বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন

পর্ব - ২৮

🟢

দেখতে দেখতে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে। সময় যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে গেছে। আজ চৌধুরী মহল একেবারেই আলাদা রূপে জ্বলমল করছে। বিয়েবাড়ি বলে কথা—এখানকার প্রতিটি কোণা, প্রতিটি রুম, এমনকি বারান্দার কোনাগুলোও যেন সাজানো হয়েছে এক মহা উৎসবের মতো। লাল, নীল, সবুজ রঙের ঝলমলে বাতি ঘরের দেওয়ালে, জানালার কাঁচে, সিঁড়ির পায়ে সব জায়গাতেই ঝিলমিল করছে। তার ওপর বাহারি ফুলের সাজ তো আছেই, গাঁদা, গোলাপ আর রজনীগন্ধার সুবাসে পুরো বাড়িটা যেন স্বর্গীয় আনন্দে ভরে গেছে।

মেঘ সেই আনন্দের মাঝেই দৌড়াদৌড়ি করছে, মন উড়ছে। আজ সে সত্যিই যে কতটা খুশি, তা বোঝানো বা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই খুশি যেন বুকের ভেতর বসে থাকা আগুনের মতো, চোখের সামনে সব উজ্জ্বল, চারপাশে সব আনন্দমুখর। হঠাৎ দৌড়ের মাঝেই তার হাতকে কেউ শক্ত করে টেনে ধরে। অজান্তে হুমড়ি খেয়ে সে সেই লোকটির বুকের সঙ্গে লাগলো। মুহূর্তে থমকে গেল মেঘ, কিন্তু সাথে সাথে আনন্দে তার চোখ জ্বলে উঠল। কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখেই সে এক গাল হেসে দিল নির্ভেজাল, একরাশ আনন্দে ভরা হাসি।

তূর্য চোখ কিছুটা আঁচড়িয়ে, কণ্ঠে এক ধরণের কঠোরতা নিয়ে বলল—

“দাঁত কেলানি অফ কর, পিচ্চি। সেই সকাল থেকে তোমায় খুঁজছি। যখনই দেখি, তখনই হুট করে হারিয়ে যাও। এক দণ্ড কি আমার পাশে বসা যায় না?

মেঘ চুল ঘষে খানিকটা লাজুকভাবে বলল,

"ওহু! আচ্ছা আচ্ছা, এবার আসি, আপনার পাশেই পড়ে বসবো।

তূর্য চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,

“এখন আবার কোথায় যাবে?

"মামনি যেতে বলেছে! আর আপনি তো জানেন, আমি আজ অনেক অনেক অনেক হ্যাপি!

তূর্য শর্টের কলার ঠিক করে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো,

“হ্যাপি হবেই তো। আফটার অল, হ্যান্ডসাম হাসবেন্ড পেয়েছো বলে কথা।

মেঘ গায়ে শিহরণ অনুভব করে, একমাত্র তাঁর চোখে আনন্দ আর আবেগের ঝলক। সে মুখ বাকিয়ে বলল,

"চুপপপপ! আপনাকে পেয়ে নয়, আজ আমার আর জানু'র একসঙ্গে বিয়ে। আপনি জানেন, আমার কতো স্বপ্ন ছিল, আমি আর বৃষ্টি একদিন একই মঞ্চে বিয়ে করবো।

“হুসসসস! আম্মু কাউকে বলতে মানা করেছে না।

হঠাৎ লাজুক ভাবে কণ্ঠ তুলে বলল,

"ওহ্ ভুলেই গিয়েছিলাম। শাশুড়ী আম্মা কতো কিউট, আমার তো তাকে চুমু দিতে ইচ্ছে করছে। যাই, এখনই দিয়ে আসি।

মেঘ চলে যাওয়ার পর তূর্য নিজের মনে একফোঁটা ছলছল হাসি আর একটু শীতল ছলে বিরবির করে ভাবতে লাগল,

“শালীকে আমি একটু জরিয়ে ধরতে চাইলে ছটফট করবে, অথচ শাশুড়ী আম্মাকে চুমু দিতে চায়। আসিস শালীর ঘরে শালী, আজ রাতে দেখবো কিভাবে দূরে থাকিস।

অন্যদিকে—

তুষার একের পর এক কথা বলছে কিন্তু বৃষ্টি মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে অজানা অসহায়তা, কণ্ঠে অচেনা বাধা, কিছু বলতে পারছে না। তুষার হালকা হাত দিয়ে বৃষ্টি'র থুতনিতে স্পর্শ করে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। শীতল, ধীর স্বরে বলে—

"বুড়ি, তুই বুঝছিস না কেন? আমরা যদি এখন পালিয়ে না যেতে পারি, তাহলে আমাকে ওই মেয়েটাকে বিয়ে করতে হবে। তুই জানিস তো, তোকে ছাড়া আমি আর কাউকে নিজের বউ হিসেবে মানতে পারবো না। আম্মু যখন বলেছে তাহলে তাই করবে। চল না পালিয়ে যায়, অনেক দূরে চলে যাবো। যাতে কেউ আমাদের মাঝে দেয়াল হয়ে না দাঁড়ায়।

বৃষ্টি চুপচাপ, নিঃশব্দে শুধু তাকিয়ে আছে। তুষার আরও কাছে এগিয়ে আসে, কণ্ঠের স্বর আরও কোমল, আরও আবেগময়…

"এই বুড়ি, কিছু বলছিস না কেন? এমন পাগলামো করিস না প্লিজ। আমি তোকে ছাড়া এক সেকেন্ডও থাকতে পারবো না। সেখানে তুইহীনা অন্য কারো সঙ্গে সংসার করবো এটা তো কল্পনাই করা যায় না। আচ্ছা, তোকে এতো কিছু ভাবতে হবে না। শুধু আমার হাতটা শক্ত করে ধর, বাকিটা আমি সামলে নেবো। ভালোবাসিস তো আমায়?

বৃষ্টি মাথা হালকা নেড়ে সম্মতি জানায়।

"তাহলে…আমার হাত আঁকড়ে ধর।

ততক্ষণে বৃষ্টি তুষার'কে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জরিয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে! আজ ভেতরের হাহাকার, কষ্ট, যন্ত্রনা চোখের অশ্রু হিসেবে তুষারে'র বুকে গড়িয়ে পরছে। সে এক হাত দিয়ে বৃষ্টি'কে আরো নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।

হুট করে বৃষ্টি তাকে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়িয়ে যায়। দুহাত দিয়ে চোখের অশ্রু মুছে নেয়। তুষার একটু অবাক হয় তবে কিছু বলে না, সে বৃষ্টি'র হাত নিজের হাতের ভাঁজে ঢুকিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু এগিয়ে যেতে পারে না, বৃষ্টি তাকে টেনে ধরে। তারপর ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে,

"কি হলো যাবি না?

সে নিচু স্বরে জবাব দেয়,

- নাহ্!

"কিহহহহহহ? মজা করছিস আমার সঙ্গে, দেখ বুড়ি সিরিয়াস সময় আমার মজা একদম পছন্দ নয়। তাই দ্রুত হেঁটে চল, আর যদি পা ব্যথা করে তাহলে বাসা থেকে বেরিয়ে কোলে তুলে নেবো, তবুও এখন চল।

বৃষ্টি একটু উঁচু হয়ে তুষারে'র থুতনিতে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সেই স্পর্শে কোনো আবেগের তাড়াহুড়া নেই বরং আছে শেষ বিদায়ের নিঃশব্দ আর্তনাদ। মৃদু, কাঁপা কণ্ঠে সে বলে…

- আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে মাফ করুক! তোমার বউয়ের হক আমি কেঁড়ে নিলাম, হয়তো আমাদের আর কখনো এতো কাছাকাছি দেখা হবে না। জানো ভাগ্য বলে কিছু একটা আছে, এই ভাগ্য সবার ক্ষেএে সুখ, ভালোবাসা দিলেও। শুধু আমার বেলায় এসে ফুড়িয়ে যায়, মাঝে মাঝে বড্ড আফসোস হয়। কেন আমার সব থাকতেও পেলাম না, নাম পেলাম আব্বু আম্মুর ভালোবাসা আর না তোমাকে। তুমি আমার আপন হয়েও হতে পারবে না, তবে তোমার প্রতি আমার সত্যি কোনো অভিযোগ নেই। তুমি রাখতে চেয়েছো কিন্তু আমি থাকতে পারিনি।

"বুড়ি কিসব আবুল তাবুল বলছিস?

- না তুষার ভাইয়া আজ আমাকে বলতে দাও, আজ যা বলবো সব সত্য। তোমায় বলে ছিলাম না, খালামনি রাজি হলেই তোমাকে আমি বিয়ে করবো। হয়তো এইকথা বলা আমার উচিত হয়নি, সেইদিন যদি তোমাকে এইটুকু কষ্ট দিতাম তাহলে আজ এতো কষ্ট তুমি পেতে না। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো তুষার ভাইয়া, আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না। মামনি যাকে পছন্দ করেছে তোমার জন্য, তুমি তাকেই বিয়ে করো। আমি যাদের নুন খেয়েছি তাদের সঙ্গে বেইমানি করতে পারবো না। খালামনি'কে আমাকে সব সময় নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসেছে, আর আমি তার বিশ্বাস কোনোদিন ভাঙতে পারবো না।

তুষার তার হাত আঁকড়ে ধরে অনুনয় স্বরে বলল,

"বুড়ি পাগলামো বন্ধ কর। আমি এসব আর নিতে পারছি না।

- তুষার ভাইয়া আমি সিরিয়াস বলছি তুমি খালামনি'র পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে নাও। তাকে বিয়ে করে তুমি সত্যি সত্যি হ্যাপি হবে।

"আম্মুর কথায় কষ্ট পেয়ে এমন করছিস তাই না?

বৃষ্টি হেসে উঠে,

- ধুর আমি কষ্ট পাবো কেন? খালামনি তো ঠিকই বলেছে, তোমার রুচি সত্যি সত্যি খারাপ নয়তো এমন অভাগী মেয়েকে কেউ পছন্দ করে। আবার এতো এতো ভালেবাসে, আচ্ছা এসব বাদ দাও। কিছু সময় পর বিয়ে এখন আমার সাথে কথা বলা কেউ দেখলে ভালো চোখে দেখবে না। তুমি ভালো থেকো আর…

কোথা থেকে কয়েকজন মেয়ে এসে বৃষ্টি'কে কথা শেষ করার আগেই টেনে নিয়ে যায়। তুষার পলকহীন ভাবে তাকিয়ে থাকে। সে নিজের মনে বিরবির করে,

"তোকে ছাড়া কিভাবে ভালো থাকবো বুড়ি। তুই তো আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিলি।

__________________

______________________________

অবশেষে তূর্য ও মেঘ এবং তুষার ও বৃষ্টি'র বিয়ে কমপ্লিট হলো। পুরো অনুষ্ঠানে তুষার মন খারাপ করে বসে ছিল, সে এখনো জানে না বৃষ্টি'র সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। ইভেন বৃষ্টি বিয়ের কয়েক মিনিট আগে জেনেছে, রেখা চৌধুরী'র সেই পছন্দের মেয়ে বৃষ্টি ছিল। তিনিও জানতেন না তার এবং ছেলের পছন্দের মেয়ে একজন,

তূর্য সব বলায় বুঝতে পেরেছে। কিন্তু সবাই এখন তুষার'কে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য চুপ করে ছিল।

তুষারে'র রুমে এক হাত ঘোমটা দিয়ে গুটিশুটি হয়ে বসে আছে বৃষ্টি। পুরো রুম ফুলে ফুলে সজ্জিত, চারদিকে ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ দরজা ঠেলে তুষার প্রবেশ করে, তাকে দেখা মাএ বৃষ্টি নড়েচড়ে বসে। ঠিক তখনই সে বড় বড় পা ফেলে ঠাসসস ঠাসসস করে বৃষ্টি'র গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আচমকা সব হওয়ায় বৃষ্টি ভয় পেয়ে যায় সে কিছু বলার আগেই তুষার কর্কশ কন্ঠে আওরায়,

"ফাজিল মেয়ে, তুই কিভাবে ভাবলি তোকে এই তুষার চৌধুরী নিজের বউ হিসেবে স্বীকার করবে? শোন, আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি আর ওকেই বউ বলে মানি। তোকে জাস্ট আম্মুর জন্য বিয়ে করেছি, আগামী কালই আমি আমার ভালোবাসা'কে পবিত্র কালেমা পড়ে বিয়ে করে ঘরে তুলবো। আর তোর সাহস হয় কি করে আমার বিছানায় বসার, তাড়াতাড়ি নাম। এই বিছানায় শুধু আমার ভালোবাসা বসবে।

বৃষ্টি ঘোমটার নিচ থেকে নিঃশব্দে হাসছে। তার দেওয়া থাপ্পড়ে গাল ব্যথা করছে তবে তার মনের কথা গুলো বৃষ্টি'র বেশ ভালো লেগেছে। তুষার আবারও ক্ষেপে উঠে,

"নির্লজ্জ মেয়ে, ড্যাং ড্যাং করে আগেই বা'স'র ঘরে বসে আছে। শোন তোকে আমি বউ মানি না আর না কোনোদিন মানবো৷ এবার তারাতাড়ি আমার রুম থেকে বের হ। এহ্ আসছে বউ হতে, নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছিস? রাক্ষসীর মতো চেহারা।

বৃষ্টি চুপ করে বসে আছে কোনো কথা বলছে না। তুষার রাগান্বিত হয়ে তার হাত টেনে নিচে নামাতে চায় কিন্তু পারে না।

"নামবি না তাহলে?

ততক্ষণে তুষার বৃষ্টি'কে কোলে নিয়ে নিচে ফেলে দেয়। সে ব্যথা কুঁকড়ে উঠে। তা দেখে তুষার দাঁত কেলিয়ে হাসে,

"আগেই বলছি কিন্তু নামলি না, দাঁড়া এখন তোকে পা টেনে হিঁচড়ে রুম থেকে বের করবো।

তুষার এগিয়ে যেতেই বৃষ্টি ঘোমটা সরিয়ে দেয়। তাকে দেখা মাএ তুষার আঁতকে উঠল,

"বুড়ি তুই....

তুষার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি'কে ধরে তুলতে এগিয়ে আসতেই বৃষ্টি দাঁত খিঁচিয়ে উঠে বসে।

- টাচ করবে না তুমি আমায়! এই তোমার ভালোবাসা, তুষার ভাইয়া? এভাবেই আমাকে ফেলে দিলে? ও আল্লাহ গো…আমার কোমড় বুঝি ভেঙেই গেল!

বৃষ্টি উঠতে গিয়েও ঠিকমতো দাঁড়াতে পারে না। আবার নিচে পড়ে যায়। ব্যথায় মুখটা কুঁচকে ওঠে। সেই দৃশ্যটা দেখেই তুষারে'র ভেতরের সব রাগ, সব অহংকার মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

সে আর কোনো কথা শোনে না। এক ঝটকায় বৃষ্টি'কে কোলে তুলে নেয়। বৃষ্টি প্রতিবাদ করার সুযোগও পায় না। তুষার তাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়।

"অনেক ব্যথা পেয়েছিস, বুড়ি? সরি রে, আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু ওই মেয়েটার জায়গায় তুই কেন? সে কই?

এই একটা কথাই বৃষ্টির ভেতরের সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়।

- কিহহহহ? তুমি এখনো সেই মেয়েকে খুঁজতেছো? তার মানে তুমি এখনো তাকেই চাইছো?!

বৃষ্টি দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, ব্যথা উপেক্ষা করে তুষারে'র দিকে আঙুল তোলে।

- ও খোদা! এ তুমি কার সঙ্গে আমার বিয়ে দিলে! এর মনে একজন, ভালোবাসে আরেকজনকে, আর এখন চাইতেছে অন্যজনকে? শালার পুত, আমার সামনে থেকে সরে যা নয়তো সত্যি সত্যি মাথা ফাটিয়ে দেবো!

তুষার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না—যাকে সে এতদিন ভালোবেসেছে, যার জন্য এত লড়াই, এত স্বপ্ন, সে-ই আজ তার সামনে, তার বউ হয়ে বসে আছে।

হঠাৎ যেন দম বন্ধ হয়ে আসে তার। সে এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কিছু সময় পর আবারও ফিরে আসে। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে বিদ্যুৎগতিতে বৃষ্টি'র কাছে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

"বুড়ি তুই আমার? সারাজীবনের জন্য তুই শুধু আমার, সত্যি সত্যি।

বৃষ্টি এখনো কটমট করে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে তুষার একটু দূরে সরে যায়। তারপর দু’কান ধরে ওঠবস করতে করতে কৃত্রিম করুণ গলায় বলতে থাকে—

"সরি…সরি…সরি বুড়ি! সত্যি আমি জানতাম না ওই মেয়েটা আমার নিজের বুড়ি। তোকে না দেখেই থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছি, এমনকি ফেলেও দিয়েছি! অনেক ব্যথা পেয়েছিস তাই না?

বৃষ্টি কোনো উত্তর দেয় না। মুখ গোমড়া করে চুপচাপ বসে থাকে। তুষার বুঝে যায়, এটা নীরব অভিমান, ভয়ংকর পর্যায়ের। সে আবার কাছে এগিয়ে আসে। এবার গলা নামিয়ে অনুনয়ের সুরে বলে,

"সরি বললাম, তবুও কথা বলবি না? আচ্ছা, তুই এখন আমাকে যে শাস্তিই দিবি, আমি মাথা পেতে নেবো। যা বলবি তাই করবো, তবুও একটু কথা বল।

এই কথাটার অপেক্ষাতেই যেন ছিল বৃষ্টি। চোখে-মুখে হঠাৎ খুশির ঝিলিক নেমে আসে। গদগদ গলায় বলে ওঠে,

- তাহলে আমাকে ওই গাছটা থেকে তেঁতুল এনে দাও। সত্যি বলছি, এরপর তোমার ওপর একটুও রাগ রাখবো না।

তুষার আঁতকে উঠে চোখ বড় বড় করে তাকায়,

"কিহহহহ! এতো রাতে তুই আমাকে পেত্নীদের এলাকায় পাঠাচ্ছিস? জানিস না, ওখানে আমি একবার গেলে আর ফিরে আসতে পারবো না! আমি যে হ্যান্ডসাম তাতে ওরা ফিদা হয়ে আমাকে ওখানেই আটকে রাখবে!

- আচ্ছা, তাহলে আমিও কথা বলবো না।

"এমন করিস না বুড়ি। আজ আমাদের ইন্টু-মিন্টুর রাত! এই সময় অভিমান করে বসে থাকলে কি মানায়? তোকে প্রমিজ করছি, আগামীকাল সকালেই তোর যত ইচ্ছে তেঁতুল লাগবে, সব আমি নিজে গাছে উঠে পেড়ে দেবো। একটাও বাদ যাবে না। তবুও এখন কথা বল।

- ওহু!

"প্লিজ…প্লিজ…প্লিজ…প্লিজ বুড়ি।

- আচ্ছা যাও, মাফ করে দিলাম। তবে কাল যদি তেঁতুল না দাও তোমার খবর আছে।

"আচ্ছা পাখি!

তুষার বৃষ্টি’র পাশে বসে একটু অভিমানী সুরে বলে উঠল,

"তুই জানতিস আজ আমাদের বিয়ে, অথচ আমাকে একটা কথাও বললি না। তুই জানিস না, সারাদিন আমার কতটা কষ্ট হচ্ছিল?

বৃষ্টি ধীরে চোখ নামিয়ে বলে,

- আমি নিজেই তো বিয়ের কিছুক্ষণ আগেই জানতে পেরেছি। যখন তোমার কাছে আসতে যাবো, ঠিক তখনই খালামনি বারণ করলো। আচ্ছা তুমিই বলো তো, বিয়ের প্রথম দিনেই যদি শাশুড়ি আম্মার কথা অমান্য করি, তাহলে উনি কষ্ট পাবেন না?

তুষার ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হেসে বলে,

"বাহ্ বাহ্! বিয়ে হতে না হতেই শাশুড়িকে নিয়ে এত ভাবনা! ভালো ভালো…তবে তাদের মাঝে আবার আমাকে ভুলে যাস না কিন্তু।

এই কথায় বৃষ্টি হঠাৎ মুচকি হেসে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়,

- আমার গিফট?

তুষার ভ্রু কুঁচকে তাকায়,

"কিসের গিফট?

বৃষ্টি চোখ বড় বড় করে বলে,

- বা রে! বা’স’র রাতে বউ’কে গিফট দিতে হয় এটাও জানো না? তার মানে তুমি আমার জন্য কিছুই আনোনি? কালকে সবাই যদি জিজ্ঞেস করে, তোমার স্বামী তোমাকে কী গিফট দিয়েছে? তখন আমি কী বলবো?

কথার শেষে সে কাঁদু কাঁদু মুখ করে তাকায়। মুহূর্তের মধ্যেই তুষার উঠে দাঁড়ায়। কিছু না বলে ধীরে ধীরে ওয়ারড্রবের দিকে যায়। একটু খোঁজাখুঁজির পর একটা ছোট্ট বক্স এনে বৃষ্টি’র হাতে তুলে দেয়।

বৃষ্টি কৌতূহলে বক্সটা খুলে ফেলে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটা সিম্পল গোল্ডের রিং। চোখের পলকে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রিংটা খুব বেশি দামী নয়, ঝলমলে গর্জেসও না কিন্তু তবুও সেটা হাতে পেয়ে বৃষ্টি খুশিতে আটখানা। সে উচ্ছ্বাস লুকোতে না পেরে বলে,

- থ্যাংকস তুষার ভাইয়া…তোমাকে অনেক অনেক অনেক থ্যাংকস। রিংটা ভীষণ সুন্দর। একদম আমার শাশুড়ির ছেলের মতো!

এই কথায় তুষার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সেও ফিক করে হেসে ফেলে, একটা প্রশান্ত, তৃপ্তির হাসি।

তুষার ধীরে ধীরে রিংটা বৃষ্টি’র হাতের আঙুলে পরিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলে ওঠে,

"ভাবিস না, এটা আমি অন্য কারও জন্য কিনেছি। এটা আমি তোর জন্যই কিনেছিলাম…দু’বছর আগে। তখন টিউশনি করাতাম, টুকটাক টাকা জমিয়ে রেখেছিলাম। ইচ্ছে ছিল, আমার বউ’কে জীবনের প্রথম গিফট'টা নিজের উপার্জনের টাকায় দেবো। যদিও রিংটার দাম খুব বেশি নয়…

বৃষ্টি কথা শেষ হতে দেয় না। চোখে চিকচিক করে ওঠা আবেগ লুকিয়ে রেখে মৃদু স্বরে বলে,

- শুনো তুষার ভাইয়া, গিফট কখনো টাকার দামে বিচার করা যায় না। তুমি ভালোবেসে দিয়েছো, এইটাই আমার কাছে সবথেকে দামি। আমি তো ভেবেই নিয়েছিলাম তুমি কিছুই দেবে না।

কথাটা বলতে বলতে তার কণ্ঠটা একটু নরম হয়ে আসে। ততক্ষণে তুষার বৃষ্টি’র ঠোঁটে আলতো একটা স্পর্শ রেখে মুচকি হেসে বলে,

"আমার বউ’টাকে এইটুকু গিফট না করলে কি চলে? আচ্ছা, এবার চল…স্টার্ট করি

কথাটা শোনামাত্রই বৃষ্টি আঁতকে উঠে,

- মা মা মা…মানে?

তুষার ঠোঁটের কোণে রহস্যমাখা হাসি ঝুলিয়ে ধীরে বলে—

"ভয় পাবেন না, ম্যাডাম। আজ ওসব কিছুই হবে না। আজ আমি শুধু আমার বউ’কে নিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখবো, সেটাও ছাদে বসে। তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে।

কিছু বলার আগেই তুষার মুহূর্তে তাকে কোলে তুলে নেয়। হঠাৎ এমন কাণ্ডে বৃষ্টি দু’হাত শক্ত করে তার গলায় জড়িয়ে ধরে। লজ্জা, ভয়ে সে চোখ বন্ধ করে নেয়। তুষার ধীর পায়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে।

ছাদের দিকে ওঠার প্রতিটি ধাপে যেন তাদের সম্পর্ক আরও একটুখানি গভীর হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের ভালোবাসার আরেকটা বহিঃপ্রকাশ—

নীরব, শান্ত, ভিন্ন রকম।

হোক না ভিন্ন, তাতে কী?

ভালোবাসা তো ভালোবাসাই!

তূর্য নিজের রুমে ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। রুমটা অদ্ভুত রকম ফাঁকা লাগছে— মেঘ নেই!

সে ততক্ষণে রুমের প্রতিটা কোণা চোখ বুলিয়ে দেখে, আলমারির পাশ, জানালার ধারে, এমনকি ওয়াশরুম পর্যন্ত। কোথাও মেঘে'র ছায়াটুকুও নেই। হঠাৎ করেই তার দৃষ্টি আটকে যায় বেলকনির দিকে।

নীল আলোয় মোড়া বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে , একটা নীল পরি! আজ মেঘ নীল রঙের লেহেঙ্গা পরেছে। ঠিক সেই নীল, যেটা তূর্য একদিন স্বপ্নে ভেবেছিল। ইচ্ছে ছিল, নিজের বউকে নীল লেহেঙ্গা পরিয়ে ঘরে তুলবে। তখন সময়, পরিস্থিতি, কিছুই পক্ষে ছিল না। ইচ্ছেটা অপূর্ণই রয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু আজ সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটাই নিঃশব্দে পূরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। তূর্য ধীরে ধীরে মেঘে'র দিকে এগিয়ে যায়। মেঘ তখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে, চোখে অদ্ভুত এক শান্তি। সে মেঘে'র ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, কিছু বলে না। তবু মেঘ যেন ঠিকই বুঝে ফেলে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলে যায়। নরম স্বরে সে বলে ওঠে,

"আপনি এসেছেন…?

তূর্য একটু অবাক হয়। কোনো উত্তর দেয় না। শুধু এক মুহূর্তেই মেঘ'কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দেয়, চেনা উষ্ণতা, চেনা আপন ঘ্রাণ! মেঘ হঠাৎ কেঁপে ওঠে, ছটফট করে ওঠে। তূর্য এক হাত তার পেটের ওপর রাখতেই সে আরো সজাগ হয়ে যায়। তূর্যে'র ঠোঁটে নিঃশব্দ হাসি। তার অবাধ্য হাত একটু নিচের দিকে নামতেই মেঘ সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলে।

"একদম দুষ্টুমি করবেন না বলে দিলাম!

কড়া শাসন, কিন্তু গলায় লুকানো লাজুকতা।

তূর্য ধীর, গভীর স্বরে বলে ওঠে—

“তাহলে কে করবে, শুনি?

"নির্লজ্জ লোক!

তূর্য হাসে। সেই হাসিতে কোনো অপরাধবোধ নেই, আছে শুধু অধিকার আর ভালোবাসা। সে শান্ত গলায় বলে,

“বউয়ের কাছে আসা, তাকে জড়িয়ে ধরা, তার সঙ্গে একটু দুষ্টুমি করা। এসব যদি নির্লজ্জতা হয়, তাহলে আমি সত্যি সত্যিই নির্লজ্জ। শুধু আমি না, আমার মতো প্রতিটা পুরুষ'ই নির্লজ্জ। আর লজ্জা? লজ্জা তো নারীর অলংকার। লজ্জা পেলে বউ'রাই পাবে, আমরা পুরুষরা কেন পাবো, হুম হুম হুম?

মেঘ কিছু বলে না।

শুধু নীল লেহেঙ্গার আড়ালে লুকিয়ে থাকা লাজে তার গাল আরো গাঢ় হয়ে ওঠে। আর তূর্য বুঝে যায়,এই নীরবতাই তার সবচেয়ে বড় জয়।

“বউ…!

ডাকটা কানে পৌঁছাতেই যেন মেঘে'র বুকের ভেতর ঢেউ উঠে যায়। শরীরটা অজান্তেই কেঁপে ওঠে। নিঃশ্বাস আটকে আসে ক্ষণিকের জন্য। এই এক শব্দে কী এমন মায়া লুকিয়ে আছে, সে নিজেও জানে না। শুধু বোঝে, এই ডাক তাকে দুর্বল করে দেয়, সমস্ত অভিমান গলিয়ে দেয়, হৃদয়ের গভীরে নরম করে হাত বুলিয়ে যায়। তূর্য আর একটু কাছে এগিয়ে আসে। কণ্ঠটা ধীরে ধীরে কোমল হয়ে নামে— “ভালোবাসি পিচ্চি বউ, খুব খুব খুব খুব খুব বেশি ভালোবাসি! এতটা ভালোবাসি যে তা শব্দে মাপা যায় না, আর না যায় তার গভীরতা মাপতে। যে ভালোবাসায় সীমা কিংবা মাপ নেই ঠিক ততটাই ভালোবাসি তোমায়!

তূর্য ছোট্ট করে চুম্বন কাঁটে মেঘে'র ঘাড়ে।

“এবার তুমি বলো, আমার কথার পরের লাইনটা।

মেঘ কিছু বলে না। মাথাটা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতর জমে থাকা অনুভূতিগুলো গলা অবধি উঠে এসেছে, অথচ ঠোঁট দুটো যেন শক্ত হয়ে গেছে। এই নীরবতার মাঝেও তার হৃদয় চিৎকার করে বলছে—ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি!

তূর্য তার নীরবতায় হার মানে না। সে মেঘে'র কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে—

“তাহলে কি আমার পিচ্চি বউ আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসো না?

মেঘে'র চোখ দুটো কেঁপে ওঠে। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।

"বাসি তো…

“কি……?

"ভালো…

তূর্য সন্তুষ্ট হয় না। সে অভিমানী স্বরে আওরায়,

“না না…পুরোটা শুনতে চাই। আর সেটাও আমাকে আলিঙ্গন করে।

মুহূর্তেই মেঘ থমকে যায়। সময় যেন হঠাৎ থেমে যায় তাদের চারপাশে। সে ধীরে পেছন ঘুরে তাকায় তূর্যে'র দিকে। ভ্রু কুঁচকে আছে, চোখে লজ্জা আর ভালোবাসার মিশেল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে, যেন কিছু বলতে চায় কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। তূর্য আর অপেক্ষা করে না। সে ধীরে মেঘ'কে নিজের দিকে টেনে নেয়। কোনো জোর নেই, শুধু নিঃশব্দ টান। বুকের ভেতর মেঘ'কে আশ্রয় দিয়ে বলল,

“তারমানে পিচ্চি আমাকে…

আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলাতে পারে না মেঘ। ততক্ষণাক সে হঠাৎ করেই তূর্যে'র বুকে ঝাপিয়ে পড়ে। বুকের ভেতর জমে থাকা সব ভয়, সব লজ্জা, সব দ্বিধা একসাথে ভেঙে পড়ে তার আলিঙ্গনে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি, যেখানে লুকিয়ে আছে নির্ভরতা আর নিখাদ ভালোবাসা। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

"আমিও আপনাকে অনেক অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি!

এই এক বাক্যে তূর্যে'র বুকটা কেমন করে ওঠে। সে আর কিছু বলে না। সে হুট করেই মেঘ'কে কোলে তুলে নেয়। হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে মেঘ আঁতকে ওঠে। ভয়ে চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে নেয়। এক হাত দিয়ে তূর্যে'র শেরওয়ানি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে—যেন পড়ে যাবে এই আশ্রয় থেকে। তূর্য তার এই ছোট্ট প্রতিক্রিয়াটা দেখে হালকা হাসে। কিছু না বলে, ধীর পায়ে নিজের গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে। রুমে ঢুকেই সে মেঘ'কে খুব যত্ন সহকারে বিছানায় শুইয়ে দেয়। এবং নিজের পরনের শেরওয়ানি এক টানে খুলে ফেলে।

মেঘ তখন লজ্জায় মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে নেয়। বুকের ভেতর নিঃশ্বাস আটকে আসে। চারপাশের প্রতিটি শব্দ যেন সে শুনতে পাচ্ছে, তবুও কিছু দেখার সাহস নেই।

তূর্য ধীরে ধীরে মেঘে'র উপরে গিয়ে শুয়ে পরে। এতে অপ্রস্তুতু মেঘ ঘাবড়ে যায়, চোখ পিটপিট করে তাকায়। বিপরীত পাশের মানুষটার ভার নিতে পারছে না। সে তারাহুরো করে বলে,

"ছাহ্ নামুন, আপনার মতো মটু লোকের ভার আমি নিতে পারি নাকি?

“যাহ্ বাবা! এখনো তো পুরোপুরি ভার দেয়নি তাতেই এই অবস্থা। বলি স্বামী জানে'র এইটুকু ভার নিতে না পারলে কিসের ভালোবাসো হুম?

মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,

"ভালোবাসা'র সঙ্গে আপনার শরীরের ভারের সম্পর্ক কি?

তূর্য ঠোঁট কামড়ে হাসে,

“অনেক সম্পর্ক আছে ম্যাডাম! আপনি যত আমার ভার সামলাতে পারবেন, আমি ভাববো তত আপনি আমায় ভালোবাসেন। এখন যদি এইটুকুতেই বলেন, আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি, তাহলে তো এই তূর্য চৌধুরী মানবে না।

তূর্যে'র বলা কথাগুলো মেঘে'র মাথার উপর দিয়েই চলে যায়। সে কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারে না। শুধু ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে—চোখে প্রশ্ন, বিভ্রান্তি আর শিশুসুলভ এক সরলতা। তার এই তাকিয়ে থাকাটা দেখে তূর্য নিঃশব্দে হেসে ফেলে।

“এত পিচ্চি বউ আমার দরকার ছিল না, যে আমার হেয়ালি কথাগুলো বুঝতেই পারবে না।

কথাটা মেঘে'র কানে যেতেই তার ভেতরের জেদটা মাথা তোলে। দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বলে,

"আচ্ছা তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। আপনি কালকে আরেকটা বিয়ে করে বউ ঘরে নিয়ে আসবেন!

এক মুহূর্তের মধ্যেই তূর্য আর কোনো কথা শোনার সুযোগ দেয় না। সে মেঘে'র কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। বুকের কাছে টেনে ধরে নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে— “বাহ্! আমার পিচ্চি অভিমান করলে বেশ বউ বউ লাগে তো। একটা কথা বলি পিচ্চি?

মেঘ মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ঠোঁট চেপে বলে,

"আমি কোনো কথা শুনতে চাই না।

“জাস্ট একটা কথা বলব?

“বললাম তো শুনব না!

তূর্য আর কথা বাড়ায় না। ধীরে মেঘে'র কানের কাছে ঝুঁকে তার ঠোঁট আলতো করে ছুঁইয়ে দেয় তার কন্ঠ দেশে! স্পর্শটা এতটাই হালকা, যেন অনুমতির অপেক্ষায়। তারপর আরও কাছে এসে ফিসফিস করে,

“আটটা বছর অপেক্ষা করেছি পিচ্চি…আটটা বছর। শুধু তোমাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য। এখন সেই পিচ্চি যদি আমার সঙ্গে অভিমান করে বসে থাকে, তাহলে কিভাবে হয় বলো তো? আমার কষ্টগুলো যদি সে না বুঝে, তাহলে কে বুঝবে শুনি? আমি যে তাকে চাই, পুরোপুরি আমার করে চাই। এতটাই চাই যে বিন্দুমাত্র দূরত্ব থাকবে না। সেই অধিকারটা কি পাবো আমি?

মেঘ কোনো উত্তর দেয় না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। চোখে জমে ওঠা অনুভূতিগুলো আর ধরে রাখতে পারে না তূর্য। হঠাৎই সে যেন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে— মেঘের গলা, গাল, কপাল জুড়ে অজস্র চুমু ছড়িয়ে দেয়। ভালোবাসা, আবেগ, আট বছরের অপেক্ষা, সব একসাথে উথলে পড়ে। মেঘ বারবার কেঁপে ওঠে। এই অনুভূতির ভার নিতে পারছে না সে। নিজের অজান্তেই তার চোখ দুটো ভিজে ওঠে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

তূর্যে'র গালে ভেজা স্পর্শ লাগতেই সে থমকে যায়। চোখ তুলে তাকাতেই মেঘে'র অশ্রুসিক্ত মুখ দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।

অনুনয় মাখা কণ্ঠে সে দ্রুত বলে—

“সরি সরি পিচ্চি, আমি বুঝতে পারিনি। তুমি না চাইলে এসব কিছুই হবে না। যেহেতু আট বছর অপেক্ষা করতে পেরেছি, তাহলে আর কয়েকটা দিনও অপেক্ষা করতে পারবো। কিন্তু তবুও কেঁদো না প্লিজ, তোমার কান্না আমার একটুও ভালো লাগে না।

তূর্য এক হাত তুলে মেঘে'র অশ্রু সিক্ত চোখ দুটো খুব যত্নে মুছে দেয়। সেই স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো দাবি নেই। শুধু নিখাদ ভালোবাসা আর সীমাহীন ধৈর্য।

তূর্য ধীরে ধীরে মেঘে'ট কাছ থেকে সরে আসতে চাইলে, বিদ্যুৎগতিতে মেঘ তার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে।

চোখে অজস্র আবেগ, কণ্ঠে কেঁপে ওঠা নরম এক শ্বাস—

"এতো ভালোবাসেন কেন আমায়? আপনার ভালোবাসায় বারবার মুগ্ধ হই। এতো ভালোবাসার যোগ্য তো আমি নয়। তবুও কেন এতো ভালোবাসেন?

তূর্য মুচকি হাসে। চোখে মায়া, কণ্ঠে অদ্ভুত উষ্ণতা…

“আমার পিচ্চি সত্যি সত্যিই তো এতো ভালোবাসার যোগ্য নয়। কারণ সে তো এর থেকেও হাজার গুন ভালোবাসা ডিজার্ভ কর। আর সেই ভালোবাসা আমি ধীরে ধীরে ফিল করাবো!

মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে, বুকের ভেতর কেমন যেন ঘন চাপ অনুভব করে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে প্রতিধ্বনিত করে,

“সেই হাজার গুন ভালোবাসা থেকে এখন যে আমার এইটুকু ভালোবাসা চাই!

তূর্য ধীরে মাথা নাড়ে। কোমল কণ্ঠে বলল,

“অনেক কষ্ট হবে কিন্তু?

"তবুও চাই!

“শেষবার ভেবে দেখো। আট বছরের ভালোবাসা এত সহজ নয়।

"তবুও চাই!

তূর্য আর অপেক্ষা করে না। ধীরে ধীরে মেঘে'র ঠোঁটের ওপর গভীর স্পর্শ ফেলে। মেঘ লজ্জায় তূর্যে'র বুকে মুখ লুকিয়ে নেয়, কণ্ঠ নরম, শীতল, আর গভীর—

“আজ #বিহঙ্গীনির_ব্যাকুল_মন শান্ত করবো। তার হৃদয়ে যত অভিযোগ আছে, সব আজ ভালোবাসায় রূপান্তর করবো। সে আমার গভীর ভালোবাসার শিকল থেকে পালাতে চাইবে, কিন্তু এই উম্মাদ তাকে সেই শিকলে আবদ্ধ রাখবে। যতই কষ্ট হোক, বিন্দুমাত্র ছাড় দেবো না। সে কাঁদবে তবুও এই উম্মাদ নিজের ভালোবাসায় অটল থাকবে। তাকে নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখবো চিরকাল!

মেঘ তখন ছোট্ট বাচ্চার মতো চোখ বন্ধ করে, তূর্যে'র বুকে লেপ্টে থাকে। তার দেহ, তার নিঃশ্বাস, প্রতিটি স্পর্শ— সবই এক গভীর আনন্দে ভরে ওঠে। মেঘ নিজের ভেতরের সব লাজ, সব দ্বিধা, সব ভালোবাসা ধীরে ধীরে তূর্যে'র স্পর্শে মিশিয়ে দেয়। আজ প্রথম বারের মতো সে নিজেকে তূর্যে'র রঙে রাঙাচ্ছে, তার দেওয়া প্রতিটি স্পর্শ অনুভব করছে, তার ভালোবাসার চাদরে নিজেকে ঢেকে রাখছে।

পুর্ণিমার আলোও আজ তাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রইলো। আলো-ছায়ার মাঝেই দুই হৃদয় এক হয়ে যায়, ভালোবাসা এভাবে চিরকাল ধরে থাকুক—ক্ষয়হীন, অটল, অমোঘ!

বিহঙ্গীনির ব্যাকুল মন গল্পটি বন্যা সিকদার-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ক্ষয় থেকে ওঠা পুনরুত্থানের গল্প