ঝিলমিল রোদ্দুরে

পর্ব - ৩৪

🟢

আমাদের সমাজে জাজমেন্ট করার লোকের অভাব নেই, সে আমার কোনো দোষ থাকুক অথবা না থাকুক। দোষ না থাকলেও কোনোভাবে দোষী, আর দোষ থাকলে তো মাটির সাথে মেলাতে সময় লাগে না।

ঝিলমিল এতদিন অর্থাৎ দুটো দিন নিখোঁজ ছিল, কোথায় ছিল, কীভাবে ছিল, কার সাথে ছিল, কী অবস্থায় ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে তানিশাকে নিয়েও। তার উপর ও একটা অবিবাহিত মেয়ে! ভবিষ্যতে এইসব কাহিনীর জন্য ওর বিয়ে হবে কিনা এসব নিয়েও চিন্তা-ভাবনার শেষ নেই। তাদের এতই মাথাব্যথা! বাড়ির মানুষ ঘুণাক্ষরেও কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে নাই অথচ সকাল সকাল পাশের বাসার এক আন্টি এসে ঝিলমিলকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে, 'কিরে তোদের গায়ে-টায়ে হাত দিয়েছিল? বাবা, কী কাহিনী। আজকালকার যুগ-জামানা খারাপ। তোদের নিয়ে কী যে টেনশনে ছিলাম। তাও ভালোভাবে ফিরে এসেছিস এই অনেক। থাক, এসব নিয়ে মন খারাপ করতে হবে না। তোর তো বিয়ে হয়েছে, এসব কথা স্বামীকে যেনো গড়গড় করে বলে দিতে যাস না। আমার তো চিন্তা হচ্ছে, তানিশাকে নিয়ে। মেয়েটার কি হবে বলে তো? আহারে।'

এই আহারে, উহুরে শুনতে শুনতে ঝিলমিল বিরক্ত হয়ে গেল। গতরাতে বাড়ির সবাই মানুষের কথাবার্তা নিয়েই আলোচনা করছিল। তারা যে এই বিষয়টা স্বাভাবিকভাবে নিবে না, তা তারা আগে থেকেই ধারণা করেছিল। কিন্তু ওদের সামনে প্রকাশ করে নাই। লাভ কি হলো? ঝিলমিল ঠিকই জেনে গেল। তানিশা এখনও নিজের ঘর থেকে বের হয় নাই বলে রক্ষা। কিন্তু কতক্ষন? এরা তো ছাড় দিবে না। কথা শোনানার জন্য এবং আলগা পিরিতের প্রলেপ লাগানোর জন্য টেনে হিঁচড়ে হলেও বের করবে।

এমনিতেই এসব নিয়ে নিজের মন-মেজাজ খারাপ, তারমধ্যে মানুষের এত কথা শুনতে কার ইচ্ছে করবে? শুধু ভদ্রতার খাতিরে মুখের উপর কিছু বলতে পারে না। নয়তো কখনো এসব পরোয়া করে?

ঝিলমিল চেয়েছিল এই ব্যাপারটা নিজের মধ্যেই রাখতে। মানুষ যা বলবে তাই এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে ফেলবে। কিন্তু তার উপায় কোথায়? বাড়িতে এসে দাদিকে পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল, 'আপনার নাতনিদের অবস্থা কেমন এখন?'

ঝিলমিলের মা ভীষণ ভেঙ্গে পড়লেন এসব শুনে। নীলিমা এসে বলল, 'এসব বোধহয় এখনও রোদ্দুরের কানে পৌঁছায় নাই। যার বিয়ে তার হুঁশ নাই আর পাড়াপড়শির ঘুম নাই দেখলে দুনিয়া উলটপালট করে ফেলবে। সবকিছু মিলিয়ে ছেলেটাও ডিস্টার্ব। সকালে বলছিল, কাল ঢাকা ফিরে যাবে। ওর সামনে যেনো বাড়িতে ভুলেও এসব কথা না হয়। বাহিরের মানুষ যে যা বলে বলুক, বাড়িতে সবাই ঠিক থাকলেই তো হলো। তানিশা এখনও ভয় পেয়ে আছে। রিমঝিমকে বলেছি, ওর কাছাকাছি থাক সবসময়। ওই মেয়েটা যদি একবার এসব কথা শোনে ওর মনের অবস্থা কেমন হবে ভাবতে পারছ!'

ঝিলমিলের কাছে সব অসহ্য লাগছিল। ইচ্ছে করছে, সবকিছু ছেড়ে কোথাও চলে যেতে যেখানে মানুষের কোলাহল নেই! রোদ্দুর হাসানকে সকালবেলা বেরিয়েছে, সম্ভবত থানায় আছে। এই ঝামেলাটা মিটমাট করতে পারলেই স্বস্তি। মাথায় একটা বোঝা হয়ে চেপে আছে। ঝিলমিল ভেবেছিল, বাড়ি আসার পর শান্তি পেয়েছে। মনটা শান্ত হয়েছে। কিন্তু শান্তি তার কপালে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মা এসেছিল, কিন্তু সে একা থাকার কথা বলে এড়িয়ে গেছে। মা আর কী বলবে? হয়তো শান্ত্বনা দিবে দু'এক কথা বলে। আর এখন তো শান্ত্বনার বাণী শুনতেও ইচ্ছে হচ্ছে না।

রোদ্দুর বাড়ি ফিরল সন্ধ্যার পর। হাসানের কাজ ছিল, যাওয়ার তাড়া ছিল তাই ওকে বাহে তুলে দিয়ে একেবারে বাড়ি ফিরেছে। বসার ঘর পার হওয়ার সময় কাউকে দেখল না। এমনিতে এই সময় বাবা-চাচারা বাসায় থাকে, সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডা বসে বাসায়। রোদ্দুর চা খাওয়ার জন্য'ই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে। এই ঘরে কাউকে না দেখে হতাশ হয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। ঘরে গিয়ে ঝিলমিলের দেখা পেল। সে এখন এই ঘরেই থাকছে‌। আগে তো রোদ্দুরের ঘরের আশেপাশে যাওয়ার'ই সাহস পেত না, আর এখন এখানে এসে রাজত্ব কায়েম করছে। রোদ্দুর যখন ঢাকা থেকে এখানে আসত তখন'ই এই ঘরের দরজা খোলা হতো বাদবাকি সময় সে নিজেই লক করে রাখত। মাঝে মাঝে মেজো চাচি গিয়ে পুরো ঘরটা পরিষ্কার করে দিতেন। রোদ্দুর ঘরে ঢুকতেই ঝিলমিল বেরিয়ে যাচ্ছিল। রোদ্দুর জিজ্ঞেস করল, 'কি হলো কোথায় যাচ্ছিস?'

ঝিলমিল কাটা কাটা কণ্ঠে জবাব দিল, 'ব্যস্ত মানুষ তুই। এখন নিশ্চয়ই ফোনের মধ্যে ডুবে যাবি নয়তো অন্যকিছু করবি, আমি এখানে থেকে কী করব? আমার বোবার মত বসে থাকতে ভালো লাগবে না।'

'থাক এখানেই। কাল তো চলে যাচ্ছি। তুই তো আরও কিছুদিন থাকবি এখানে। এখন অবশ্য সমস্যা নাই, সব সমস্যা মোটামুটি মিটেই গেছে। তবুও আরেকটু সাবধানে থাকার চেষ্টা করিস।'

ঝিলমিল ঘুরে তাকিয়ে বলল, 'ও আচ্ছা চলে যাবি? ভালোই তো। আমাকে বলছিস কেন? আমি শুনে কি করব? আর আমি তো এখানেই থাকব। শশুর বাড়ি না আমার? দুনিয়া উল্টেপাল্টে গেলেও তো শশুর বাড়িতেই থাকতে হবে। তুই যেনো খবরদার আমাকে আর নিতে আসিস না। আমি তোর সাথে যাব না। তুই গিয়ে একলা একলা থাক, মনমতো যা ইচ্ছে কর। বন্ধু-বান্ধব, আর কে কে যেনো আছে না? গল্প করিস, আড্ডা দিস। সম্ভব হলে ওদের সাথে ওখানেই থেকে যাস। বাড়িতে ফেরার কি দরকার? বাড়িতে আসিস কি জন্য? ঘুম? সেটা তুই ফুটপাতে বসে শুয়েও ঘুমাতে পারবি।'

ঝিলমিল এতগুলো বলে থামল। রোদ্দুর কিছুটা হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ঝিলমিলের কণ্ঠ শুনে মনে হয়, রাগ করে কথাটা বলছে। কিন্তু চেহারা আবার অন্য কথা বলে! রোদ্দুর বোঝার আগেই ঝিলমিল ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ঝিলমিল বুঝতে পারছিল না, কি করবে! অন্যসময় হলে শিউলিদের বাসা থেকে ঘুরে আসতো, কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। নানারকম লোকে নানারকম কথা বলছে।

গায়ে একটা চাদর পেঁচিয়ে ছাদে এসে দাঁড়াল। চাঁদ তার রূপালি আলোয় উদ্ভাসিত করে দিয়েছে প্রকৃতি। আশেপাশে সবখানে চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ে আল্পনা আঁকছে। স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। শিশিরের শব্দ পাওয়া যায় কান পাতলে। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না— অথচ মনপ্রাণ দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। উল্টোদিকে গেলে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা নদীটাও দেখা যাবে। ঝিলমিল পেছন ফিরতেই রোদ্দুরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। আচমকা ভয় পেল। কখন যে বিড়ালের মত টিপে টিপে এসে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কে জানে! ঝিলমিল রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বলল, 'ফলো করছিস? লাভ নেই।'

'একা ভালো লাগছিল না।'

'বাবাহ! আগে তো একলাই ছিলি। তখন তো কোনো মানুষজন সহ্য করতে পারতি না।'

বিজ্ঞাপন

'এখনও পারি না.... সবাইকে ভালো লাগে না। সবার সঙ্গ ঠিক উপলব্ধি করতে পারি না।'

'আমি মানুষ হিসেবে ভীষণ বোরিং। আমার সঙ্গও উপলব্ধি করতে পারবি না। যারা মজা করে কথা বলে, তাদের সাথে কথা বলে শান্তি পাওয়া যায়। আমি এত রং রসিকতা জানিনা‌। আমি শুধু ঝগড়া করতে জানি।'

রোদ্দুর প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, 'তোর মন খারাপ?'

'হুমমমম.... অনেক বেশি।'

'কারণ?' রোদ্দুর জিজ্ঞেস করল।

ঝিলমিল রোদ্দুরের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল অজান্তেই। কাঁধে মাথা রাখল। আচমকা রোদ্দুরের হাত চলে গেল, ঝিলমিলের কাঁধে। ওকে খুব আলতো করে নিজের মধ্যে আবদ্ধ করে নিল।

ঝিলমিল বলল, 'আমার জীবনটা কেমন অদ্ভুত হয়ে গেল। যা হচ্ছিল সবটাই তো মেনে নিয়েছি। মনের সব দুঃখগুলোকে একটা কুঠুরিতে আটকে রাখতে চেয়েছিলাম, যেনো সময়-অসময়ে তা মনের আনাচে কানাচে কিছুতেই ছড়িয়ে যেতে না পারে। একটা সামান্য ঘটনা... আমার কাছে খুব সামান্যই মনে হয়েছে; সেটাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মানুষ কী বানিয়ে ফেলছে। এখন নিজের'ই মনে হচ্ছে, মহাপাপ করে ফেলেছি। আমি এই মহাপাপের পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাই। এই বার বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।'

ঝিলমিলের মুখে এই কথা শুনে রোদ্দুর ঠিকই বুঝতে পারল, সে কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল।

রোদ্দুর বলল, 'তোর সাথে সবাই আছে, বাড়ি সবাই। কারো কথায় কান দেওয়ার কি দরকার? মানুষের জীবন কয়দিনের? বাঁচতে হলে একটু ভালোভাবেই বাঁচা উচিত, নিজের কথা ভাবা উচিত।'

আজ মনে হয় সে রোদ্দুরের ভেতরকার আরেকটা রূপ দেখতে পেল। ওর কথাটা ভীষণ অন্যরকম শোনাল, এতদিনের সাথে মিল নেই। অনেক আদুরে আর আহ্লাদে ভরপুর। ওর রাগচটা স্বভাবের পর এমন কথা শুনে ঝিলমিল সব কথারা বাঁধন হারা হয়ে গেল। সে রোদ্দুরের কাঁধে মাথা রেখেই বলল, 'কিন্তু আমার যে ভালো লাগে না।'

রোদ্দুর এইবার ঝিলমিলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, 'এক জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাই কি ভালোলাগার হয়ে থাকে? আমি তো একটা বিরক্তিকর মানুষ, সবসময় রাগ করি, ধমক দিই। আমাকে কি ভালো লাগে? আমি কি ভালোলাগার মত মানুষ? তাও তুই আছিস তো আমার সাথে! তুই তো বাড়ির সবার আদরের। বাইরের লোকের কথায় কি আসে যায়? তোর কোনো বিপদ-আপদে ওরা এগিয়ে আসবে না। ওরা তখন আগাবে যখন তোর দোষ ধরতে পারবে‌। তোর বাড়ির মানুষ সব পরিস্থিতিতে তোর পাশে থাকবে। তাই ভুলে যা তাদের কথা।'

ঝিলমিল জানে, মানুষের এসব কথা কানে তোলা মানে নিজেকে ছোট করার সুযোগ তাদের করে দেওয়া। সে সুযোগ না দিলে, কথার পিঠে দু'টো কথা শুনিয়ে দিলে, তাদের কখনো সাহস হতো না এসব বলার। কিন্তু মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে চুপ করে যেতে ইচ্ছে করে.... সব সময় কথা বলতে ভালো লাগে না, তর্কে জড়াতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু যে দোষের বোঝা তাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই দোষের বিন্দু পরিমাণ ভাগের অংশীদার সে নয়।

সে কিছুটা কান্নাভেজা কন্ঠে বলল, 'সবই ঠিক আছে, তবুও আমাকে ওসব বাজে কথা শুনতে হচ্ছে তো? মানুষের বাঁকা দৃষ্টি সহ্য করতে হচ্ছে!'

রোদ্দুর হঠাৎ করেই ওকে নিজের বাহুবন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলল। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, 'দুনিয়ার সব কিছু ভুলে যা, মাথা থেকে সবকিছু ঝেড়ে ফেল। মনে কর কিচ্ছু হয় নাই। কোথাও কেউ নেই। এই যে পূর্ণিমা রাত, জোৎস্নার আলো— শুধু উপলব্ধি করে যা নিজেকে আর আমাকেও। প্রতি মুহূর্তে আমরা মনে হচ্ছে, আমি কী জ্বালায় ভুগছি। বুকের ভেতর যন্ত্রণায় ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি কেনো! কিন্তু এই কেনোর সঠিক উত্তর জানতে পারছি না। সবটা তোর জন্য। আমার ভেতরকার অসহনীয় হাহাকার, যন্ত্রণা, মায়াবী সত্ত্বা... সব মানে সব! আমার মনে হয়, আমি জীবনে প্রথমবারের মত ভালোবেসে ফেলেছি। প্রথমবার, হ্যাঁ প্রথমবার! আগে যেটা ছিল ওটাকে ভালোবাসা বলে না, ওটা আমার একরোখা জেদ। জেদ আর ভালোবাসা কখনোই এক আকাশে ঝলঝল করতে পারে না। কীভাবে বোঝাব, তুই আমার জন্য কী!'

ঝিলমিল থমকে গেল অনেকটা। হুঁশ হতেই সরে দাঁড়াল। রোদ্দুর'ও ঝিলমিলের এই পরিবর্তন টের পেয়ে নিজের হাতের বাঁধন আলগা করে দিল। ঝিলমিল কেমন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 'আমি নিচে যাচ্ছি।'

রোদ্দুর মাথা নাড়াল‌। ঝিলমিল চলে গেল। রোদ্দুর কিছুক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ঝিলমিল যেই আশ্চর্যজনক বাঁধনে তাকে বেঁধে ফেলেছে ঠিক সেই বাঁধনে ঝিলমিলকে বেঁধে ফেলার জন্য সে অপেক্ষা করবে.... অপেক্ষা করতেই হবে তাকে।

.

বিজ্ঞাপন
ঝিলমিল রোদ্দুরে গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক ও রহস্যময় গল্প