ঝিলমিল রোদ্দুরে

পর্ব - ৩৭

🟢

ঝিলমিলের এমন অবস্থা দেখে রোদ্দুর ভয় পেয়ে গেল। থতমত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'কি হয়েছে? এমন করছিস কেনো?'

ঝিলমিলের কান্না তখনও বন্ধ হয় নাই। তৎক্ষণাৎ রোদ্দুরের কথার উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ বাদে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, 'তুই কোথায় গিয়েছিলি? আমি অনেকবার তোকে ফোন করেছিলাম। তুই কেনো ফোন রিসিভ করিস নাই? জানিস কতটা চিন্তায় ছিলাম। চৌরাস্তার মোড় থেকেও ঘুরে এসেছি। ভেবেছিলাম তুই তো সবসময় ওখানেই থাকিস, তখনও থাকবি বোধহয়!'

রোদ্দুর ঝিলমিলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, 'সো সরি। আর কক্ষনো হবে না। আজ আসলেই একটু দেখলি করে ফেলেছি....'

'একটু না, অনেক বেশি।'

'হ্যাঁ অনেক বেশি। আসলে গিয়েছিলাম একটা কাজে। তুই যখন ফোন করেছিলি তখন ব্যস্ত ছিলাম তাই ফোন রিসিভ করতে পারি নাই। পরে ব্যাক করতে গিয়ে দেখলাম ফোনে চার্জ না থাকার কারণে ফোন অফ হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতেই চেয়েছিলাম। পরে ভাবলাম, এতদূর এসেই যখন পড়েছি তখন কাজগুলো সেরে যাই। বিশ্বাস কর, এত দেরি হবে আমি জানতাম না।'

ঝিলমিল দু'হাতে নিজের চোখ মুছে বলল, 'ঠিক আছে। আর কখনো এমন করবি না।' তারপর দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। রোদ্দুর ঘরে এসে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। সে পুরো ঢাকা শহর ঘুরে এলো ঝিলমিলের আবদার পূরণ করতে। তখন কীসব শাড়ি চুরির নাম বলেছিল, সেসব খুঁজতে তো যথেষ্ট সময় লাগে নাকি! ঝিলমিল অবশ্য এসব দেখে আগ্রহ প্রকাশ করল না, সে রোদ্দুরকে ফিরে পেয়েছে এতেই অনেক।

মানুষ একবার হারিয়ে গেলে ফিরে পাওয়া যায় না— কথাটা ঝিলমিল ভালো করেই জানে। আজ রোদ্দুর যখন ফিরে আসছিল না, ফোন ধরছিল না তখন ঝিলমিলের মনের মধ্যে তুফান বয়ে যাচ্ছিল। হারানোর ভয়, যন্ত্রণা সবকিছুর মিশ্র অনুভূতি। তারপর রোদ্দুরকে যখন দেখল মনে হলো, তার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্খিত মানুষটাকে সে খুঁজে পেয়েছে। একদা স্বপ্নে দেখেছিল রাজপুত্রকে যে ঝিলমিলকে সব অবসাদ থেকে বাঁচাতে এসেছে, ওর জীবনের সব না পাওয়া বরবাদ করতে এসেছে; আজ রোদ্দুরকে তাই মনে হলো। তবে ভুল নয়। ওই হয়তো তার সেই রাজপুত্র, যাকে স্বপ্ন দেখত; যাকে নিয়ে হাজার হাজার স্বপ্ন সাজাতো, স্বপ্ন বুনত। রাতে শোয়ার পর ঝিলমিল একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের উপর থেকে কয়েক টন ওজনের পাথরটা নেমে গেছে, এখন বেশ হালকা লাগছে।

.

উসমান খন্দকার ভেবেছিলেন, তাকে এরা বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে না। কিন্তু এত উকিল, এত নোটিশেও কোনো কাজ হচ্ছে না। একটা মামলার জায়গায় তার নামে আরও ছয়টা মামলা হয়েছে। যাকে বলে, কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটে বেরিয়েছে। আরেকটু সাবধান থাকলে হয়ত আজ তাকে এখানে থাকতে হতো না! সেদিন কোনোরূপ পরিকল্পনা ছাড়াই ঝিলমিলকে কিডন্যাপ করেছিল। পথে একা পেয়েছে, লোকজন দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে। তারপর তানিশাকে এত তাড়াতাড়ি তুলে আনা উচিত হয় নাই। যেহেতু সব হুট করেই করা হয়েছে, তাই ফেঁসে গেছে। তারপরও নিজের উপর একটা আত্নবিশ্বাস ছিল, এই যাত্রায় পার পেয়ে যাবে। ওদের এখান থেকে সরানোর সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। এখন চার দেওয়ালের একটা বদ্ধ কামড়ায় বসে কপাল চাপড়াচ্ছেন। তার ছেলেদের'ও ধরেছে, ওরা বাহিরে থাকলে যে করেই হোক একটা ব্যবস্থা করে ফেলত। কিন্তু এখন একদম নিরুপায়। হাপিত্যেশ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। ক্ষমতা হারিয়ে অন্ধ হয়ে ফজলুল সরকারকে একটা উপযুক্ত শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। ওদের মনে ভয় ঢোকানোর জন্য বাড়ির পেছন দিক দিয়ে যাওয়ার পথে যে ঘরটায় খুব সহজে নিজের বাগে আনা যায়, লোক লাগিয়ে তাই করেছিল। বেশ অনেকবার ঝিলমিলের ঘরের জানালায় ঢিল ছুঁড়েছে, ঠকঠক করেছে। ভয় তো পেল না উল্টো পুলিশে জানান দিল। তারপর ভাইয়ে ভাইয়ে ঝামেলা লাগানোর জন্য'ও একেকজনকে একেক রকম কথা বলেছে।

এইতো গত সপ্তাহেও মাহমুদ সরকারকে সামনে পেয়ে বলেছিল, 'কী হে ভাইসাব, ভালো তো? শরীর স্বাস্থ্যের কি খবর? আপনাদের ভাইয়ের জন্য আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগে। আপনারা তো পড়ে আছেন সেই বাপের আমলের ব্যবসা নিয়ে ওইদিকে বড় ভাই কি করছে দেখুন। তিনি তো নিজের সব গুছিয়ে নিচ্ছে আবার আপনাদের সম্পত্তিও সব তার দখলে। ভাই.. দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে পারছেন? ওরা ভালোভাবে সব আমাদের আয়ত্তে নিয়ে নিবে শেষে দেখা যাচ্ছে আপনি আঁটি হয়ে গড়াগড়ি করছেন।'

এইতো এভাবেই ভালোই চলছিল দিনকাল। অদ্ভুতভাবে সব ছাড়খাড় হয়ে গেল। তার এতদিনের পরিকল্পনা, পোষা কতকগুলো সাঙ্গপাঙ্গরা; সব হাতের নাগালের বাইরে। তবে তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, ওই বাড়ির কোনো মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিবেন না। তাকে যেমন সবাই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাঁক করে দিয়েছে, তিনিও সেভাবে সবাইকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিবেন।

তানিশা মামাবাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। ঝিলমিল তো এখানে থেকে চলে গিয়েই বেঁচেছে তবে তার দিকে মানুষের বাঁকা দৃষ্টির অবসান এখনও ঘটে নাই। সাবরিনা মেয়েকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। চিন্তায় চিন্তায় প্রেসার হাই করে ফেলেছেন। এখনও পর্যন্ত তানিশার মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় নাই। রেহানা খাতুন সবদিক বিবেচনা করে বললেন, 'দেখো, তোমরা যদি মেয়ের বিয়ে দিতে পারো। আমি এর থেকে ভালো কোনো উপায় দেখছি না। একমাত্র বিয়ের মাধ্যমেই ওর উপর থেকে এই কালো দাগ ঘুঁচবে।'

উনার কথাটা ঠিক আছে, কিন্তু তানিশা এখনও অনেক ছোটো। ওর বিয়ে দেওয়াটা এখনই দেওয়া ঠিক হবে কিনা, সেটা নিয়ে মোটামুটি সবাই দ্বিধাগ্রস্ত। তার উপর এলাকায় যে কাহিনী রটে গেছে, সেখানে ভালো পাত্র পাওয়া সহজ হবে না। বাড়ির সব মানুষের মাথায়'ই এই একটা বিষয় বোঝার মত চেপে আছে। তানিশা সেখানে নিশ্চুপ। এই বিষয়ে ভালো/মন্দ কিছুই বলে না। শিমু ফোন করে ঝিলমিলকে বলছিলেন এসব কথা। ঝিলমিল শুনে বলল, 'আমি যে তানিশাকে এখানে এনে রাখব, সেই ব্যবস্থাও নাই। আচ্ছা, এখনই বিয়েশাদীর কথা ভাবতে হবে না। আমি দেখছি কী করা যায়। এমনিতেই রোদ্দুর বলছিল, এই বাসাটা চেঞ্জ করবে। তাড়া দিলে হয়ত গুরুত্বের সহিত নিবে ব্যাপারটা। তারপর ওকে কিছুদিন আমার সাথে এখানে রাখব।'

'ঠিক আছে, যা ভালো বুঝিস।'

ঝিলমিল ফোন রেখে দিল। ওখানে থাকাকালীন মানুষের ওই চোরা দৃষ্টিটা ওকেও ভুগিয়েছিল খুব। এমনও হলো যে ভরা মজলিসে গিয়েছে তারমধ্যে কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল, 'ইশশশ রে, তোদের সাথে কি হলো এটা? কতগুলো দিন আটকে ছিলি বল তো। মানুষ কত নিষ্ঠুর। আহারে, ছোটো ছোটো বাচ্চা মেয়েগুলোকেও ছাড় দিল না।'

তখন বড্ড লজ্জায় পড়তে হতো। ঝিলমিলের ওই মুহূর্তে মনে হতো, মাটি ফাঁক হয়ে যাক আর সে টুপ করে মাটির নিচে ঢুকে পড়ুক।

রোদ্দুর বাড়ি ফিরতেই ওকে যা বলার দরকার ছিল, ততটুকু বলল। এই বাড়িটা আসলেই একজন মানুষের জন্য। ঝিলমিলের মাঝে মাঝেই দমবন্ধ থাকে। না ঠিকমতো হাঁটাচলা করা যায়, না নিঃশ্বাস ফেলা যায়। এই এইটুকু বাসার জন্য ওই বাড়ি থেকে এখনও কেউ এসে এক রাত থাকতে পারে নাই।

রোদ্দুর বলল, 'দু'দিন বাদে রায়হানের বিয়ে। সে কাল থেকেই আমাদের সাথে শুরু করবে হল্লা, প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানে থাকতে হবে। ওর বিয়ের পর যদি হয়। আর এখন তো হবেও না, মাসের মাঝামাঝি চলছে। সামনের মাস ছাড়া সম্ভব হবে কি?'

'ঠিক আছে, কিন্তু এখন তো আমরা বাসা দেখে রাখতে পারি। সবকিছু ঠিকঠাক করে রেখে যখন উঠা লাগে তখন উঠে পড়ব।'

'আচ্ছা ঠিক আছে। কাল বের হবো। আজ রাত হয়ে গেছে। এই রাতে আর বাইরে বের হতে ইচ্ছে করছে না। তোর কথা মেনে নিয়েছি, তুই এখন আমার একটা কথা শোন। এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়া‌।'

'হুমম, এটাই তো আমার ডিউটি। সন্ধ্যা থেকে কয় কাপ হলো খেয়াল আছে?'

রোদ্দুর ডানে বায়ে মাথা নাড়িয়ে 'নেতিবাচক' জবাব দিল। ঝিলমিল হাতের কর গুনে গুনে উত্তর দিল, 'ছয়বার.... এই সাত হবে।'

রোদ্দুর সোজা হয়ে বসে বলল, 'হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলব নাকি?'

'সরি, আমি পারব না। এখন তোকে চা দিয়ে আমি কম্বলের তলায় ঢুকব। এই বছর শীত যাচ্ছে না কেনো জানিনা। কী যে ঠান্ডা বাবাগো। এই ঠান্ডার মধ্যে তুই আমাকে দিয়ে বারবার পানি নাড়াচ্ছিস, এই কাজ সেই কাজ! উফফফ, কোথায় ভেবেছিলাম বিয়ের পর শুধু চিল আর চিল। এখন দেখছি খেটে মরা ছাড়া উপায় নাই। আমি বলেই না এখনও আছি নাহয় তুই যে মানুষ তোর কাছে কেউ দু'দিনও টিকতে পারত না।'

ঝিলমিলের কথা শুনে রোদ্দুর বিমর্ষ মুখে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলল, 'আমি যে একজনের ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করছি তাতে কিছু না! আর উনি সামান্য দু'কাপ চা বানিয়েই ক্লান্ত।'

.

রোদ্দুর নিজের কথা রাখল। পরদিন ঝিলমিলকে নিয়ে বের হলো বাড়ি দেখতে। ওর ভার্সিটির কাছাকাছি একটা বাড়ি পছন্দ করে সেখানেই কথাবার্তা বলে ঠিক করল। ঝিলমিলের'ও পছন্দ হয়েছে। অন্তত মুরগির খোপ থেকে তো রেহাই পাবে‌।

দিন কাটতে কাটতে খুব তাড়াতাড়িই সময় চলে এলো। আবীরের বিয়ের বন্দোবস্ত শুরু হয়ে গেছে। আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোদ্দুর আর ঝিলমিল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল। বাড়ি ফিরল মাত্র। সকাল থেকে এত মানুষজনের মধ্যে থেকে ঝিলমিলের মাথা ধরেছে। তাই বাড়ি ফিরেই ধপাস করে শুয়ে পড়েছে।

রোদ্দুর ওর পাশে বসে বলল, 'মাথা টিপে দিব?'

'লাগবে না।'

'দিই... নয়ত পরে বাড়ি গিয়ে সবার কাছে নালিশ করবি তোমাদের ছেলে আমার একটুও যত্ন করে না। একটুও খেয়াল রাখে না। এমনিতেই তো আমার নামে দুর্নামের শেষ নাই। যেচে পড়ে আবার কেনো কাঁধে দোষ নিব বল তো!'

ঝিলমিল বলল, 'ওহ আচ্ছা। বাড়ির মানুষের কথা ভেবে মাথা টিপে দিচ্ছিস। আর দু'দিন আগে বললি, ভালোবাসিস... কী কী যেনো? সব শুধু মুখের কথা তাইনা?'

রোদ্দুর নড়েচড়ে বসল। বলল, 'উহুঁ, ফাও ফাও কথা রোদ্দুর বলে না। আমি তো তোর জন্য'ই অপেক্ষা করছি। দেখা গেল, ভালোবাসার দাবি নিয়ে আমি একাই এগিয়ে গেলাম আর তুই মুখ ফিরিয়ে বসে রইলি।'

'ভালোবাসলে প্রত্যাখ্যান হওয়ার ভয় বিসর্জন দিতে হয়।'

রোদ্দুর ভুরু কুঁচকে তাকাল ঝিলমিলের দিকে‌। ও মনে হচ্ছে, দিনকে দিন ভালোবাসা বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠছে‌।

সে ঝিলমিলের উদ্দেশ্য প্রশ্ন করল, 'কি বলতে চাইছিস তুই?'

ঝিলমিল কোনো কথা বলল না। রোদ্দুরের হাত টেনে নিয়ে নিজের কপালে রেখে চোখ বুঁজল। রোদ্দুর আলতো হাতে কপালের দু'পাশে ম্যাসাজ করে দিল অনেকক্ষণ পর্যন্ত।

ঝিলমিল রোদ্দুরের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, 'আর লাগবেনা। থ্যাংক ইয়ু। ঘুমাব, বাতি নিভিয়ে দে। আলো চোখে লাগছে।'

রোদ্দুর মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। ওর জীবনটাই কেমন পরিবর্তন হয়ে গেল। আগে কখনো এইভাবে কারো হুকুম তামিল করা পছন্দ'ই করত না। ওর যেটা ভালো লাগত, যেটা পছন্দ সেটাই করত‌। আর এখন ঝিলমিলের পছন্দের অগ্রাধিকার'ই বেশি। এইতো অফিসের কিছু কাজ ছিল, অন্যসময় হলে বাতি জ্বালিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকত। কিন্তু এখন যখন ঝিলমিল একবার বলে দিয়েছে ওর ঘুম পেয়েছে বাতি নিভিয়ে দিতে হবে, রোদ্দুর তা এক ঝটকায় মেনে নিয়েছে।

ভাবটা এইরকম, 'আপনি বলতে থাকুন মহারানী আপনার জন্য এই বান্দা সর্বদা হাজির।'

একটা সুন্দর সকাল। চকচকে সূর্যের রশ্মি চকচকে রূপালী এবং স্বর্ণের বিভিন্ন রং ছড়িয়ে দেওয়া, পাখির মৃদু কিচিরমিচিরে ভরপুর আনন্দময় সকাল। প্রতিদিনের মত আজও রোদ্দুরের ঘুম আগে ভাঙ্গল। তবে আজ তাড়াহুড়ো নেই, ছুটির দিন। রোদ্দুর অনেকক্ষণ পর্যন্ত বিছানায় গড়াগড়ি করল। তারপর আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। ঝিলমিলকে ডেকে বলল, 'অ্যাই আজ তোর ডাইনোসর সিল্ক পড়ার দিন, তাড়াতাড়ি উঠে পড়।'

ঝিলমিল তৎক্ষণাৎ বলল, 'আমি ঠিক সময় উঠে পড়ব। তুই আমাকে বিরক্ত করিস না।'

রোদ্দুর ডাকাতের মত হো হো করে হাসতে লাগল। সেই হাসির আওয়াজে ঝিলমিলের ঘুম পুরোপুরি ছুটে গেল। সে চোখ কচলে উঠে বসল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'পাগল নাকি? এভাবে হাসছিস কেনো?'

ঝিলমিলের এহেন অভিযোগে রোদ্দুর ব্যাথিত হলো। সে দুঃখী এবং উদাস মুখে বলল, 'এসব পাগল ছাগলের অপবাদ তুই দিতে পারলি আমাকে? আমি কত ভদ্র, কত ইনোসেন্ট!'

ঝিলমিল হেসে বলল, 'আর একটা কথা বললে মাইর খাবি।'

তাই রোদ্দুর আর কথা বলার রিস্ক নিল না। ঝিলমিলকে তাড়া দিয়ে নিজেও উঠে পড়ল। ওই বাড়িতে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে। আজকে বিয়ের অনুষ্ঠানে আদিয়াত থাকছে না। ওর মামা শ্বশুর অসুস্থ, তাই যেতছি হয়েছে ওখানে। রোদ্দুর ফ্রেশ হয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতেই ফোন বেজে উঠল। সৌভিক ফোন করেছে। রোদ্দুর রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলল, 'মামা, আজকে তো সেই একটা প্ল্যান করেছি। রাতে আমাদের এইখানেই থাকবি তো নাকি!'

রোদ্দুর মাথা চুলকে বলল, 'হবে না হয়তো। আমার স্বাধীন জীবন, একলা জীবনের ইতি ঘটেছে ভাই। অন্য একদিন থাকব।'

সৌভিক চেঁচিয়ে বলল, 'ঠিক এইজন্য'ই আমি বিয়ে করি না। শালা তোরা বিয়ে করে সব চেঞ্জ হয়ে গেছিস। কবে জানিনা আমাদের নামগুলো'ও ভুলে বসে থাকিস। ভালো ভালো, বেশ ইমপ্রুভমেন্ট হচ্ছে। চালিয়ে যা দোস্ত তবে মাঝে মাঝে এই অধমদের একটু মনে করিস। এতে তোর যথেষ্ট মঙ্গল হবে।' সৌভিক ফোন রেখে দিল। রোদ্দুর ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে দেখল ও এইদিকেই তাকিয়ে আছে। তাই ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে ফোন কানে ঠেকিয়ে অযথা বলল, 'আরে ভাই বিয়ের পর বউ ছাড়া দুনিয়ার কিছু ভালো লাগে না। সব নিরামিষ, সব অন্ধকার। বউ হচ্ছে আলোর জগত। বিয়ে কর, তারপর বুঝতে পারবি। বিয়ে ছাড়া বউয়ের মর্ম বোঝার মত মহাপুরুষ এখনও তুই হতে পারিস নাই।'

রোদ্দুরের কথা শেষ হতেই সে ফোন নামিয়ে রাখল। ঝিলমিল গালে হাত ঠেকিয়ে বলল, 'আচ্ছা তুই কি বিবাহ বিশারদ? সবাইকে যে জ্ঞান দিয়ে দিয়ে বেড়াচ্ছিস, নিজের জ্ঞান আছে তো? বউ আলোর জগত! বউয়ের মর্ম! বাহ কত কথা, তুই নিজে এসব বুঝিস?'

রোদ্দুর এক দৌড়ে ঝিলমিলের দিকে এগিয়ে এলো। ওর হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে এসে থুতনিতে হাত রেখে বলল, 'বুঝি। তুই চাস তোকে বোঝাই? তাহলে সরাসরি বল। এভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলার কি দরকার?'

ঝিলমিল আপ্রাণ চেষ্টা করল রোদ্দুরের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর, কিন্তু পারল না। যত আলগা হতে নিচ্ছে ততই রোদ্দুর ওকে নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে। ঝিলমিল বলল, 'সুযোগ পেলেই এমন অভদ্রতামি করিস কেনো?'

রোদ্দুর নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, 'কারণ আমি অভদ্র আর এই উপাধি তুই আমাকে দিয়েছিস।'

'আচ্ছা তুই অনেক ভালো, এখন আমাকে ছেড়ে দে।'

বিজ্ঞাপন

'জি না।'

রোদ্দুর এইবার একপাশে ঘুরিয়ে ঝিলমিলকে ওর সামনাসামনি দাঁড় করাল। চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল। ঝিলমিলের পক্ষে ওভাবে তাকানো অসম্ভব। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, বুকের মধ্যে স্বজোরে দুপ্পুরদাপ্পুর আওয়াজ হচ্ছে। রোদ্দুর ওর থুতনিতে হাত ঠেকিয়ে মুখ উপরে তুলল। ঝিলমিল চোখ গরম করে তাকাল। রোদ্দুর চোখের ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করল, 'ওসবে কোনো লাভ হবে না।'

তবে মুখে একটা কথা জিজ্ঞেস করল, 'আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিবি?'

'হুমমম.... বল।' নত মস্তকে বলল ঝিলমিল।

'আগে আমার দিকে তাকা।'

'এভাবেই বল, শুনছি আমি।'

'উহুঁ।'

ঝিলমিল তাকাল। রোদ্দুর বলল, 'সেদিন যখন আমার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন আমার জন্য এত টেনশন কেনো করছিলি? উমমম... একদম চোখ নামাবি না। আমার চোখে চোখ রেখে উত্তর দে। আমি জানতে চাই। যে মানুষটাকে সহ্য করতে পারিস না, সে হারিয়ে গেলেই বা তোর কী?'

ঝিলমিল নিঃশ্বাস চেপে বলল, 'আমি কখন বলেছি তোকে আমার সহ্য হয় না। আর.... আর....'

'আর কী?'

ঝিলমিল কথা বলবে কি? রোদ্দুর বারবার তাকে অপ্রস্তুত করে দিচ্ছিল। যেই কথা মুখে আসে সে কথা ওভাবেই আবার ভেতরে চলে যায়‌। রোদ্দুরের জন্য কেনো এত চিন্তা হয়েছিল, সেটা তো ওইসময় ভেবে দেখে নাই! এখন ভাবতে গিয়ে গোলমাল পেকে যাচ্ছে।

ঝিলমিল উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল, 'একজন মানুষ হিসেবে আমার সার্বিক দায়িত্ববোধ আছে না! যেহেতু একসাথে থাকি সেক্ষেত্রে আমার উচিত তোর খোঁজখবর রাখা এবং খোঁজখবর নেওয়া।'

রোদ্দুর হেসে বলল, 'মনে হচ্ছে বইয়ের পড়া আমায় মুখস্থ শুনাচ্ছিস।'

'এখন তোর দেরি হচ্ছে না? তখন তো আমার সাথে তাড়াহুড়ো করলি। আমি গিয়ে রেডি হই, আমার সময় লাগবে তো। এরপরে আর কখন যাব আমরা?'

রোদ্দুর ফের এক হাতের সাহায্যে ঝিলমিলের মুখটা ওর দিকে ঘুরিয়ে এনে বলল, 'প্রসঙ্গ ঘুরাস না। আমার প্রশ্নের উত্তর দে।'

ঠিক এই সময় ঝিলমিলের ফোনটা বেজে উঠল। ওরা দু'জন একইসাথে ফোনের দিকে তাকাল। রোদ্দুরের হাতের বাঁধন আলগা হয়ে এলো। সে ঝিলমিলকে ছেড়ে দিয়ে বলল, 'ফোনটা তোকে বাঁচিয়ে দিল‌, আজ ছেড়ে দিলাম।'

ঝিলমিল যেনো হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে ঠিক করল। ফোন হাতে নিয়ে দেখল শিউলি ফোন করেছে। মনে মনে সহস্রাধিকবার ওকে ধন্যবাদ জানাল।

এরপর তো ঝিলমিলের রোদ্দুরের সাথে কথা বলতে, কোথায় যেতে অস্বস্তি হবে; তারচেয়েও বেশি লজ্জা করবে। আজকে অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছিল আর ভাবছিল। উফফফ, এই ছেলেটা মাঝেসাঝে এত পাগলামী করে না! ঝিলমিলের মেকআপের শেষ প্রলেপটা মুখে লাগাতেই রোদ্দুর ঘরে প্রবেশ করল। ওকে দেখে তৎক্ষণাৎ মাথা নামিয়ে অন্যকাজে হাত দিল অর্থাৎ কিছু করার নেই তাই জিনিসপত্রগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করছিল।

রোদ্দুর জিজ্ঞেস করল, 'শেষ?'

'হুম।'

তারপর সে বলল, 'তোকে ডায়নোসর শাড়িতে খুব সুন্দর লাগছে।'

ঝিলমিল হাসতে গিয়েও হাসি চেপে গেল। ও বোধহয় এই শাড়িকে সারাজীবন ডায়নোসর শাড়ি হিসেবেই উল্লেখ করে যাবে। ঝিলমিল এতক্ষণ রোদ্দুরের দিকে তাকায় নাই। তবে সে যখন গেট লক করছিল তখন একবার চোখ তুলে তাকিয়েছে। তাতেই বুকের মধ্যে হৃদপিন্ড ১০৪ ডিগ্রী এঙ্গেলে লম্ফঝম্প করা শুরু করে দিয়েছে। নতুন বউয়ের মত লজ্জা লাগছে। আশ্চর্য, চোখ দু'টোর কি সমস্যা হলো? ওর দিকে তাকাতে পারছে না কেনো!

বিয়ে বাড়িতে মোটামুটি সবাই ঝিলমিলের অচেনা। সে অবশ্য রোদ্দুরের সাথে সাথেই রয়েছে। মাঝেমধ্যে তার ডায়নোসর শাড়ি সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে।

রোদ্দুর ঝিলমিলকে বলল, 'তুই একটু এখানে বোস, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।'

ঝিলমিল বসল না, আশেপাশে চক্কর দিল। কিছুদূর আগাতেই রোদ্দুরকে দেখতে পেল কার সাথে যেনো কথা বলছে। একটা মেয়ে, দু'জন কী হেসে হেসে কথা বলছে। ঝিলমিল চোখ ছোট ছোট করে ওখানেই দাঁড়িয়েই পড়ল।

আপনমনে বিড়বিড় করে বলল, 'ওমা! ওর চেহারা কী গ্লো করছে। অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথা বলার কারণে চেহারা এত চকচক করছে। অথচ আমার সাথে যখন কথা বলে তখন মনে হয় ওকে কেউ জোর করে নিমপাতার রস খাইয়ে দিয়েছে। এসব দেখার জন্য আমি এখানে এসেছি নাকি? এসব তো সহ্য হচ্ছে না।'

পরক্ষণেই আবার নিজেকে প্রশ্ন করল, 'এসব কেনো তোর সহ্য হচ্ছে না। তুই তো রোদ্দুরকে ভালোবাসিস না যে অন্যকারো সাথে হেসে কথা বলতে দেখলে তোর হিংসে হবে। বিয়ে হয়েছে বলে, নিয়ম রক্ষার্থে, থাকতে হবে বলে ওর সাথে থাকিস। কুল ডাউন, হিংসে হওয়ার কোনো কারণ নেই। ওর জীবন আছে, ওটা ওর মত করে উপভোগ করতে দে।'

নিজের মনের এই কথাটা নিজের'ই মানতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তার। হঠাৎ মনে হলো, রোদ্দুরের জীবনে কোনো জায়গা নেই তার। যতই ভালোবাসা দেখাক না কেনো, সব সাময়িক। তাছাড়া একজনকে ভালোবেসে অন্যজনের সাথে হেসে কথা বলবে কেনো?

রোদ্দুর এসে দেখল ঝিলমিল খারাপ করে বসে আছে। রোদ্দুর বলল, 'আয় তোকে ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।'

'লাগবে না।'

'কেনো? একা একা বসে থাকবি?'

'হুমম.... একই ভালো।'

ঝিলমিলের উঠতে হলো না। যার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছিল রোদ্দুর সে নিজেই এগিয়ে এলো। ইনি হচ্ছে, রোদ্দুরের বন্ধু রায়হানের ওয়াইফ মোহনা। রোদ্দুর তার সাথে ঝিলমিলের পরিচয় করিয়ে দিয়ে কেটে পড়ল। ঝিলমিলের সাথে অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই উনার গল্প জমে গেল। পরবর্তীতে কথা বলার জন্য একে অপরের ফোন নম্বরটাও নিয়ে রাখল।

বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা সন্ধ্যা নাগাদ শেষ হয়ে গেল। ঝিলমিলকে একা রাখবে না বলেই রোদ্দুর আজ বন্ধুদের সঙ্গ দিতে পারছে না। তাই অনুষ্ঠান শেষ হতেই ঝিলমিলকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল।

পথিমধ্যে ওকে বলল, 'কফি খাবি?'

'খাওয়া যেতেই পারে।'

রোদ্দুর একটা কফিশপের সামনে বাইক পার্ক করল। ঝিলমিলকে নিয়ে ভেতরে যেতেই সানিয়ার সাথে দেখা হয়ে গেল। ও কফিশপ থেকে বের হচ্ছিল। সানিয়াকে দেখে ঝিলমিলের মুখে হাসি ফুটল আর রোদ্দুরের কপালে পরপর কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। সানিয়া ঝিলমিলছর আপাদমস্তক পরখ করে বলল, 'ভালোই!'

ঝিলমিল হেসে বলল, 'হুম.. ভালো তো হবেই। আপনার ভাইয়ার পছন্দে কেনা শাড়ি। ভালো না হয়ে যাবে কোথায় বলেন তো আপু?'

সানিয়া দাঁত কিড়মিড় করে রোদ্দুরের দিকে তাকাল। বলল, 'বিয়ে করে ফেলেছ। এত তাড়াতাড়ি আমাদের সম্পর্কের ইতি টানবে কখনও ভাবতেই পারি নাই। তাও কিনা বিয়ের খবরটা তোমার বউয়ের মুখ থেকে শুনতে হলো।'

রোদ্দুরকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঝিলমিল নিজেই বলল, 'ও আসলে অনেক লাজুক তো। কীভাবে নিজের বিয়ের কথা নিজের মুখে বলবে? আমি তো ওর বউ, তাই আমিই বলে দিলাম। আপনাকে তো বলেছি, মন খারাপ করবেন না। আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে সর্বপ্রথম দাওয়াত আপনিই পাবেন। আপনার কি খাবার পছন্দ বলেন তো? সেটাই মেনুতে রাখব।'

সানিয়া ফোঁস ফোঁস করতে করতে চলে গেল। ঝিলমিল আফসোসের সুরে বলল, 'ইশশ আমার না হওয়া সতীনটা!'

রোদ্দুর হেসে উঠল সাথে ঝিলমিল'ও। ওরা কফি খেয়ে দু'জন রাজ্যের গল্প করে বাড়ি ফিরল। বাড়ি ফিরতে ফিরতে অবশ্য ভালোই রাত হয়েছে। কারণ ফেরার পথে জ্যামের মধ্যে প্রায় দেড় ঘন্টা আটকে ছিল। এমনিতেই আবহাওয়া ঠান্ডা কিন্তু এত গিজগিজ করা মানুষের মধ্যে গরমে ঝিলমিল প্রায় ঘেমে গিয়েছিল। বূলা বারোটা নাগাদ করা মেকআপ তখন উঠতে উঠতে প্রায় নাই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কফিশপে বসে সে আবার ফোনেয ক্যামেরা দেখে ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়েছে।

রোদ্দুর বারবার বলেছে, 'এই জিনিসটা তো পেটেই চলে যাবে, আর দিস না। পরের জন্য একটু বাঁচিয়ে রাখ।'

'কেনো? শেষ হয়ে গেলে আবার কিনে দিবি।'

রোদ্দুর কানে ধরেছে, সে আর এসব কেনাকাটার মধ্যে নাই। জীবনে কোনোদিন এত শপিং করে নাই। শুধুমাত্র প্রথম যখন স্যালারি পেয়েছিল, তখন বাড়ির সবার জন্য টুকটাক কেনাকাটা করেছিল তাও সেসব ছিল সহজ-সরল। ঝিলমিলের লিষ্টের মত ডাইনোসর না, রেভলন ফ্রস্ট'ও না।

বাড়ি ফিরে দেখল কারেন্ট নাই। এইদিকে জেনারেটর এর কী যেনো সমস্যা হয়েছে, তাই সেটাও অফ। এখন সাততলায় উঠতে হবে সিঁড়ি ভেঙে। রোদ্দুর তো এক লহমায় উঠে গেল। ঝিলমিল আর পারল না। এক কদম সামনে আগায় তো আরেক কদম থেমে যায়। একবার তো হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিয়েছে।

অবশেষে দরজা পর্যন্ত আসতে পারল। হৃদপিন্ড এখনও ধুকপুক করছে। ঘরে গিয়ে সোজা ধপাস করে বসে পড়ল। রোদ্দুরকে বলল, 'তুই এত নিষ্ঠুর! এভাবে আমাকে রেখে চলে এলি?'

'তো তোকে কি আমি কোলে করে নিয়ে উঠতাম? তাহলেই তো ন্যাকা ন্যাকা কণ্ঠে বলতি, তুই এত অভদ্র কেনো!'

ঝিলমিল ওর হাতের ব্যাগটা তুলে রোদ্দুরের দিকে ছুঁড়ে ফেলল। রোদ্দুর সহসা তা ক্যাচ করল। ব্যাগ হাতড়ে সে লিপিষ্টিক টা বের করল। ঝিলমিল দেখে বলল, 'এসব তোর ইউজ করার জিনিস না, রেখে দে।'

'আরে দেখছি তো।' তারপর উল্টেপাল্টে পুনরায় বলল, 'এই জিনিস যে খাবারের সাথে পেটে যায়, পেট খারাপ হয় না?'

'খেয়ে দেখ, হয় কিনা!'

'স্বাদ কেমন?'

'টেস্ট কর।'

রোদ্দুর ঝিলমিলের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, 'করব? সত্যি?'

'হুম, করতে পারলে কর।'

রোদ্দুর ঝিলমিলের কাছাকাছি এগিয়ে এসে ফের জিজ্ঞেস করল, তারপর আবার.... আবারও। ঝিলমিল বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকাল। ঝিলমিল রোদ্দুরের উসখুস করা দেখে যা বোঝার বুঝে গেল। সে তড়িৎ বেগে উঠে দাঁড়িয়ে রোদ্দুর সামনে এসে ওর চুলগুলো মুঠোবন্দী করে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, 'অসভ্য, অভদ্র কোথাকার! এত বাজে হয়ে গেছিস ছিঃ। তোর সাথে থাকাই তো রিস্ক।'

.

বিজ্ঞাপন
ঝিলমিল রোদ্দুরে গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও রহস্যময় গল্প