বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ২৬

🟢

লন্ডনের রাত কনকনে শীত নিয়ে নেমে এসেছে। আকাশের রং গাঢ় কালো, মাঝে মাঝে মেঘের ফাঁক দিয়ে ফিকে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে শহরের ওপর। দূরে দূরে জ্বলজ্বল করছে স্ট্রিটলাইট, কিন্তু ছাদের এই কোণটায় অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা, শহরের কোলাহলও যেন এখানে এসে থেমে গেছে।

ছাদের ঠান্ডা মেঝের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে আয়ান। পরনে শুধু একটা পাতলা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। শরীর গরম রাখার মতো কোনো শীতের কাপড় নেই, অথচ সে যেন শীতটা অনুভবই করছে না। কনকনে হাওয়ায় তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরের যন্ত্রণা তার চেয়েও বেশি শীতল।

তার পাশেই বসে আছে আসিফ! এই একটা মানুষ— যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আয়ানে'র সঙ্গ ছাড়েনি। আয়ানে'র জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সময়গুলোতে, সবচেয়ে অন্ধকার রাত গুলোতে সে পাশে থেকেছে। যখন আয়ান ভেঙে পড়েছে, যখন নিজেকে সামলাতে পারেনি, তখনো আসিফ ছায়ার মতো লেগে ছিল।

এমনকি রাতে ঘুমানোর সময়ও। আয়ান ওয়াশরুমে গেলেও আসিফ বাইরে দাঁড়িয়ে পাঁচ-ছয়বার ডাক দিত, ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেলে দরজায় টোকা দিত। শুধু এই ভয়ে, যদি তার বেস্ট ফ্রেন্ড কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। হয়তো এটাই বন্ধুত্ব, নিজের সব কাজ, নিজের সব কষ্ট ভুলে গিয়ে আরেকজনের জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।

এখন রাত প্রায় তিনটা!

লন্ডনের বেশিরভাগ মানুষ গভীর ঘুমে, কিন্তু আসিফ এখনো আয়ানে'র পাশে বসে আছে, এই তীব্র শীতের মধ্যেও। তার গায়ে মোটা জ্যাকেট, ততেও ঠান্ডায় কাঁপছে, তবুও উঠে যেতে চাইছে না। আয়ান একা থাকলেই যেন বিপদ।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর হঠাৎ নীরবতা ভেঙে আসিফ কথা বলে ওঠে—

"ভাইরে, এবার অন্তত রুমে চল। এভাবে বসে থাকলে কি তোর কষ্ট কমে যাবে?

আয়ান কোনো জবাব দেয় না। দৃষ্টিহীন চোখে সামনে তাকিয়ে থাকে। যেন এই শীতল রাতের অন্ধকারের মধ্যেই তার সব উত্তর লুকানো। আসিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলে—,

"আমি বুঝতে পারছি, তুই মেঘ'কে ভুলতে পারছিস না। কিন্তু তাকে ভালোবাসাটাও যে এখন তোর জন্য পাপ, সেটা তো জানিস।

আয়ান তবুও চুপ। একফোঁটা শব্দ বেরোয় না তার মুখ থেকে। আসিফ এবার একটু শক্ত কণ্ঠে বলে,

তুই আমাকে বল তো, এভাবে সারাক্ষণ উদাস হয়ে বসে থাকলে কি সব সমস্যা, সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে? না, কোনোদিন না। তোকে বুঝতে হবে ভাই, জীবন কোনোদিন একজনের জন্য থেমে থাকে না। সে মানুষটা যতই প্রিয় হোক, তবুও আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তোকে বুঝতে হবে নিজের জন্য না হলেও আংকেলের কথা ভেবে এগিয়ে যেতে হবে।

মৃদু হাওয়ায় আয়ানে'র চুল এলোমেলো হয়ে যায়। সে ধীরে চোখ বন্ধ করে। মনের ভেতর সুখ না থাকলে কোনো কথা বলতে ভালো লাগে না। তাই সে নিশ্চুপ হয়ে আসিফে'র কথা শুনছে।

আসিফ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে বলল,

"আমি জানি, তুই আংকেলকে ঘৃণা করিস। কিন্তু আমার মনে হয়, তোর এমন পাগলামো করা ঠিক হচ্ছে না। আচ্ছা তুই নিজেই বল, একটা মানুষ, বিশেষ করে একজন পুরুষ, সে কি সত্যিই সঙ্গীহীন থাকতে পারে? আমার তো মনে হয় না। অথচ দেখ, আংকেল ঠিকই থেকেছে। আংকেল আর আন্টি ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। আর তাদের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবেই তুই এই পৃথিবীতে এসেছিলি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে আন্টি অজানা গন্তব্যে চলে গেল। তখন আংকেল চাইলে অনায়াসেই আরেকটা বিয়ে করতে পারত। কেউ কিছু বলত না। কিন্তু সে করেনি, শুধু তোর জন্য!

গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সে একা, পুরোপুরি একা। তোর পাশে এখনো কেউ আছে, আমার কাছে অন্তত তুই নিজের কষ্ট বলতে পারিস, মন হালকা করতে পারিস। কিন্তু আংকেল? সে এতগুলো বছর নিজের সব কষ্ট নিজের বুকের ভেতরেই চেপে রেখেছে। একবার ভাবতে পারিস সে কতটা অসহায়?

যেখানে তোর তার কাঁধে হাত রেখে চলার কথা ছিল, সেখানে তুই তাকে ঘৃণা করছিস, সেটাও না জেনে, না বুঝে একটা ভুলের জন্য। একটাবার আংকেলের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখ। তার নিজের বলতে আর কেউ নেই। একমাত্র তুই ছিলি। এখন তুইও তাকে দেখতে পারিস না, তার সঙ্গে কথা বলিস না, তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকিস না। আচ্ছা বল তো, আজ যদি তোর মা বেঁচে থাকত, তাহলে কি তুই এমনটা করতে পারতিস?

মুহূর্তের মধ্যে আয়ানে'র বুক ধক করে ওঠে। মনে হয় কেউ যেন ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। সে চুপচাপ আসিফে'র প্রতিটি কথা শুনতে থাকে, ভেবে দেখতে থাকে। আসিফ খুব বেশি মিথ্যা বলেনি, এই সত্যিটা আয়ান নিজেও অস্বীকার করতে পারে না। আসিফ আবার বলে ওঠে,

"একজন বাবা যদি ছেলের হাজারটা অন্যায় ক্ষমা করে তাকে বুকে টেনে নিতে পারে, তাহলে তুই ছেলে হয়ে সেটা পারবি না কেন? বিশ্বাস কর, বাবা-মা কখনো ভুল করে না। তারা যা করে, সবই সন্তানের ভালোর জন্যই করে। তাদের সঙ্গে…

হঠাৎ আয়ান কড়া স্বরে বলে ওঠে,

“লেকচার দেওয়া শেষ হলে এবার অফ যা। আর নিতে পারছি না। আগামীকাল তার সঙ্গে দেখা করবো।

"আর…

“হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা, চাচা, মামা। যা যা বলা দরকার, সব বলবো। কিন্তু আজকে দয়া করে মুখ বন্ধ কর।

আয়ান বিরক্ত হলেও কণ্ঠে এক ধরনের ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। হয়তো সে স্বীকার করছে না তবে সেটা তার কথার ধরন বুঝিয়ে দেয়। আসিফ আর কিছু বলে না। শুধু নিঃশব্দে হেসে ওঠে। সে বুঝতে পারছে—তার কথাগুলো অবশেষে আয়ানে'র মনে ঢুকতে শুরু করেছে। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।

আসিফ হালকা কেঁশে হেসে বলল,

"আরেকটা কথা আছে...

আয়ান বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,

“আবার কী?

আসিফ গলায় হালকা আবেগ জড়িয়ে বলল,

"দেখ ভাই, ভালোবাসা মানেই সব সময় পূর্ণতা নয়। অনেক সময় ভালোবেসেও মানুষ ঠকে যায়। যেমন—আমি! কাউকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে এমনভাবে ঠকেছি যে নিজের উপরই বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। কিন্তু জানিস, পরে একজন মানুষ পবিত্র কালেমা পড়ে আমার হাত ধরে আমাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আমি আজ যা, তার পেছনে সেই মানুষটার অবদান সবচেয়ে বেশি। তাই আমি ভাবছিলাম তুই যদি…

কথাটা শেষ করার আগেই আয়ান ক্ষেপে উঠে চেঁচিয়ে বলল,

“শালা! ঘটকগিরি করতে আসছিস? ভাগ এখান থেকে! তোর ওই ত্যাড়ছেঁড়া বোনকে আমি কোনোদিন বিয়ে করবো না।

আয়ানে'র রাগী কণ্ঠে কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঠাসস ঠাসস করে কয়েকটা জোরে আঘাত এসে পড়ল তার মাথায়।

দুজনেই অবাক হয়ে একসাথে পেছনে তাকাল।

তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। চোখেমুখে আগুন জ্বলছে, চোয়াল শক্ত করে বাঁধা। রাগে তার সারা শরীর কাঁপছে। মেয়েটাকে দেখামাত্রই আয়ান চমকে উঠে দাঁড়িয়ে যায়, কিন্তু এক পা-ও এগোতে পারে না। মেয়েটি মুহূর্তের মধ্যেই এগিয়ে এসে আয়ানে'র হাত আঁকড়ে ধরে এবং ফ্যাল ফ্যাল করে কাঁদতে শুরু করে।

এই দৃশ্য দেখে আসিফ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। এটা তার একমাত্র বোন নয়না। আর নয়না যদি একবার কান্না শুরু করে, তবে তার আবদার পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সে থামে না। তাই প্রাণ বাঁচাতে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়। আসিফ পালিয়ে যেতেই আয়ান বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠে বলে,

“এই শালা! তোর এই রাক্ষসী বোনকে নিয়ে যা! এ তো আমার মাথা খেয়েই ফেলবে!

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নয়না হঠাৎ আয়ানে'র হাতে দাঁত বসিয়ে দেয়। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে সে, আচমকা তাকে ছিটকে ফেলে দেয়। নয়না পায়ে একটু বেশি ব্যথা পায়, ঠিক এতেই গলার স্বর দ্বিগুণ বেড়ে যায়।

আয়ান তাড়াহুড়ো করে নয়না'র মুখ চেপে ধরে ফেলে। আশেপাশের দালান থেকে কিছু লোক তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে আয়ান বলে উঠে,

“এই রাক্ষসী, স্টপ! একদম স্টপ! তোর জন্য এখন আমাকে গণধোলাই খেতে হবে নাকি?

নয়না কেঁদে কেঁদে আয়ানে'র হাত সরিয়ে দেয়। চোখ দুটো ভিজে উঠে, কণ্ঠটা কাঁপছে।

"তুমি আমার পায়ে ব্যথা দিলে বাবু…

আয়ান বিরক্তিতে দাঁত কিঁচিয়ে বলে ওঠে,

“ওহ্ শীট! তোকে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ভেঙে ফেলবো কিন্তু! ননসেন্স মেয়ে! তোর থেকে আমি বয়সে এত বড়, আর তুই আমাকে বাবু বলছিস? চুপ কর! কাঁদা বন্ধ কর, বোন!

কথাগুলো যতটা রাগের, তার ভেতরে ততটাই অস্বস্তি। শেষে আয়ান আর কিছু না বলে নয়নার পাশে বসে পড়ে। ঠিক তখনই নয়না'র কান্না হঠাৎ থেমে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ঠোঁটের কোণে একচিলতে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে সে ফিসফিস করে বলে,

"তাহলে বলো, আমাকে বিয়ে করবে? নয়তো আমি আবার কাঁদবো কিন্তু...

আয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ে। চোখ কপালে তুলে বলে,

“তোকে বিয়ে করবো আমি? নো নো! আমার লাইফে এমনিতেই প্রব্লেমের অভাব নেই। এখন তোকে বিয়ে করে নাচতে নাচতে আরেকটা প্রব্লেম ঘরে আনতে চাই না।

পরক্ষণেই নয়না গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করে—

"ভাইয়ায়য়য়য়য়য়

আয়ান আতঙ্কে এদিক–ওদিক তাকায়। মুখে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে,

“ওহ খোদা! এই মেয়ে কি শুরু করলো! আমার মান-ইজ্জত আজ এখানেই শেষ। চুপ কর বোন, চুপ কর! বিয়ে করবো, সত্যি বলছি, করবো! কিন্তু প্লিজ থাম!

নয়না মুহূর্তেই চুপ করে যায়। আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁচে।

"তাহলে চলো বিয়ে করি? নয়না নিরীহ স্বরে বলে।

“এই ওয়েট! বিয়ে করি বললেই তো আর বিয়ে করা যায় না। আমার কিছু শর্ত আছে। সেগুলো মানতে পারলে তবেই বিয়ে।

নয়না এক মুহূর্তও দেরি না করে আনন্দে বলে ওঠে,

"রাজি, রাজি! তোমার সব শর্তে আমি রাজি। শুধু ফিজিক্যাল রিলেশন করবে না বললেই বোম দিয়ে উড়িয়ে দেবো।

আয়ান দাঁতে দাঁত পিষে আওরায়,

“কিহহ? তুই ওইসব করার জন্য বিয়ে করতে চাইছিস?

নয়না তার কথা একদমই পাত্তা না দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নিজের গায়ে জড়ানো চাদরটা আলতো করে আয়ানে'র গায়ে জড়িয়ে দেয়। তারপর তার সামনে বসে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে বলে,

"আরে না! আমি তো তোমায় ভালোবাসি। দেখো না, তুমি কতো কিউট, আমিও কিউট। তো আমাদের দেখতে হবে না, আমাদের বাচ্চা কাচ্চা কতো কিউট হয়। শুধু ওদের কথা ভেবে ওইসব করবো নয়তো এসব পঁচা কাজ আমার একদমই পছন্দ নয়।

নয়না'র কথাটা শুনেই আয়ান খিলখিল করে হেসে ওঠে। এতদিন পর নিজের অজান্তেই এমন করে হাসছে, সে নিজেও খেয়াল করেনি। নয়না চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই হাসিটা সে কতদিন পর দেখছে, তার হিসেব নেই। যে মানুষটার মুখে সবসময় গম্ভীরতা আর বিরক্তির ছাপ লেগে থাকে, সেই মানুষটা আজ তার সামান্য কথায় হেসে উঠেছে—এই ভাবনাটাই নয়না'র বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ ঢেলে দেয়।

আয়ান হাসি থামিয়ে আয়ান মজা করে বলে,

“এত যে বিয়ে বিয়ে করে লাফাচ্ছিস, বিয়ের পর আমাকে সামলাতে পারবি? বয়স কতো তোর, হুম?

নয়না একদম সরল গলায় উত্তর দেয়,!

"বাইশ বছর!

“আমাদের বয়সের ডিফারেন্স কতো জানিস?

নয়না হাতের আঙুলে গুনতে গুনতে একটু সময় নেয়। তারপর নিশ্চিত গলায় বলে,

"তেরো বছর!

আয়ান ভুরু কুঁচকে তাকায়।

“এইটুকু বাচ্চা মেয়ে হয়ে এত বড় দামড়া বেডাকে বিয়ে করবি?

এই কথায় নয়না'র চোখের কোণে জল চিকচিক করে ওঠে। কণ্ঠটা কদমদমে হয়ে যায়।

"তোমার ফুল তো আমার থেকেও ছোট। তার বেলায় কিছু না, আর আমার বেলায় এত কথা! থাক, বিয়ে করতে হবে না। আমি ভাইয়াকে বলে আরেকজন খুঁজে নেবো।

এই বলে নয়না উঠে যেতে চাইলে, মুহূর্তের মধ্যে আয়ান তার হাত টেনে বসিয়ে দেয়।

“বাহ্ বাহ্! যখন চলে যেতে বলতাম তখন আমার মাথায় উঠে বসে থাকতি। আর এখন এইটুকু কথায় এত অভিমান?

নয়না মুখ ঘুরিয়ে নেয়, কিছু বলে না। আয়ান একটু নরম কন্ঠে বলল,

“তার আগে শুনে তো যা, আমি কী কী শর্ত দেবো।

তার কণ্ঠে এবার আর রাগ নেই, আছে এক ধরনের দায়িত্ব আর অজানা টান। নয়না ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায়, চোখের ভেতর কৌতূহল। আয়ান মুচকি হেসে নয়না'র কাঁধে হাত রাখে।তারপর আকাশ পানে তাকিয়ে আনমনে বলে উঠলো—

“একটা কথা জানিস নয়না, ভালোবাসা এমন একটা জিনিস যা সবার ভাগ্যে থাকে না। সবাই নিজের মানুষটাকে হাজার হাজার গুন ভালোবাসলেও তাকে পায় না, প্রতিটি মোনাজাতে তাকে চেয়েও কেউ কেউ তার আপন হয় না। এই আমাকে দেখ, ওকে ছোট্ট ছোট্ট হাত ধরে হাঁটিয়েছি, ওকে যত্ন করে খাইয়ে দিয়েছি কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সে এখন অন্য কারো। সে অন্য কারো আলিঙ্গন হয়ে বেঁচে থাকবে, তার মধ্যে নিজের সুখ খুঁজে নেবো। অথচ তাকে আমি এতোটা চেয়েও পেলাম না, শুনেছি যার ভালোবাসা যত গভীর তাকে নাকি আল্লাহ্ তায়ালা নিজ হাতে তাকে আপন করে দেয়। হয়তো আমার ভালোবাসায় খুঁত ছিল, তূর্য তাকে আমার থেকেও বেশি ভালোবেসেছে। জানিস যখন শুনলাম আমার ফুলে'র বিয়ে হয়ে গেছে তখন মনে হচ্ছিল সেই ভাগ্যবান লোকটিকে নিজ হাতে খুন করি, এমন ভাগ্য আমার হলো না কেন?

পরে যখন জানতে পারলাম ওই ভাগ্যবান লোকটি আমার ছোট ভাই, বিশ্বাস কর আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। আমার ফুল যখন সবচেয়ে বিপদে ছিল ওই লোকটাকে তার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হোক সেটা সকলের সামনে কিংবা আড়ালে।

আমি ওকে কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করিনি, সারাজীবন শুধু ওকে নিজের করে চেয়েছি। না ওকে কখনো বুঝতে পেরেছি আর না কখনো ওর মনে জায়গা করে নিতে পেরেছি। তবে জানিস আগের মতো তেমন একটা আফসোস হয়, কারণ আমি ওর যোগ্য ছিলাম না বলে ও আমার হলো না। যে ওর জন্য পারফেক্ট, যে ওকে সারাজীবন আগলে রাখতে পারবে, নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসতে পারবে সেই ওকে পেলো।

আয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ অবাধ্য চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো। নয়না উঁচু হয়ে সেই অশ্রু মুছে দেয়। এবং তার মুখ খানা নিজের দিকে ফিরিয়ে মৃদু স্বরে বলল—

"তার মানে তোমায় পেয়ে আমিও ভাগ্যবতী? তুমি বলেছিলে না আমি আবেগের বসে তোমার পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায়। আজ দেখতে পাচ্ছো আমার ভালোবাসায়ও কোনো কমতি ছিল না, আমিও তোমাকে অনেক অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি!

আয়ান নিঃশব্দে হাসে! মেয়েটি বয়সের দিক দিয়ে ম্যাচিউর হলেও বাচ্চাদের মতো ব্যবহার করে।

“তোর ভালোবাসায় যেমন কমতি ছিল না ঠিক তেমন একজন সঠিক মানুষটাকেও তো তুই পাবি না। পারবি এই ভাঙা হৃদয়ের মানুষটার সঙ্গে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে?

নয়না হাসতে হাসতে বলে,

"পারবো মানে দৌড়াতে দৌড়াতে পারবো।

“এই মন কিন্তু কোনোদিন ওই ফুল'কে ভুলতে পারবে না। ওকে হয়তো পাবো না, বা নতুন করে ভালোবাসবো না। তবে আমার হৃদয় থেকে ওকে মুছতেও পারবো না। তুই কি চাইবি তোর মানুষটার মনে অন্য কেউ বসবাস করুক, সে তোর পাশাপাশি আরেকজনকে ভালোবাসবে?

আয়ান নয়না'র চোখে চোখ রেখে বললো।

"পারবো না কেন? ফুল থকবে ফুলে'র জায়গায় আর আমি থাকবো আমার জায়গায়। তোমার ভাঙা হৃদয় দু টুকরো হয়েছে, তো এক জায়গা ফুল সারাক্ষণ ঘুমাবে। আর আমি সারা দিনরাত তোমায় জ্বালতন করবো। ব্যাস এটুকু হলেই চলবে।

কথাটা বলেই খিলখিল করে হাসতে থাকে নয়না।

আয়ান ভ্র কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

“আমার প্রতি তোর কোনো অভিযোগ নেই?

"একটুও নেই! তুমি আমার হবে এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া। এর থেকে বেশি কিছু আমি চাই না। তবে আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

“কি?

"আজ থেকে তোমায় আমি কি বলে ডাকবো? আয়ান ভাইয়া, নাকি বাবু।

আয়ান ততক্ষণে মুখ বাকিয়ে উঠে,

“বোন তোর যা ইচ্ছে ডাকতে পারিস তবে বাবু বাদে। কেমন বাচ্চা বাচ্চা ফিল হয়।

"এসব নাম ভালো না, আমি তোমায় বাঙালিদের মতো ‘ওগো’ বলে ডাকবো। সো কিউট! এবার রুমে চলো, এতো রাতে বাহিরে থাকতে নেই। আর তুমি কালকেই ভাইয়ার সঙ্গে আমাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলবে। এই শীতে একা একা ঘুমাতে ভালো লাগে না।

তারপর দুজনেই উঠে দাঁড়ায়। নয়না আয়ানে'র হাত আঁকড়ে ধরে নিজেদের রুমের দিকে হাঁটতে থাকে। একদিকে অপূর্ণতা হলেও আরেকদিকে পূর্ণতা।

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প