হসপিটালের করিডোর জুড়ে তখনো সেই ভারী, দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা! যেন বাতাস পর্যন্ত শব্দ করতে ভুলে গেছে। সাদা দেয়াল, নীল আলো আর দূরে ভেসে আসা মনিটরের একটানা বিপ… বিপ… শব্দ। সব জায়গায় যেন মৃত্যুর গন্ধ লেগে আছে চারদিকে একদিকে ICU–র ভেতরে তূর্য মৃত্যুর সঙ্গে শেষ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা শ্বাস যেন ধার করা, প্রতিটা সেকেন্ড অনিশ্চিত। অন্যদিকে পাশের কেবিনে মেঘ অচেতন হয়ে পড়ে আছে—নিস্তেজ দেহ, ফ্যাকাসে মুখ, চোখের পাতায় জমে থাকা না বলা হাজারো কথা। পুরো চৌধুরী মহল আজ শোকের চাদরে মোড়া। কারো চোখে হাসির লেশ নেই, কারো মুখে কথা নেই। সবাই যেন নিজের ভেতরেই ভেঙে পড়েছে। রেখা চৌধুরী দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে আছে। শক্ত করে চোখ বন্ধ করে আছে, তবুও চোখের কোণ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। মাত্র একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য ছেলেটাকে কম কষ্ট তো দেয়নি সে! আজ সব বুঝেও কিছু করার নেই। মা হয়েও সে অসহায়।
তুষার এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সে কথা বলতে পারছে না। গলার ভেতর যেন পাথর আটকে আছে। মেঘে’র উপর প্রচণ্ড রাগ জমে আছে তার বুকে। একটাবার কি ক্ষমা করা যেত না? একটাবার কি ভাইটার হাত ধরে সব ঠিক করা যেত না? শুনেছে মনের জোর থাকলে মানুষ নাকি মৃত্যুর দোরগোড়া থেকেও ফিরে আসে। কিন্তু যে মানুষ নিজের প্রিয় মানুষটাকেই হারানোর ভয় নিয়ে বেঁচে থাকে, সে কি আদৌ বাঁচতে চাইবে? তুষার জানে, তূর্য এমনই এক মানুষ।
ঠিক সেই সময়, পাশের কেবিনে হালকা নড়াচড়া।
মেঘে’র চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। ধীরে ধীরে সে চোখ খুলে চারপাশে তাকায়। সবকিছু অচেনা, মাথাটা ঝিমঝিম করছে। পাশে বসে থাকা বৃষ্টি'কে দেখে তার বুকটা হু হু করে ওঠে। বৃষ্টি'র চোখ বেয়ে নিঃশব্দে পানি পড়ছে, সে কিছু বলছে না, শুধু মেঘে’র হাতটা শক্ত করে ধরে আছে।
হঠাৎ তূর্যে'র কথা মনে পড়তেই মেঘে'র বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট একসাথে ভেঙে পড়ে। সে ডুকরে কেঁদে ওঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
"মামনি....
কিছু বোঝার আগেই সে নামতে গিয়ে বেড থেকে নিচে পড়ে যায়। মেঝেতে পড়ার সাথে সাথে তীব্র ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে শরীরে, কিন্তু সে ব্যথার দিকে তাকায় না। চোখে তখন শুধু একটাই দৃশ্য, ICU’র দরজা। মেঘ হোঁচট খেতে খেতে উঠে দাঁড়ায়, ছুটতে শুরু করে ICU’র দিকে। পায়ের যন্ত্রণা, শরীরের দুর্বলতা কিছুই তাকে থামাতে পারে না। তার প্রতিটা দৌড়ে শুধু একটাই প্রার্থনা, সে৷ বেঁচে থাকুক! বৃষ্টি পিছন থেকে ছুটে আসে, আতঙ্কে গলা কেঁপে ওঠে তার।
– মেঘু আস্তে যা! ব্যথা পাবি!
কিন্তু মেঘ শুনছে না। ICU’র দরজার সামনে এসে সে থমকে দাঁড়ায়। কাঁচের ওপাশে শুয়ে থাকা মানুষটাকে একবার দেখার জন্য তার বুক ফেটে যাচ্ছে। চোখ ভিজে ঝাপসা হয়ে আসে, ঠোঁট কাঁপতে থাকে। হাসপিটালের সেই করিডোরে তখন শুধু কান্না আর অপেক্ষা।
আর মৃত্যুর সাথে লড়াই করা এক ভালোবাসার নাম—
মেঘ ICU–র দরজার সামনে যেন নিজের শেষ নিয়ন্ত্রণটুকুও হারিয়ে ফেলে। দু’হাত দিয়ে দরজাটা বারবার জোরে ধাক্কাতে থাকে, যেন দরজার ওপাশে থাকা মানুষটাকে টেনে আনতে চায়। কাঁচের ভেতর কী হচ্ছে সে দেখতে পাচ্ছে না, তবুও তার বুকের ভেতর থেকে একটা আর্তনাদ বারবার উঠে আসছে, ওখানে তূর্য আছে, ভয়ানক কষ্টে আছে। তার চিৎকারে কয়েকজন নার্স দৌড়ে আসে। তারা মেঘ'কে ধরে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
- ম্যাম, প্লিজ! আপনি এখানে থাকতে পারবেন না। দয়া করে শান্ত হোন!
কিন্তু মেঘ নড়তে নারাজ। শরীরে যেন হঠাৎ করে অদ্ভুত এক শক্তি ভর করেছে। কান্নায় গলা ভেঙে সে চিৎকার করে উঠে,
"আপনারা বুঝতে পারছেন না কেন? ওনি এটার ভেতরে আছে! আমি ওনার কাছে যাবো… ওনি কষ্ট পাচ্ছে, খুব কষ্ট পাচ্ছে!
নার্সদের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে সে বৃষ্টি'র দিকে তাকায়। চোখে তখন অনুনয় স্বরে বলল,
"বৃষ্টি, এদের বল আমার পথ থেকে সরে যেতে। আমি কারো কথা শুনবো না। আমি যাবোই ওনার কাছে।
এই অবস্থার মাঝেই হঠাৎ করিডোরের এক প্রান্ত থেকে রেখা চৌধুরী দৌড়ে আসে। মেঘ'কে দেখে আর দেরি করে না—সরাসরি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয় বাহুতে। সেই পরিচিত মায়ের স্পর্শ পেতেই মেঘ যেন ভেতর থেকে পুরো ভেঙে পড়ে। তার কান্না তখন আর চাপা থাকে না। সে মুখ তুলে রেখা চৌধুরী'র দিকে তাকায়, চোখ দুটো পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে। কাঁপা কণ্ঠে বলে—
"মামনি… তুমি এসেছো? দেখো তোমার ছেলে আমাকে একা করে দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমাকে কিছু না বলে, কিছু না বুঝিয়ে… আমি ওনাকে ভালোবাসি মামনি, খুব খুব খুব ভালোবাসি। তবুও কেন এমন করছে? আমি কি এতোটাই খারাপ?
রেখা চৌধুরী নিজের চোখের পানি মুছে কোনোমতে শক্ত থাকার চেষ্টা করে। বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে গেলেও শান্ত কণ্ঠে বলে,
– মা, একটু শান্ত হ। আমি বুঝতে পারছি তোর কষ্টটা। কিন্তু দরজার ওপাশে যাওয়া যাবে না মা। ডক্টর'রা চেষ্টা করছে তো।
এই কথা শুনেই মেঘ হঠাৎ রেখা চৌধুরী'র বুক থেকে সরে আসে। তার চোখে তখন শুধু প্রতিবাদ আর ক্ষোভ।
"কেন যাওয়া যাবে না? আমি তো তোমার ছেলের বউ! তাহলে কেন আমাকে যেতে দেবে না? আমি ওনার স্ত্রী… আমি যাবো! আমাকে যেতে দিতে বলো!
বৃষ্টি ছুটে এসে মেঘের হাত ধরে। চোখ ভেজা, গলা কাঁপছে…
- মেঘু, এমন করিস না প্লিজ। ভাইয়ার অবস্থা এমনিতেই খুব ক্রিটিকাল। তুই এমন করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ডক্টর'দের নিজেদের কাজ করতে দে নয়তো ভাইয়া আমাদের ছেড়ে...
বৃষ্টি আর কথা শেষ করতে পারে না। গলাটা আটকে আসে, চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। মেঘ ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টি এতটাই রক্তিম আর হিংস্র যে বৃষ্টি শিউরে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই মেঘ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে,
"আসবি না আমার কাছে!তুই চাস না আমার ওনি ফিরে আসুক? কেন চাস না বল? আমার কষ্ট তোদের কাছে কিছুই না, তাই না? আমার বুক ফেঁটে যাচ্ছে, আর তোরা শুধু নিয়মের কথা বলছিস!
কেউ কিছু বোঝার আগেই মেঘ সবার মাঝখান দিয়ে ছুটে গিয়ে তাজিম চৌধুরী'র পা জড়িয়ে ধরে। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সে উম্মাদের মতো করে কাঁদতে থাকে। করিডোরে থাকা সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তবুও বলে,
"বাবাই ও বাবাই তোমার ছেলেকে আমার কাছে ফিরে আসতে বলো না। আমার দম বন্ধ লাগছে বাবাই। এতো গুলো বছর কষ্ট দিয়ে ওনি শান্তি পায়নি। এখন আবার সেই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে নতুন করে ঘা তৈরি করছে কেন? ওনাকে ফিরে আসতে বলো বাবাই। বলো না, আমি ওনাকে ছাড়া কিভাবে থাকবো বলল? আমার দুনিয়াতে ওনিই সব… ওনি না থাকলে আমি বাঁচবো কীভাবে?
মেঘে'র এই আকুতি শুনে পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কারো মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হয় না। কেউ ভাবতেও পারেনি, একটা মানুষ ভালোবাসার জন্য এতটা পাগল হয়ে যেতে পারে। হসপিটালের সেই ঠান্ডা করিডোরে তখন শুধু একটাই শব্দ— একজন নারীর অসহায় কান্না, আর মৃত্যুর সাথে লড়াই করা এক ভালোবাসার অপেক্ষা।
তাজিম চৌধুরী মাথা নিচু করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়লেও সে আর তাকাবে না। চোখের সামনে নিজের ছেলের জীবন-মরণ যুদ্ধ, আর পায়ের কাছে তার মেয়ের উন্মত্ত আর্তনাদ, যেন তাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছে। মেঘ তার পা আঁকড়ে ধরে বারবার ঝাঁকুনি দেয়, যেন এই ঝাঁকুনিতে কোনো অলৌকিক উত্তর বেরিয়ে আসবে।
"বাবাই…শুনছো না? ও বাবাই একটা কথা না বলো প্লিজ।
কিন্তু তাজিম চৌধুরী'র ঠোঁট কাঁপে না, চোখও ওঠে না। তিনি মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে থাকেন। নিঃশব্দে, অসহায়ভাবে।
কোনো উত্তর না পেয়ে মেঘে'র ভেতরের শেষ শক্তিটুকুও ভেঙে পড়ে। সে হঠাৎ উঠে এসে রেখা চৌধুরী'র বুকে লেপ্টে যায়। দু’হাতে শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে হাওমাও করে কাঁদতে থাকে। তার কান্না তখন আর কেবল কান্না নয়, সেটা যেন বুক ছিঁড়ে বের হওয়া আর্তনাদ। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার, কথাগুলো টুকরো টুকরো হয়ে বেরিয়ে আসে।
"মামনি আমার বুকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ ভেতর থেকে চেপে ধরছে, আমি পারছি না মামনি, একটুও পারছি না।
রেখা চৌধুরী তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। নিজের চোখ ভিজে গেলেও তিনি চেষ্টা করেন শক্ত থাকতে। কিন্তু মেঘ তখন নিজের ভেতরেই ডুবে যাচ্ছে। মেঘ কাঁপতে কাঁপতে আবার বলে—
"আমি কি করবো এখন মামনি? আমাকে বলো না, আমি কি করবো? এই যন্ত্রণার থেকে আমাকে মুক্তি দাও নয়তো ওনাকে আমার করে দাও মামনি।
মেঘে'র আত্ম চিৎকার পুরো হসপিটাল কাঁপিয়ে তুলে। এতোটা অসহায় তাকে কখনো কেউ দেখেনি।
"মামনি তোমার ছেলেকে উঠতে বলো না। আমি ভালোবাসি ওনাকে, ওনি তো এটাই শুনতে চেয়েছে তাই না। তাহলে এখন কেন উঠছে না, আপনি এতোটা স্বার্থপর হবেন না, আমি সহ্য করতে পারছি না। ও মামনি তোমার ছেলেকে আমার হাহাকার বুক শান্ত করতে বলো না, আমি তার সাথেই সংসার করবো। সারাজীবন তার সঙ্গ ছাড়বো না, বলো না আমার কাছে ফিরে আসতে। আমার ভিষণ কষ্ট হচ্ছে, মামনি আমি সত্যি সত্যি মরে যাবো ওনাকে না পেলে। ওনি কেন বুঝতে পারছে না, আমার ওনাকে চাই মানে চাই!
মেঘ আবারও নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়। চোখ দুটো লাল, শরীর কাঁপছে, তবুও সে এক পা এগিয়ে দেয় ICU–র দিকে। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ হেঁচকা টান দিয়ে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। মুহূর্তের মধ্যেই— ঠাসসস! ঠাসসস! করে পরপর তীব্র থাপ্পড় এসে পড়ে মেঘে'র গালে। শব্দটা করিডোরের নিস্তব্ধতায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে।
মেঘ হতভম্ব হয়ে লোকটার দিকে তাকায়। ভয় আর বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে তুষার। চেনা মুখ, কিন্তু অচেনা দৃষ্টি। চোখে যেন আগুন জ্বলছে, চোয়াল শক্ত করে ধরা, বুক ধুকপুক করছে রাগে।
মেঘ কিছু বলার আগেই তুষার গর্জে ওঠে,
- অনেক হয়েছে, আর নয় মেঘু! তুই কি আমার ভাইকে বাঁচতে দিবি না? আজ যদি আমার ভাইয়ের কিছু হয়, তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম। আচ্ছা বল তো, মানুষ জীবনে তো কত ভুল করে, তার জন্য কি সারাজীবন তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়? তুই কি পারতি না একবার আমার ভাইকে ক্ষমা করে দিতে? একটুখানি ভালোবাসতে পারতি না?
তুষার হেসে ওঠে, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই,শুধু তিক্ততা।
- সময় থাকতে যদি মূল্য দিতিস, তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না। সব সময় একটাই কথা,
‘আপনি আমার কেউ না, আমি আপনার সঙ্গে থাকবো না, আপনাকে আমি ভালোবাসি না।
তাহলে আজ কেন ভালোবাসার কথা বলছিস বল? ভাইয়ের যতটুকু বেঁচে থাকার আশা ছিল, তুই ছেড়ে চলে যাবি বলে, এই ভয়ে সেইটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে।
মেঘ ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে। একটা শব্দও বের হয় না। বুকের ভেতর যেন কেউ পাথর চাপা দিয়েছে। তুষার মিথ্যা বলছে না,
- অনেক চুপ করে থেকেছি, আর নয়। তুই জানিস তোর এত স্ট্রং হওয়ার পেছনে কে আছে? কে তোকে আড়ালে থেকে সাহস দিয়েছে? কে তোকে বারবার বিপদ থেকে টেনে তুলেছে? তোর সাথে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে, পরের দিন সে কেন তোর পা ধরে মাফ চেয়েছে জানিস?
তুষারের কণ্ঠ তীক্ষ্ণ হয়।
- তোর গায়ে কেউ হাত তুললে, তাকে হাজারটা আঘাত কে করেছে জানিস? কয়েক মাস আগে আমাদের সেই ক্লাসমেট তোকে থাপ্পড় দিয়েছিল, সেই ছেলেটা এখনো কেন বিছানা থেকে উঠতে পারছে না জানিস? এই সবকিছুর পেছনে ভাই আছে, ভাই!
মেঘ কথাটা শোনা মাত্র কয়েক ধাপ পিছিয়ে যায়। বুক ধকধক করতে থাকে, মাথা ঘুরে ওঠে। তার চোখে আতঙ্কে, তুষার আবারও চিৎকার দিয়ে উঠে,
- যে ভাই আমার অসহায় নারীদের পাশে দাঁড়ায়, সেই ভাই কি নিজের বিয়ে করা বউ'কে রেখে পালিয়ে যাবে? সে তোকে আগে থেকেই পছন্দ করতো কিন্তু তুই ভাইয়ের থেকে খুব ছোট বলে আম্মুকে বিয়ের কথা বলতে চেয়েও পারেনি। তোদের বাসার যাওয়ার কথা হলে ভাই সবার আগে ব্যাগ গুছিয়ে রাখতো। বিশ্বাস না হলে আম্মুকে জিজ্ঞেস কর? তাহলে ভাব সে কেন তোকে রেখে পালিয়ে যাবে?
তোকে বিয়ে করতে না চাওয়া, বা’স’র রাতে নেশা করে বাজে কথা বলা, এসব কিছুই ভাই ইচ্ছে করে করেছে। যে ভাই কোনোদিন সিগারেট পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখেনি, সে নেশা করবে? হাও ইজ দিস পসিবল? শুধু তোকে সাহসী বানানোর জন্য ভাই এমন করেছে। যেন তুই নিজের লড়াই নিজে লড়তে পারিস। যেন কেউ তোকে ছোট মনে না করে। আর সেই তুই বলছিস, ভাই তোকে একা রেখে পালিয়ে গিয়েছিল?
মেঘ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। সে এতোদিন যা ভেবেছে সব মিথ্যা ছিল। কই কেউ তো তাকে এই সত্য কোনোদিন বলে নি।
তুষার দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে আবার কথা বলতে শুরু করে। সেই শ্বাসে জমে আছে বহুদিনের চাপা কষ্ট, অপরাধবোধ আর ভাইকে হারানোর ভয়। এবার তার কণ্ঠ আর আগের মতো কঠিন নয় ভাঙা, ক্লান্ত, ভারী।
- সেদিন তোর উপর এমন বাজে এলিগেশন দেওয়ার জন্য হয়তো রাগের মাথায় ভাই তোকে একটু বেশিই কষ্ট দিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু বিশ্বাস কর, ওটা ভাইয়ের মনের কথা ছিল না। ভাই তোর উপর একটু রেগেছিল। কারণ তুই সব সময় এদিক-ওদিক ছেটাছোটি করতি, কারো কথা শুনতি না। নিজেকে কোনো কিছুর ধার না দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতি। নিজের সম্মান নিজেকেই রক্ষা করতে হয় অথচ তুই সেসব বুঝতি না, তোকে অনেক বার বলা হয়েছে কেউ ডাক দিলেই যাবি না কিন্তু তুই সব সময় নিজের জেদে অটল।
ভাই ভেবেছিল তোকে একটু কষ্ট দিলে তুই হয়তো বুঝবি, নিজের দিকে খেয়াল রাখবি। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, সেই কষ্টের পরিণাম এতটা ভয়ংকর হবে। ভাইয়ের সব কথা আমি জানি মেঘু, সব। যেদিন ভাই দেশ ছেড়ে চলে যায়, সেদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছিল। একদম বাচ্চার মতো। সে যেতে চায়নি। একদমই চায়নি। কিন্তু তখন আর কোনো উপায় খুঁজে পায়নি। চারদিক থেকে দেয়াল উঠে গিয়েছিল।
কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে তার!
- সেদিন ভাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিল। পরে আবার ফিরে আসতে চেয়েছে… বহুবার। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাই সে অপেক্ষা করেছে। তোর আঠারো বছর হওয়া পর্যন্ত। এর আগেও আমি তোকে সব সত্যি বলতে চেয়েছি। কিন্তু ভাই আমাকে মানা করে দিয়েছিল। ভেবেছিল, সময় দিলে আবার তোর মন জয় করতে পারবে। আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু ভাই এটা জানতো না… মন এমন একটা জিনিস, যা একবার ভেঙে গেলে আর কোনোদিন আগের মতো জোড়া লাগে না।
কথাগুলো বলেই তুষার চুপ করে যায়। মেঘ যেন নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলে। পা দুটো অবশ হয়ে আসে, দাঁড়িয়ে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে যায়। বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা হঠাৎ করে ফেটে বেরোতে চায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসে। সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। শুধু চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ে।