রোদ্দুর খুব মনোযোগ সহকারে চিরকুটে চোখ বোলাচ্ছে। তেমন কিছু নেই তবে ওর নাম লেখা কয়েকবার, তারপর কাটাকুটি করা। নিচের লাইনে আবার লিখেছে, রোদের মতোই তেজ দেখায়। আমার সাথে এত তেজ গিরি দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না।
রোদ্দুর কাগজটার এ'পাশ ও'পাশ উল্টে দেখল। পেছন দিকের কোণায় আবার লেখা রয়েছে, 'কী করে যে বলব?' তারপর কয়েকবার ওর নাম লেখা। ব্যস আর কিছু নাই।
রোদ্দুর ঝিলমিলকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল, 'এসব কি? পড়াশোনা বাদ দিয়ে আবার নাম মুখস্থ করছিস নাকি?'
ঝিলমিল চমকে তাকাল। রোদ্দুরের তো এই প্রশ্ন করার কথা নয়। বোকার মত তাকিয়ে থাকতে দেখে রোদ্দুর পুনরায় প্রশ্ন করল, 'কিরে? এসব কি? মুখে কথা নাই কেনো?'
ঝিলমিল আন্দাজে বলল, 'কই কি?'
রোদ্দুর চিরকুটটা ওর চোখের সামনে মেলে ধরল। ঝিলমিল যেনো হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এটা ওই চিরকুট না যেটার কথা সে ভাবছিল, এটা আলাদা, অন্য একটা। ঝিলমিল মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল, 'ধুর এসব কিছু না। ক্লাসের মধ্যে তোকে ইচ্ছেমত থাবড়াতে ইচ্ছে করছিল। সেখানে তো আর তা সম্ভব নয়, তাই এইভাবেই মনের খায়েশ মিটিয়েছি।'
'তোর প্রেমিকা ছিল না আশেপাশে? আমার বদলে উঠে দু'টো থাবড়া দিতি।'
কী এক প্রেমিকার জালে ফেঁসে গেছে। যত চায় এড়াতে, ততই জেঁকে বসে। ঝিলমিল রোদ্দুরের কথায় মনোযোগ না দিয়ে বইয়ের দিকে মনোযোগ দিল। কিছুক্ষণ বাদেই বাড়ি থেকে তিন্নি ফোন করল। ওর সাথে ঘন্টাখানেক বকবক করল। বেচারার খুউব মন খারাপ। সে এমন একটা সময়ে ছাড়া পেয়েছে, যখন অন্য সবাই ব্যস্ত। কেউ নিজেদের সংসার রেখে তৎক্ষণাৎ আসতে পারছে না।তার বড় দুই বোন বাচ্চাকাচ্চার স্কুল আর পড়াশোনার জন্য আটকে গেছে। রোদশীর শাশুড়ি অসুস্থ, তাই সে কিছুদিন পর আসবে বলেছে। এইদিকে ঝিলমিল আর রোদ্দুর, দু'জন তো একসাথে ফেভিকলের মত আটকে আছে। তিন্নির সাথে কথা শেষ করে ঝিলমিল রোদ্দুরকে বলল, 'তুই কি আর ছুটি পাবি না? চল না, আমরা এক সপ্তাহের জন্য ঘুরে আসি। আপু আর কয়দিন থাকবে? ওরে দেখি না কতদিন। প্লিজ, ছুটি নিয়ে নে।'
রোদ্দুর দৃষ্টি ফোনের স্ক্রিনে রেখেই বলল, 'হুম, অফিস তো তোর শ্বশুরের। দু'দিন পর তাই আমাকে ছুটি দিবে। আমি গিয়ে বলব, আব্বাজান আপনার একমাত্র বউমা আমাকে ছুটি দিতে বলেছে। দয়া করে যদি আমার ছুটি মঞ্জুর করতেন, তবে আপনার বউমা বাধ্য থাকত! কী তাই বলব গিয়ে?' রোদ্দুর এইবার ঝিলমিলের দিকে তাকাল।
ঝিলমিল বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, 'তোর জন্য আমিও আটকে গেলাম। ধুর, ভালো লাগে না কিছু।'
ঝিলমিল মন খারাপ করে উঠে গিয়ে জানালায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। রোদ্দুর ভাবল, কী করা যায়? বউয়ের এসব আবদার মেটাতে গেলে তো তাকে চাকরি-বাকরি ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে হবে। ভেবে ভেবে একটা উপায় অবশ্য বের করল। তবে তা বাস্তবায়ন করতেও দু'দিন সময় লাগবে। ঝিলমিলকে তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না, পরিকল্পনার পরিবর্তন'ও হতে পারে না। তখন তো আর ম্যাডামের চেহারার দিকে তাকানোই যাবে না, মুখটা একদম বাংলার পাঁচের মত করে রাখবে।
রোদ্দুর ঝিলমিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে উঁকি নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কাউকে দেখছিস নাকি?'
'না। কাকে দেখব আবার?'
'দেখার মানুষের অভাব আছে? তোর গার্লফ্রেন্ড আবার তোর টানে এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে কিনা কে জানে?'
রোদ্দুরের এসব বাঁকা কথায় ঝিলমিলের মাথা সবসময় গরম হয়ে যায়। তবে এখন সে হেসে ফেলল। শুধু চোখমুখ জুড়ে হাসি খেলে গেল, মুখে কিছু বলল না। রোদ্দুর জিজ্ঞেস করল, 'হাসছিস কেনো?'
'তোর কথা শুনে।'
'হাসির মতো কোনো কথা বলেছি আমি? যেটা সত্যি সেটাই বললাম।'
'ওটা তো আমি আর আমার বান্ধবী মিলে দুষ্টুমি করছিলাম। বাড়িতে থাকতে শিউলিকে নিয়েও এইরকম দুষ্টুমি করেছি। সাইফুল ভাই আছে না? তাকে চিনিস?'
রোদ্দুর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, 'হুম। তোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতো রাস্তায়। সম্ভবত তোকে পছন্দ করত।'
'আরে ওসব কিছুই না। বাড়িতে একবার বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, এইটুকুই। ওরে যে কতবার আছাড় খাওয়ালাম! আরেকবার তো এমন ধাক্কা দিয়েছিলাম যে ঠান্ডায় পানিতে পড়ে কুপোকাত হয়েছিল। উনি বুঝত আমরা এসব করছি, কিন্তু কিছু বলত না।'
রোদ্দুর মুখ কালো করে উত্তর দিল, 'তা বলবে কেন? বললে কি আর বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে পারে? ভালো ভালো। এসবই হচ্ছিল। ঠিক আছে, যা ইচ্ছে হয় তাই কর। আমার কি? আমি কে? আমি কেনো এখানে আছি? তুই'ই বা আছিস কেনো? যা যা, তোর ওই পেয়ারের সাইফুল ভাইয়ের কাছে যা।'
ঝিলমিল কপাল চাপড়াল। একটু আগে পর্যন্ত ছিল প্রেমিকা এখন আবার সাইফুল ভাইকে নিয়ে পড়েছে। কোন দুঃখে যে এই ব্যাটাকে সাইফুল ভাইয়ের ইতিহাস শোনাতে গিয়েছিল কে জানে?
কিছুদিন পর্যন্ত রোদ্দুরের যেরকম পর পর একটা ব্যবহার ছিল, এখন আর সেটা নেই। আবার আগের রূপে ফিরে এসেছে। ওর ঠিক নাই, শুধু গিরগিটির মতো রূপ বদলায়। এইতো এখন আবার মুখ ফিরিয়েছে সাইফুল ভাইয়ের কথা শুনে। ঝিলমিল ছেড়ে দিল, একটু পর নিজেই আবার আসবে ভাব জমাতে।
.
মাঝখানে কিছুদিন ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল। রোদ্দুরের কাজের ব্যস্ততা যেমন ছিল, তেমনি বাসা পরিবর্তনের ঝামেলাও ছিল। ঝিলমিল এইরকম পরিস্থিতির মধ্যে কখনো পড়ে নাই তাই ওর কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বিরক্তিকর কাজ হলো এই বাসাবাড়ি পরিবর্তন করা। দু'টো দিনেই অতীষ্ঠ হয়ে উঠল। নতুন বাসায় এসে কোথায় কি রেখেছে কিছুই মনে পড়ছে না, এত জিনিসপত্রের মধ্যে দরকারি জিনিস খুঁজেও পাচ্ছে না।
রোদ্দুর মনে মনে বলল, 'এইবার মজা বুঝবা চান্দু। আমার সাধের বাসা আমাকে দিয়ে ছাড়িয়েছ না, করো করো এইবার সব নিজেই করো। যা ইচ্ছে হয়, যেভাবে ইচ্ছে হয়।'
বাড়তি এই কাজের জন্য রোদ্দুর সময় পাচ্ছে না একটুখানি সময় নিজেকে দেওয়ার জন্য। তাই আজ ঝিলমিলখে সব ঠিকঠাক করতে বলে, নিজে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাইরে এসে ভালো লাগছে, আলাদা রিফ্রেশমেন্ট। সে নিশ্চিত, ঝিলমিল পাঁচ মিনিট পার হতে না হতেই ফোন করা শুরু করে দিবে। রোজকার মত সেই একই কথা, কোথায় আছিস? কার সাথে? বাড়ি ফিরবি কখন? আমার একা একা ভালো লাগছে না। নতুন বাসাটা কেমন অদ্ভুতুড়ে। তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়।
রোদ্দুর অবশ্য বিরক্তবোধ করে না। শুধু আগুনে ঘি ঢেলে ঝিলমিলকে রাগিয়ে দেয়। কাজের ব্যস্ততার জন্য সাইফুলের কথাটা ভুলে গিয়েছে, এই শান্তি।
ঝিলমিল অবশ্য আজ রোদ্দুরকে ফোন করল না। বাসায় কথা বলতে বলতে যতটুকু পারল গুছিয়ে রাখল। গত দুইদিন ধরে তো এসব'ই করছে, মাথা ধরে গেছে একদম।
বিছানায় বসতেই কলিংবেল বেজে উঠল, রোদ্দুর এসেছে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিল। রোদ্দুর দ্রুত গলায় বলল, 'এখন সাতটা বাজে। দশ মিনিটের মধ্যে নিজে রেডি হয়ে কাপড়চোপড় রেডি করে ফেল। বাড়ি যাব।'
কী কারণ কিংবা বিস্তারিত কোনোকিছুই ঝিলমিল জিজ্ঞেস করল না। বাড়ি যাওয়ার কথা শুনেই সে খুশি। একদম ১০ মিনিটে সবকিছু রেডি করে ফেলল। তারপর বেরিয়ে পড়ল।
পথিমধ্যে রোদ্দুরকে বলল, 'আমরা যে বাড়ি যাব এটা কি কেউ জানে?'
'তুই কি কাউকে জানিয়েছিস?'
ঝিলমিল মাথা নেড়ে 'না' বলল। রোদ্দুর উত্তর দিল, 'তাহলে কেউ জানে না।'
'ভালো হয়েছে। আমাদের দু'জনকে দেখলে সবাই কতটা সারপ্রাইজড হয়ে যাবে একবার ভাব! আমার তো ভীষণ মজা লাগতেছে। তিন্নি আপু আছে, কাল নাকি আপুও আসবে। উফফফ, সবাই মিলে আবার কতদিন পর!' উচ্ছাসিত ভঙ্গিতে বলল ঝিলমিল।
'আসছে সেলিব্রেটি! কী এমন হয়ে গেছে যে ওনাকে পেলে সবাই লাফালাফি করবে। আমাকে দেখ। আমি আগে থেকে বাড়ি গেলেই সবাই আমাকে নিয়ে মাতামাতি করে। এইবার'ও তাই করবে, দেখে নিস।'
'না আমি চোখ বন্ধ করে থাকব। মানুষের আলগা পিরিত দেখতে পারব না। আসলে তুই অনেকদিন পরপর যাস তো, তাই সবাই একটু দেখানোর জন্য তোর সাথে নাটক করে। আসলে তোর প্রতি মন থেকে কারো ভালোবাসা নেই। কী আর করবে? এখন একমাত্র ছেলে বলে তো ছেলেও দিতে পারে না, লোকে খারাপ বলবে না। তাই তোকে চুপচাপ সহ্য করে নেয়, মাঝে মাঝে ওই একটুআধটু ভালোবাসা দেখায়। আমি সব সময় সবার কাছাকাছি ছিলাম, তাই তোর থেকে আমার প্রতি ভালোবাসা এমনিতেও বেশি হবে ওমনিতেও বেশি হবে। আমার ওত লোক দেখানো ভালোবাসার শখ নাই।' ঝিলমিল মুখ ঝামটে বলল।
রোদ্দুর ওর দিকে সরু চোখে তাকিয়ে রইল। দুইজনের এই তর্কাতর্কির মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল। শীতের প্রকোপটা মোটামুটি কমে এসেছে, তবে এইখানে ভালোই ঠান্ডা। রোদ্দুর ঝিলমিলের হাত চেপে ধরল। এখানে এলেই আগেরকার ভয়াবহ স্মৃতিটা মনে পড়ে। ঝিলমিলকে আর কোনোভাবেই হারাতে চায় না সে। আঁকাবাঁকা পথঘাট বেরিয়ে বাড়ি পৌঁছাল দু'জন। রাস্তা থেকেই উত্তরের বারান্দায় তিন্নিকে দেখতে পেল ঝিলমিল। ওখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠল। ঝিলমিলকে দেখামাত্র তিন্নিও উচ্ছ্বাসে চেচিয়ে উঠল। আশেপাশের বাসার থেকে কয়েকজন উঁকিঝুঁকি মারল, কাহিনী কি দেখার জন্য। যখন দেখল এটা মসলা বিহীন সাধারণ একটা ঘটনা, তখন আবার নিজেদের বাড়ি চলে গেল।
তিন্নি নিচে নেমেই হুড়মুড় করে এসে ঝিলমিলকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'ইশশশ, মেয়েটা একদম আগের মতই আছে। কতদিন পর দেখলাম, বল তো!' তারপর রোদ্দুরকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'আর তুই? তুই তো দেখি দিনকে দিন সুন্দর হচ্ছিস। বাব্বাহ, বিয়ের বাতাস ভালোই লেগেছে তোর গায়ে।'
রোদ্দুর হাসল, লাজুক হাসি। তৎক্ষণাৎ হাসিটা চেপে যাওয়ার চেষ্টা করলে। এই বয়সে এইরকম লাজুক হাসি মানায় না।
ওরা ভেতরে যেতেই সকলে হৈ হৈ করে উঠল। রোদ্দুর মাত্র একটু শান্তিমত বসতে পারল। এই কয়েকদিনে তার উপর দিয়েও প্রচুর ধকল গেছে। সবার সাথে কথাবার্তা শেষে তিন্নি ওদের টেনে নিয়ে ছাদে এলো। রোদ্দুর বলল, 'তোমরা যাও, আমি আব্বুর সাথে দেখা করে আসছি।'
ওরা সকলে একটা পাটি বিছিয়ে বসে পড়ল। চাঁদের আলো খুব প্রকোট নয়। রিমঝিম ফোনের ফ্লাশ জ্বালিয়ে কিছুটা দূরে রেখে দিল। তারপর এসে ঝিলমিলের পাশে বসল।
তিন্নি জিজ্ঞেস করল, 'তো বল ঝিলমিল, ভাইয়াকে ছাইয়া বানিয়ে তোর কেমন অনুভূতি হচ্ছে? আমি যখন প্রথম তোদের বিয়ের খবরটা শুনলাম, আমার তো পুরো অ্যাডভেঞ্চারের মতো লেগেছিল। ভেবেছিলাম তোরা দুইটা হয়ত চুপিচুপি প্রেম করছিস। পরে রিমঝিমের থেকে জানতে পারি, একরকম জোর করেই তোদের বিয়ে হলো। এখন কি অবস্থা? সংসার জীবন কেমন লাগছে?'
ঝিলমিল একটু ভেবে বলল, 'বুঝতে পারছি না। রোদ্দুর কেমন তা তো তোমরা ভালো করেই জানো।'
তিন্নি বলল, 'রোদ্দুর আমাদের কাছে যেরকম, তোর কাছে তো আর সেইরকম না তাইনা? তোর কাছে তো নিজেকে আলাদাভাবেই প্রকাশ করবে।'
'আমার কাছে তো আলাদা মনে হয় না।' পরক্ষণেই গমগমে গলায় বলল, 'ও হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু আলাদা আছে বটে। মানে ভীষণ অভদ্র, ফাজলামি করতে করতে চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়।'
তিন্নি মুখে এক গাল হাসি ফুটিয়ে বলল, 'ওহ আচ্ছা। এখন তো টুকটাক দুষ্টুমি, অভদ্রতামি আর অসভ্যতামি হবেই। তুই আবার এইটাকে এত বড় করে দেখছিস? পাগলী মেয়ে.....'
বলতে বলতে রোদ্দুরের উপস্থিতি ঘটল। আড্ডা জমার সুযোগ মিলল না। নিচ থেকে খাওয়ার জন্য ডাকাডাকি শুরু করল। প্রথমবার 'না' করে দিয়েছিল, কিন্তু বড় চাচা যখন ডাকতে এলো তখন সুড়সুড় করে একেকজন নিচে নেমে গেল। অনেকদিন পর খাওয়ার সময় এত গল্পগুজব হলো। খাবে কি, এরা নিজেদের পেটের কথা বলেই কুল পাচ্ছে না।
সকলে হেসে বলাবলি করছে, 'আমরা আজ নিজেদের কথা বলে পেট ফাঁকা করে নিই, তারপর না হয় খাবার খাব। এখন ভরা পেটে খেতে পারছি না তো।' বলেই হো হো করে হাসি। তাদের সাথে তাল মিলিয়ে অনেকদিন পর তানিশার মুখেও হাসি ফুটল।
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হতে হতে অনেক রাত হলো। যে যার মত নিজেদের ঘরে চলে এলো। ঘুমের সময় ঝিলমিলের সাথে রোদ্দুরের আর আলাদাভাবে কথা হলো না। দু'জন দু'দিক ফিরে আপনমনে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালবেলা ঝিলমিলের ঘুম ভাঙ্গল, খুটখাট শব্দে। ঘুম ভেঙ্গে রোদ্দুরকে দেখতে পেল, সে রেডি হচ্ছে। ঝিলমিল ঘড়ির দিকে তাকাল, ভোর সাড়ে পাঁচটা। ভাবুক দৃষ্টিতে রোদ্দুরের দিকে তাকাল। তার এইদিকে হুঁশ নেই। ঝিলমিল উঠে বসে বারুদের মত ঝলসে উঠা খিটখিটে সুরে বলল, 'এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস?'
রোদ্দুর ফিরে তাকিয়ে বলল, 'আমার অফিস আছে না? এজন্যই তো রাতে এসেছিলাম, আর এখন ফিরছি।'
ঝিলমিল আশ্চর্য হয়ে বলল, 'তুই যে চলে যাবি আমাকে তো আগে বলিস নাই। কয়েকটা দিন ছুটি নিয়ে আসতে পারলি না? একটুখানি সময়ের জন্য এসে কি হলো? তোকে এই সকালে কিছু যেতে দিবে ভেবেছিস?'
'কাল রাতেই মায়ের সাথে আমার কথা হয়েছে। কিছু করার নেই। তুই কিছুদিন থেকে যা। যখন যাওয়ার ইচ্ছে হবে তখন আমাকে ফোন করিস, আমি এসে নিয়ে যাব।'
'মানে তোকে আমি অন্য কোন কারণে ফোন করতে পারব না আর?' গলা উঁচু করে বলল ঝিলমিল।
রোদ্দুর ঘুরে তাকাল। ঠোঁটের আগায় মৃদু সজীব হাসি, চোখজুড়ে চকচকে দৃষ্টি। ঝিলমিলের পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বেশ নম্র কণ্ঠে বলল, 'যখন ইচ্ছে তখন ফোন করিস। এখন আসছি। এখানে একটু ভালোভাবে চলাফেরা করিস, সাবধানে থাকিস। একা একা বাড়ির বাহিরে বের হওয়ার কোনো দরকার নেই। সবাই তো আছেই, সময় মন্দ কাটবে না।'
ঝিলমিলের চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করল, 'সময় মন্দ কাটা অথবা ভালো কাটা এত দূরেই থাক, তোকে ছাড়া সময় কাটবে কিনা সেটা নিয়েই সন্দেহ।' কিন্তু বলা হলো না। রোদ্দুর বিদায় নিয়ে চলে গেল। ও চলে যাওয়াতে ঝিলমিলের এত খারাপ লাগল, যা বলার মত নয়। লম্বা একটা দূরত্ব হবে, রোদ্দুর সহজে এখানে আসবে না আর। যাওয়ার আগে কী সুন্দর আদুরে কণ্ঠে কতকগুলো উপদেশ দিয়ে গেল। সবসময় যদি এইরকম হাসিমুখে থাকে, এইরকম স্বচ্ছ আর টলটলে সম্পর্ক বজায় রাখে তাহলে যেকোনো মুহূর্তে ঝিলমিল ওর বুকের মধ্যে মথিত শ্বাসটা ছেড়ে দিয়ে তার মনের কথাটা বলে আত্মসমর্পণ করে ফেলবে এক লহমায়।
.