন কিছু ভেবেছিল কিন্তু এটা যে সত্য হবে এটা জানতো না। যে কারণে এতো গুলো বছর নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রেখেছিল আজ তাই হলো।
"বুড়ি এমন করে বলিস না। আমি সত্যি সত্যি তোকে ভালোবাসি, তোকে ছাড়া আমি বাঁচবো না কেন বুঝিস না।
- সম্ভব নয় তুষার ভাইয়া!
"কেন সম্ভব নয়? আচ্ছা বল আমি কি করলে তুই আমার হবি? তুই যা চাস তাই হবে, দরকার হলে আমি আমি ক'লি'জা বের করে দেবো তবুও তুই অন্য কারো হওয়ার কথা বলিস না। আমি সহ্য করতে পারছি না, অনেক কষ্ট হচ্ছে।
- তুষার ভাইয়া নিজেকে শক্ত করো। যেটা হওয়ার নয় সেটা ভাবতে নেই। তাছাড়া আমি আর তুমি ভাই....
তুষার হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠে,
"বুড়ি! তুই আমাকে নাই ভালোবাসতে পারিস কিন্তু তুই আমার বোন কোনদিনই ছিলি না। তোকে আমার বউ বানানোর স্বপ্ন দেখেছি আর তুই সেই পবিত্র সম্পর্কে ভাই বোন বলতে চাচ্ছিস?
আচমকা বৃষ্টি তুষারে'র পেটে চিমটি দিল। সে ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো, তা দেখে বৃষ্টি ভেংচি কাটে।
- আমার সামান্য চিমটি সহ্য করতে পারো না তাহলে আমাকে সারাজীবন সহ্য করবে কিভাবে? আর এতোক্ষন ধরে আজাইরা পেঁচাল না পেরে এইটুকু বললেই তো হতো,
“বুড়ি তোকে আমার বউ বানাতে চাই ! বউ হবি আমার?
যা বলার তা না বলে তুই আমার, তুই অন্য কারো হওয়ার কথা বলিস না ব্লা ব্লা ব্লা। তুমি এতো গাঁধা কেন বল তো? তোমার সাথে বিয়ের আগে প্রেম করতে চাই না, আমি শুধু এইটুকু বুঝাতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি, তুমি সত্যি একটা পাগল।
সঙ্গে সঙ্গে তুষার বৃষ্টি'কে ঝাপটে জরিয়ে ধরে। কাঁদু কাঁদু কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,
"তুই সত্যি আমার বউ হবি বুড়ি?
- নাহহ!
"কিহহহহ? সত্যি আমার বউ হবি না? ভালোবাসি কিন্তু।
বৃষ্টি মুখ বাকিয়ে আওরায়,
- তাতে আমার কি? বিয়ে করে ঘরে তুললেই মানবো ভালোবাসো নয়তো মানছি না।
"সত্যি?
- হুম!
"চল তাহলে এখনি বিয়ে করি?
- ওহু, আগে খালামুনি'কে সহ বাড়ির সবাইকে রাজি করাও তারপর। সবাই রাজি হলেই আমি রাজি নয়তো....
"নয়তো পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করবো তবুও অন্য কারো হতে দেবো না। আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলতো?
- কি?
"তুই আগেই জানতি আমি তোকে ভালোবাসি তাই না?
বৃষ্টি এক গাল হেসে বলে,
- তোমার মতো আমি গাধা নাকি যে কিছু জানবো না। এমনি এমনি আমার তুষার ভাইয়া কাউকে চকলেট, চুরি গিফট করে না হু।
তুষার বৃষ্টি'র থুতনিতে আলতো চুমু দিয়ে মুচকি হেসে বলে,
"জাস্ট বিয়ে'টা হতে দে তারপর বুঝাবো এই গাঁধা কি কি করতে পারে হুম!